আজ মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০ ইং

‘এই শহরের মানুষ আমাকে ফেলে দেবে না’

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-০৩ ১৫:৫৫:৩৯



|| শাহ্ দিদার আলম নবেল ||

২৬ জুন ২০২০

এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি তখন কামরান ভাইয়ের মৃত্যুর দশদিন পার হয়ে গেছে। এই দশদিনে আমি অন্তত একশতবার কামরান ভাইকে নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি। একটু অবসর পেলেই চেষ্টা করেছি স্মৃতিগুলো অক্ষরে রূপ দিতে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি। লিখতে বসলেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তাঁর আমার অম্ল-মধুর, হাসি-ঠাট্টা, সুখ-দুঃখ, মান-অভিমানের কত ঘটনা, কত স্মৃতি। অবসরে কতো ঘটনা স্মৃতির পালে হাওয়া দেয়। চোখ ঝাপসা করে। অশ্রু গড়ায়। কিন্তু লিখতে গেলেই সবকিছু উবে যায়। স্মৃতিগুলো পালায়। হাত অসাড় হয়ে পড়ে, বুকের মধ্যে দুক দুক শব্দ হয়। এই যখন অবস্থা, তখন আমি জোর করে বিশ্বাস করার চেষ্টা করছি কামরান ভাইয়ের সাথে আমার কোন স্মৃতি নেই! কামরান ভাইয়ের সাথে আমার কোন ঘনিষ্টতা ছিল না! বদর উদ্দিন আহমদ কামরান নামে কাউকে আমি চিনিই না!

কিন্তু মনকে আর কতো প্রবোদ দেয়া যায়! মুখে বলে তো আর মনকে বোঝানো যায় না। মুখ আর মনের এই দ্বন্দ্বের কাছে আমি পরাস্ত। অসহায়। স্মৃতিশক্তি সবসময় আমার সাথে প্রবঞ্চনা করে। ছোটবেলা থেকেই আমার স্মরণ শক্তি কম। কবিতা বা রচনা আসতো। আমি মুখস্ত করতে পারতাম না। রচনা বানিয়ে লিখতাম। কবিতার চার লাইনের বেশি খাতার পাতায় উঠতো না। সেই ভোলাভালা মানুষ আজ বসেছি স্মৃতিরোমন্থনে। তাও স্বজন হারানোর স্মৃতি। জানি না লেখাটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। 

শেষ দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন বাদ দিলে কামরান ভাইয়ের জীবনে কোন পরাজয় ছিল না। নির্বাচনে তিনি কেবলমাত্র ব্যালটের হিসেবে হেরেছিলেন। ঘরের-বাইরের ষড়যন্ত্রের জালে আটকে গিয়েছিলেন কামরান ভাই। যে কারণে ভোটের হিসাব মিলেনি। নির্বাচনে কামরান ভাইকে সিলেটবাসী প্রত্যাখান করেনি। ষড়যন্ত্র আর নগরবাসীর প্রতি তার অগাদ বিশ্বাস তাকে হারিয়েছে। তবে এই হারাকে পরাজয় বলে না। নির্বাচনে জিতলে তিনি হয়তো মেয়রই থাকতেন। কিন্তু আমৃত্যু তিনি ছিলেন নগরবাসীর ‘মেয়র সাব’। সুখে-দুঃখে মানুষ মানুষ তার শরণাপন্ন হতো। কামরান ভাইয়ের দুয়ার থেকে কেউ খালি হাতে ফেরেননি। টানা দুইবার হেরেও সুগন্ধা ৬৫ নম্বর বাসায়  গেইট বসাননি তিনি। নগরবাসীর জন্য ২৪ ঘন্টা ছিল তার দুয়ার খোলা। তবে এটাও সত্য নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার দুঃখ কামরানের ভাইয়ের ছিল আমৃত্যু। সেই কষ্ট, যাতনা আর দুঃখ আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। অনুভব করেছি তার কথায়, গল্পে, দীর্ঘশ্বাসে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট তাঁর দুঃখবোধ নিয়েই চেষ্টা করছি কিছু লেখার।

সময়টা ২০১৩ সালের ১৮ মে। সিটি করপোরেশনের তৃতীয় নির্বাচনের মাস দিন বাকি। শিবিরের নৃশংস হামলার শিকার হন সহকর্মী দৈনিক সবুজ সিলেটের স্টাফ রিপোর্টার অহী আলম রেজা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ওসমানী হাসপাতালে। ফোনে খবরটা জানাই কামরান ভাইকে। তখন তিনি মেয়র। মাগরিবের নামাজ পড়ে কামরান ভাই আসেন হাসপাতালে। রেজা ভাইয়ের তখন অস্ত্রোপচার চলছে। আমি খুবই উদ্বিঘ্ন। কামরান ভাই আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারেন। সান্তনা দেন। আমি সান্তনা পাই না। পশুরা রেজা ভাইকে এমনভাবে কুপিয়েছে মনে হচ্ছিল না ওটি থেকে কোন সুসংবাদ আসবে। আমার অবস্থা বুঝে কামরান ভাই আমাকে ওটির সামনে থেকে সরিয়ে নেন। মজার মজার কথা বলে মন ভালো করার থেরাপি দেন। প্রসঙ্গ তুলেন নির্বাচনের। জানতে চান এই মূহুর্তে নির্বাচন হলে রেজাল্ট কেমন হবে? আমি বলি ‘আপনি ফেল করবেন। বিপুল ভোটে ফেল করবেন।’ ফেল করার কথা শুনেও কামরান ভাই হাসেন। আমাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন ফেল করবো?’ আমি বলি, ‘আপনার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আপনাকে ডুবাবে।’ কামরান ভাই আবারো হাসেন। এবার হাসিটা একটু দীর্ঘ হয়। বলেন, ‘ শোন ভাই নবেল, এই শহরের মানুষকে আমি চিনি। মানুষও আমাকে চিনে। দেখে নিও মানুষ আমাকে ফেলে দেবে না।’ মুখে ফেল করার কথা বললেও কামরান ভাইয়ের মতো আমারও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল মানুষের আস্থার প্রতি। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। খেলা চলতে থাকে পর্দার অন্তরালে। নির্বাচন হয়ে দাঁড়ায় ‘পাপেট শো’। পর্দার ভেতর থেকে নাচানো হয় পুতুল। এর মধ্যে ভোটের আগে টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা যেন কামরান ভাইয়ের মুল প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনকালীন সময়ে বেশির সময় গভীর রাতে কথা হতো কামরান ভাইয়ের সাথে। রাতে ঘুমানোর আগে ফোন দিতেন। মাঠের অবস্থার খোঁজ খবর নিতেন। শেষ পর্যন্ত আমার বিশ্বাস ছিল কামরান ভাই অল্প ভোটের ব্যবধানে হলেও জিতবেন।

বলতে দ্বিধা নেই, ওই সময়টায় সাংবাদিক হিসেবে আমার অবস্থান মোটেও নিরপেক্ষ ছিল না। চেষ্টা করেছি কামরান ভাইকে হাইলাইট করে জনসমর্থন তৈরিতে সাহায্য করার। অনেক সময় এ নিয়ে অফিস থেকেও ঝাড়ি খেয়েছি। আমার সংবাদ নাকি কামরানের গুনগানে ভরা থাকে। আমি ঝাড়ি হজম করি। কিন্তু পরদিন যখন রিপোর্টটি হুবহু ছাপা হতে দেখতাম তখন কি খুশিই না লাগতো। পত্রিকার সংবাদ ফটোকপি করে লিফলেট আকারে ভোটারের কাছে বিলি হতো।

ভোটের দিন এই কেন্দ্র ওই কেন্দ্র ঘুরে সাথে থাকা পাভেল ভাইয়ের সাথে হিসেব মিলাই। আমার আর পাভেল ভাইয়ের হিসেবে তখনও বলছে কামরান ভাই পাশ করবেন। কামরান ভাইয়ের প্রতি আমাদের দূর্বলতার কারণেই হয়তো জয়ের পাল্লা কোনভাবেই আরিফুল হকের দিকে ঝুঁকছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যালটের গণণায় জয়ের হাসিটা থেকে যায় আরিফুল হকের মুখে। ভাঙ্গা মন নিয়ে সেই পরাজয়ের নিউজ ঢাকায় পাঠিয়ে অসাড় হয়ে বসে থাকি অফিসে। শরীর খুব ক্লান্ত। কিন্তু মন চাইছে না বাসায় যাব। ঘড়ির কাঁটা ঘুরার সাথে রাত বাড়ে। বাসা থেকে তাড়া আসে ফেরার। অফিস থেকে নেমে রওয়ানা হই ছড়ারপাড়ের দিকে। যে বাসায় এখন উচ্ছ্বাস থাকার কথা। মুখে মুখি মিষ্টি খাওয়ার দৃশ্য দেখার কথা, সেই বাসা নিরব। বাসায় ঢুকার পর তাকাতে পারি না কামরান ভাইয়ের মুখে দিকে। তিনিই টেনে নেন বুকে। কামরান ভাই কাঁদেন। আমিও কাঁদি। দুই ভাই কতোক্ষণ কাঁদলাম জানি না। আমি আর বসি না। কামরান ভাই শুধু বলেন, ‘কেঁদো না ভাই। সব আল্লাহ রব্বুল আলামিনের ইচ্ছা।’

নির্বাচনে পরাজয়ের পর কামরান ভাইয়ের সাথে আরো ঘনিষ্টতা বাড়ে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ফোন দিতেন। অনেক সময় শুধু মজার কোন গল্প শোনানোর জন্যও ফোন দিতেন। আমার পত্রিকার (বাংলাদেশ প্রতিদিন) সম্পাদক নঈম নিজাম ভাই খুব পছন্দ করতেন কামরান ভাইকে। সেই সুবাদে কামরান ভাইকে নিয়ে প্রায়ই স্পেশাল নিউজ হতো। সেই নিউজ হয়তো প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামের টপে বা পত্রিকার ডেটলাইনের নিচে ছাপা হতো। ডেটলাইনের নিচে যে তিনটি নিউজ ‘স্ট্যাম্প সাইজ’ ছবিসহ ছাপা হয় তার নিচে একটি বড় ‘বর্ডার লাইন’ বা দাগটানা থাকতো। কামরানই ভাই ওই ‘বর্ডার লাইন’কে বলতেন ‘বাঁশ’। মাঝে মধ্যে ফোন করে বলতেন, ‘ভাই নবেল, অনেক দিন হয় ভাইকে বাঁশের উপর ওঠাও নাই। দেখ না কিছু একটা করা যায় কি-না?’ কামরান ভাইয়ের ফোন পেলে আমিও একটা ইস্যু বের করে নিউজ তৈরি করে পাঠাতাম। পরদিন দেখা যেত ঠিকই কামরান ভাই ‘বাঁশের ওপর’। নিউজ ছাপা হলেই কামরান ভাই ফোন দিতেন। আমাকে দোয়া করতেন। বলতেন, ‘দোয়া করি আল্লাহ তোমাকে আরও অনেক বেশি লেখার তওফিক দিন’। কামরান ভাই নেই। আর হয়তো কেউ কোনদিন বলবে না ‘বাঁশের উপর’ তুলে একটা নিউজ করে দিতে।

সর্বশেষ নির্বাচনের আগে কতিপয় লোক চেষ্টা করেন কামরান ভাই আর আমার মধ্যে দূরত্ব তৈরির। আমার নামে চলে কানপড়া। চেষ্টা চলে আমাকে ‘কামরান বিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপনের। আমি সোজাসাপ্টা মানুষ। কাউকে ভালোবাসলে বুক-পিট দুইটাই দেই। বুক এগিয়ে দিয়ে পিঠে ছুরি মারার অভ্যাস আমার নেই। ওই মহলটির কারণে কামরান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ কিছুটা কমে আসে। দূরত্ব তৈরির বিষয়টা কামরান ভাইয়েরও দাগ কাটে। একদিন সরাসরি জিজ্ঞেসও করেন। জানতে চান কোন সমস্যা আছে কি-না? আমি বলি, ‘আপনার কাছে থাকা কিছু লোক চায় না আমি আপনার পাশে থাকি। আর ওই লোকগুলোরও প্রয়োজন আছে আপনার। তাই কাছে আসি না। তবে পাশ থেকে সরে যাই নি।’ কামরান ভাই মন খারাপ করেন। দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। আমি বুঝি কামরান ভাই অসহায়। তাঁর শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা। কামরান ভাই বলেন, ‘কে কি বললো, আর করলো তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা দুই ভাই ঠিক থাকলেই হলো।’ আমিও তার কথায় সায় দেই। ফোনে হাসার ভান করি। কিন্তু জানি এ বিচ্ছেদের জ্বালা আমারও কম নয়।

সর্বশেষ নির্বাচনের আগে একদিন গভীর রাতে ফোন দেন কামরান ভাই। পরদিন সকালে বাসায় যেতে বলেন। বাসায় যাওয়ার পর ডেকে নেন বেডরুমে। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে কামরান ভাই বসে আছেন সোফায়। পাশে বসা ভাবী। রুমের ভেতর তখন কামরান ভাইয়ের পিএস বদরুল। নির্বাচনের পরিস্থিতি জানতে চান কামরান ভাই। কঠিন সত্যটা বলি। সেই কঠিন সত্য মেনে নিতে পারেন না কামরান ভাই। মানুষ এতো নিচে নেমে ষড়যন্ত্র করতে পারবে, এটা হয়তো কামরান ভাই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সারাদেশের মানুষ যখন ধরে নিয়েছে সিলেটসহ সবকটি সিটিতে নৌকা জিতবে। তখন আমি কামরান ভাইকে বলে এসেছিলাম আপনি হারবেন ষড়যন্ত্রের কাছে। আপনার অতি বিশ্বাসের কাছে। নির্বাচনের পর কামরান ভাই ফোন করে বলেছিলেন, ‘ভাই নবেল, তোমার কথাই ঠিক হলো। আমাকে হারিয়ে দেয়া হলো।’

গত রমজানে নানা কারণে কামরান ভাইয়ের সাথে ঘন ঘন কথা হতো। তাঁর সাথে সর্বশেষ দেখা সম্ভবত ২৭ রমজানের আগের দিন। সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে কাউন্সিলর আজাদ ভাইয়ের ত্রাণ বিতরণে। ভালো থাকার আর্শিবাদ করে সাবধানে থাকতে বলেন। ২৩ মে আজাদ ভাইসহ আমরা কয়েকজন মিলে শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে নমুনা দিয়ে আসি। পরদিন শুধুমাত্র আজাদ ভাইয়ের পজেটিভ আসে। রাতে কামরান ভাইকে কে জানি ভুল তথ্য দেয় আজাদ ভাইয়ের সাথে আমিও পজেটিভ। উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন দেন। জানতে চান আমার শারীরিক অবস্থা। ভালো আছি শুনে স্বস্তি পান। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন।

এর কয়েকদিন পর ভাবির করোনা পজেটিভ ধরা পড়ে। খবর পেয়ে রাতেই ফোন দেই কামরান ভাইকে। ফোন ধরেননি। পরদিন সকালে ব্যাক করেন। সাহস দেই, দুশ্চিন্তা না করতে বলি। সর্তক থাকতে বলি। ভাবীর পজেটিভ রিপোর্ট আসার পর থেকে কামরান ভাইকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। এরপর থেকে যতোবার আল্লাহর কাছে নিজের জন্য, নিজের মা-বাবার জন্য হাত তুলেছি, ততোবার কামরান ভাইয়ের সুস্থতা চেয়েছি। কিন্তু এই গোনাগারের দোয়া হয়তো আল্লাহর কাছে কবুল হয়নি। ৫ জুন তাঁর রিপোর্ট আসে পজেটিভ। পরদিন থেকে আমার শরীরেও করোনার নানা উপসর্গ। বাসায় দীর্ঘদিনের অ্যাজমার রোগী মা, আর বয়স্ক বাবার কথা ভেবে ভয় পেয়ে যাই। বাসায় আইসোলেশনে চলে যাই। এর মধ্যে শুনি কামরান ভাইকে শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। যেদিন কামরান ভাইকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেদিন কতোবার মনোস্থির করেছি হাসপাতালে দেখতে যাব। আবেগি মানুষ আমি। কামরান ভাইকে দেখে নিজেকে কতোটুকু স্থির রাখতে পারবো বুঝতে পারি না। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে সময় পার হয়। এদিকে রিপোর্ট না পাওয়ায় বুঝতে পারছি না আমি ‘পজেটিভ’ না ‘নেগেটিভ’। উপসর্গগুলো জানান দিচ্ছে অবস্থা সুবিধের নয়। কতোক্ষণ পর পর ফোন দেই মেহেদী কাবুলকে। সর্বশেষ অবস্থা জানি। শেষ পর্যন্ত কামরান ভাইকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। খবর আসে কামরান ভাইয়ের প্লাজমা লাগবে। রক্তের গ্রুপ ‘এ পজেটিভ’। ছোট ভাই হৃদয়ের মাধ্যমে ঢাকার একজন ডোনার ম্যানেজ হয়। তার ফোন নাম্বার দেই দেবাংশু দাস মিঠু দা’র কাছে। পরে সম্ভবত ওর প্লাজমা আর নিতে হয়নি। কামরান ভাই ফিরে আসবেন না, এটা আমার কখনো মনে হয়নি। গত পরশু (২৩ জুন) রাতে স্বপ্নে দেখছিলাম কামরান ভাই পিংক কালার পাঞ্জাবি পরে এইডেড স্কুলের লম্বা বারান্দা ধরে হাঁটছেন। এমন দৃশ্য আমার চোখে সবসময় ধরা পড়ে। সাদা পাঞ্জাবি আর টুপি পরা লম্বাদেহী কোন মানুষ দেখলেই দূর থেকে মনে হয় কামরান ভাই।

আইসোলেশনে থাকাকালীন সময়ে রাতে ঘুমানোর আগে ফোন বন্ধ করে দিতাম। সকালে সুইচ অন করতাম। ১৫ জুন ফজরের নামাজ পড়তে ওঠেছি। রাত পৌণে ৪টা বাজে। কি জানি ভেবে ফোন চালু করলাম। ফোন চালু হতেই দেখলাম সিলেটভিউ’র রিপোর্টারদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে কামরান ভাইয়ের মৃত্যুর সত্যতা নিয়ে দিব্য ও সাকলিনের চ্যাট। নিজের শরীরে চিমটি কাটি, আমি তো কোন দুঃস্বপ্ন দেখছি না? ফোন দেই মেহেদী কাবুলের কাছে। কাবুল জানান, সত্যিটা। আমার বুক ফেটে কান্না আসে। বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। সে কান্না থামে না। আমি জানি এই কান্না থামার নয়। স্ত্রী সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কে কাকে সান্তনা দেবে। তার চোখও যে বাঁধ মানছে না। কামরান ভাই যে আমার পরিবারেরই একজন। আমাদের বড় স্বজন। এই পরিবারের ছোট বড় সবার কাছে বড় আপন ছিলেন তিনি। সকালে যখন ছোট মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করে ‘বাবা কামরান আংকেল বুঝি মারা গেছেন?’ আমি উত্তর দেই না। বলতে পারি না ‘হ্যাঁ বাবা তোমার কামরান আংকেল আর নেই।’ শুধু বলি, ‘সবাই তাঁর জন্য দোয়া কর। আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।’

কামরান ভাই সারাজীবন মানুষের খেদমত করেছেন। তার কাজে হয়তো আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। মহামারিতে মৃত্যুতে দিয়ে হয়তো তাকে শহীদি মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ যদি তার বান্দাকে কবুল করে নেন, তবে একজন মুসলমান হিসেবে এর চেয়ে বড় আর কি পাওয়ার আছে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব ও নিজস্ব প্রতিবেদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন