আজ মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০ ইং

মুক্তাপুর

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-১২-১৫ ১৩:৫৯:১০

লেখক : আব্দুল হাই আল-হাদী

আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমন্ত পাহাড়ের কোলে নির্ভার ’লাল শাপলার বিল’। বিশাল সে বিলের বুক চিরে মেঠোপথটি উত্তর দিকে চলে গেছে একেবারে ভারতের ভেতর। পথের শেষের ওপারের স্থানটির নাম ’মুক্তাপুর’। ভারতের মধ্যে পড়লেও জায়গাটি ভালো করেই পর্যটকদের দৃষ্টিগোচর হয়। ’লাল শাপলার বিল’ দেখলে  নিশ্চয় সে জায়গাটি আপনিও দেখেছেন। ’নো ম্যান্স ল্যান্ড’ এ দাঁড়িয়ে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে উঠা খাসি-সিন্টেংদের এক ঐতিহ্যবাহী পুঞ্জি বা গ্রাম এটি। বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতিবিজড়িত যে কয়েকটি স্থান রয়েছে, তার মধ্যে ’মুক্তাপুর’ একটি। ’মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের নামকরণ এস্থানের নামেই হয়েছিল এবং সেটির ’হেডকোয়ার্টার’ ছিল এখানে।    

মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১ টি সেক্টরের মধ্যে ৫ নং সেক্টরটি অন্যতম। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী এবং সদর দপ্তর ছিল বর্তমান সুনামগঞ্জের দোয়ারা উপজেলার বাঁশতলা। ভারত থেকে নেমে আসা লুভা নদীর পশ্চিমাংশ থেকে সুরমা নদীর উত্তরাংশ ধরে বর্তমান সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টেকেরহাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এ সেক্টরের কর্মকান্ড। সুরমার ওপার অর্থাৎ দক্ষিণ ও পূর্বাংশ ছিল ৪ নং সেক্টরের অধীন। ৫ নং সেক্টরের অধীনে ৭ টি সাব-সেক্টর ছিল যার মধ্যে মুক্তাপুর অন্যতম। মুক্তাপুর সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন কাজী ফারুক আহমেদ, সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন সুবেদার মুজিবুর রহমান এবং এডমিন ইনচার্জ ছিলেন নায়েক সুবেদার নাজির হোসেন। এর পাশাপাশি ডাউকি ও সংগ্রামপুঞ্জি সাব-সেক্টরের অবস্থান ’মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের কাছাকাছি ছিল। এখানে উল্ল্যেখ করা প্রয়োজন যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সাব-সেক্টরগুলো পরিধি ও সদর দপ্তরগুলো সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়েছে।

’মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের অধীনে সারি নদী অববাহিকার বেশিরভাগ অংশ এবং লুভা নদীর পশ্চিমাংশের অবস্থান। কিন্তু এ অঞ্চলের যুদ্ধদিনের বিবরণ খুব একটা পাওয়া যায় না । এর কারণ হিসেবে যতটুকু জানা যায়, ৪ ও ৫ নং সেক্টরে প্রথম দিকে বাংলাদেশের নিয়মিত সৈন্য ও অফিসারের অপর্যাপ্ততা এবং প্রচারের অভাব।  ’মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ১১টি সেক্টরের মধ্যে ৫ নং সেক্টরে প্রথম দিকে বাংলাদেশের নিয়মিত সৈন্য ও অফিসার যথেস্ট না থাকায় এবং ৪ ও ৫নং সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধে যথেষ্ট প্রচারিত না হওয়াতে বিশেষ করে ৫ নং সেক্টরের অনেক অবদান বই-পুস্তকে খুব সামান্যই স্থান পায়। যাঁরাই ৫ নং সেক্টর সম্বন্ধে লিখেছেন নেহায়েত দায়সারা গোছের লেখণীতে স্পর্শ করেছেন এ অঞ্চলের বীরত্বগাথা।’ (১৯৭১-সময়ের সাহসী সন্তান- ব্রিগেডিয়ার জয়ন্ত কে.সেন, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারী ২০০৫ পৃষ্ঠা-৬০)।
বর্তমানে ভারতের মেঘালয়ের ওয়েস্ট জৈন্তিয়া হিল্স জেলার আমলারেম ব্লকে অবস্থিত। ২০১১ সালের আদমশুমারীর তথ্য মতে, মুক্তাপুরের সর্বমোট জনসংখ্যা ১০২৪ যার মধ্যে পুরুষ ৫২৭ ও নারী ৪৯৭ । এখানে মোট প্রায় ২০০ পরিবার বসবাস করে। 

বর্তমান কানাইঘাটের লুভাছড়া নদী ধরে পশ্চিমাংশ থেকে সুরমা নদীর উত্তর অংশের ভারত সীমান্ত পর্যন্ত পুরো অঞ্চলটি ৫ নং সেক্টরের আওতায় ছিল। ৫ নং সেক্টরের ’মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের আওতায় মুক্তিযোদ্ধারা কানাইঘাটের লোভা ও সুরমার পশ্চিম-উত্তরাংশ, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও সিলেট সদর অংশে যুদ্ধ করেছে। তাদের মূল টার্গেট ছিল ডাউকি-জৈন্তাপুর-সিলেট এক্রিস, করিমগঞ্জ-কানাইঘাট-সিলেট এক্রিস এবং কোম্পানিগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-সিলেট এক্রিস-এ শক্রুর প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙ্গে সিলেট জয়। বিশেষ করে, ডাউকি-জৈন্তাপুর-সিলেট এক্রিস-এ তামাবিল-জৈন্তাপুর রাস্তা ধরে অগ্রসর হওয়া এবং এই এক্রিস-এ প্রধান আক্রমণ রচনা করা হয় চুড়ান্ত পরিকল্পনায় সৈন্য সমাবেশ নিয়ে। এ সাব-সেক্টরের আওতাধীন বীর যোদ্ধারা চুড়ান্ত বিজয়ে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন। লুভাছড়া নদী থেকে একেবারে  ডাউকি- সারি নদীর (চেঙ্গেরখাল) পুরো অংশেই মুক্তাপুর সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা অকুতোভয় লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন।  

’মুক্তাপুর’-এ বাঙালি হাজার হাজার শরনার্থী আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানকার মানুষ অকৃপণ হাতে সে শরণার্থীদের সহায়তা করেছেন। সদর দুপ্তর থেকে পাক-বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত অপারেশনগুলো সেখান থেকে পরিচালিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সেখান থেকে অন্যত্র পাঠিতে ট্রেনিং দেওয়া হতো । মুক্তিযুদ্ধের সে স্মৃতিবিজড়িত স্থা্নটি ’লাল শাপলার বিল’ দেখতে দিয়ে আপনিও এক পলক দেখতে পারেন বাংলাদেশ থেকে। তবে কোনভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করতে যাবেন না।  আর ভারতে গেলে ডাউকি-মুক্তাপুর রাস্তায় গাড়িতে চড়ে দেখে আসতে পারেন নিজের চোখে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/১৫ ডিসেম্বর ২০১৯/মিআচৌ

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন