আজ রবিবার, ৩১ মে ২০২০ ইং

রিপোর্ট নেগেটিভ

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৪-০৮ ২২:১৯:২০




|| পার্থ তালুকদার ||

-আমরা যখন একসময় বুড়োবুড়ি হয়ে যাব তখনও কিন্তু একই বিছানায় ঘুমাব। ঠিক আছে? মনে থাকবে ?
রুদ্র হাসতে হাসতে বলে-হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, মনে থাকবে।
-ও.. আরেকটা কথা। এটা কানে কানে বলব।
রুদ্র তার কান এগিয়ে দেয়।
মাধবী ফিসফিস করে বলতে থাকে।

কথা শুনে অট্টহাসিতে উল্লাস করে রুদ্র। হাসে মাধবীও। বিয়ের প্রথম রাতে এভাবেই তাদের মধ্যে অলিখিত এক চুক্তি সম্পাদন হয়। তারপর একেএকে কেটে যায় দু’টা বছর। মাধবীর কোলজোড়ে আসে ফুটফুটে সন্তান। বাসায় মাঝারি সাইজের একটা খাট তাই তিনজনের দৈর্ঘ্য বরাবর শুতে সমস্যা হওয়ায় প্রস্থ বরাবর তাদের শিয়র দিতে হয়। সংসারের টুকটাক বিষয়ে তাদের মধ্যে যে একটুআধটু সমস্যা হয় না- তা নয়। কিছু হাড়িপাতিল এক সাথে রাখতে গেল টুংটাং আওয়াজ হওয়াটাই স্বাভাবিক। যে ঘরে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে, সেখান থেকে রাগ-অনুরাগকে পিটিয়ে বিদায় করার কারো সামর্থ্য নেই।

একদিন হলো কী, দুটা পাতিলের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যায়। এই টুকটাক বিষয় নিয়ে। ঐ দিন সারাদিনে তাদের মধ্যে আর টু শব্দও হয়নি। রাতে শুতে গিয়ে আরো দু-একটা কথা কাটাকাটি হয়। ব্যস, রুদ্র'র মাথা রৌদ্রতাপের ন্যায় গরম হয়ে ওঠে। সে বালিশ নিয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে সোজা ফ্লোরে গিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। এদিকে মাধবীর মনে যদিও উচাটন অবস্থা বিরাজ করে তবুও ব্যাক্তিত্বের লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার জন্য সেও তার ছোট্ট বাবুকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চল পড়ে থাকে। তারপর সেকেন্ড পার হয়, মিনিট পার হয়, ঘন্টা পার হয়। মাধবীর মনে হলো সে উদ্যোগ না নিলে এই মান-অভিমানের মিটমাট হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।

এবার সে রুদ্র'র হাত ধরে টানে। শরীরে সজোরে ধাক্কা দেয়। এভাবে তিলেতিলে একসময় তাদের রাগ-অনুরাগের সমাপ্তি ঘটে।
মাধবী রুদ্রকে বলে- বিয়ের প্রথমরাতে তোমাকে কী বলেছিলাম মনে আছে?
-হুম, মনে আছে।
-তাহলে এমন করলে কেন? খুব ভাব ধরে বালিশটালিশ নিয়ে নিচে নেমে গেলে!
রুদ্র কোনো সদুত্তর দিতে পারে না। এবার মাধবী রুদ্র'র বুকে আলতোভাবে মাথা রাখে।

ফিসপিস করে বলে- এই স্থানটা হচ্ছে আমার নির্ভরতার স্থান, নির্ভয়ের স্থান, বিশ্বাসের স্থান। পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেলেও তোমার বুকে মাথা রাখলেই সবকিছু নির্মল হয়ে আসে। সবকিছু শান্ত মনে হয়। তোমাদের পুরুষদের বুক কী দিয়ে তৈরি বলতো? এখানে যেমন আগুন আছে তেমনি আছে জল। এখানে যেমন পাথর আছে তেমনি আছে চিকচিকে মিহি বালু কণা।
রুদ্র কোনো কথা বাড়ায় না। শুধু হাসে। মিটিমিটি হাসে।

দুই.

ছ'মাস পরের ঘটনা।
একদিন দুপুরবেলা রুদ্র ঘনঘন কাশতে থাকে। মাঝে মধ্যে দু-একটা হাঁচিও দেয়। শরীরটা গরম গরম লাগছে। এমনটা ক'দিন ধরে হলেও সে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না। তবে এখন মনের মধ্যে তার একটা ভয় কাজ করছে। সারাবিশ্বে এই এমুহূর্তে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এমন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে তবে চারদিকে করোনাভাইরাসের যে আতংক- ভয়টা এই জন্যই বেশি।

দুই দিন এভাবেই চলে। তৃতীয় দিন ডাক্তারকে ফোন দেয় রুদ্র। ফোনটা রেখে নিস্তেজভাবে বসে থাকে। মাধবী তাকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে বলে, ডাক্তার কী বললো ? তুমি এভাবে মনমরা হয়ে বসে আছ কেন?
রুদ্র বলে, ডাক্তার বললো অতি দ্রুত করোনাভাইরাসের টেস্টটা করানোর জন্য।
মাধবীর বুকের ভেতরটা চলাৎ করে ওঠে। সে বলে, কী বলছো এসব!
- হ্যাঁ ঠিকই বলছি মাধবী।

পরের দিন রিপোর্ট আসে। রিপোর্ট পজেটিভ। রুদ্রকে সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এদিকে মাধবীকে বলা হয় কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য। পৃথিবীটা তার কাছে শূন্য শূন্য লাগছে। পায়ের তলায় যেন মাটির অস্তিত্ব নেই। সব কিছু ফাঁকা, ধূসর, প্রাণহীন।

টিভিতে খবর দেয় দেশে আজ এতজন লোক মারা গেছে, এতজন আক্রান্ত হয়েছে, এই দেশে আজ এত হাজার লোক মারা গেছে, এত হাজার আক্রান্ত। সবদিক থেকেই বাতাসের বেগে খারাপ সংবাদ আসতে থাকে। একেকটা খবরের সাথে সাথে মাধবী ভেঙ্গে নুয়ে পড়ে। ক্ষাণিকপর আবার সে মাথা উচু করে দাঁড়ায়। সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে একা কাঁদে। মনে পড়ে তার বিয়ের প্রথমরাতের অলিখিত চুক্তির কথা। সে তার অতীতের সুখস্মৃতি রোমন্থন করে এবং ভবিষ্যতের কঠিন সময়ের কথা চিন্তা করে ডুকরে কেঁদে উঠে।

আজ দশ দিন হলো রুদ্র হাসপাতালে ভর্তি আছে। দিনে কয়েকবার সে মাধবীর সাথে ফোনে আলাপ করে। সে জানালো আজ আবার তার শরীর থেকে টেস্টের জন্য নমুনা নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল বিকালে রিপোর্ট দিবে। সে আরো জানালো এই দশ দিন সে কিভাবে সময় ব্যয় করেছে। কোন কোন বই পড়েছে। মাধবীকে বললো মোটেই টেনশন করো না, মন শক্ত রেখো। ভয় নয়, সচেতন থাকবে। কিছুক্ষণ পরপর ভালো করে হাত ধুবে। বাবুর প্রতি খেয়াল রাখবে।

কোনরকম রাত পার হলো। মাধবীর অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে বুকের মধ্যে পাথর চাপা পড়ে আছে। সারাদিন সে কিছুই মুখে দিতে পারেনি। আজ বিকেলে রুদ্র'র রিপোর্ট দিবে। মনের মধ্যে সর্বদা খারাপ চিন্তা ভর করছে। যদি রিপোর্ট আবারো পজেটিভ আসে ! হায় গড!

বিকেলে রুদ্র মাধবীকে ফোন করে কাঁদতে শুরু করে। এতদিনের জমানো ভাপ নিমিষেই বের হতে চাইল। মাধবী কী হলো, কী হলো বলে সে নিজেও কাঁদতে থাকে। এবার রুদ্র কান্না থামায়। বলে, আমি বেঁচে গেছি মাধবী, আমি বেঁচে গেছি। আমার রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে, নেগেটিভ। মাধবীর দুচোখ বেয়ে টলটল করে জল পড়তে থাকে।সে উৎফুল্ল হয়ে বলে- তুমি কখন আসবে রুদ্র ?- এই তো এখনই, এখনই আমাকে রিলিজ দিবে।
মাধবী বলে- তুমি এসো রুদ্র, তুমি এসো। তোমাকে ছাড়া বড্ড একা লাগে, বড্ড অসহায় লাগে আমার।

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন