আজ সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০ ইং

সাহিত্য ভূতের কবলে

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৫-২৯ ২২:৪৬:১৭




|| রুবা তানজিদা ||

দশম শ্রেণিতে যখন অধ্যয়নরত, দেশে সেইবার বন্যা হয়েছিল। সে বছর নাকি পাহাড়ী ঢলের কারনে পুরো বাংলাদেশ পানিতে তলিয়ে যায়, সেই কারনে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সমুহ বন্ধ ঘোষনা করা হয়। যেহেতু সামনে এসএসসি পরীক্ষা মাথার উপর পড়াশোনার চাপ অনেক বেশি। ব্লু -বার্ড হাই স্কুলে যারা পড়াশোনা করেছে বাবলা স্যার হলেন সকলের পরিচিতমুখ। যতদুর মনে আছে স্যার অষ্টম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশনি পড়াতেন, প্রায় সবাই বাবলা স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যেতো। স্যারের অংক বোঝানোর তরিকা ছিল অদ্ভুত। উনার কাছে যারা প্রাইভেট পড়তো সবাই স্যারের ভক্ত সবার প্রিয়, স্যার ছিলেন খুবই মিষ্টিভাষী। স্যারের কাছে উনার প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার সন্তানস্বরুপ। স্যার এর কাছে যে বা যারা পড়তো পড়েছে অংকে ৮০ নাম্বারের নিম্নে পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা খুবই অল্পসংখ্যক। স্যারের নিরলস পরিশ্রমের ফল হিসেবে উনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো রেজাল্ট আশা করা যুক্তিসঙ্গত। প্রতিটি শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক খাটতেন, সময় দিতেন প্রচুর উনি।

স্যারের বাসা সিলেট শহরের রায়নগর। আমরা সাত বান্ধবী নাজিয়া, নাফিসা, তান্নী, শর্মী, সালওয়া, সামান্তা, প্রতিদিনকার মতো স্যারের বাসায় যাবার জন্য প্রস্তুত নিচ্ছিলাম। ল্যান্ডফোন থেকে কল করে সামান্তাকে জানাই, ও যেন আমার আরো এক বান্ধবী তান্নীর বাসায় চলে আসে। তান্নীর বাসা থেকে এক রিকশা চড়ে স্যারের বাসায় রওয়ানা দিবো। আমি আমার বাসা থেকে দরগা গেইট হয়ে তান্নীকে নিয়ে স্যারের বাসায় রওয়ানা হলাম। পুরো সিলেট শহর পানিতে থৈ থৈ, মনে হচ্ছিল মাঝ দরিয়াতে সাঁতার কাটছিলাম। স্যার এর বাসায় গিয়ে দেখি মাত্র কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী টিউশনি পড়তে আসছে।  স্যার বললেন যেহেতু তোমরা চলে এসেছো, ঘন্টাখানিক ক্লাস করে চলে যাও। এক ঘন্টা ক্লাস করার পর স্যার ছুটি দিয়ে দিলেন। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি তার মধ্যে রিকশা খোঁজে পাওয়া অতি কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল, তবুও কোনোমতে একটি রিকশা পাওয়া গেলো। পাঠানটুলা থেকে রায়নগড় ভাড়া ছিল ২৫ টাকা। রিক্সাচালক দাবি করে বসলেন ৫০ টাকা ভাড়া ছাড়া যাবেন না। উপায়ন্তর নাই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে,  তার উপর মুষলধারে বৃষ্টি। পুরো এলাকা পরিবেশটা কেমন জানি ভুতুড়ে ভুতুড়ে ভাব। প্রতিদিন আমি চৌহাট্টা দিয়ে মিয়া ফাজিলচিশত হয়ে বাসায় যেতাম, সেইদিন ব্লু -বার্ড প্রাইমারী স্কুলের পাশ দিয়ে সাগরদীঘীর পাড় হয়ে গেলাম। সেই রাস্তা দিয়ে গেলে শশ্মানঘাটের পাশ যেতে হতো তাই ওই জায়গায়টুকুর পাশ দিয়ে যেতে আমার প্রচন্ড ভয় লাগতো। লোকমুখে শোনা কথা সেখানে একটা তিন রাস্তার মোড়ে প্রায় মাঝরাতে মানুষ নাকি একজন মহিলাকে দেখা যেতো, ঘটনা সত্য কি মিথ্যা তা জানা ছিলো না। শশ্মানঘাটের পাশ দিয়ে আমার রিকশা যাচ্ছিল, তার মধ্যে লোডশেডিং এর কারণবশত ঐ এলাকাতে বিদুৎ ছিলো না, রিকশাচালককে বললাম-যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জায়গা পার হতে, এই জায়গা আমার মোটেই ভালো লাগে না। জবাবে রিকশাচালক বললেন ‘আপা পানির জন্য তো রিক্সা সামনের দিকে আগানো সম্ভব হচ্ছে না, তার উপর আপা ঘোর অন্ধকার কিছু দেখা যায়না, ম্যানহোল অনেক সময় খোলা থাকে তাই আস্তে ধীরে সাবধানে যাওয়া ভালো, আপা কি ডরায় গেছেন? ডরায়েন না....,

একেতো বৃষ্টি তার উপর বিদুৎ নাই ,ভয়ে আমার গা যেন শিউরে উঠার মতো অবস্থা আর রাস্তা যেন ফুরোচ্ছে না। মানবশুন্য এলাকায় হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন আমার চুলে স্পর্শ করছে। মুহুর্তের মধ্যে গলার স্বর বসে গেল, মস্তিষ্কের স্তর যেন আলফা গামা বিটা অতিক্রম করে ধাপে ধাপে নামতে শুরু করে, কানের ভেতর কোন শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম না। আমার দাদু শৈশবে পুরোনো দিনের অনেক গল্প বলতেন। দাদুর কাছ থেকে প্রায় শুনতাম বৃষ্টি বাদলের দিনে নাকি প্রেতাত্মারা নাকি অবাধে চলাফেরা করে, সুযোগ পেলে মানুষকে উত্যক্ত করে। আমার মস্তিষ্ক যখন আলফা গামা বিটা একের পর এক স্তর ধাপে ধাপে নামতে শুরু হল, তখন আশেপাশের পরিবেশটা আরো যেন অ-স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল।  বাতাস তীব্রতর হওয়ার কারনে পাশের বাঁশবনের বাঁশ একটি অন্যটির গায়ে লাগায় কেমন শব্দ অদ্ভুত ভূতুড়ে মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই আমার স্মরণে আসে ঠাকুরমার ঝুলির কল্পকাহিনীর শাঁকচুন্নির কথা। দেখতে কি পরিমান কুৎসিত কদাকার ছিল, বাঁশবাগানের পাশে শেওড়া গাছে থাকতো। শাঁকচুন্নির মনে ইচ্ছে ছিল ব্রাহ্মণের বউ হবার জন্য, একদিন সুযোগ পেয়ে সে ব্রাহ্মণের বউকে ধরে সেই শেওড়া গাছে বেঁধে রাখে এবং ব্রাহ্মনের বউয়ের ছদ্মবেশ ধরে সুখে সংসার করতে লাগলো। ব্রাহ্মনের মা কিভাবে যেন তা টের পেয়ে গেল যে সে শাঁকচুন্নি বউয়ের বেশ ধরে সংসার করে। তা বুঝতে পেরে ওঝা এনে সেই শাঁকচুন্নিকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয় আর ব্রাহ্মনের বউকে খুঁজে পাওয়া যায়। যাই হোক যখন চুলে স্পর্শ অনুভব করলাম তখন মনে হল আমার পাশে কেউ আমার ওড়না ধরে নিচের দিকে টান দিচ্ছিলো। ঠাৎ কোথা থেকে একটি মোটরবাইক এসে আমার রিকশার গতিরোধ করে, মনে মনে ভাবতে শুরু করি একি কান্ড! উভয় সংকটের মধ্যে পড়লাম, এই জায়গায় ছিনতাই হয় প্রায়। আমার বড় বোন একবার ছিনতাইকারী কবলে পড়েছিলেন এই জায়গায়, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় খতমে ইউনুসসহ সকল দোয়া যা মনে ছিল জপে নিতে শুরু করি, তিনটা ছেলে অস্পষ্ট আবছা দেখতে পেলাম। এর মধ্য থেকে একজন বলল আপা আপনার ওড়না চাকার মাঝে প্যাঁচ লেগে গেছে, সকথায় আছেনা ‘বনের বাঘে খায়না মনের বাঘে খায়’। এতক্ষন যা ভাবছিলাম এর কিছুনা ওড়না চাকা লাগার কারনে সাইড থেকে টান ছিল আর রিকশা হুডের একপাশে বাতাস ঢোকার কারনে আমার মনে ভয় বিরাজ করছিল । যার ফলে যত রকমের আজে বাজে চিন্তা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে, ওরা যদি সতর্ক না করতো তাহলে কবে যে পটল তুলে ফেলতাম। আল্লাহ তাআলার দরবারে অশেষ শোকরানা গোজার করি, আমার এই জীবনের জন্য। ভূত বলতে কিছু নেই এই পৃথিবীতে সব মনের অজান্তে ভীতি থেকে তৈরি ভাবনা বা কল্পনা, যা আমার ক্ষেত্রে ঘটেছিল।

একটা কথা প্রমাণিত যে ভূত দুই জায়গায় জীবিত থাকে। এক ঠাকুরদা-ঠাকুরমার গল্পে। যত ভূত তাঁরাই দেখেছেন। এখনকার ছেলেমেয়েদের সত্যি বলতে ভূত দেখার সময় কোথায়। চোখ থাকে তো আইফোনে। ভূতেরা এতটাই কেয়ারলেস হয়ে পড়েছে, লজ্জায়, শোকে তারা এখন পলাতক।

দুই, সাহিত্যে। যুগ যুগ ধরে বেঁচে রয়েছেন তারা, বইয়ের প্রতি পাতায় পাতায়। সাহিত্যে এইসব ভূতের রসবোধ এতটাই আকর্ষণ করে আমাদের যে, কখনও কখনও হিরো হয়ে গেছেন। তাই তো ভূতের রাজার তিন বর আজও আমাদের কাছে অনন্য বিজ্ঞাপন।

সুতরাং সাহিত্যে ভূত আসে শুধুমাত্র রস সৃষ্টি করার জন্যই। খুব জোর, কয়েক আনা পয়সা রোজগার হয়ে থাকে সাহিত্যিকদের। এছাড়া ভূতের রহস্য খোঁজার কিছু নেই। একটি প্রশ্ন যেটা আমার মাথায় এখনো ঘুরপাক খায় সে বিষয়টি আমার যতটুকু মনে আছে ওড়না আমি গুটিয়ে নিয়ে বসেছিলাম চাকায় কিভাবে তা প্যাচ লেগে যায়?-পিডি


@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন