আজ সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং

জীবনানন্দ দাশ: অলক্ষ্মীর ঘরে লক্ষ্মীর বসবাস

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৬-১৮ ২২:৩৪:১৬

সংগৃহিত ছবি




|| মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন ||

সময়ের অনেক আগে জন্মানো কবির নাম জীবনানন্দ দাশ। শতাব্দী কাঁপানো অতিকায় প্রতিভার নাম জীবনানন্দ দাশ। বাংলা ভাষার অহংকার, আধুনিক বাঙালি মননের সুনিপুণ চিত্রকর, বেখাপ্পা সমাজের ভূয়োদর্শনের সুচিত্রক, কবি কুসুমকুমারী তনয় জীবনানন্দ দাশ। তাই শতাব্দীর ফারাক জেনেও কবিকে মনে হয় আজকের মানুষ। দহনে বিক্ষত ক্লিষ্ট হৃদয়ে সান্ত্বনার পরশ বুলায়। চোখ মেলে কবির বিদগ্ধ মুখভঙ্গী দেখি, যেন সবজান্তার মতো সন্তর্পণে দাড়িয়ে আছে নিঃশ্বাস ঘন দূরত্বে।

"সকলকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্গে পৌঁছুবে
সকলের আগে সকলেই তাই,,,--1946-47"

ফটকাদের সমাজে অনুভূতিশীল মানুষের হাহাকার নিরর্থক। ক্ষেত্রবিশেষ উৎপাত। বেশি উচ্চকিত হলে গলা টিপে স্বর থামানোর আয়োজন যথেচ্ছ।

"জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে
সন্তানের মতো হ’য়ে—
সন্তানের জন্ম দিতে-দিতে
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়,
কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়
যাহাদের; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজক্ষেতে আসিতেছে চ’লে
জন্ম দেবে—জন্ম দেবে ব’লে;
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন
আমার হৃদয় না কি? তাহদের মন
আমার মনের মতো না কি?-- বোধ"

স্পষ্টত, কবি শুধু মানুষের থেকে নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা করছেন। যেই চিন্তা-মনোভাব-প্রবৃত্তি মানুষের সমাজে জঞ্জাল বাড়ায়, সেসব কবির কাছে অপাঙ্কতেয়। কবি অন্তর্গত সূক্ষ্ম অনুভূতির কাছ থেকে ইশারা পেয়ে নিজেকে আগে থেকেই আলাদা করার প্রয়াস নেন। সমাজ তার অনুভূতির ধার ধারে না। অথচ সমাজ ক্রমেই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আগামী দিনের শিশুর জন্য, আগামী দিনের সভ্যতার জন্য উদ্বেগ ধারন না করে পারছেন না। পৃথিবীটা মানুষের। মানুষের পৃথিবীতে মানুষেরই যদি বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়, তাহলে কিসের এত আয়োজন? এত জ্ঞান-বিজ্ঞান, লড়াই-সংগ্রাম কার জন্য?

দ্রষ্টার মতো কথা বলছেন। ভবিষ্যত দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত বোধ করছেন। মানুষের পাশবিকতা, হীনতা-দীনতার অবসান কামনা করছেন। জীবনকে প্রেমের চাঁদরে ঢাকতে গভীর তাগিদ অনুভব করছেন। মানুষকে সুগভীর প্রেমে উদ্বুদ্ধ করছেন। অবশেষে সব বাজে খরচ হচ্ছে দেখে অভিসম্পাতের মতো বাণী দিচ্ছেন ছন্দের মোড়কে করে। বদমাশের ভীড়ে শান্তির দূত অবাঞ্চিত। কবি ক্রমাগত আহত বোধ করছেন।

"জীবনের ইতর শ্রেণীর
মানুষ তো এরা সব; ছেঁড়া জুতো পায়ে
বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করে;
সৃষ্টির অপরিক্লান্ত চারণার বেগে
এইসব প্রাণকণা জেগেছিল–বিকেলের সূর্যের রশ্মিতে
সহসা সুন্দর বলে মনে হয়েছিল কোনো উজ্জ্বল চোখের
মনীষী লোকের কাছে এই সব অণুর মতন
উদ্ভাসিত পৃথিবীর উপেক্ষিত জীবনগুলোকে।--1946-47"

মানুষ একা হয়ে যাচ্ছে। তীব্র একাকীত্বের নির্মম পীড়নে ব্যক্তির আত্মা মরে যাচ্ছে। অন্তঃসারশূণ্য কাঠামো হয়ে জড়বস্তুর মতো ঘুরছে ব্যক্তি। ব্যক্তির সামনে আশার বাণী নেই, ভবিতব্য নেই। চরম নৈরাশ্যের অন্ধকারে ব্যক্তি লীন হয়ে যাচ্ছে। আবার অন্ধকারেই হাতড়ে ফিরে ভুলের হাতে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে। আলো ঝলমলে না হয়ে পৃথিবী ক্রমশ অন্ধকারের কেনাবেচায় সরগরম হচ্ছে। কবি এসব অনুভব করছেন আর অস্থির হয়ে উঠছেন। যাদের হাতে সমাধানের ভার তারাই হাজির করছে নিত্য নতুন আপদ। মানুষকে বিভ্রান্ত করে 'চড়কের গাছে তুলে দিয়ে' ঘুমাচ্ছে। অতি আশাবাদ থেকে নৈরাশ্যের জন্ম। গভীরভাবে আশাবাদী কবিকে কখনো কখনো নৈরাশ্যের প্রবক্তা মনে হতে পারে। আদতে নিশ্ছিদ্র তিমিরে অবগাহন করে তিমির হননের অনিবার্যতা তুলে ধরছেন। পৃথিবীতে কোনো আলো নেই।

"এ-যুগে কোথাও কোনো আলো–কোনো কান্তিময় আলো
চোখের সুমুখে নেই যাত্রিকের;--1946-47"

তথাপি কোথায় যেন গভীর আশাবাদের বীজ লুকিয়ে থাকে। কবি আস্থা রাখতে চান মানুষের অন্তঃস্থ শক্তির উপর। মানুষের চেতনার বাগানে অজস্র রঙের ফুল ফুটবেই। কবি স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান।

"তবুও মানুষ অন্ধ দুর্দশার থেকে স্নিগ্ধ আঁধারের দিকে
অন্ধকার হ’তে তার নবীন নগরী গ্রাম উৎসবের পানে
যে অনবনমনে চলেছে আজও–তার হৃদয়ের
ভুলের পাপের উৎস অতিক্রম ক’রে চেতনার
বলয়ের নিজ গুণ রয়ে গেছে বলে মনে হয়।--1946-47"

জীবদ্দশায় অখ্যাত কবি মৃত্যুর পর তুমুল জনপ্রিয় হন। কবি বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা স্বীকার করেই বলা যায়, এই জনপ্রিয়তা সস্তা জনপ্রিয়তা নয়। লোকচক্ষের আড়ালে থাকা অনেকজনকেই প্রকাশ্যে আনার চেষ্টা হয়ে থাকে। যেজন টেকে, টিকে যায় আপন শক্তির বলে। একজন বুদ্ধদেব বসু প্রকাশের আলোতে আনলেই জীবনানন্দ দাশ জনপ্রিয় হয়ে যায় না। পাঠক-শ্রোতার নিজস্ব অনুভূতির বাহন হলেই কেবল নিখাদ জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়। মৃত্যুর পর ব্যক্তি জীবনানন্দ দাশ কিছু প্রত্যাশা করছেন না। মৃত মানুষ কিছু প্রত্যাশা করতে জানেও না। তবে সময় কিছু প্রত্যাশা করতেই পারে।

"অনেক অপরিমেয় যুগ কেটে গেল;
মানুষকে স্থির- স্থিরতর হতে দেবে না সময়;
সে কিছু চেয়েছে বলে এত রক্ত নদী।--শ্যামলী"

জীবনানন্দ দাশ যখন কাব্য সাধনা করছেন তখন আজকের মতো এত তীব্র হয়নি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির বিচ্ছেদ। বলা যায়, শুরু হয়েছে মাত্র। বিচ্ছেদের উপসর্গ দেখা দিয়েছে কেবল। কবি সেটাকে শুধু গভীরভাবে উপলব্ধিই করলেন না, ভবিষ্যতের ব্যামোটাও ধরে ফেললেন। এভাবেই চলবে চিরকাল? মানুষ কি নিজের কল্যাণ কামনা করে না? মানুষ কি আত্মঘাতী হবার আয়োজন করছে? এভাবেই যদি চলে চিরকাল, মানুষের পক্ষে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কবি সেই অনিবার্য দুর্দশাকে হৃদয়ে ধারন করছেন। ধারন করে তীব্র ব্যথায় ছটফট করছেন। আর্তধ্বনির প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। ভাষার বিবরণে লিখিত হয়ে চলে গভীর মর্মপীড়ার ছবি। ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের ছবি কাব্য ব্যঞ্জণায় আঁকা হতে থাকে।

আগেই বলেছি, সময়ের অনেক আগে কবি লিখছেন তীব্র যাতনার কথা। সমকালের মানুষ সেই যাতনার অনুভূতি তীব্রভাবে লাভ করে নাই তখনো। একদিন মানুষ যেই বেদনায় ছটফট করে মরবে সেই বেদনার সুড়সুড়ি চলছে মাত্র। এমন অবস্থায় মানুষের কাছে দুর্বোধ্য লাগবেই তার কবিতা। সমকালের পাঠকের কাছে জীবনানন্দ দাশ অকবির নামান্তর। কিংবা প্রলাপের রূপকার মাত্র। যদিও কবি জানতেন, কী নির্মম সত্যকে তিনি ধরে রাখছেন কবিতার পৃষ্ঠাগুলোতে।

সময়ের পথ ধরে ভবিষ্যতে হাটছেন, যেমন হাটছেন তিনি হাজার বছর ধরে অতীতের চেনা পথেও। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, সুমেরু-কুমেরু, আকাশ-পাতাল প্রভৃতি সমস্ত কিছুকে আবৃত করে আপন কক্ষপথে ছুটছেন। যাপন করছেন মহাকালের মহাজাগতিক মহাজীবন। ধূসর হয়ে আসা পান্ডুলিপি ঝেড়ে নতুন করে মেলে ধরছেন। কালিক-স্থানিক সমস্ত চেতনার মর্মে গিয়ে অনুভব করছেন করাচ্ছেন জীবনের অপূর্ব সুধা।

"টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।
রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কতো দেখিয়াছি।
ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন— যেন কোন্ বিকীর্ণ জীবন
অধিকার ক’রে আছে ইহাদের মন;
দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ
মরণের সাথে লড়িয়াছে;-- আট বছর আগের একদিন।"

মহাজীবনের অমিত উপলব্ধিকে টেনে এনে পায়ের কাছে নামিয়েছেন। পায়ের তলায় তার বাংলার মাটি। নশ্বর দেহের চারপাশে বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি। আয়নায় নিজেকে দেখে নিয়ে অপরূপ সুন্দরের নামকীর্তণ করছেন।
"তোমরা যেখানে সাধ চ'লে যাও — আমি এই বাংলার পারে র'য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;"

"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর :"

নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে নিজেকে ভালোবাসতে পারার অপূর্ব স্বাদ-উপভোগের জীবনকে যাপন করেছেন কবি। বাংলার প্রকৃতি-সংস্কৃতি ও ভাষার মধ্য দিয়ে আত্ম-আবিষ্কারের মহিমা গেয়েছেন। নিজের দেশকে ভালোবাসলেই কেবল পৃথিবীকে ভালোবাসা যায়। নিজের জীবনকে ভালোবাসতে পারলে অন্যের জীবনকেও ভালোবাসা যায়। নিজের মধ্য দিয়ে সমস্ত কিছু দেখার এই চোখ মহাজীবনের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে জাত। "রূপসী বাংলা"র কবিতাগুলো অন্তরাত্মার উচ্ছ্বাস হিসেবে লিখিত। মজ্জায় উপলব্ধ অনুভূতির প্রকাশ অকৃত্রিম হয়। কবি তার জীবনের চরম উপলব্ধিকে 'রূপসী বাংলা' গ্রন্থের কবিতাগুলোতে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

বাংলার নারী-নদী-পাখি-বৃক্ষ-ঘাস-লতা-গুল্ম-প্রাণী ও মানুষ নিয়ে কবির উচ্ছ্বাস নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং আজন্ম চর্চিত বলেই মনে হয় আমাদের। এই মহান উপলব্ধির উচ্চমূল্যকে ধারন করতে পারবে না সমকালের নাগরিক-পাঠক। তাই আমরা দেখি, রূপসী বাংলা প্রকাশিত হলো তার জীবদ্দশার বাইরে গিয়ে। হ্যা, কবির মৃত্যুর চার বছর পর 1957 সালে। তার কাছে দেশপ্রেম সস্তা আবেগের নাম ছিলো না, মর্মে উপলব্ধি করা নিষ্কলুষ আবেগের নাম। কিন্তু লোকে যদি সস্তাই ভাবে! তাই হয়তো কালক্ষেপন। হয়তো অপেক্ষা করছিলেন পাঠকের মনন তৈরি হবার। অপেক্ষা তাকে ভরসা দিতে পারেনি। আরো সময় লাগবে অনেক। আমরা দেখি, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সময়টি হয়নি।

জীবনানন্দ দাশ কি জানতেন, তিনি শতাব্দী ডিঙিয়ে জন্ম নিয়েছেন? তার জন্মটি একশো বছর পরে হলেই বরং ভালো হতো? তিনি জানতেন কিনা আমরা জানি না। তবে আমরা এটা জেনে গেছি, তিনি ছিলেন আমাদের কালের কবি, একবিংশ শতকের কবি। চরম বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিরর্থকতাবোধ, নৈরাশ্যের সাগরে নিমজ্জন, ক্ষয়িষ্ণু প্রাণশক্তির ক্রমাবনতি ইত্যাদির দগদগে ঘা নিয়ে ব্যক্তি তীব্র ব্যথায় কাতরায়; আত্মদংশনের বিপুল চাপ, 'কিছুতেই মানাইছে না রে' উপলব্ধি, কোথাও আলো নেই আর' দেখে দেখে ব্যক্তি আজ হাহুতাশের বাষ্পে ভেসে বেড়ায়। ব্যক্তি প্রবলভাবে ভরসা খোঁজে, বেঁচে থাকার প্রেরণা খোঁজে, সার্থকতার পরিমাপ খোঁজে। কিছুই তার মনের পিপাসা তৃপ্ত করছে না' দেখে আরো কুণ্ঠিত হয়ে যায়। তীব্র নিরাসক্ত জীবন মর্মমূলে নিয়ত হলাহলের স্বাদ আনে। এই জীবন তো আমাদের প্রত্যাশিত ছিলো না। এই জীবনকে তো আমরা আবাহন করিনি। তাহলে কি সেই পাপ যা আমাদের এই পরিণতির সামনে এনে দাড় করিয়েছে? আমরা সেই পাপের ক্ষতিপূরণ চাই। আমাদের কাছে এই পাপের কোনো ক্ষমা নেই। হয় প্রতিশোধ নয় অভিসম্পাত। এ যুগের প্রতিটি সংবেদনশীল হৃদয় এভাবেই ক্ষোভ পুষে রাখে মনে। প্রতিকার নেই, প্রতিবিধান নেই, নিরাময় নেই, অনন্ত ব্যাধি নিয়ে আমৃত্যু হাসফাস করার নামই এ যুগের জীবন। এই যুগের কবি জীবনানন্দ দাশ ভুল করে জন্মেছিলেন অতীতের সেই ১৮৯৯ সালে, ঊনবিংশ শতকের শেষ প্রান্তে।

অতিরঞ্জনের মতো শোনায় তবু কেউ কেউ যে বলেন, জীবনানন্দ দাশের পর যিনিই কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন তিনিই মূলত বেয়াদবী করেছেন। তাদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা বলছি না, কবিতা লেখার প্রয়োজন আর নেই। কিন্তু এ কথার মর্মমূলে রয়েছে সেই কথা যে, জীবনানন্দ দাশ শতাব্দী ডিঙ্গিয়ে জন্ম নেয়া এক কালজয়ী প্রতিভা।

বরিশালে পড়াশুনা করছেন, কলকাতায় এসে কলেজে পড়ছেন, পয়সার অভাবে ঘনঘন বাড়ি যাচ্ছেন, পড়াশুনা শেষে চাকরি করছেন, চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন, কখনো বা চাকরিচ্যূত হচ্ছেন। সব মিলিয়ে অস্থির একটি জীবনকে যাপন করে গেছেন জীবনানন্দ দাশ। অলক্ষ্মীর পৃথিবীতে লক্ষ্মীর বসতি কিছুতেই নির্বিকার থাকতে পারে না। নিস্তরঙ্গ, নির্বিবাদ দিন যাপন এই রকম এগিয়ে থাকা সত্ত্বার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।

১৯৫৩ সালে ট্রাম দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অনেকে তার এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা ভাবার অনেক যুক্তি দেখতে পান। সে সময় ট্রাম দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাবার কোনো নজির নেই। তদুপরি জীবদ্দশায় কবি হিসেবে প্রায় অখ্যাত থেকে যাবার গ্লানি হয়তো কুড়ে কুড়ে খেয়েছে তার প্রখর চেতনাকে। মৃত্যুর কারন যাই হোক, কবির ব্যক্তিগত লাঞ্ছনার কোনো সদুত্তর নেই আমাদের কাছে। আজকের এই দূরাগত সময়ে একটি কৌতূহল আমাদের না হয়ে পারে না যে, কবিকে যারা কথায় কথায় তিরষ্কার-তুচ্ছ করেছিলো তাদের প্রতি কবির মনোভাবটি কেমন ছিলো? সময়ের ক্ষুদ্র জীব মনে করে সর্বাংশে অবজ্ঞা করতে পেরেছিলেন কি? নাকি তিনিও ক্ষুদ্রদের মতো রাগ-ক্ষোভ-প্রতিহিংসা লালন করতেন মনে? সেসব আর জানার উপায় নেই। তবে মহাকালের কাছে তার আর্জি-অভিযোগের ভুরি ভুরি নজির রয়ে গেছে। মহাকালের কাছে তার অনেক প্রার্থনাও ছিলো।

"আমি শেষ হব শুধু , ওগো প্রেম , তুমি শেষ হলে !
তুমি যদি বেঁচে থাকো ,- জেগে রবো আমি এই পৃথিবীর পর,-
যদিও বুকের পরে রবে মৃত্যু ,- মৃত্যুর কবর !--প্রেম।"

জীবনানন্দ দাশ সদা প্রেমে বিগলিত সত্ত্বার নাম। মহাকাল কবির প্রার্থণা মঞ্জুর করেছে। অমর প্রেমের কবি হয়ে জীবনানন্দ দাশ আজো বেঁচে আছেন বাংলায়, মহাপৃথিবীর মহানাগরিক হয়ে। বিষণ্ন প্রেমিকের তাপিত মনে অমিত রোমাঞ্চ জাগানোর সঞ্জীবনী হয়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতাগুলো সদা জেগে থাকে। নিরর্থক জীবনের নিত্য সঙ্গী বিষণ্নতা। কবি সেই ক্ষয়িষ্ণু অনুভূতির মেরামত করেন। ভগ্ন হৃদয়কে গুছিয়ে আনেন। তুচ্ছ জীবনবোধের স্থলে মহাজীবনবোধকে প্রতিস্থাপিত করেন। ব্যর্থ স্বপ্ন-সংগ্রামের বীজভূমিতে নতুন চারা রোপণ করেন।

"হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার? আমিও তোমার মতো বুড়ো হব—বুড়ি চাঁদটারে আমি
করে দেব কালীদহে বেনো জলে পার;
আমরা দুজনে মিলে শূন্যে করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।--আট বছর আগের একদিন"

সূক্ষ্মদর্শী মানুষের চেতনায় প্রতি মুহূর্তে সময়ের দাগ-দংশন আঁকা হতে থাকে। যারা গভীরে দেখতে পায়, যাদের বিশ্লেষন ক্ষমতা প্রবল, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি যন্ত্রণা পায়। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় তার হাতে নেই। এই যন্ত্রণা আসে অশালীন ব্যবস্থার বদৌলতে। বৈষম্যের ভিত্তি ধরা সমাজে প্রতিনিয়ত এই যন্ত্রণার উৎপাদন হয়। একা ব্যক্তি তার নিরাময় করতে পারে না। তাবৎ বিশৃঙ্খলার কাছে একা ব্যক্তি তুচ্ছ এবং অসহায়। বিশ্লেষণ প্রবণ মানুষ এই সত্যের মুখোমুখী দাড়িয়ে অনুভব করে আমূল পরিবর্তনের অপরিহার্যতাকে। আর তখন সে সমষ্টির চেতনায় লীন হতে থাকে। ব্যক্তি তখন সমষ্টির কন্ঠ হয়ে অনেক অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করে ফেলে।

"আমার খাবার ডিশে হরিণের মাংসের ঘ্রাণ আমি পাবো,
…মাংস-খাওয়া হ’লো তবু শেষ?
…কেন শেষ হবে?
কেন এই মৃগদের কথা ভেবে ব্যথা পেতে হবে
তাদের মতন নই আমিও কি?-- ক্যাম্পে"

যখন এই পর্যবেক্ষণ কবির সামাজিক সত্ত্বাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়, তখন আরো কট্টর করে আনেন কবিতার ভাষা।

"যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।--অদ্ভুত আঁধার এক"

বাংলা ভাষা রবীন্দ্রনাথের পর কবি জীবনানন্দ দাশের হাত ধরে কাব্যিকতার চূড়া স্পর্শ করেছে। পৃথিবীর প্রধানতম ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা অন্যতম। আর এই ভাষার সর্বোচ্চ শিল্পরূপ সাধন করেছেন ক্ষণজন্মা জীবনানন্দ দাশ। জীয়ন্তে কবির দুর্দশার কারন হয়েছে যেসব মানুষ তারা সবাই নিতান্তই সংখ্যা। ইতিহাস তাদের মনে রাখেনি। ভাষাও তাদের ধারন করেনি। সাহিত্য-শিল্পের রূপ বিকৃতি ছাড়া আর কোনো ভূমিকা তাদের নেই। জীবনানন্দ দাশ মহাজীবনের অনিন্দ্য সাধ উপভোগের নিমিত্ত স্থূল দুঃখ-দুর্দশার জীবনকে সাময়িক ব্যবহার করেছেন মাত্র। হয়তো সেই ব্যবহার করার প্রয়োজনটি তার সাঙ্গ হয়েছিলো 1953 সালে ট্রাম দুর্ঘটনার ক্ষণটিতে।

আজ যারা কবিতা লিখছেন তাদের অনেকেই জীবনানন্দ দাশকে অতিক্রম করে যেতে চাচ্ছেন। যখন অতিক্রম করতে ব্যর্থ হচ্ছেন তখন নানা ভুলভাল বকেন। প্রতিভা কখনো ধ্রুব নয়। জীবনানন্দ দাশকে অতিক্রম করার মধ্যে কারো ছোট-বড় হবার ব্যাপার নেই। বরং ভাষার জন্য সেটি ইতিবাচক। ভাষা তার আপন গতিতে সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ প্রক্রিয়াকে সাথে নিয়ে এগোতে থাকে। সেই এগুনোর প্রক্রিয়ায় যারা ঠিকভাবে হাল ধরতে জানে তারাই কালিক সীমানাকে অতিক্রম করে যায়। গদ্যের জীবনানন্দ দাশ তুলনামূলক কম প্রকাশিত। কিন্তু আমরা যেটুকু তার গদ্যের পরিচয় পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে, গদ্যেও তিনি শতাব্দী সমান সময়কে ডিঙ্গিয়ে গেছেন।

জীবনানন্দ দাশ একটি সত্ত্বার নাম। স্পষ্ট করে বলা যায়, খাটি বাঙালি সত্ত্বার নাম। ইতিহাস-বিজ্ঞান-সমাজ-রাজনীতির আলোকে জাগরণে-ঘুমে পরিপূর্ণ বাঙালি সত্ত্বার অখন্ড প্রতিচ্ছবি জীবনানন্দ দাশের তাবৎ শিল্পকর্ম।

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন