আজ বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০ ইং

ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি দখল

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-১২-০৮ ১৩:৩৭:১৭

সিলেটভিউ ডেস্ক :: অনেক কষ্টে জমানো অর্থ আর স্ত্রীর গহনা বিক্রির টাকা দিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদী হাইজিংয়ের কাছ থেকে সাড়ে ৩ কাঠা জমি কেনেন মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক এসএম সিদ্দিকুর রহমান। ’৯০-এর দশকে কেনা ওই জমির ওপর টিনশেড বাড়িও করেন তিনি। ওই বাড়িতে মায়ের নামে একটি হাসপাতালের কার্যক্রমও শুরু করেন সিদ্দিকুর রহমান।

আর এই জমির ওপরই নজর পড়ে ট্রাফিক পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ওবায়দুল হকের। স্থানীয় কিছু জালিয়াত চক্রের সহায়তায় রাতারাতি চিকিৎসক সিদ্দিকুর রহমানের বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন তিনি। শুধু দখলেই সীমাবদ্ধ নয়, বাড়ির হোল্ডিং নম্বর পরিবর্তন করে এখন সেখানে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। রাজউকের বর্তমান পরিচালক (প্রশাসন) ওয়ালিউর রহমানের সামনেই চিকিৎসক ও তার সন্তানকে মারধর করে জমিটি দখলে নেন ট্রাফিক পুলিশের ওই কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা।

এ ঘটনায় রাজউক, দুদক, পুলিশের সদর দফতর ও আদালতে আবেদন করে জমিটি ফেরত পাওয়ার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সিদ্দিকুর রহমান। জমিটি যেন বেদখল না হয় সেজন্য রাজউক ও ঢাকার নিু আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওবায়দুল বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশের সদর দফতর থেকে একজন এআইজির নেতৃত্বে বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে। সূত্র জানায়, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ট্রাফিক অফিসারের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের সত্যতা মিলেছে।

বাড়িটি উদ্ধারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর রাজিব, পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সাবেক ডিসি বিপ্লব কুমার সরকারেরও দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কাউন্সিলর রাজিব (বর্তমানে জেলে) বাড়িটি উদ্ধার করে দেবেন বলে সিদ্দিকুর রহমানের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নেন। কিন্তু তিনি কোনো সহায়তা করেননি। বিপ্লব কুমার সরকারেরও কোনো সহায়তা পাননি তিনি। জমি উদ্ধার করে দেবেন- এই শর্তে আদাবর থানার তৎকালীন ওসি গাজী রুহুল ইমাম ৩০ লাখ টাকার ঘুষ দাবি করেছিলেন। টাকা দিতে না পারায় সিদ্দিকুর রহমানকে কোনো সহযোগিতা করেনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। বাধ্য হয়ে আদালত, রাজউক, দুদক ও পুলিশের দ্বারস্থ হন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ওবায়দুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আপনি প্রশ্ন করার কে? আপনি অনধিকার চর্চা করছেন। আপনাকে কিছু বলতে চাই না। এ নিয়ে অধ্যাপক ডা. সিদ্দিকুর রহমান পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ দিয়েছেন।’ ভুক্তভোগী অধ্যাপক ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুগান্তরকে বলেন, ‘১৯৯৫ সালের ২০ এপ্রিল মোহাম্মদী হাউজিংয়ের ৯ নম্বর রোডের ২০ নম্বর প্লটে ৩৩০ অযুতাংশ জমি কিনি। ১৯৯৮ সালের ১৯ জুন আমার স্ত্রীর নামে দেড় কাঠা ও পরে আমার নামে দুই কাঠা জমির নামজারি হয়। ওই জমির ওপর টিনশেড ঘর নির্মাণ করে আমার মায়ের নামে একটি দাতব্য হাসপাতাল (অজুফা খাতুন মেমোরিয়াল হাসপাতাল) স্থাপন করি। সেখানে একজন কেয়ারটেকারও রাখি।

তিনি বলেন, ওই কেয়ারটেকারের সঙ্গে যোগসাজশে ২০১৪ সালে পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের টিআই ওবায়দুল হক ও তার সহযোগীরা বাড়িটি রাতের অন্ধকারে দখল করে নেয়। বিষয়টি আদাবর থানার তৎকালীন ওসি গাজী রুহুল ইমাম এবং পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ওই সময়ের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকারকে জানাই। ২০১৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আদাবর থানায় জিডি করি। থানা পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নিলে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের কাছে অভিযোগ করি। ওই দিনই ডিএমপি কমিশনার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তেজগাঁও জোনের ডিসিকে নির্দেশ দেন। তার পরও ডিসির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ওসি গাজী রুহুল ইমামের কাছে গেলে তিনি বলেন, যদি আমাকে ১০ লাখ এবং ডিসি স্যারকে ২০ টাকা টাকা দিতে পারেন তবে বিষয়টি দেখতে পারি।’

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, উপায়ন্ত না দেখে আদালতের শরণাপন্ন হই। গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি আদালত একটি আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, ‘অত্র মোকাদ্দমা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নালিশি তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি দখল, আকার-আকৃতি ও প্রকৃতির বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়া হইল।’ ওই নির্দেশ বহাল থাকলেও দখলদাররা ১০ তলা ভবন নির্মাণের কাজ অব্যাহত রেখেছেন। এরই মধ্যে পঞ্চম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওবায়দুল হকের নেতৃত্বাধীন চক্রের সদস্যরা জাল কাগজপত্র ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজউক থেকে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি নেন। সে অনুযায়ী ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করলে ডা. সিদ্দিকুর রহমান রাজউকে অভিযোগ দেন। অভিযোগ যাচাই শেষে রাজউক গত ৮ আগস্ট এবং ২৪ আগস্ট দুই দফায় ইমারত নির্মাণ ছাড়পত্র বাতিল করে। পাশাপাশি ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের সব কার্যক্রম স্থগিত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ দেয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিআই ওবায়দুল হকের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে রাজউকের একজন অথরাইজ অফিসার ২৯ এপ্রিল ইমারত নির্মাণের অনুমতিপত্র দেন। বিষয়টি রাজউক চেয়ারম্যানকে অবগত করা হলে তিনি ওই জমিতে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে ২৯ আগস্ট একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০১৪ সাল পর্যন্ত ওই হোল্ডিংয়ের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয় ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান ও স্ত্রী ইসরাত সিদ্দিকার নামে। সিটি জরিপ অনুযায়ী তাদের নামে খাজনা পরিশোধ করা হয় ২০১৭ সাল পর্যন্ত। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ওই হোল্ডিংয়ের পৌরকর পরিশোধ করা হয় ইসরাত সিদ্দিকা এবং ডা. সিদ্দিকুর রহমানের নামে। রাজস্ব বিভাগের কর অঞ্চল-৫ এর কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত রশীদ নম্বর ৬৬৭৩৩ (তারিখ-২৭-০৭-২০১৬)।

এ ক্ষেত্রে হোল্ডিংটির অবস্থান ছিল মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির ৯ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ি। কিন্তু ২০১৪ সালে বেদখল হয়ে যাওয়ার পরপরই দখলদাররা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বাড়িটির হোল্ডিং নম্বর পরিবর্তন করে ফেলে। এর বিরুদ্ধে ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান অভিযোগ দায়ের করলে সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল আইনজীবী মতিউর রহমানের আইনগত মতামত নেয়া হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়। এতে পরিবর্তিত ১৮/এ নম্বর হোল্ডিংয়ের কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই হোল্ডিংটি বাতিল করা হয়।

জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সাবেক ডিসি বর্তমানে রংপুরের এসপি বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘জমি দখলের অভিযোগটি প্রায় পাঁচ বছর আগের। তাই এ নিয়ে বিস্তারিত কোনো কিছু বলতে পারছি না। আমার কাছে এ ধরনের অভিযোগ এলে সাধারণত আদালতের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। ওই সময়কার ওসি যদি টাকার প্রস্তাব দিয়ে থাকে সেটা অপেশাদার কাজ করেছেন।’

আদাবর থানার তৎকালীন ওসি গাজী রুহুল বলেন, ‘বিষয়টি আমার ভালোভাবে মনে নেই। ওই সময় যদি কোনো জিডি হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) পরিচালক ওয়ালিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের সহযোগিতাতেই দখলের ঘটনা ঘটেছিল। টনাস্থলে গিয়ে আমি পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চেয়েও পাইনি।’

মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান বলেন, ‘প্লটটির প্রকৃত মালিক অধ্যাপক ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান। সেটি দীর্ঘদিন ধরে তাদের দখলেই ছিল। এতদিন পর টিআই ওবায়দুর রহমান ও তার সহযোগীরা কীভাবে মালিকানা দাবি করছে আমার বোধগম্য নয়।’ জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এসপি সাদিরা খাতুন বলেন, আইজিপি মহোদয়ের নির্দেশে বিষয়টির তদন্ত করছি। শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করব। প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে এ নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না।

সৌজন্যে :: যুগান্তর

সিলেটভিউ২৪ডটকম/৮ ডিসেম্বর ২০১৯/মিআচৌ

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন