আজ রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

ইন্দানগর সবুজ টিলার ভাঁজে

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-০৯-০৭ ২২:৪৪:৫৭





::  মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন ::


মাঝে মাঝে ভুল করে এমন কিছু জায়গাতে ঢুকে পড়ি, শাপে বর হয়ে যায়। আবাল্য ঘুরাঘুরির অভ্যাসটি থাকার কারনে এই রকম অনুভূতি জীবনে বহুবার হয়েছে। তেমনি এক অনুভূতি আমাকে রোমাঞ্চিত শিহরিত করে তুললো সেপ্টেম্বরের এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল পূর্বাহ্নের সময়টুকুতে। ভুল করে অজায়গাতে ঢুকে পড়ার বিড়ম্বনা পোহাবার অভিজ্ঞতাও অকিঞ্চিতকর। তবে গলাকাটা বা চোর-ডাকাত আন্দাজ করে দৌড়ানি কিংবা গণপিটুনির মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা যে এখনো হয় নি, সেটা অবশ্যই ভাগ্যের কথা।

দিনকাল যা পড়ছে, একদিন হলেও হয়ে যেতে পারে দুর্ভাগ্যজনক সেই অভিজ্ঞতার উদ্ভব। সেদিন আসার আগ পর্যন্ত ঘুরেফিরে চোখ জুড়োনো আর হৃদয়ে পরম প্রশান্তির আমদানি চলছে, চলতে থাকুক। খাসিয়ারা সন্ধ্যা নামলেই পুঞ্জিতে যে তীর-ধনুক হাতে অপেক্ষা করে সেটাও কম আতংকের নয়।

ইন্দানগর চা-বাগানের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই বিস্তৃত সবুজের হাতছানি। ফেঞ্চুগঞ্জের শাহজালাল সারকারখানার ইঞ্জিনিয়ার জাহিদ,  প্রায় তিন বছর ধরে আছে। সেখানে আমার বেড়াতে গিয়ে ঘুরতে বের হওয়া। চা-বাগানের সীমানা দিয়েই মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার শুরু আর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার শেষ। তো এমন একটি পয়েন্টে দাড়িয়ে একটি বিশেষ অনুভূতি হবে সেটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু চমকের শুরু এরপর থেকে।

চা-বাগান ধরে হাটতে শুরু করার পরই দুইজন খর্বকায় মানুষ চ্যালাকাঠের ভারী দুই স্তূপ কাঁধে ঝুলিয়ে হনহন করে চলে গেলো আমাদের পাশ দিয়ে। আমরা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম তাদের দিকে। ঘন ঘন টিলার সারি আর অপরিসর সমতলভূমি জুড়ে নিশ্ছিদ্র চা-গাছের বিস্তার। সবুজে সবুজে সয়লাব। কোথাও ফাঁকা নেই, সবুজ ব্যতিত আর কোনো রঙ নেই এখানে। সূর্যের সাদা আলো দিনের উজ্জ্বলতা মাখিয়ে প্রগাঢ় করেছে সেই সবুজকে।

চা-বাগানের দুইটি অংশ। উত্তরভাগ ও ইন্দানগর। এটি রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নে পড়েছে। দক্ষিণ ও পূর্বদিকে দুইটি পাকা রাস্তা চলে গেছে। জাহিদ আর আমি প্রথমেই ধরলাম পূর্বদিকের পথ। পথটা চলে গেছে ইন্দানগর পানপুঞ্জির টিলার দিকে। দুইপাশে সবুজ চা-গাছ দিয়ে মোড়ানো টিলার সারি রেখে আঁকাবাঁকা পথ ধরে যেতে যেতে গভীর জঙ্গলের অনুভূতি আসে মনে।

বাঁশ-বাগান আর কাঠের গাছের সারি ধরে ঘন সুনিবিড় নিসর্গের পরিবেশ। ছায়া ও রোদে মিলে চিকচিক করছে চারদিক। খাসিয়াদের মাত্র সতেরটি ঘরের বসবাস পানপুঞ্জির টিলায়। টিলার গায়ে খাঁজকাটা সিঁড়ির পথ ধরে উপরে উঠতে উঠতে একেবারে হাঁপিয়ে উঠলাম। শ্বাস পড়ছে ঘনঘন। এত উচুতে নিত্য আসা-যাওয়া করা মানুষগুলো খুবই পরিশ্রমী।

খাসিয়াদের বসতভিটা দেখার মধ্যে একটি বিশেষ আকর্ষণ থাকে সব সময়। বার্মিজ পোশাকে আবৃত মহিলাগণ ঘরের বারান্দায় বসে পান-পাতার গোছগাছ করছে, পরিষ্কার উঠোন, ছিমছাম-পরিপাটি আঙিনা এবং শিশুর সারল্য নিয়ে মানুষগুলোর চকিত চাহনী। টিলার উপর উঠতেই চোখে পড়তে লাগলো। উঠোন আর ঘরের মেঝের পরিচ্ছন্ন পরিসরটুকু খাসিয়াদের নান্দনিকতাবোধের স্মারক হয়ে বিরাজমান থাকে।