আজ শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০ ইং

গ্রন্থালোচনা: লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমনকুমার দাশের ‘লোকসাধকের দরবারে’

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-৩০ ০০:২৬:৫৬

:: হিমাদ্রী শর্মা ::

(বইয়ের নাম : লোকসাধকের দরবারে। লেখক : সুমনকুমার দাশ। প্রকাশনাসংস্থা : নাগরী, সিলেট)

সিলেটের লোকশিল্পের লোকায়িত কিছু রত্নগাঁথাদের নিয়ে রচিত এই বইটি। বাউলদের জীবনের টুকরো-টুকরো কিছু স্মৃতির কথা সাবলীল আঙ্গিকে লিখেছেন লেখক সুমনকুমার দাশ। বইটিকে লেখকের আত্মস্মৃতি বলাও চলে! ৮৭ পৃষ্ঠার এই বইটি সাইজের দিক দিয়ে খুব বড় না হলেও ভেতরের গুণীদের জীবনের গল্পগুলো আপনাকে ভাবাবে, আপনাকে জানান দিবে কত গুণীর কর্ম, তাদের দর্শন, তাদের সৃষ্টি সম্পর্কে।

'লোকসাধকের দরবারে' বইটি মূলত ১৩ জন সংগীতজ্ঞকে নিয়ে রচিত। সেসকল গুণীজনেরা হলেন, সুষমা দাশ, চন্দ্রাবতী রায়বর্মণ, কফিলউদ্দিন সরকার, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, রামকানাই দাশ, বিদিতলাল দাস, কারি আমীর উদ্দিন আহমদ, হিমাংশু গোস্বামী, দুলাল ভৌমিক, রোহী ঠাকুর, রণেশ ঠাকুর, ইসমাইল, কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য।

লেখক তাদের সাথে মিশেছন। একবার দুবার নয়,বারংবার মিশেছেন তাদের সাথে। যখনই সুযোগ পেয়েছেন তাদের সাথে মিশতে চেয়েছেন। তাদের জীবনের টুকরো-টুকরো কিছু স্মৃতি জেনেছেন, তাদের অপ্রকাশিত কথা কিংবা গান সম্পর্কে জেনেছেন। এসব কিছুই লেখক তুলে ধরেছেন এই বইয়ে।

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষই রয়েছেন যারা লোকগানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছেন। কিন্তু তথাকথিত সমাজে তাদের তেমন একটা মূল্যায়ন করা হয় না, তাদের এমন অনেক কালজয়ী সৃষ্টি রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে এই সমাজ জানে না কিংবা জানার চেষ্টাটুকুও করে না। কিন্তু তারপরও দু'তিন জন মানুষ ক্রমাগত চেষ্টা করে যান এই রত্নদের এবং তাদের সৃষ্টিকে সবার সামনে উপস্থাপন করতে। লেখক সুমনকুমার দাশ তাদের অন্যতম। তিনি সেসব গুণীদের নিয়ে লিখেছেন এই বইয়ে যারা লোকগানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেবর্তে ছিলেন দিনের পর দিন। যাদের কেউ এখনো বেঁচে আছেন, অনেকেই আবার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।

লেখক বাউলের আখড়া আর ফকিরের আসরে নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যমে গুণীসব লোকবিদদের সম্পর্কে জেনেছেন, তাদের জগৎ সম্পর্কে গভীরভাবে জেনেছেন, স্মৃতিগুলো অকপটে লিখে গেছেন প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

বইয়ে লোকসাধকের কিছু কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা একজন পাঠক হিসেবে আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে। কয়েকটা কথা না বললেই নয়!
লেখক ও লোকসাধক চন্দ্রাবতী রায় বর্মণের কথোপকথনের এক পর্যায়ে লেখককে তিনি বললেন, ‘আমি গান গাই। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু আমারে নিয়া বই হইতে পারে!’ বা লোকসাধক বিদিতলাল দাস (যাকে সবাই পটলদা বলে সম্বোধন করত!) বললেন, ‘কিছু পাওয়ার জন্য সুরের জগতে আসিনি,এসেছি প্রাণের তাগিদে। এই যে গানের জগতে পড়ে আছি,সেটা ভালোবাসায়’ কিংবা লোকসাধক হিমাংশু গোস্বামীর কথায় পরিপূর্ণ দেশপ্রেম ফুটে উঠে যখন তিনি বললেন, ‘দেশ ত্যাগ করলেও সারাক্ষণ দেশ নিয়েই আমি ভাবি। এখন প্রবাসে বাংলাদেশের লোকগান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছি। জীবনের শেষদিন অবধি শুদ্ধ ও অকৃত্রিম সুরে লোকগান ছড়িয়ে দিতে কাজ করব। ’

ছোটবেলায় বাবার মোবাইলে গান শুনতাম, ‘আমি চাইলাম যারে,ভাবে পাইলাম না তারে’ কিংবা ‘আমার বন্ধুয়া বিহনে গো, বাঁচি না পরানে গো, একেলা ঘরে রইতে পারি না। ’ শুধু গুনগুন করে গাওয়ার চেষ্টা করতাম নিজের মতোন করে। কিন্তু জানতামই কে এই অসাধারণ গানগুলোর জনক? আপনিও যদি আমার মতো গানগুলোর রচয়িতার নাম না জেনে থাকেন তাহলে শুনুন এই অসম্ভব সুন্দর কথাগুলোর স্রষ্টা কফিলউদ্দিন সরকার। এই বইটির মাধ্যমে আপনি এই গুণী ব্যক্তির ব্যাপারে কতকথা জানতে পারবেন, যা হয়তো জানার জন্য আপনি বিগত দিনগুলোতে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের সেই গানের লাইনের কথা কে শুনে নাই, ‘আমি আকাশেও রোদের দেশে ভেসে ভেসে বেড়াই/ মেঘের পাহাড়ে চড়ো তুমি। ’ সেই কালিকাপ্রসাদকে নিয়ে লেখক তার স্মৃতির কথা বর্ণনা করেছেন এই বইটিতে। এই গুণী মানুষের যখন অকস্মাৎ প্রয়াণ ঘটলো তখন ‘প্রথম আলো’র অনলাইন সংস্করণে এই লেখক কালিকাপ্রসাদের স্মরণে লিখলেন, ‘তুমি তো গ্রামের মাটিকে মেঘ বানিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিলে শহরের আকাশে। ’

বইয়ের একটি অংশে লেখকের সাথে ইসমাইল ভাইয়ের কিছু স্মৃতি ফুটে উঠে। এই ইসমাইল ভাই ও লেখকের প্রথম দেখা সিলেটের শাহজালাল মাজারে। পরে একদিন হুট করে ইসমাইল ভাই লেখকের অফিসে এসে হাজির। কথা প্রসঙ্গে যখন লেখক জানতে পারলেন ইসমাইল ভাই অভুক্ত, তখনই লেখক তাকে নিয়ে গিয়ে অফিসের পাশের একটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের আহার গ্রহণ করলেন। তারপর ইসমাইল ভাইয়ের ইচ্ছানুযায়ী তাকে লালনের আখড়া ঘুরে আসার জন্য লেখক তাকে ২ হাজার টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন। ঘটনার অনেকদিন পর ইসমাইল ভাই ও লেখকের আবার দেখা। সেবার ইসমাইল ভাই লেখকের জন্য উপহারস্বরূপ একটা পাঞ্জাবি নিয়ে আসেন। লেখক সেটা দেখে বেশ অভিভূত হয়েছিলেন, যেটা তার লেখনীতে ফুটে উঠেছে। পরে লেখক নিজেও ইসমাইল ভাইকে একটা পাঞ্জাবি কিনে দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেন। কিন্তু ইসমাইল ভাই সামনের ইদে নিবে বলে সেদিনের মতো চলে যায়। এরপর থেকে লেখকের সাথে ইসমাইল ভাইয়ের আর দেখা হয় না। লেখক কী কখনো ইসমাইলকে পাঞ্জাবি কিনে দিতে পারবেন? দেখা কী হবে তাদের?
বইটি পড়ে লোকসাধকের জীবন নিয়ে অনেক কিছুই জানলাম। লোকসাধকদের আসলে খুবই সহজ সরল জীবন হয়। খুব বেশি চাওয়া থাকেনা তাদের। এই যে দিনের পর দিন তাদের গান,সৃষ্টি মানবসমাজ অবহেলায় ফেলে রেখেছে সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র ক্ষোভ যেন নেই তাদের!খুশি মনে সৃষ্টির রচনায় ব্রতী তারা। তারা শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে পড়ে আছেন যুগের পর যুগ ধরে।
পড়তে আপনাকে হবেই, হয় বই নয়তো পিছিয়ে!

পুনশ্চ : সুমনকুমার দাশ দাদা, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই উপেক্ষিত মানুষের কথা প্রকাশ করার জন্য। আপনার লেখা না পড়লে আমারও হয়তো আজীবন অজানাই রয়ে যেত এসব লোকসাধকদের কথা!

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন