আজ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং

গোবিন্দ ধর: স্রোত সাহিত্য পত্রিকা ও প্রকাশনা

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৮-০৬ ১৫:৪৬:৩২

সেলিনা হোসেন :: কথাবিশ্ব, ভারতের ত্রিপুরার কবি গোবিন্দ ধরের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ২০১৭ সালের ১০ই এপ্রিল। আমার ডাইরি থেকে তারিখটি পাই। সেদিন গোবিন্দ ধর শ্যামলীর বাসায় এসেছিল। সঙ্গে ছিল ত্রিপুরার আরো একজন কবি অভীককুমার দে আর চট্টগ্রামের আবৃত্তি শিল্পী প্রবীর পাল। ঘরোয়া পরিবেশে জমে উঠেছিলো আড্ডা।সঙ্গত কারণেই আড্ডার জোয়ার ছিলো মাতৃভাষার টানে। দেশ ভিন্ন হলেও ভাষা এক। একই ভাষার শিল্প সাহিত্যের টানে জমে উঠেছিল প্রাণের উচ্ছাস।

স্রোত প্রকাশনা: কবি গোবিন্দ ধরের সাহিত্যপত্র ও প্রকাশনা সংস্থার নাম 'স্রোত'। এই সংগঠনের পক্ষে ওরা একটি সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করবে। আমাকে নিমন্ত্রণ করার জন্য ওরা এসছে। সবসময় ফোনে বা ইমেলে নিমন্ত্রণ পাই। গোবিন্দ ধর নিজে আমার বাড়িতে এসেছে। খুবই ভালো লাগলো। সাহিত্য সম্মেলন আমার লেখক সত্ত্বার টান। অস্থিত্বের অংশ বলে মনে করি। সঙ্গে সঙ্গে যাবো বলে কথা দিলাম। ওরা আমাকে প্রণাম করলো।

স্রোত আয়োজিত কথা সাহিত্য উৎসব ২০১৭:  ১১ই জুন ২০১৭ রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন, আগরতলা। বিকেল : ৩টা-রাত ৯টা। জুন মাসের ১০ তারিখ আমি আনোয়ার এবং কথাসাহিত্যিক নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর একসঙ্গে ট্রেনে করে আগরতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। লেখক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আমার প্রথমে দেখা হয় টেকনাফে। সেই সময়ে টেকনাফে আমার, "পোকা মাকড়ের ঘরবসতি" উপন্যাসের "সিনেমা সুটিং" হচ্ছিল। চলচ্চিত্র পরিচালক আখতারুজ্জামান সরকারি অনুদানে সিনেমা বানাচ্ছিলেনন। শিল্পী ছিলেন কবিতা, আলমগীর, খালেদ খানসহ অনেকে।তাঁরা আমাকে সুটিং দেখার জন্য টেকনাফে নিয়ে গেছিলেন। লেখক জাহাঙ্গীর তখন সরকারি চাকুরি সূত্রে টেকনাফে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ছিলেন সহকারী কমিশনার, ভূমি। সময় তখন ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি। তিনি তখন টেকনাফের রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প নয়াপাড়া দেখাশোনা করতেন। রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে আসার খবর তখন ঢাকায় বসে দৈনিক পত্রিকায় পড়তাম।ইচ্ছা ছিল রোহিঙ্গাদের শরনার্থী জীবন নিয়ে একটি উপন্যাস লিখব। সিনেমার সুটিং দেখার অবসরে সময়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে দেংতে যাই। আলাপ হয় লেখক নূরুদ্দিন জসহাঙ্গীরের সঙ্গে। রোহিঙ্গা বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারি। তাদের প্রতিদিনের ক্যাম্প জীবনযাপনের অনেককিছু দেখার সুযোগ হয়। একজন লেখকের দৃষ্টি দিয়ে ক্যাম্পে দিনযাপন তিনি সেভাবে দেখছিলেন তা আমার কাছে যন্যরকম দেখা মনে হয়েছিল। ট্রেনে এই বিষয়ে অনেক কথা হয়। তিনি আমাকে তাঁর উপন্যাস "উদ্বাস্তু" দেন। এটাই হলো সাহিত্য সম্মেলনের ভিন্ন মাত্রা। লেখকের সঙ্গে লেখকের আন্তরিক যোগাযোগ যেভাবে কবি গোবিন্দ ধরকেও এই সূত্রে দেখতে পাই অন্তরঙ্গ আলোকে। আগরতলায় গিয়ে অনেক লেখকের সঙ্গে দেখা হয়। যোগাযোগ হয়। ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়। কলকাতা থেকে এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কলকাতায়। কলকাতার সাহিত্য আকাদেমীর মুখ্য প্রধান থাকার সময় তাঁর আমন্ত্রণে একটি সেমিনারে গিয়েছিলাম। দিল্লির পাঞ্জাবি ভাষার কথাসাহিত্যিক অজিত কৌরের আয়েজিত সার্ক লেখক সম্মেলনে দেখা হয়েছিল রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি ঢাকাতেও এসেছিলেন। এভাবে সাহিত্য সম্মেলন পরিচয়ের সূত্রটি ধরে রাখে। সাহিত্যই মুখ্য বিষয় হয়ে জেগে থাকে হৃদয় মাঝারে। পাশে থাকেন পাঠক সমাজ। আর একজন প্রিয় কবির সঙ্গে দেখা হয়। তিনি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং। ককবরক ভাষার কবি। আমি তাঁর কবিতা বাংলা অনুবাদে পড়েছি। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই তাঁর কবিতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। দেখা হওয়ার পরে ভাবলাম ধন্য "উত্তর পূর্ব কথাসাহিত্য উৎসব-১৭"। এভাবেই সাহিত্য সম্মেলন বা উৎসব যাই বলি না কেন সব লেখকেরই প্রাণের টান থাকে এখানে। এভাবে আগরতলা সাহিত্য উৎসব মিলন মেলা হয়ে উঠেছিল। গভীর আনন্দে ডুবে গিয়েছিলাম গভীর স্রোতে। নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের ২নং মিলনায়তনে উৎসবের উদ্বোধন করেন গৌতম বসু, উপাচার্য মহারাজা বীরবিক্রম বিশ্ববিদ্যালয়। সম্মানিত অতিথি ছিকেন মেঘালয়ের কবি ও সাহিত্যিক স্ট্রীমলেট ডখার। ছিলেন বাংলাদেশের লেখক নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর। ছিলপন কলকাতার কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় এবং কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং। নেপালসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা লেখকদের এই মিলনমেলা ছিল আমাদের প্রাণের উৎসব। উৎসবে বাংলাদেশের জনপ্রিয় আবৃত্তি শিল্পী প্রবীর পাল তিনটি সিডিতে আবৃত্তি করেছে কবি গোবিন্দ ধর ও কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের কবিতা। এই তিনটি সিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এটিও ছিল অনুষ্ঠানের আর একটি দিক। আগের দিন কবিতা পাঠের আসর বসেছিল ভগৎ সিং যুব আবাসের অডিটোরিয়াম হলে। সেই অনুষ্ঠানে ত্রিপুরার দিলীপ দাস, কল্যাণ গুপ্ত,কৃত্তিবাস চক্রবর্তী,কাকলী গঙ্গোপাধ্যায়, পদ্মশ্রী মজুমদার,অপাংশু দেবনাথ, অভীককুমার দে, শঙ্খ সেনগুপ্ত, রতন আচার্য, রিয়া দেবী, সরু কাবিয়া, ফাল্গুনী চক্রবর্তী, স্ট্রীমলেট ডখার  মৃণালকান্তি দেবনাথ, মণীষা পাল চৌধুরী থেকে শুরু করে অনেকেই ছিলেন। সেদিনের অনুষ্ঠান পরবর্তী অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল "কথাসাহিত্যের কথকতা ও আজকের সময়"। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিশিষ্ট জনেরা। শিরোনামগুলো বিস্তৃত পরিসরের ছিল। খুব ভাললেগেছে এই আলোচনা অনুষ্ঠানটি। অনেককিছু জানার সুযোগ হয়েছে। এখানে শিরোনামগুলো উল্লেখ করছি-নেপালের কথাসাহিত্য, মেঘালয়ের কথাসাহিত্য আসামের কথাসাহিত্য, ত্রিপুরার কথাসাহিত্য, অনুগল্প পাঠ,আর ছিল আন্তর্জালে সাহিত্য। সব মিলে এই"উত্তর পূর্ব কথাসাহিত্য উৎসব-১৭" আমার জানার পরিধি বাড়িয়েছে। বন্ধনের আবেগ সঞ্চারিত করেছে। সাহিত্য মানবজীবনের পাটাতনে আলোর তৃষ্ণা দেখিয়েছে। আগরতলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার।প্রতিবারই আন্তরিক ছোঁয়ায় স্নাত হয়ে ফিরেছি। এমন অনুভবের পাশাপাশি এবার গোবিন্দ ধর আমাকে ত্রিপুরার পাঠকের সামনে পৌঁছে দেখার জন্য আমার একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশের আগ্রহ দেখিয়েছে। এ আমার লেখকের পাঠকের কাছে যাওয়ার আনন্দ। গোবিন্দ ও পদ্মশ্রী দুজনেই কবি। তাদেরকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

লেখক: বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্য

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন