আজ শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০ ইং

বাউটা হুলো

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-১৪ ১৬:০৬:২১

বাউটা হুলো
:: ফারজানা ইসলাম লিনু ::

গত বছর কালু ভুলু নামের জোড়া কুকুরের মৃত্যুর পর পুত্রের মন ভীষণ খারাপ। পোষা কুকুরের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রয়াণে তার হৃদয় ভেঙে চৌচির। চিপে চিপে কান্না করে কুকুর জোড়ার জন্য। পুত্রের দুঃখে সমব্যথী আমাদের কেয়ারটেকার শুক্কুর মিয়া বিকল্প খুঁজতে থাকেন।
এমনিতেই মায়া বড় অদ্ভুত জিনিস, সাত সমুদ্রের ওপারে, আকাশে, পাতালে গিয়েও শান্তি নাই। মায়া পিছু তাড়া করে যন্ত্রণা দেয়।

বারংবার প্রানীদের মৃত্যু সহ্য করতে পারবে না, এই আশংকা থেকেই আমার সংবেদনশীল পুত্র আবার কুকুর পালনে তীব্র অনীহা প্রকাশ করে। তার নারাজিতে আমিও মনে মনে বেশ খুশি।

তারপরও আমার পুত্রকে খুশি করতে শুক্কুর মিয়া একদিন একটা বাচ্চা বিড়াল নিয়ে হাজির। বাসায় বিড়ালের প্রবেশ নিষেধ, তাইতো দুজনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিচ তলার দারোয়ানের রুমে বিড়ালটা থাকবে।

ফুটফুটে বিড়ালছানা নিয়ে পুত্রের ভীষণ ব্যস্ততা এখন। বিড়ালের আরাম আয়েশের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুত্র ও তার শুক্কুর ভাইয়ের প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে দুই প্রহর। এমনকি রাতে ঘুমানোর আগেও নিচে গিয়ে বিড়ালের খোঁজ খবর নেয়া হয় অতি আগ্রহে।

এইসব আজাইরা কাজ আমি দেখেও না দেখার ভান করি। আবার বাইরে যাওয়ার সময় পুত্রের অগোচরে বিড়ালের রুমে ঢুঁ মেরে নিজেও একটু খোঁজ খবর নিয়ে যাই। ক'দিনে বাচ্চা বিড়ালটা গায়ে গতরে একটু বড় হয়েছে। শৈশব কৈশোর ছাড়িয়ে সে এখন পুরা যৌবনে। তার রূপ যশের খ্যাতি পাড়ার বিড়াল মহলে রীতিমতো ইর্ষণীয়।

রূপবান হুলো বিড়ালের খোঁজে পাড়ার তাবত বিড়ালিনিরা এসে আমাদের গ্যারেজে ভীড় করে। বাইরে বের হওয়ার সময় গ্যারেজে প্রায়ই দেখি নানা সাইজের, বর্ণের বিড়াল সমাবেশ। আমাদের হুলো বিড়ালের জন্য বিড়ালিনিদের এই আড্ডা আয়োজন, এইটা যে কারো বুঝতে বাকি থাকবেনা।

সকালে ঘুম থেকে উঠে পুত্রের প্রথম কাজ হলো বিড়ালের ঘরে উঁকি দেয়া। সেদিনও ব্যতিক্রম হয়নি। নিচতলা থেকে হঠাৎ পুত্রের কান্না শুনা যায়। আমি হন্তদন্ত করে দৌড়ে বের হই।

কি হয়েছে বাজান?

মা..... চোর আমার বিড়াল নিয়ে চলে গিয়েছে।

এইটা কেমন কথা? বিড়ালের কি অমন আকাল পড়েছে?চোর তোমার বিড়াল নিয়ে যাবে।

হ্যাঁ মা, দুইটা টোকাই ছেলের কু দৃষ্টি পড়েছিল আমার বিড়ালের উপর। তারা রোজ এসে এইখানে বসে থাকতো।

না না, এতো সকাল কেউ বিড়াল চুরি করতে আসবে না।

কালকে রাতে ঘুমানোর আগে আমি বিড়ালটাকে ঠিকঠাক মতো দেখেছি। শুক্কুর ভাই মনে হয় ভুল করে দরজা খুলে রেখেছিল। আর..... বলেই আবার ক্রন্দন।

বিড়ালতো প্রায়ই বাইরে বের হয়, কেউ তো নেয় নি। নিশ্চয়ই অন্য ঝামেলা আছে। দুষ্ট বিড়াল কোথাও লুকিয়ে আছে হয়তো।

পুত্রের মনের অবস্থা চিন্তা করে আমরা সবাই মিলে বিড়ালকে গরু খোঁজা খুঁজলাম। নাহ, বিড়ালটা পাওয়া গেলো না। বিড়াল হারানোর পরে থেকে বাকি বিড়ালদেরও আসা বন্ধ হয়ে গেলো।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে মা গিয়ে বারান্দায় হাঁটেন। প্রায়দিনই চোখে পড়ে অবিকল আমাদের হুলো বিড়াল এক বিড়ালিনিকে সাথে নিয়ে সড়কের এলইডি লাইটের নিচে একটা পিলারের উপর বসে আছে। সকাল হলে আর দেখা যায় না।

আমাদের ঠিক সামনের বাসাটা ভেঙে ফেলা হয়েছে, পাইলিং চলছে নতুন বাসা বানানোর জন্য। জায়গাটা উদাম হওয়ার কারণে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তাইতো মা উনার সোনা দাদার (নাতি) বিড়ালের খোঁজে রোজ একবার গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ান।

একদিন আমাকে ডাকলেন, বিড়াল দম্পতিকে দেখার জন্য।
ঠিক তাইতো, আমাদের আদরের হুলো বিড়াল লাস্যময়ী এক বিড়ালিনির সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে। ভাবলাম নিচে গিয়ে দুজনকেই নিয়ে আসি। বিড়ালের ঘরে দুজনে সংসার পাতুক। ছানাপোনায় ভরে উঠুক নিচতলা।
প্রানী হারানোর শোকে কাতর আমার পুত্রের ভগ্নহৃদয় জোড়া লাগবে। এর চেয়ে আনন্দের বিষয় কি হতে পারে।

কিন্তু আমার মতো প্রানী বিদ্বেষী মহিলাকে দেখলে অভিমানি বিড়াল আসতে চাইবে না। তাই আমার না যাওয়াই ভালো।
শুক্কুর মিয়াকে বললাম, হুলো বিড়াল একা আসতে না চাইলে তার প্রেয়সী সমেত নিতে এসো।
কিসের কি, শুক্কুরকে দেখে সে এক দৌড়ে পগার পার।

চেষ্টার কোন ত্রুটি না করে শুক্কুর এসে একদিন জানিয়ে দিল, না গো মামি, 'এই উলা বাউটা অই গেছে, আর আইতো নায়।"

ততদিনে পুত্র আমার বিড়ালের শোক কাটিয়ে উঠেছে। আমিও মনে মনে ভাবলাম ভালোই হয়েছে। আপদ বিদায় হয়েছে। তাছাড়া খুদ মানুষই ভালোবাসার জন্য রাজ সিংহাসন ছেড়ে ছুঁড়ে বনে চলে যায়, আর এই অবলা প্রানী আমাদের ঘরের সুখের জীবন ছেড়ে তার জ্ঞাতিকুলের এক মেখরিকে নিয়ে পালিয়েছে। এ আর এমন কি?
সুখে থাকুক বেচারা হুলো বিড়াল।

শুক্কুর মিয়ার মাধ্যমে হুলো সম্পর্কে নিত্যনতুন খবর আসে। একদিন খবর পেলাম কোন বিড়ালিনির মনিবের বাড়িতে ঘর জামাই হুলো বিড়ালের দিন ভালোই কাটছে। ভালো থাকলেই ভালো। বিড়াল নিয়ে ভাবার আমার সময় কই?

ছুটির দিনে বারান্দায় গান শুনে একটু জরুরি লিখা লিখিতে ব্যস্ত আমি। কড়ই গাছের পক্ষীকূলেরা সঙ্গী তখন আমার। বিশেষ করে একজোড়া কাক দম্পতির সাথে আমার খাতির একটু বেশি। ভীষণ ঝগড়াটে আর ছিচকাঁদুনে কাক বউটা অবশ্য একটু ঝামেলা করে। কারণে অকারণে কাক জামাইয়ের সাথে কাইজ্যা বাঁধায়।ঘুঘু জোড়া আবার সুখী দম্পতি। চড়ুই, বুলবুলি, শালিক, পেঁচা সবাই দাম্পত্যজীবনে সুখী।

কিসের একটা উদ্ভট শব্দ আমার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় বারবার। পক্ষীদের থেকে চোখ ফিরিয়ে দেখি বিশ্বজিৎদের টিনের চালায় হুলো বিড়াল দম্পতি গভীর প্রণয়ে ব্যস্ত। আমাকে দেখে এমন চোখ বড় করে তাকালো,..... "দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালোবাসিবার দে রে মোরে অবসর"।

আমি বেচারা হুলো বিড়ালের মনের কথা বুঝতে পেরে জায়গা বদল করে অন্য বারান্দায় চলে যাই। টিনের চালার কড়ত মড়ত শব্দে বিশ্বজিতের বাপের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিশ্বজিতের মা লম্বা কুটা নিয়ে তেড়ে আসে। বিড়াল জোড়ার প্রণয় লীলা সাঙ্গ হয়।

প্রেমিক বিড়াল হিসেবে হুলোটার জনপ্রিয়তা এখন বেশ তুঙ্গে। সপ্তাহে সপ্তাহে তার প্রেয়সী বদল হয়। সদ্য সাবেক পুয়াতি প্রেয়সী মোটা পেট নিয়ে বিশ্বজিৎদের উঠানে আলস্যে রোদ পোহায়। হুলো আর তার দিকে ফিরেও তাকায় না।

নতুন প্রেয়সীকে নিয়ে হুলো এখন রেখার মায়ের টিনের চালে অভিসার করে। ঢালু চাল থেকে বার বার গড়িয়ে পড়ে, আবার উঠে। প্রকাশ্য দিবালোকে বিড়াল জোড়ার উৎকট প্রণয়কান্ডে আমার লিখালিখি বাঁধাগ্রস্ত হয়, মনোযোগেও ছন্দপতন ঘটে। হিশ হাশ, যাহ বললেও তারা নির্বিকার।

কিছু দিনের মধ্যে দেখা যায় পাড়ার সকল বিড়ালিনিরা সন্তানসম্ভবা। বিরহ ব্যাথার তোয়াক্কা না করে বাচ্চা প্রসবের নিরাপদ ম্যাটার্নিটি হাউসের খুঁজে ভারী শরীরে তারা এদিক ওদিক ঘুরে। এই দুঃসময়ে হুলো বিড়ালকে আর তাদের আশেপাশে দেখা যায় না। অধিকার আদায়ে বিড়ালিনিরাও কেন জানি নিশ্চুপ। হয়তো এটাই তাদের নিয়তি।

প্রেমিক বিড়াল উল্টো মুছ তাও দিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ায়। কুমারি মেখরি দেখলে দৌড়ে যায়। নানা ভঙ্গিতে মুগ্ধ করতে চায় বালিকা মেখরিকে। এই তল্লাটে তার চেয়ে কারবারি হুলো আর নেই। অহংকারে হুলোর মাটিতে পা পড়েনা। মেখরিরাও তার প্রেমে বিনাশর্তে দিওয়ানা।

ক'দিন থেকে হুলোটাকে আর দেখি না। মনে হয়
এই এলাকায় প্রেম ভালোবাসা ও সংসার পাতা তার শেষ। আবাস গুটিয়ে পাড়ি জমিয়েছে অন্য কোথাও। আবার হয়তো জড়িয়েছে নতুন সম্পর্কে। আমরা তাকে ভুলতে বসেছি প্রায়, সেও আমাদের ভুলে গিয়েছে নিশ্চিত।

গ্রীষ্মের এক তপ্ত দুপুর। কেমন সুনসান নিরবতা চারিদিকে। স্কুল থেকে ফিরে দেখি গ্যারেজে লান থান হয়ে একটা বিড়াল শুয়ে আছে। উঠতি বয়সী কোন বিড়াল না, একেবারে বুড়ো হুলো। আমার সব কিছুতে অনাবশ্যক কৌতুহল। পা টিপে টিপে বিড়ালের কাছে গেলাম। এ তো দেখি আমাদের সেই হুলো বিড়াল। গায়ের রং, পেটের নিচের দাগ সবই অবিকল।

কিন্তু গতরে আগের জৌলুস নেই। কেমন যেন চুপসানো বিধ্বস্ত চেহারা, জীর্ণ হাড় জির জিরে শরীর।

আমি বিড়ালের ভাষা বুঝিনা, বিড়ালরাও আমার ভাষা বুঝেনা। তারপরও অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলাম। হুলোটার মুখে রা.. নেই। আগের মতো চোখ বড় করে না তাকালেও পালিয়ে যায় না।
বুঝলাম, তাকোত নেই।

ড্রাইভার আমাকে বললো, মামি হেই বাউটা বিলাই আবার আইছে দেখছুইন নি? বলেই মোটা একটা লাঠি হাতে নিলো।

আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পড়িমরি করে বাউটা হুলো দিলো এক দৌড়।

ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব । একটু ধাতস্থ হয়ে ড্রাইভারকে দিলাম ধমক, সব সময় আগলঠাইয়্যামি না করলে হয় না?
একসময় শুক্কুর মিয়া কত চেষ্টা করে আকর্ষনীয় জীবনের প্রলোভন দেখিয়েও ফেরাতে পারেনি হুলোটাকে। কি এমন হয়েছে বাউটা হুলোর? একাকি বিধ্বস্ত চেহারায় আবার যে ফিরে এলো গ্যারেজে? মনের খুতখুতানি আমার যায়না।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার বাউটা হুলোকে খুঁজে এসেছি, না পাইনি। ড্রাইভারের লাঠির ভয়ে বেচারা হুলো হয়তো বাকি জীবনে এ মুখো হবেনা। আমারও জানা হবে না কি হয়েছিলো তার জীবনে, কেন তার এমন পরিণতি।

ফারজানা ইসলাম লিনু : গল্পাকার ও শিক্ষিকা

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন