আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং

সুশান্তের মৃত্যু: স্টিং অপারেশনে রিয়ার বিরুদ্ধে বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৮-০২ ১০:০৮:১২

সিলেটভিউ ডেস্ক :: যত সময় এগোচ্ছে, সুশান্ত সিংহ রাজপুতের মৃত্যুরহস্যে ‘স্বজনপোষণ’-এর পাশাপাশি অভিযোগের আঙুল দৃঢ় হচ্ছে রিয়া চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। এই পালাবদল স্পষ্ট করে ধরা পড়েছে সম্প্রতি সুশান্তের বাবা কে কে সিংহ পটনায় রিয়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্য-সহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার পর।

এবার রিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের তীরকে আরও তীক্ষ্ণ করল একটি ভারতীয় চ্যানেলের স্টিং অপারেশন। সেখানে চ্যানেলের সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে কথা বলেছেন সুশান্তের ফিটনেস ট্রেনার (শরীরচর্চা প্রশিক্ষক) সমীর আহমেদের সঙ্গে।

গত পাঁচ বছর সমীরের তত্ত্বাবধানে শরীরচর্চা করেছেন সুশান্ত। পেশাদার সম্পর্কের বাইরে তিনি সুশান্তের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন বলে জানান সমীর। তার বিস্ফোরক দাবি, সুশান্ত কী ওষুধ খাবেন, সেটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন রিয়া।
ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে রিয়া তার আবেদনে জানিয়েছেন, সুশান্ত অবসাদের শিকার ছিলেন এবং দীর্ঘ দিন ধরে মানসিক অবসাদের ওষুধ খাচ্ছিলেন। কিন্তু সত্যিই কি পর্দার এম এস ধোনি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন? এ প্রশ্ন এবার উঠে আসছে ট্রেনার সমীরের বক্তব্যেও।

স্টিং অপারেশনে তিনি দাবি করেছেন, সুশান্তের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল গত ১ জুন। তার আগে ২৯ মে নিজের মাকে হারিয়েছিলেন সমীর। সে কথা জানতে পেরে নিজেই তাকে ফোন করেছিলেন সুশান্ত।

ফোনে কথা বলার সময় সুশান্ত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলেন বলে দাবি সমীরের। যেকোনও প্রয়োজনে সমীর আসতে পারেন তার কাছে, এমন আশ্বাসও নাকি এসেছিল বড় পর্দার সত্যান্বেষীর কাছ থেকে। সেই ‘স্বাভাবিক’ সুশান্ত কীভাবে নিজেকে শেষ করে দিতে পারেন মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে? হিসাব মেলাতে পারছেন না সমীর। পারছেন না অনেকেই। এখনও অবিশ্বাসের ঘোর কাটছে না সুশান্তের পরিজনদের।

তার বোনের বক্তব্য, গত ৮ জুন তিনি রিয়ার ফোন পান। রিয়া তাকে জানান, সুশান্তের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছে। তিনি সুশান্তের বাড়ি ছেড়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজের বাড়িতে। যাওয়ার সময় রিয়া তার নিজের এবং সুশান্তের কিছু জিনিস নিয়ে যান বলে দাবি সুশান্তের বোনের। তিনি আর ফিরতে নাও পারেন, এমনও নাকি জানিয়ে গিয়েছিলেন রিয়া।

রিয়ার অনুরোধমতো সুশান্তের কাছে এসে কয়েক দিন ছিলেনও তার বোন। কিন্তু চার দিন সুশান্তের অ্যাপার্টমেন্টে থাকার পর তার বোন গত ১২ জুন নিজের বাড়িতে ফিরে যান। তার ঠিক দু’দিন পর তার ভাইয়ের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়।

তিনি যে গত এক বছর সুশান্তের সঙ্গে ছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন রিয়া নিজেও। সুপ্রিম কোর্টেও তিনি জানিয়েছেন, সুশান্তের সঙ্গে তার লিভ ইন সম্পর্কের কথা। কিন্তু তিনি বারবার দাবি করেছেন, সুশান্তের মৃত্যুর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। রিয়া জোর দিয়েছেন সুশান্তের অবসাদ এবং সেই সংক্রান্ত চিকিৎসার ওপর।

কিন্তু এই ‘ওষুধ’-এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন ট্রেনার সমীর। তার প্রশ্ন, ওষুধ দেওয়ার আগে কি সুশান্তের সঙ্গে কথা বলেছিলেন চিকিৎসক? মানসিক অবসাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসক-রোগী কাউন্সেলিং বিশেষ প্রয়োজন। সেটা কি সুশান্তের বেলায় হয়েছিল? প্রশ্ন সমীরের।

তার ক্লায়েন্ট কী ওষুধ খাচ্ছেন, সেটা একজন ফিটনেস ট্রেনারের জানাটা খুবই জরুরি। সেইমতো তিনি ফিটনেস রুটিন ঠিক করেন। কিন্তু সুশান্তের ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক সমীরের দাবি, অভিনেতা কী ওষুধ খেতেন, সেটা জানতেন একমাত্র রিয়া।

শরীরচর্চার ক্ষেত্রে সুশান্ত যে খুব ভাল এগোচ্ছিলেন, সে কথা জানিয়েছেন সমীর। তবে নায়কের ব্যক্তিগত পরিসরে যে একটা বড় পরিবর্তন হয়েছিল, টের পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন সমীর। বেশ কয়েক বছর তারকাকে কাছ থেকে দেখা এই অভিজ্ঞ ট্রেনারের দাবি, সুশান্তের জীবনে রিয়া আসার পরই সব পাল্টে যেতে থাকে।

এই পরিবর্তনের জেরে তাদের ছেলে যে জীবন শেষ করার দিকে এগোচ্ছেন, সে কথা বিন্দুমাত্র টের পাননি সুশান্তের বাড়ির লোকজন। গত ২১ জানুয়ারি বিহারে, নিজের পারিবারিক বাড়িতে জন্মদিন কাটিয়েছিলেন সুশান্ত। কিন্তু সে সময় তার মধ্যে মানসিক অবসাদের কোনও লক্ষণ দেখতে পাননি পরিজনরা।

এমনকি, পরিবারের দাবি, রিয়া চক্রবর্তীর সঙ্গে সুশান্তের প্রেম নিয়ে কিছুই জানতেন না তারা। রিয়াকে তারা কখনও দেখেননি এবং সুশান্তের মুখেও কখনও রিয়ার নাম শোনেননি৷ সুশান্তের বাবার অভিযোগ, সুশান্ত আগে যে বাড়িটায় বাস করতেন সেখানে ভূতপ্রেত আছে বলে সেই বাড়ি তাকে ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন রিয়া৷ সুশান্তের ‘মানসিক অবসাদ’-এর চিকিৎসাও নাকি করতেন রিয়ার পরিচিত চিকিৎসক।

তদন্তে নেমে বিহার পুলিশ জানতে পেরেছে, সুশান্তের ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার পুরনো লোকদের সরিয়ে দেন রিয়া। পরিবর্তে, সুশান্তের চারপাশে রিয়া নাকি রেখেছিলেন নিজের লোক। পুরনো ভৃত্য, রাঁধুনিকে খারিজ করেন রিয়া। লকডাউনের আগে পরিবর্তন করেন সুশান্তের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীকে। কেন? ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের।

তারা কথা বলেছেন সুশান্তের এই সাবেক কর্মচারীদের সঙ্গে। বিহার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পুরনো পরিচারক ও রাঁধুনি জানিয়েছেন, সুশান্তকে নিজের অঙ্গুলিহেলনে চালাতে ভালবাসতেন রিয়া। তিনি কী ওষুধ খাবেন, সেটা দেখাশোনা করতেন নিজে। এমনকি, সুশান্ত কোনও কোনও সময় ওষুধ খেতে ভুলে গেলে রিয়া নাকি নিজেই ওষুধ তুলে দিতেন তার হাতে। পুলিশের কাছে জানিয়েছেন সুশান্তের সাবেক পরিচারক ও রাঁধুনি।

আত্মহত্যায় প্ররোচনার পাশাপাশি রিয়ার বিরুদ্ধে সুশান্তের টাকা আত্মসাৎ করারও অভিযোগ তুলেছেন কে কে সিংহ। তার অভিযোগ, সুশান্তের একটি অ্যাকাউন্টে ১৭ কোটি টাকার মধ্যে ১৫ কোটি টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছিল এমন এক অ্যাকাউন্টে, যার সঙ্গে সুশান্তের কোনও সম্পর্ক নেই।

অন্যদিকে, আরেকটি সংবাদমাধ্যমে সুশান্তের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, সুশান্তের অ্যাকাউন্ট থেকে রিয়ার অ্যাকাউন্টে কোনওদিন বড় অঙ্কের টাকা ট্রান্সফার হয়নি।

তবে আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গে সুশান্তের বাবা কে কে সিংহের অভিযোগকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ইডি। বিহার পুলিশের কাছে কে কে সিংহ যে এফআইআর দায়ের করেছেন, তার একটি কপি দেখতে চেয়েছে ইডি।

রিয়া, তার ভাই-সহ পরিবারের মোট ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এফআইআর-এ। আর্থিক প্রতারণার পাশাপাশি সুশান্তকে মানসিক নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার দায়েও অভিযুক্ত করা হয়েছে চক্রবর্তী পরিবারকে।

এই মামলা পাটনা থেকে মুম্বাইয়ে সরানো হোক, ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে এই মর্মে আবেদন করেছেন রিয়া। অভিনেত্রীর সংশয়, বিহার পুলিশ তদন্ত করলে তিনি সুবিচার পাবেন না।

সেই সঙ্গে এই ঘটনার সিবিআই তদন্তের জন্য টুইটারে অমিত শাহের কাছে আবেদন করেছেন রিয়া। জানিয়েছেন, তিনি চান সুশান্তের রহস্যমৃত্যুতে সত্য প্রকাশিত হোক। তবে সুপ্রিম কোর্টের পাশাপাশি মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকেও সিবিআইকে তদন্তভার দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।

চুপ করে নেই রিয়াও। তিনিও পাল্টা অভিযোগ এনেছেন সুশান্তের পরিজনদের বিরুদ্ধে। রিয়ার অভিযোগ, তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত করছেন সুশান্তের আত্মীয়রা। তাছাড়া, সুশান্তের বন্ধু সিদ্ধার্থ পিঠানিকেও নিজের বয়ানে তার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে জোর করা হয়েছে বলে দাবি অভিনেত্রীর।

রিয়ার দাবি, মুম্বাই পুলিশকে একটি ইমেল করেছেন সিদ্ধার্থ। সেখানে তিনি অভিযোগ করেছেন, গত ২২ জুলাই কনফারেন্স কলে তার সঙ্গে কথা বলেন সুশান্তের বোন মিতু এবং তার স্বামী আইপিএস অফিসার ওপি সিংহ। সেখানে আইপিএস সিংহ জানতে চান রিয়ার সম্বন্ধে। সুশান্তের সঙ্গে রিয়া যখন লিভ ইন করছিলেন, সে সময়কার খরচের বিশদ হিসাবও চেয়ে পাঠান।

মুম্বাই পুলিশকে পাঠানো সিদ্ধার্থের ইমেলে নাকি আরও একটি ফোন কলের উল্লেখ আছে বলে দাবি রিয়ার। সেই ফোন তিনি নাকি পেয়েছিলেন ২৭ জুলাই। ফোনের ওপারে আইপিএস সিংহ নাকি সিদ্ধার্থকে বিহার পুলিশের কাছে রিয়ার বিরুদ্ধে বয়ান দিতে বলেন। তাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও মুম্বাই পুলিশকে জানিয়েছেন সিদ্ধার্থ।

সব মিলিয়ে, সুশান্ত কাণ্ডে এখন বেশ কোণঠাসা রিয়া। রিয়ার ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় এসেছে সুশান্তের সাবেক প্রেমিকা অঙ্কিতা লোখান্ডের সাম্প্রতিক বক্তব্য। তার দাবি, সুশান্ত তাকে বলেছিলেন, রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে তিনি খুশি নন। সাবেক প্রেমিকের সঙ্গে নিজের চ্যাটের ছবিও সুশান্তের পরিবারকে দিয়েছেন অঙ্কিতা।

‘স্বজনপোষণ’, ‘অবসাদ’-এর মতো সম্ভাবনাকে ছাপিয়ে এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় খলনায়িকা রিয়া-ই। বিশেষ করে সাম্প্রতিক স্টিং অপারেশনের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, তা হলে কি সুশান্তের অপমৃত্যু আসলে ধীরে ধীরে পরিকল্পিত একটি পরোক্ষ হত্যা? সূত্র: আনন্দবাজার

সিলেটভিউ২৪ডটকম/২ আগস্ট ২০২০/ডেস্ক/মিআচৌ

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন