আজ মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯ ইং

যেসব অভিযোগে বহিষ্কার হলেন যুবলীগের সেই ‘ক্যাশিয়ার’ আনিস

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-১০-১১ ১৮:৪৮:০৫

সিলেটভিউ ডেস্ক :: দুর্নীতি-মাদক ও ক্যাসিনোবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর আত্মগোপনে যাওয়া যুবলীগের বহুল আলোচিত নেতা কাজী আনিসুর রহমান আনিসকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

শুক্রবার যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ আতিয়ার রহমান দীপু।

তিন ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘কাজী আনিসের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রেসিডিয়াম সদস্যরা একমত হয়েছেন কাজী আনিসকে বহিষ্কার করার জন্য। সেই আলোকে কাজী আনিসকে আমরা বহিষ্কার করেছি।’

ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেয়া হবে কি না- সে সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান দীপু।

তিনি যুবলীগ অফিসের পিয়ন থেকে কেন্দ্রীয় নেতা বনে যান কাজী আনিস। দুর্নীতি-মাদক-ক্যাসিনোবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে তিনি আড়ালে চলে যান। প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা কাজী আনিসের অবস্থান নিয়ে সৃষ্টি হয় ধোঁয়াশার। কেউ বলছেন কাজী আনিস দেশত্যাগ করেছেন; কেউ বলছেন আত্মগোপনে আছেন।

কি কারণে আনিসকে বহিষ্কার করা হয়েছে জানতে চাইলে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক এ বি এম আমজাদ হোসেন বলেন, ‘কাজী আনিস বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের দফতর সম্পাদক। তার দুর্নীতির কথা আমরা পত্র পত্রিকায় দেখেছি এবং অর্থনৈতিক তসরুফের কারণে তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’

যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দরপত্র থেকে কমিশন আদায় এবং সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে পদ-বাণিজ্য করে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

গত ২০ দিন ধরে কাজী আনিস আত্মগোপনে আছেন। তিনি দলীয় কার্যালয়ে যাচ্ছেন না, বাড়িতেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সরদার মোহাম্মদ আলী মিন্টু জানানন, আনিস যুবলীগের কমিটি বিক্রি করে, চাঁদাবাজি, দরপত্র থেকে কমিশন নিয়ে অবৈধ ভাবে বিপুল পরিমাণে সম্পদ বানিয়েছে। এর ভয়ে এখন সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

যুবলীগ নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, কাজী আনিস কেন্দ্রীয় যুবলীগের কার্যালয়ে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন ২০০৫ সালে। বেতন ছিল মাসে ৫ হাজার টাকা। সাত বছর পর বনে যান কেন্দ্রীয় যুবলীগের দফতর সম্পাদক। যুবলীগের সবশেষ কমিটিতে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদ দেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব।

কাজী আনিস আঙুল ফুলে কলাগাছ। তিনি এখন একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক। আত্মগোপনে যাওয়ার আগে কোটিপতি আনিস যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক ছাড়া কাউকে পরোয়া করতেন না। তার বেপরোয়া মনোভাবে যুবলীগ নেতাদের অনেকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কোণঠাসা।

২০০৫ সালে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যখন আনিসের চাকরি হয়, তখন তিনি নেতাদের হুট ফরমায়েশ শোনার পাশাপাশি কম্পিউটার অপারেটরের কাজও করতেন। এই সুবাদে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি কার্যালয়ে আসা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গেও সখ্য হয় তার। সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তিকে পিছিয়ে থাকা নেতাদের নজরেও চলে আসেন আনিস।

কেন্দ্রীয় যুবলীগ সারা দেশে যেসব কমিটি দিত, সেগুলো কম্পিউটারে টাইপ করে দিতেন আনিস। টাইপ করতে গিয়ে কোন জেলায় কে সভাপতি কে সম্পাদক তা নখদর্পণে চলে আসে আনিসের। মুখস্থ বলে দিতে পারতেন যেকোনো কমিটির নেতার নাম। এসব কারণেই চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হয়ে যান তিনি। আবার জেলাপর্যায়ের নেতারাও কমিটির বিষয়ে কেন্দ্রের তথ্য বা সিদ্ধান্ত জানতে তাকে ফোন করতেন। এভাবে জেলা নেতাদের সঙ্গেও তার সখ্য হয়ে যায়।

২০১২ সালে যুবলীগের কমিটি হলে আনিস পেয়ে যান উপদফতর সম্পাদকের পদ। শীর্ষ নেতার আশীর্বাদ থাকায় ছয় মাস পর খালি থাকা দফতর সম্পাদক পদে পদোন্নতি পেয়ে যান আনিস।

কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনিসকে সবাই ‘ক্যাশিয়ার’ বলেই চেনে। তবে গত এক যুগে তিনি শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। কিছু যুবলীগ নেতার সব ধরনের অপকর্মের সঙ্গী এই আনিস।

ধানমণ্ডি ১৫ নম্বর সড়কে প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে আনিসের। তবে ওই ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন না। বর্তমানে রাজধানীর ধানমণ্ডির ১০/এ সড়কের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে থাকেন কাজী আনিস। ওই ফ্ল্যাটটিও তার নিজের।

শুধু তাই নয়, গোপালগঞ্জে আনিসের রয়েছে বিপুল স্থাবর সম্পত্তি। আগে পাঁচ-ছয় বিঘা জমি ছিল তাদের। গত চার বছরে কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন। বাড়ি করেছেন, পেট্রলপাম্প এবং তার পাশের জমি কিনেছেন। এর মধ্যে পেট্রলপাম্পটি কিনতে কোটি টাকা লেগেছে আনিসের। পাশেই ৫ একর জমি আছে তার কেনা। এ ছাড়া ঢাকায় আনিসের তিনটি বাড়ি আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদাবাজি, দরপত্র থেকে কমিশন ও যুবলীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদবাণিজ্য করেই বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছেন কাজী আনিস। যুবলীগ নেতারা জানান, আনিসের দাপটে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টেকা দায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতারা অভিযোগ করেন, আনিসের বিরুদ্ধে কথা বলে টেকা কঠিন। বিভিন্ন ইউনিটে বছরের পর বছর সম্মেলন না করে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চালানো হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে এসব আহ্বায়ক কমিটি বানানো ও দীর্ঘদিন বহাল থাকার সুযোগ করে দিচ্ছেন আনিস। আনিসের দাপটে পুরনো অনেক নেতা যুবলীগে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন।

নেতাকর্মীরা জানান, জিকে শামীম, খালেদসহ কয়েকজনের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়েন আনিস। তার সিন্ডিকেট চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্লাবে জুয়ার আসর চালানোসহ সব অপকর্মে জড়িত। যুবলীগে আনিসুর ‘ক্যাশিয়ার’ নামেই পরিচিত। চাঁদার টাকা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন মহলে পৌঁছানোর কাজ করেন তিনি। এক শীর্ষ নেতা ছাড়া সবাই তাকে সমীহ করেন। আনিসুরের কারণে ত্যাগী ও সৎ যুবলীগ নেতারা শীর্ষ নেতাদের কাছেও ভিড়তে পারেন না।

যুবলীগের ৭ম কংগ্রেস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংগঠনটির প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বৈঠক শুরু হয় বেলা ১১টায়। এ বৈঠকে যোগ দেননি চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। দুই ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে কাজী আনিসের বহিষ্কার অন্যতম।

জাতীয় কংগ্রেসের আগে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠকে সংগঠনটির অধিকাংশ প্রেসিডিয়াম সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন না যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে গ্রেফতার যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে তার সখ্যের তথ্য উঠে আসে। তার মদদে রাজধানীতে অনেক যুবলীগ নেতা ক্যাসিনো ব্যবসা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়। তলব করা হয়েছে ব্যাংক হিসাব। এর পর থেকে রাজনীতি থেকে অনেকটাই আড়ালে চলে যান ওমর ফারুক। তার বিষয়ে আজকের সভায় আলোচনা হয়। সভাশেষে যুবলীগ নেতারা বলেন, যুবলীগ চেয়ারম্যানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভায় সভাপতিত্ব করেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ। উপস্থিত ছিলেন- প্রেসিডিয়াম সদস্য শহীদ সেরনিয়াবাত, শেখ শামসুল আবেদীন, আলতাব হোসেন বাচ্চু, মো. সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, মজিবুর রহমান চৌধুরী, মো. ফারুক হোসেন, মাহবুবুর রহমান হিরণ, আবদুস সাত্তার মাসুদ, মো. আতাউর রহমান, অ্যাডভোকেট বেলাল হোসাইন, আবুল বাশার, মোহাম্মদ আলী খোকন, অধ্যাপক এবিএম আমজাদ হোসেন, আনোয়ারুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার নিখিল গুহ, শাহজাহান ভূঁইয়া মাখন, ডা. মোখলেছুজ্জামান হিরু, শেখ আতিয়ার রহমান দীপু প্রমুখ।


সৌজন্যে : যুগান্তর
সিলেটভিউ২৪ডটকম/১১ অক্টোবর ২০১৯/জিএসি

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •   দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে: নজীবুর রহমান
  •   দুর্মূল্যের সময়ে সিলেটে স্বস্তি ‘সুরমা বাজারে’
  •   দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী
  •   দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে জেলা কৃষক দলের মানববন্ধন
  •   জিন্দাবাজারে ফুটপাতে আরিফের ঝটিকা অভিযান
  •   অ্যাসিডিটির সমস্যা দূর করে লবঙ্গ
  •   সিলেটে ছয় দিনে কর আদায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ টাকা
  •   হাড়ের ক্ষয়রোধ করে নাশপাতি
  •   সেফুদার সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ
  •   দক্ষিণ সুরমায় গলাকেটে গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টায় আসামীদের স্বীকারোক্তি
  •   কানাইঘাটে সুরমা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন
  •   সিলেটে ‘লবণ গুজব’: প্রশাসনের কঠোর তৎপরতায় স্বস্তি
  •   ৫৮ বছরে এবার সর্বোচ্চ লবণ উৎপাদন
  •   আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি ডিসেম্বরে
  •   নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রনে সরকার ব্যর্থ: বাম গণতান্ত্রিক জোট
  • সাম্প্রতিক রাজনীতি খবর

  •   পদত্যাগের গুঞ্জন নিয়ে যা বললেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা
  •   হাসপাতালের লিফট ছিঁড়ে নিচে আমীর খসরুসহ ১২ বিএনপি নেতা
  •   শোভন-রাব্বানী ও ৫ এমপিসহ ১০৫ জনের সম্পদের অনুসন্ধানে দুদক
  •   শেখ হাসিনা জনগণের সঙ্গে নির্মম রসিকতা করে চলছেন: রিজভী
  •   ‘পেঁয়াজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চালের দামও বাড়াচ্ছে সিন্ডিকেট’
  •   খালেদার জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করতে চান ঐক্যফ্রন্টের যেসব নেতা
  •   তলে তলে বিএনপি-জামায়াতের গলায় গলায় পিরিত: কাদের
  •   ভারতের সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষমতা এই সরকারের নেই: মির্জা ফখরুল
  •   স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নির্মল সম্পাদক বাবু
  •   উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকছেন না এমপিরা
  •   ‘নেতৃত্ব নিতে আগ্রহী নন সজীব ওয়াজেদ জয়’
  •   ড. কামাল প্রধানমন্ত্রীর কাছে চেয়ে দাওয়াত নিয়েছেন: গয়েশ্বর
  •   পত্রিকায় নাম না এলে কি আন্দোলন হয় না, প্রশ্ন গয়েশ্বরের
  •   ‘দুর্নীতিবাজদের খবর প্রকাশ বন্ধ করতেই গণবিজ্ঞপ্তি জারি’
  •   সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইলেন রাঙ্গা