আজ শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০ ইং

একজন লেখক ও বইমেলা

পূর্ণদৈর্ঘ্য জীবনের স্বল্পদৈর্ঘ্য রোজনামচা

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০২-২২ ১১:০৬:৫৬

ফারজানা ইসলাম লিনু :: হতদরিদ্র মানুষের ঘোড়া রোগ থাকা যে বড় দুরারোগ্য ব্যাধি তা একমাত্র ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। ফেব্রুয়ারি আসার আগে থেকেই আমার মন আকুলি বিকুলি করে বই মেলার জন্য। বইয়ের টানে ঢাকা বইমেলায়ও গিয়েছি কয়েকবার।

"বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়না", এই অপ্তবাক্যকে ভুল প্রমাণ করে প্রতিবার বই মেলা থেকে কপর্দকহীন হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। বইয়ের বোঝার ভারে দুই হাতের জোড়ার যন্ত্রাংশ ব্যাথায় ঢিলে হয়। তাও একরত্তি আফসোস হয় না। সংসার ধর্ম ভুলে নতুন বইয়ের গন্ধ মাদকতায় কাটে কতটা দিন।

গণিত অলিম্পিয়াডের ডিভিশনাল রাউন্ডে কোয়ালিফাই করলেই প্রতি ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণিত উৎসবে অংশ নেয়া যাবে। পুত্র কন্যাদের আমি খুব করে কান মন্ত্রণা দেই, বাবা ভালো করে পরিক্ষা দিস।

"যদি লাইগ্যা যায়", তাদের সাথে আমারও ঢাকা যাওয়া হবে।

আমার অতি আগ্রহের কারণে পুত্রকন্যাদের নিজস্ব আগ্রহে ভাটা পড়তে পারে, তারপরও নিরবধি আমার কুমন্ত্রণা চলে।

বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিড়ে যায় কস্মিনকালে। তখন পুত্রকন্যাদের চাইতে আমার উচ্ছ্বাস বেশি থাকে।
খুদে গণিতবিদকে আসাদ গেটের সেন্ট জোসেফ স্কুলের ক্যাম্পাসে নামিয়ে দিয়ে বাংলা একাডেমি যাওয়ার জন্য উসখুস করি।

দেশ সেরা লেখক, বিজ্ঞানী, ক্রিকেটার, মাউন্টেনিয়ার সহ সেলিব্রেটিদের মিলন মেলা বসে সেন্ট জোসেফে। এই যজ্ঞ রেখে কেমনে যাই? তাইতো দুই দিন ব্যাপী জাতীয় গণিত উৎসবের সমাপ্তিতে দ্রুত বই মেলার পথে পা বাড়াই।

একবারতো টিনএজ কন্যা বেঁকে বসে, স্কুলের ইউনিফর্ম পরে সে বই মেলায় যাবে না। কাপড় চেঞ্জ করতে একবার বাসায় গেলে আর বই মেলায় যাওয়া লাগবে না। মুখে কিছু বলিনা। ব্র‍্যাকেটে কত কথা শুনাই, "কি আমার সেলিব্রিটিরে, ইউনিফর্ম পরে বই মেলায় যাবে না"। বাপের মধ্যস্থতায় কন্যাকে আসাদ গেটের আড়ং থেকে জামা কিনে পরিয়ে দেই।

ঢাকা শহরের ঐতিহ্যবাহী ট্রাফিকজ্যাম ঠেলে বাংলা একাডেমি পর্যন্ত গেলেও ভীড় ঠেলে হাঁটতে কষ্ট হয়। দুই হাতে বইয়ের বোঝা নিয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে হাঁটতে গিয়েও মন তৃপ্তিতে ভরে উঠে। পত্রিকায় ও টিভিতে দেখা কত বিখ্যাত কবি সাহিত্যিক চোখের সামনে। দম বন্ধ লাগে, নিঃশ্বাসের আদান প্রদানের গতি বেড়ে যায়। নিজেই নিজের গায়ে চিমটি কাটি, আজন্ম লালিত সাধ প্রিয় কোন লেখককে সামনা-সামনি দেখা। আমার ছেলে মানুষিতে পুত্রকন্যাদের সম্মানে লাগে। তারা লজ্জা পায়। ভেতরে ভেতরে ত্যক্তবিরক্ত হয়, মুখে কিছু বলে না।

কন্যারা বড় হয়েছে, পরিক্ষার কারণে ফেব্রুয়ারির গণিত অলিম্পিয়াড থেকে সরে পড়েছে। এখন আমি পুত্রকে কুমন্ত্রণা দেই। এই সব কুমন্ত্রণা সে এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে।

২০২০ সাল, নিজের বই প্রকাশের সুযোগে সিলেটের বই মেলার পাঠ চুকিয়ে আমি একদিন ঢাকা মেলায় হাজির। পাঠক হিসেবে মেলায় আসায় হলেও লেখক হিসেবে মেলার মাঠে এই আমার প্রথম পদচারণা।

উত্তেজনায় যথারীতি আমার গায়ে ঘাম ঝরে, হৃদকম্প দিয়ে হালকা জ্বর আসে। থোড়াই পাত্তা দেই সবকিছু। নিজের বই প্রমোট করতে একুশে বই মেলায় আছি এর চেয়ে বড় সুখানুভূতি আর কি হতে পারে।

লেখক হিসেবে আমার সুখ্যাতি দূরে থাক খ্যাতিও সেরকম নেই। তারপরও আমি অভাজনের কিছু প্রিয়জন এসে বই মেলায় হাজির। এদের কারো সাথে আত্মার সম্পর্ক, কারো সাথে লেখক-পাঠক সম্পর্ক। আমার লেখক জীবন সার্থক করতে তাদের এইটুকু ভালোবাসাই অবশিষ্ট ছিলো।

প্রতিটা স্টলের সামনে লেখক, পাঠক, ক্রেতার বাজারি ভীড়। ভীড়ের ভেতর শান্তিতে দুদন্ড দাড়ানোই দায়, অটোগ্রাফ দিয়ে ফটো তোলার সুযোগ কম। সবার সাথে ছবি তুলতে না পারার অপূর্ণতায় কিছুটা কাতর আমি।

ভালোবাসার মানুষজনের আন্তরিক অনুরোধ উপেক্ষা করে আজই ছাড়তে হবে এই শহর। দূষণের শহরে ভরা বসন্তেও কোকিলের কুহুতান নেই, বাসন্তি ফুলের সৌরভ নেই। ধুলার আস্তরণ ভেদ করে আমের মুকুল তবুও উঁকি দিচ্ছে।

ফাগুনের আগুন লাগা দিনে যদি এক পশলা বৃষ্টি হয়, সবুজ পাতায় প্রাণ আসে। হয়তো এই শহরের রূপ যৌবন ফিরবে তখন।

বছর ঘুরে আসবে আবার ফেব্রুয়ারি। দিনে দিনে বইমেলার ব্যাপ্তি নয় বাড়বে পাঠকের ব্যাপ্তি। বই দেখে নয় বই কিনে দেউলিয়া হয়ে ঘরে ফিরবে ধুলা মাড়িয়ে চলা বইমেলামুখি মানুষের প্লাবন।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন