আজ শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০ ইং

করোনা ভাইরাস: আল্লাহর উপর ভরসা ও সচেতনতা

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৪-২১ ১৮:২৩:০৯

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল :: তাওয়াক্কুল’ আরবী শব্দ যার বাংলা অর্থ হলো ভরসা করা, আস্থা রাখা। সহজভাবে বলা যায়, বান্দার সকল কাজে আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা বা আস্থা রাখা এবং আল্লাহ তায়ালাকে একমাত্র  অভিভাবক হিসেব গ্রহণ করা। সকল কাজে আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা রাখা ফরজ। একজন মুমীন বান্দা তার সকল কাজে আল্লাহকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে। কারণ, আল্লাহ যার অভিভাবক হবেন তার ক্ষতি বা অকল্যাণ করার ক্ষমতা অন্য কারো নেই।

আল্লাহর উপর ভরসা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, এবং তিনিই সর্বোত্তম কর্মকর্তা।” (আল-কুরআন, সূরা আলে-ইমরান, আয়াত:১৭৩) আল কুরআনে অন্যত্রে বলা হয়েছে- 
“(হে রাসূল) বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। তাওয়াক্কুলকারীরা তাঁর উপরই নির্ভর করে।” (আল-কুরআন, সূরা যুমার, আয়াত: ৩৮)

আল্লাহর উপর ভরসা সম্পর্কে হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি উট বেঁধে রেখে আল্লাহর উপর ভরসা করব,না বন্ধনমুক্ত রেখে? তিনি বললেন, উট বেঁধে নাও, অতঃপর আল্লাহর উপর ভরসা কর। (তিরমিযি)।


সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারীতে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-এর একটি উক্তি বর্ণিত হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেউ যদি ঘরে বা মসজিদে এই বলে বসে থাকে যে,আমি কোনো কাজ করব না। আমার নির্ধারিত রিযক আমার কাছে এসে পড়বে। তার হুকুম কী? ইমাম আহমদ (রাহ.) জবাব দিলেন‘ এ লোক প্রকৃত ইলম থেকে বঞ্চিত।’ এরপর বলেন, ‘স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ, ‘আল্লাহ আমার রিযক রেখেছেন আমার বর্শার ছায়ায়’।


তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথোপযুক্ত তাওয়াক্কুল করতে তাহলে তিনি তোমাদের সেভাবেই রিযিক দিতেন যেভাবে পাখিদের দিয়ে থাকেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় আর সন্ধ্যায় তৃপ্ত হয়ে নীড়ে ফেরে।’ এ হাদীসে রিজিকের খোঁজে নীড় থেকে বের হওয়ার কথা আছে। একইভাবে সাহাবীগণ ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন, ক্ষেত-খামারে কাজ করতেন। আর তারাই তো অনুসরণীয়।’


এবার আসি মূল কথায়, আমরা অনেকেই তাওয়াক্কুল সম্পর্কে ভূল ধারণা করে থাকি। আমরা মনে করি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করলেই হলো। আসলে বিষয়টি এমন নয়। তাওয়াক্কুল অবশ্যই করবেন তার আগে আপনার কাজ আপনাকে করতে হবে। যেমন-আপনি তাওয়াক্কুল করলেন আল্লাহ আমাকে খাওয়াবেন আর আপনি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলেন অর্থাৎ কাজ-কর্ম করলেন না, প্রকৃত অর্থে এটার নাম তাওয়াক্কুল নয় এটার নাম ভন্ডামী। কারণ, আল্লাহ আপনার হাত-পা, বিবেক-বুদ্ধি দান করেছেন প্রথমে আপনার দায়িত্ব হলো তার সদ্ব্যবহার করা, তারপর আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা এরই নামই হলো তাওয়াক্কুল।


উপরের হাদীসটি নিয়ে যদি আমরা পর্যালোচনা করি এবং একটু চিন্তা করি তাহলে আমরা কী দেখতে পাই? এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে উটকে বাধতে বলেছেন তারপর তাওয়াক্কুল করতে বলেছেন।


আজ সারা দুনিয়া করোনা ভাইরাসের মহামারীতে আতংকিত। এই মহামারী হতে বাঁচতে হলে আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসার পাশাপাশি অবশ্যই সচেতনতার প্রয়োজন। অর্থাৎ, ঘরে অবস্থান করা, অতি প্রয়োজনে বাহিরে যেতে হলে মাস্ক ব্যবহার করা, বার বার হাত ধৌত করা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। মোট কথা ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকতে সবধরণের সচেতনতা অবলম্বন করা। সচেতনতা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয় বরং সচেতনতা তাওয়াক্কুলের পরিপূরক।

মহামারীতে ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে,লোকসমাগম এড়িয়ে চলা এবং ঘরকে ইবাদতখানা বানানো।
ইবনে হাজর আসকালানী (রহ.) মহামারি সম্পর্কে তার অনবদ্য গ্রন্থে-দুটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন।


এক: দামেস্কে একবার মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তারা হাজারো মানুষ সমবেত হয়ে ভাইরাস থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করেছিলেন। যেখানে আগে প্রতিদিন ৫০ জন করে মারা যেত দোয়া মাহফিলের পর সেখানে হাজার মানুষ মারা যেতে লাগল।

দুই: কায়রোতে ৮৩৩ হিজরী সনে ব্যাপক মহামারি সৃষ্টি হয়েছিল। সকলে তিন দিন রোযা রেখে মরুভূমিতে গিয়ে দোয়া করল। জমায়েতের ফল হল হিতে বিপরীত। মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে গেল দৈনিক হাজারে। দুয়া, দুরুদ মাহফিল ভালো নি:সন্দেহে। কিন্তু মহামারির সময় ঘরে অবস্থান করা ইসলামের নির্দেশ।আর এ কারণে ভয়াবহ আমওয়াস মহামারির সময় আমর বিন আস (রা) বললেন- হে   লোকসকল, এ মহামারি হল আগুনের মত। যখন আসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই তোমরা পাহাড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়। তখন সকলে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল।

তাই প্রত্যেককে এখন ঘরমুখী হতে হবে এবং ঘরকে মসজিদে রূপান্তর করতে হবে। করোনা ভাইরাসের মহামারী হতে বাঁচতে হলে আমাদেরকে আরো বেশি করে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। এই ভাইরাস সাধারণত চুঁয়াছে প্রকৃতির,তাই ডাক্তারগণ সাধারণ দূরত্ব বজায় রাখতে এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলতে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের সকল উলামায়ে কেরামও জনসমাগম এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করাকে সীমিত পর্যায়ে রাখতে নির্দেশনা প্রদান করছেন।

কিন্তু দুংখজনক হলে সত্য অতি আবেগীরা তা যেনো মানতে নারাজ। তাই তারা তাওয়াক্কুলের অপব্যাখ্যা করতেছেন। পাকিস্তানের মুফতি আল্লামা তাকি উসমানী সাহেব আপাতত মুসাফাহা করতেও  নিরুৎসাহিত করেছেন। অথচ আমাদের দেশে এখনো বড় জানাযা,  জামাত, দুয়া, মিলাদ মাহফিল চলতেছে যা বর্তমান সময়ের জন্য মোটেই কাম্য হতে পারে না।


কোথায়ও যাতে  জনসমাগম বেশি না হয় সেজন্য প্রসাশনের পাশাপাশি ইমাম-খতিব, আলেম-উলামা ও মুসল্লিদেরকে সচেতন আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।

আসুন,করোনা ভাইরাসের মহামারী হতে বাঁচতে হলে আল্লাহর উপর ভরসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সচেতনতা অবলম্বন করি। নিজের ঘরকে ইবাদতখানা হিসেবে গড়ে তুলি,বেশিবেশি করে দুয়া, দুরুদ, ইস্তেগফার, নফল সালাত আদায় করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে তার মেহেরবানিতে করোনা ভাইরাসের মহামারী হতে হেফাজত করুন, আমিন।

লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ ২১ এপ্রিল ২০২০১/ জুনেদ

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন