আজ বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪ ইং

লাল শাপলার ’আন্দু গাঙ্গ’

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১২-২১ ১৫:১৫:১৩

আব্দুল হাই আল-হাদী :: আন্দু মানে অপ্রয়োজনীয়, অনর্থক, অর্থহীন ইত্যাদি। সে অর্থে ’আন্দু লেক’ হচ্ছে এমন একটি লেক যার আদৌ কোন প্রয়োজন নেই কিংবা একটি অর্থহীন লেক। বেরসিক মানুষদের মধ্যে যারা এমন নাম দিয়েছেন তা যে মোটেও যথার্থ হয়নি, তা নি:সন্দেহে বলা যায়। কারণ নামকরণের সাথে বাস্তবতার ন্যুনতম কোন মিল নেই। নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ প্রকৃতির এক অপরৃপ সৃষ্টির নাম হচ্ছে ’আন্দু লেক’। মিঠাপানির এক অফুরন্ত উৎস এ লেক। লেকপারের ৩ টি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পানি আর মাছের চাহিদা পুরণ করছে এ লেক। সিলেটের পর্যটনে এটি যুক্ত করতে পারে নতুন মাত্রা।  

কুয়াশা মোড়ানো শীতের সকালে পথের ক্লান্তি ভুলে সে ’আন্দু লেক’এ গেলে আপনি দেখতে পাবেন, বিস্তির্ণ এলাকাজুড়ে পানির উপর ’লাল শাপলার’ সাম্ভ্রজ্য। কুমারী মেয়ের মতো লাজুক অথচ সতেজ-আকর্ষণীয় শাপলাগুলো যেন দীর্ঘকাল অপেক্ষারত কোন এক ব্যাকুল প্রেমিকার প্রতিচ্ছবি। আর এর সাথে সকালের সোনাঝরা মিষ্টিরোদ যেন সেগুলোর রৃপ-লাবণ্য বাড়িয়ে তুলে কয়েকগুণ। বিশাল লেক আর তাই সেখানে শাপলার দাপটও অনেক বেশি। বিশাল লেকের স্থানে স্থানে একতাবদ্ধ শাপলাগুলো যেন নিজেদের রাজত্বকে মজবুত করেছে দুশমনদের হাত থেকে। লালের পাশাপাশি এখানে সাদা শাপলারও কোন কমতি নেই।

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন জুড়ে বিস্তৃত আন্দু লেকটি প্রকৃতির এক অনন্য দান। প্রকৃতি তার অকৃপণ হাতে নিজের মতো সাজিয়েছে এ লেককে। লেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ কি.মি. এবং গড় প্রস্থ প্রায় ৪০০ মিটার। কানাইঘাট উপজেলার ১নং লক্ষীপ্রসাদ ইউপি, ৩নং দিঘীরপার পূর্ব ইউপি এবং ৪নং সাতঁবাক ইউনিয়নের মধ্যস্থলে এই লেকটির অবস্থান।

সিলেট শহর থেকে লেকটির দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। সিলেট-জকিগঞ্জ রোডের বাংলাবাজার নামক স্থানে নেমে জনপ্রতি ১০টাকা ভাড়ায় সিএনজি অটোরিকশা করে ভবানিগঞ্জ বাজার। সে বাজার আন্দু লেকের তীরে অবস্থিত। এছাড়া সিলেট-জকিগঞ্জ রোডে সড়কের বাজার নেমে ১০টাকা ভাড়ায় লেগুনা বা সিএনজি অটোরিকশা ধরে লন্তির মাটি স্ট্যান্ডে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে লেকটির। অপরদিকে সিলেট-তামাবিল সড়ক দিয়ে কানাইঘাট বাজার হয়েও লেকটিতে যাওয়া যায়। সময় সর্বোচ্চ এক ঘন্টা লাগতে পারে। লেক ভ্রমণের পাশাপাশি বাংলার আবহমান পল্লীর জীবনচিত্র দেখার এক অনন্য সুযোগ যে কেউ কাজে লাগাতে পারেন।

স্থানীয়ভাবে এটিকে আন্দুগাঙ্গ বা পুরাতন সুরমা বলে অভিহিত করা হয়। আবার অনেকে এটাকে ’আন্দু বরাক’ নামে ডেকে থাকেন কারণ একসময় সুরমাকে স্থানীয়রা বরাক নদী নামে অভিহিত করতো।

এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রবীণদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে এটাই ছিল সুরমার মূল প্রবাহপথ। এ অংশটি অনেকটা আকাঁবাকা। ১৮৯৭ সালের প্রলয়ংকারী ভূমিকম্পে সুরমা নদীর এ অংশের গতিপথ বদলে যায়। মূল প্রবাহ ১ নং লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের দিকে সৃষ্টি হয় এবং ক্রমে সেটিই সুরমার মূল প্রবাহপথে পরিণত হয়। নব সৃষ্ট সে প্রবাহ অনেকটা সোজা হওয়ায় নৌযোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধার সৃষ্টি করে এবং এটাকে মূলপথ হিসেবে সরকার ব্যবহার শুরু করে। এ সময় থেকে আদি প্রবাহ অর্থাৎ বর্তমান আন্দুগাঙ্গ একধরণের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে। যার কারণে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার পুরাতন সুরমাকে স্থানীয় মানুষের কল্যাণের কাজে লাগানোর চিন্তা করে এবং এ অংশের দু’দিকে বাঁধ দিয়ে মূল সুরমা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এতে স্থানীয় মানুষের পানীয়-জলের অভাব দূর হওয়ার পাশাপাশি নদীভাঙ্গন সমস্যা থেকেও রক্ষা পায় ৩ ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ।    

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমির নাম আন্দু লেক। প্রকৃতি তাঁর অকৃপণ হাতে রূপ-লাবণ্যের সবটুকু ঢেলে সাজিয়েছে এ লেকটিকে। লাল শাপলার পাশাপাশি এখানকার জীববৈচিত্র্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে। পর্যাপ্ত খাবার এবং মানুষের আনাগোণা কম হওয়ার কারণে এখানে পানকৌড়ি, বক, মাছরাঙ্গাসহ পরিযায়ী অনেক পাখির দেখা মেলে। দেশীয় মাছের এক নিরাপদ অভয়াশ্রম এ লেক। লেকটির গভীরতাও অনেক বেশি। সারা বছর পর্যাপ্ত স্বচ্ছ পানি থাকা এবং না শুকানোর কারণে এখানে দেশীয় বিল্প্তুপ্রায় অনেক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। জলজ অন্যান্য প্রাণিরও বিচরণ দেখা যায় এখানে। মোট কথা, জীববৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধ স্থানের নাম হচ্ছে ’আন্দু গাঙ্গ’।

এছাড়া সিলেট-জকিগঞ্জ রোডের জুলাই নামক স্থান থেকে লেক পর্যন্ত স্বচ্ছ পানির একটি সুন্দর খাল রয়েছে। লেকের চার পাশে আছে ছোট ছোট অনেকগুলো গ্রাম। লেকের ধারে গড়ে উঠেছে দ্বীপের মতো ছোট ছোট দুটি চর। লেকের পাশ ঘেষে রয়েছে ৪টি জামে মসজিদ, ভবানীগঞ্জ বাজার ও জুলাই আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। রয়েছে ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। লেক পারের প্রায় প্রত্যেক বাড়ির সাথে পাকা বাঁধাই করা ঘাট। গোসল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল কাজই এখানে সম্পাদন করেন স্থানীয় মানুষেরা।  

দর্শনার্থী এডভোকেট মাহবুব উল আলমের ভাষ্য মতে, লাল শাপলার বিল দেখেছি, অনেক লেক দেখেছি কিন্তু এত বিশালতার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লেক কখনো দেখিনি। সত্যি অনেক সুন্দর, অনেক উপভোগ্য লেকটি।
এখানে আছে ছোট-বড় অনেক নৌকা আছে। যে কেউ নৌকা ভাড়া নিয়ে উপভোগ করতে পারেন এখানকার সৌন্দর্য। এখানকার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের চিত্র খুবই মনোহর। সময় থাকলে সেটাও উপভোগ করা যেতে পারে। লেকের ও লেকের পাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য সবাইকে মুগ্ধ করবে। লেকের বিশালতায় পর্যটকরা পাবেন অন্যরকম অনুভূতি। বর্তমানে প্রশাসন লেকটিকে জলমহাল হিসেবে ইজারা দিয়েছেন যাতে শাপলাসহ প্রাকৃতিক এ লেকের জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ইজারা বাতিল করলে পর্যটকরা সচ্ছন্দ্যে লেক ভ্রমণ উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষেরাও সারাবছর লেকটি থেকে মাছ সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রশাসন ও বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন জায়গাটিকে ’পর্যটন এলাকা’ ঘোষণা করে পর্যটকবান্ধব কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলে ’আন্দু গাঙ্গ’ বা ’আন্দু লেক’ হতে পারে বিনোদনের এক চমৎকার স্থান। একইসাথে এটি স্থানীয় মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।  


লেখক: আব্দুল হাই আল-হাদী, লেখক ও পরিবেশকর্মী।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন