আজ বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২১ ইং

সিলেটের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যে লালিত ভৈরব নিকেতন বাড়ি

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১০-২৩ ১৯:৪৫:২৩

ছবি: ইন্টারনেট



|| বহ্নি চক্রবর্তী ||
উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম শ্রীহট্টের দুর্গাপুজোয় লুকিয়ে রয়েছে কতশত ইতিহাস। ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে। আজ মহাসপ্তমী। ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়ার এক মাসেরও পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপুজো। পরপর দুটি মলমাস পড়ে যাওয়ায় এই বছর এতটা পরেই আয়োজিত হচ্ছে বাংলার সর্ববৃহৎ উৎসব। চলতি বছরে দুর্গাপুজো একটু অন্যরকম। কারণ করোনা। তা বলে জাঁকজমকে ত্রুটি থাকছে না এক ফোঁটাও। থিম পুজোয় সেজে উঠছে  বাংলাদেশ ও কোলকাতা!  

দুর্গাপুজোর ইতিহাসের বিষয়ে অধ্যাপক অশোকনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে বাংলাদেশে প্রতিমায় দুর্গা পূজা অন্ততঃ এক সহস্র বৎসরের অধিক প্রাচীন। জনসাধারণের বিশ্বাস, প্রতিমায় দুর্গা পূজা নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচেন্দ্রর দ্বারাই আরম্ভ হয়।কিন্তু এই প্রবাদ ভিত্তিহীন। আলিবর্দি খাঁ এবং তৎদৌহিত্র সিরাজদৌলার সমসাময়িক ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। অথচ বাংলার উক্ত নবাবদয়ের শাসনকালে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভাগ বলিয়া ঐতিহাসিক গণ কর্তৃক নির্দিষ্ট। শ্রী চৈতন্য দেবের সমসাময়িক বিখাত বাঙালি সৃতিনিবধোকার রঘুনন্দন পঞ্চদশ শতকে আবির্ভূত হন। রঘুনন্দনের (১৫০০-১৫৭৫) তিথিতথো বইতে 'দুর্গোত্সবেরতথো' নামক একটি প্রকরণ আছে। এবং তাহার দুর্গাপূজো তথ্য নামক মৌলিক দুর্গাপুজোর সম্পূর্ণ বিধি প্রদত্ত। রঘুনন্দন নিজেই স্বীকার করিয়াছেন যে, তিনি পূর্বতন পন্ডিত ও প্রবাদ সমূহ হইতে তাঁহার গ্রন্থে  অনেক উপাদান সংগ্রহ করিয়া ছিলেন। তিনি কালিকাপুরান, বৃহনোনদিকেশবর ও ভবিষ্যপুরান হইতে ও বহু বাকো উদ্ধার করিয়া ছিলেন। তৎপরবর্তী নিবন্ধকার রামকৃষ্ণ- রচিত নিবদ্ধের নাম "দুর্গাচরনোকৌমদী"। মিথিলার প্রসিদ্ধ পন্ডিত বাচসপতি মিশ্র (১৪২৫- ১৪৮০) তাঁহার ক্রিয়া চিন্তামনি এবং বাসন্তী-পূজা প্রকরণ বইতে দুর্গাদেবীর মৃনমই প্রতিমার পূজা পদ্ধতি বিবৃত করিয়াছেন। বাচসপতি রঘুনন্দনের বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী পুজো বললেই উঠে আসে বেশ কয়েকটি নাম। তার মধ্যে অন্যতম সিলেট শহরের শিবগঞ্জ মজুমদার পাড়ায় ভৈরব নিকেতন বাড়িতে এখন সাজো সাজো রব। মা গতকাল মর্ত্যে চলে এসেছেন আজ মহাসপ্তমী  এ বাড়ির পুজো  এবার পা দিলো সিলেটে ৭২তম বর্ষে।

সিলেটে ভৈরব নিকেতন বাড়ির পুজোর ইতিহাস
প্রথম থেকে এই পূজা শুরু হয় সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ এর দীঘলি গ্রামে।  প্রয়াত সুধীর চন্দ্র দে এর প্রপিতামহ প্রয়াত শিব চরণ দে বংশ পরম্পরায় পূজা করতেন। তারপর তাঁর সন্তান প্রয়াত শ্যামাচরণ দে দীঘলি গ্রামে পূজা করতেন। শ্যামা চরণ দে  ও মাতঙ্গিনী দে পরবর্তী সময় চলে  আসলেন  গ্রামের বাড়ী থেকে পূজা নিয়ে,  সিলেট শহরে উনাদের পুত্র সুধীর চন্দ্র দে এর কাছে।  সুধীর চন্দ্র দে ছিলেন পিতা-মাতার ভীষণ আজ্ঞাকারি। সেই থেকেই এই পুজো ভৈরব নিকেতন মায়া হোটেল এর বাড়ীর পূজা  বলেও বিখ্যাত।

মায়া হোটেল সিলেট শহরের প্রথম হোটেল, পূর্ববর্তী নাম ছিলো প্রসন্নময়ী, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কাষ্টঘর নিবাসী।  পরবর্তী সময় এই হোটেলের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন প্রয়াত সুধীরচন্দ্র দে ক্রয়ের মাধ্যমে।  এবং প্রসন্নময়ী থেকে নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন মায়া হোটেল।  ইতিহাস ঐতিহ্য বহন করে আজকের এই মায়া হোটেল- কাষ্টঘর সিলেট।  

বংশ পরম্পরা
প্রয়াত শ্যামা চরণ দে, প্রয়াত সুধীর চন্দ্র দে, জন্ম গোবিন্দগঞ্জ, দীঘলি গ্রামে।  বংশ পরম্পরায় চলে আসছে যুগের পর  যুগ ধরে!  তৎকালীন সময় পূজা করা হতো ছোট পরিসরে নিয়ম নিষ্ঠা অনুসারে। আজও সেই প্রথা রয়ে গেছে। এরপর প্রয়াত শ্যামা চরণ দে'র পুত্র প্রয়াত সুধীরচন্দ্র দে শিবগঞ্জ  বাড়িতে দুর্গা পূজা শুরু করেন।। সেই পরম্পরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন প্রয়াত সুধীর চন্দ্র দে মহাশয়ের দুই পুত্র সত্যজিৎ দে ও সুপর্ণ দে।

এই বাড়ির দুর্গা প্রতিমার বৈশিষ্ট্য
দে বাড়ির প্রতিমার বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ বাড়ির প্রতিমা তিনচালার। প্রতিমার পিছনে মঠচৌরির কাজ রয়েছে। অর্থাৎ মাটির নকশা করা তিনটি মঠের চূড়ার আকৃতির চালি। প্রতিমার পিছনে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর দেবীমুখ ও কার্তিক ও অসুরের মুখ সাধারণ মানুষের মতো। বাংলা ধাঁচের মুখের বিশেষত্ব, প্রতিমার চোখ মানুষের মতো হয় আর দেবীমুখের বিশেষত্ব হল প্রতিমার চোখ টানা টানা হয়।

প্রয়াত সুধীর চন্দ্র  দে বাড়ির প্রতিমায় দুই ধাঁচের মিশ্রণই রয়েছে। দুর্গা, সরস্বতী ও লক্ষ্মী প্রতিমার দেবীমুখের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে প্রতিমার মুখে ছাঁচ বংশ পরম্পরায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়। ঐ ছাঁচেই প্রতি বছর তিন দেবীর মুখ তৈরি করা হয়।

পূজোর নিয়ম আছে। যেহেতু দে পরিবার শাক্ত মত অনুসারী, বংশ পরম্পরায় বলি প্রথা আছে পারিবারিকভাবে!  সপ্তমী দিন ও নবমী তিথিতে বলি ও মাছ ভোগ দেওয়া হয়। আর অষ্টমী তিথিতে নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। পরম্পরা ধরে রেখে প্রতি বছর  এইভাবে ভোগ তৈরি করা হয়।

বিসর্জন দেখার মতো
আজও এ বাড়িতে বিসর্জনের একটা নিয়ম রয়েছে। প্রাচীন প্রথা মেনে ভৈরব নিকেতন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা প্রতিমা বিজর্সন দিতে যান। প্রয়াত সুধীরচন্দ্র দে'র তিন পুত্র ও ৫ কন্যা সবাই আমেরিকায় বসবাসরত। তবে সত্যজিৎ দে ও সুপর্ণ দে দেশে সবসময় আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন। ঐতিহ্য পরম্পরা বহন করে চলছেন ভৈরব নিকেতন বাড়ীর সদস্য বৃন্দগণ ।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: রানা দত্ত (আমেরিকা প্রবাসী), শুভ্রাংশু চক্রবর্তী টিটু, সত্যজিৎ দে।  

লেখক: কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য প্রবাসী।

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন