আজ রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ ইং

বিশ্ব শিক্ষক দিবস: মেধাবী তরুণ শিক্ষক ও পেশার ভবিষ্যত

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-১০-০৫ ১৭:৩৮:৪৩

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর এ দিবসটি উদযাপিত হয়। বিশ্বের শিক্ষকদের অবদান স্বীকার, তাদের মূল্যায়ন এবং এগিয়ে নেয়াসহ শিক্ষক ও শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ইউনেস্কো দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। এ বছর সংস্থাটির সদস্যভুক্ত ১০০ দেশে ৪০১টি শিক্ষক সংগঠন দিবসটি উদযাপন করছে।

ইউনেস্কো এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘তরুণ শিক্ষক: পেশার ভবিষ্যত’। বাংলাদেশেও শুরু থেকে প্রতিবছরই এ দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। তবে কখনোই সরকারিভাবে দিবসটি উদযাপিত হয়নি। অন্যান্য বছরের মতো এবারও বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি আয়োজন করেছে।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড আর শিক্ষার মেরুদন্ড হলো শিক্ষক। একটি দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, টেকসই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষক একজন শিল্পীর ন্যায় মানব মনের সহজাত প্রবৃত্তি বা শক্তি ও সুপ্ত সম্ভাবনার পরিস্ফুটন ঘটিয়ে সত্যিকারের মানুষ তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকেন। বিষয়বস্তু পাঠদানের মাধ্যমে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ, নৈতিকতাবোধ, কায়িক শ্রমের মর্যাদা, নেতৃত্বের গুণাবলী, সৃজনশীলতা, সামাজিক অগ্রগতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অপরিহার্য কুশলী হিসেবে সম্পৃক্ত থাকেন। তাই একজন শিক্ষককে হতে হবে ধী-শক্তির অধিকারী, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা হবে তার চলার পথের পাথেয়।

ভবিষ্যতে যারা দেশ চালাবেন তাদের জন্য যদি এখনই সুশিক্ষা নিশ্চিত করা না যায় তাহলে দেশের অগ্রগতি অর্জন দূরে থাক, দেশ অনেক পিছিয়ে পড়বে। সুশিক্ষা নিশ্চিতকরণের প্রধান নিয়ামক হল সুশিক্ষক। সুশিক্ষক বা আদর্শ শিক্ষক নিশ্চিত না করে সুশিক্ষার অন্য সব উপাদান নিশ্চিত করলেও সুশিক্ষা কখনো সুসম্পন্ন হবে না। দেশের যে কোন খাতের কর্মবীরদের প্রাথমিক ভিত্তিটা রচিত হয় শিক্ষকের হাতেই। এই কারণে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কী রকম শিক্ষক নিশ্চিত করতে পারছি, তার ওপর।

আজকাল প্রায়ই শোনা যায়, এখন আর আগের মতো মেধাবী, যোগ্য ও দায়িত্বশীল শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষাখাতের বর্তমান এই চিত্র যদি হতাশাজনক হয়, তাহলে এই খাতের ভবিষ্যৎ চিত্র হবে রীতিমতো ভয়াবহ বা আতঙ্কজনক। নানাবিধ কারণে শিক্ষকতা আজ এতটাই অনাকর্ষণীয় আর গুরুত্বহীন পেশায় পরিণত হয়েছে যে, ন্যূনতম মেধা আর যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলেমেয়েরাও আজ আর শিক্ষক হতে চায় না। ফলে শিক্ষকতা আজ সমাজের পরিত্যক্ত ও প্রান্তিক পেশায় পরিণত হয়েছে। যারা আজ এ পেশায় আসছেন, তাদের অধিকাংশই অনন্যোপায় হয়ে এ পেশায় আসছেন। একান্ত অনন্যোপায় ও অনিচ্ছুক এইসব পেশাজীবী (শিক্ষক) দিয়ে কোনভাবেই শিক্ষার্থীদের আদর্শ শিক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। এই সুযোগে অনেকে তাদের ছেলেমেয়েকে বিদেশি কারিকুলাম ও সিলেবাস অনুযায়ী বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত ব্যয়বহুল ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু সেই সামর্থ্য তো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর নেই। আর সামর্থ্য থাকলেও আদর্শিক বিবেচনায় এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও জাতির ভবিষ্যৎ স্বার্থ সুরক্ষায় এটা সঠিক পন্থা বা উপযুক্ত সমাধান হতে পারে না।

একজন শিক্ষার্থীর মনোজাগতিক চিন্তাধারা, চেতনা, প্রবৃত্তি ও মানস গড়ে ওঠে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালে। ফলে এই স্তরে শিশুদের আদর্শ শিক্ষক দ্বারা সুশিক্ষাদান করানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ্য মেধাবীদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। একইভাবে দেশের ৯৮ শতাংশ শিক্ষার মূল দায়িত্ব পালনকারী বেসরকারি শিক্ষকরা আজ নানাভাবে উপেক্ষিত। আর্থিক সুযোগ-সুবিধা থেকে এখনো শিক্ষকগণ বঞ্চিত। এখনো পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাড়া, চিকিৎসাভাতা, উৎসবভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং টাইম স্কেল ও প্রমোশন প্রভৃতির ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষদের মধ্যে চরম বৈষম্য। অর্থাৎ এখনো শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়নি। এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতির অশুভ হস্তক্ষেপে প্রতিদিন চাকরিচ্যুত হচ্ছেন কিংবা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হচ্ছেন এ দেশের বেসরকারি শিক্ষকগণ। আইনের আশ্রয় চেয়েও বছরের পর বছর কোন প্রতিকার পাচ্ছে না এসব শিক্ষক। বেসরকারি শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা ও হয়রানির প্রতিকারে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অভিভাবক হিসেবে জাতীয় বিশ্ব বিদ্যালয়ের কোন কার্যকর ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরেরও কোন কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত ভাবনাটা মূল্যায়ন করলেও আমরা শিক্ষা খাতের এই কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারব। যেমন : আমরা আমাদের সন্তানকে মোধাবী ও যোগ্য শিক্ষকের নিকট পড়াতে চাই। কিন্তু আমাদের অসাধারণ মেধাবী সন্তানটা শিক্ষক হোক, তা কিন্তু আমরা চাই না। কারণ আমরা জানি, যথাযথ সুযোগ-সুবিধা সে পাবে না, পাবে না একটা সম্মানিত উন্নত জীবন। তাহলে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষক কোথা থেকে আসবে? এ পেশার উজ্জল ভবিষ্যতের জন্য ইউনেস্কো এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে মেধাবী তরুণ শিক্ষকদের গুরুত্ব দিয়েছে।

কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদ বা গভর্ণিং বডি ও কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে একদিকে বেসরকারি শিক্ষকগণ কথায় কথায় চাকরিচ্যুতির ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে কাঙ্খক্ষিত শিক্ষা ও পাঠদানে মনোযোগী হতে পারছেন না। অন্যদিকে তরুণ মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বিধায় শিক্ষায় মেধাশূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশের অভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনে চলছে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। আইএলও এবং ইউনেস্কোর সনদ অনুযায়ী ‘সমযোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি সমান পেশায় নিয়োজিত থাকলে তারা সমান মর্যাদা ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত হবেন’। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ প্রত্যেক দেশে এই সনদের পরিপূর্ণ প্রতিফলন হয়েছে। অর্থাৎ এসব দেশে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের পেশাগত সমান মর্যাদা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। অথচ বারবার আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই দেশের শিক্ষক সমাজকে অতি কষ্টে বর্তমান অবস্থায় আসতে হয়েছে, যা অত্যন্ত পীড়াদায়ক ও অবমাননাকর এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সম্প্রতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘জনবল কাঠামো- ২০১৮’ নামে জারি করা আইনটি এই দেশের শিক্ষক সমাজের জন্য চরম অবমাননাকর ও বৈষম্যমূলক। এ অবস্থায় মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন মেধাবী শিক্ষক এই প্রতিপাদ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। এখন সময়ের দাবি হচ্ছে, মেধাবীরা এই পেশায় যাতে নিরুৎসাহিত না হয়, সে জন্য শিক্ষদের আত্মমর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি সকল বৈষম্যের অবসান।

সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুরূপ পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান প্রভৃতি ক্ষমতা সরকারি কর্মকমিশন, শিক্ষা অধিদপ্তর-বোর্ডও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে ন্যস্ত করা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে আরো কার্যকর ও জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জনবল কাঠামো বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক  বৈধভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত সকল শিক্ষকের এমপিওভুক্তিকরণ অত্যাবশ্যক। অনতিবিলম্বে এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণকে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য কোনো প্রকার শর্তারোপ বন্ধ করে জনবল কাঠামো ২০১৮ সংশোধন ও সংস্কার করতে হবে। পর্যায়ক্রমে সরকারি ও বেসরকারি সকল বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ ও সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে এই পেশায় উদীয়মান তরুণ প্রতিভার আকর্ষণ এর কোন বিকল্প নেই। তাহলেই বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০১৯-এর মূল প্রতিপাদ্যের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে।

ফারুক আহমদ, লেখক-শিক্ষক ও সাংগঠনিক সম্পাদক, বাকবিশিস সিলেট মহানগর।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •   শাবিতে 'প্লে ফর রাফা' ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন
  •   ‘জনগণ ভোট দিতে পারেনি’ বক্তব্যের জন্য মেননকে ধন্যবাদ ড. কামালের
  •   ‌‘পাল্টে যাবে’ শাহী ঈদগাহ
  •   অনুমতি মিললে খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন ড. কামাল
  •   সেই এমপি বুবলীকে স্থায়ী বহিষ্কার করল বাউবি
  •   ফারুক-মারুফ-শাওন-দিপু ছাড়াই বৈঠকে যুবলীগ
  •   মাকে দেখে ফেলে জীবনটাই গেল ছোট্ট ফাতেমার
  •   ছাতকে ৭টি স'মিলে মোটা অংকের জরিমানা
  •   ঘুরে দাঁড়িয়ে সিলেটের দারুণ জয়
  •   মৌলভীবাজার সদর ও পৌর স্বেচ্ছাসেবকলীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত
  •   ভোলায় সংঘর্ষের ঘটনায় যা জানালেন পুলিশ সুপার
  •   গোয়াইনঘাটে বিডি ক্লিনের সভা ও পরিচ্ছন্ন-পরিচ্ছন্নতা অভিযান
  •   নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগ মিছিল
  •   সিলেটে তিন অভিযান: পলাতক ৩ আসামি গ্রেফতার
  •   ভোলায় মুসল্লিদের উপর হামলার প্রতিবাদে সিলেটে ছাত্র জমিয়তের মিছিল
  • সাম্প্রতিক ফিচার খবর

  •   প্রাণিসম্পদে ওয়াছি উদ্দিনের বিরুদ্ধে একাট্টা দূর্নীতিবাজ প্রেতাত্মারা
  •   সকলের হাত পরিষ্কার থাক !
  •   আবরার হত্যার নেপথ্যে কারা?
  •   তৃতীয় বছরে দৈনিক বিজনেস বাংলাদেশ
  •   হিন্দুধর্ম ও কিছু কথা
  •   শ্রীহট্টে’র বনেদী বাড়ীর দূর্গা পুজো
  •   আমার বাতিঘর মহিউদ্দিন শীরু স্মরণে কিছুকথা
  •   আজ পৃথিবীর সর্বত্র দিন-রাত সমান
  •   আজব এক ব্যক্তি কাঁচা মাছ, মাংস ও লতাপাতা খেয়ে স্বাভাবিক চলে
  •   পরিবারের আর্থিক অনটনে ৬৭ টাকা নিয়ে শহর ছাড়েন , এখন আয় ৮৫০০ কোটি
  •   আজ পবিত্র আশুরা
  •   ইন্দানগর সবুজ টিলার ভাঁজে
  •   উদ্বাস্তু জীবন ও রাষ্ট্রহীনতা
  •   অনুপ্রেরণার আরেক নাম মেধাবী ইফতু
  •   দাদা-দাদির বলা গল্পেই আমি মুসলিম হওয়ার অনুপ্রেরণা পাই