আজ রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ইং

রেজওয়ানের ভাসমান স্কুল পেল বিশ্বস্বীকৃতি

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২১-০১-২৩ ০০:৫৭:৫১

সিলেটভিউ ডেস্ক :: চলনবিল এলাকার শিশুদের জন্য ভাসমান স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মাদ রেজওয়ান বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু সংগ্রামী হিসেবে নতুন স্বীকৃতি পেয়েছেন। সম্প্রতি ব্রিটেনের প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুগুইন রেনডম হাউস থেকে প্রকাশিত বিগত দুই শতাব্দীর জলবায়ু সংগ্রামীদের নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ে স্থান পেয়েছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের বেন লারউলের লেখা ‘ক্লাইমেট রেবলস’ বইয়ে ‘নৌকাস্কুল’-এর উদ্ভাবক মোহাম্মদ রেজওয়ানকে ‘ক্লাইমেট রেবল’ (জলবায়ু সংগ্রামী) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বইটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৪১ জন জলবায়ু সংগ্রামীর কথা তুলে ধরা হয়েছে।

রেজওয়ানের প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি সংস্থা ‘সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা’ চলনবিলের বন্যাপ্রবণ এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে স্কুল নেই, সেখানে শিশুদের পড়ালেখা চালিয়ে নিতে ২০০২ সালে চলনবিলে ভাসমান স্কুল চালু করে। বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে তার মডেল অনুসরণ করে অন্যান্য সংস্থাও পরে ভাসমান স্কুল কার্যক্রম শুরু করে।

রেজওয়ানের নৌকাস্কুলের ধারণাটি জাতিসংঘের ফান্ডস অ্যান্ড প্রোগ্রামস (ইউনিসেফ, ইউএনইপি এবং ইউএনডিপি) থেকে ইনোভেশন ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পায়।
রেজওয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের দেশের মানুষ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যেও জীবন-জীবিকা চালিয়ে নিচ্ছে। তাদের এই সংগ্রামী চরিত্র আমাকে শিশুদের জন্য ভাসমান স্কুল গড়তে অনুপ্রাণিত করেছে।

জানা যায়, রেজোয়ানের ডিজাইনকৃত ভাসমান স্কুল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক ডিজাইন উইথ দ্য ৯০% যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্তির জন্য মনোনীত হয়েছে।

রেজোয়ান বলেন, ‘একজন স্থপতি হিসেবে আমি সত্যি সম্মানিতবোধ করছি। আমি আশা করছি আমরা বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের উন্নয়নে জীবন বদলে দেওয়া আরও ডিজাইন আনতে পারব। আমি আরও আশা করছি, এই স্বীকৃতি তরুণ ডিজাইনার, স্থপতি ও ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ব্যক্তিকেও বিশ্বজুড়ে গ্রামীণ সমাজের অগ্রগতিতে এরূপ ডিজাইন সমাধান উদ্ভাবনে উৎসাহিত করবে।’ এসএএম সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়াম ২০১৭-১৮ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাজলে ‘বেঙ্গল স্ট্রিম’ স্থাপত্য প্রদর্শনীতে রেজোয়ানের নৌকাস্কুলের ডিজাইন প্রদর্শন করে।

চলনবিলের ‘নৌকাস্কুল’ বিশ্বের ১০ মডেল স্কুলের একটি :

২০১৭ সালের অক্টোবরে এই ‘নৌকাস্কুল’ বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা সিএনএনের জরিপে ‘বিশ্বের অন্যতম ১০টি উদ্ভাবনীমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।’

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকির মুখে থাকা ভারত, চীন, কম্বোডিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়াসহ আরও অনেক দেশে চালু হয়েছে মোহাম্মদ রেজওয়ানের মডেলের এই ভাসমান স্কুল। বেশ কয়েকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ান। তাঁর প্রকল্পকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে দুটি তথ্যচিত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থাকা আরও অনেক দেশে চালু হয়েছে এই নৌকাস্কুল।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠক্রমে যুক্ত হয়েছে এই স্কুল। অসাধারণ উদ্ভাবন নৌকার মধ্যে তৈরি এই ভাসমান স্কুল নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে তথ্যচিত্র ‘ইজি লাইক ওয়াটার’।

আফ্রিকা, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্যাপ্রবণ এলাকায় বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠনগুলো মোহাম্মদ রেজোয়ানের নৌকা স্কুলের ধারণা অনুসরণ করছে। ফলে নাইজেরিয়া, জাম্বিয়া, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের বেশ কিছু অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণ সহজ হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশেও অন্যান্য সংগঠন রেজোয়ানের উদ্ভাবিত এই নৌকাস্কুলের মডেলের অনুকরণে হাওর ও বিলে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা প্রদান করছে।

বাংলাদেশের পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরের তিন জেলাজুড়ে বিশাল একটি বিলের নাম ‘চলনবিল’। এই বিলে বছরের সাত মাস পানি থাকে। এতে বছরের বেশির ভাগ সময় চলনবিল অঞ্চলের শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। বিলের পানি গ্রামে উঠে গেলে এ অঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এসব শিক্ষার্থীর কথা বিবেচনা করে ২০০২ সালে চলনবিলের শিশুদের পড়ালেখার বিকল্প হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ভাসমান স্কুল’ তৈরি করেন বিল এলাকার তরুণ বাসিন্দা নাটোরের গুরুদাসপুরের রেজওয়ান। রেজওয়ান জানান, ২০০২ সালে চলনবিলের স্কুলশিক্ষার্থীদের পড়ালেখার বিষয়ে বিকল্প স্কুল হিসেবে এই ‘ভাসমান স্কুলের’ চিন্তা তাঁর মাথায় আসে। এরপর নিজের স্কলারশিপের মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার ও একটি ল্যাপটপ দিয়ে স্কুলের যাত্রা শুরু করেন তিনি।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/২৩ জানুয়ারি ২০২১/বিডিপ্রতিদিন/মিআচৌ-৫

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন