আজ রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ ইং

শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু, আজ মহাষষ্ঠী

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১০-২২ ১৩:৪৭:০৪

সজল ঘোষ :: উৎসব প্রিয় সনাতন বাঙালি হিন্দুরা মেতে উঠেছে পূজার আনন্দে। শারদীয় দুর্গোৎসবের পঞ্চমী পেরিয়ে আজ মহাষষ্ঠী।

আজ (বৃহস্পতিবার) ষষ্ঠী পূজার মধ্যে দিয়ে জগত জননী মা শ্রীদুর্গা দেবীর আগমনী ধ্বনী ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র। তাই উৎসবের আমেজ এখন সিলেট নগরের হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে। মন্ডপে মন্ডপে বর্ণিল আলোকচ্ছটা সবার মন-প্রাণ রাঙিয়ে দিয়েছে। আজ থেকে সিলেটসহ সারাদেশে শুরু হবে বাঙালি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় শ্রীদুর্গাপূজা। এ বর্ণিল উৎসব চলবে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত।

পূরাণ মতে, রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তে তিনি পূজার আয়োজন করায় দেবীর এ পূজাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। কিন্তু রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে লংকা যাত্রার আগে শ্রী রামচন্দ্র দেবীর পূজার আয়োজন করেছিলেন শরৎকালের অমাবস্যা তিথিতে, যা শারদীয় দুর্গোৎসব নামে পরিচিত। দেবীর শরৎকালের পূজাকে এজন্যই হিন্দুমতে অকাল বোধনও বলা হয়। এবার  মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা ও বিজয়া দশমীতে বিজয়ার শোভাযাত্রাও হচ্ছে না। মন্ডপে মন্ডপে সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগআরতি আয়োজিত হবে সীমিত পরিসরে।

করোনার কারণে দুর্গাপূজায় উৎসব সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরিহার করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে  সাত্ত্বিক পূজায় সীমাবদ্ধ রাখা হবে। তাই এবারের দুর্গোৎসবকে কেবল দুর্গাপূজা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

তবে এ বছরের দুর্গোৎসব শুরুর মাসটি (আশ্বিন) ‘মল মাস’ তথা ‘অশুভ মাস’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় হেমন্ত ঋতুর কার্তিক মাসে এই পূজার আয়োজন হচ্ছে। মল মাসে পূজা-অর্চনা কিংবা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় না। একই কারণে প্রতি বছর মহালয়া তথা দেবীপক্ষ শুরুর সাতদিন পর পাঁচদিনের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটলেও এবার ব্যতিক্রম ঘটছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়া আয়োজিত হলেও এবারে দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষের সূচনার ৩৫ দিন পার করে।

সনাতন বিশ্বাস ও পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার দোলায় (পালকি) চড়ে স্বর্গালোক থেকে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন (আগমন)। যার ফল হচ্ছে মড়ক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ ও মহামারির প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে। দেবী স্বর্গালোকে বিদায় (গমন) নেবেন গজে (হাতি) চড়ে। যার ফল হিসেবে বসুন্ধরা শস্যপূর্ণা হয়ে উঠবে।

আজ বৃহস্পতিারব মহাষষ্ঠী পূজা দিয়ে শুরু হবে পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব। আজ ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সায়ংকালে দেবীর বোধন ও মহাষষ্ঠী পূজা হবে।

শরৎকালের দুর্গোৎসব শুধু উৎসব নয়, মহা-উৎসব। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, আধ্যাত্মিকতার অনুভ‚তি, সংস্কৃতি, বৈচিত্র্য, বাণিজ্য, বিদ্যাচর্চা, সামাজিক প্রীতির বন্ধন, হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যকে সমন্বয় সাধন করে। বিশ্বজননীর পূজায় বাঙালি হিন্দুর হৃদয়কে প্রসারিত করে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে। সকল দেশের মানুষকে আপন করে নিতে উৎসবকে বিশ্বজনীন উৎসবেও পরিণত করেছে।

এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, সামাজিক উৎসবও। দুর্গোৎসব উপলক্ষে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী একত্রিত হন, মিলিত হন আনন্দ-উৎসবে। তাই এ উৎসব সার্বজনীন। দুর্গাপূজার সাথে মিশে আছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি। ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এ আপ্ত বাক্যে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সবাই একসাথে উৎসব পালন করব। সকলে মিলে যুদ্ধ করে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। তাই এই দেশ আমাদের সকলের। প্রধানমন্ত্রী শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ সকল নাগরিকের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমার প্রত্যাশা, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে সক্ষম হব।’

এবার সারাদেশে ৩০ হাজার ২৩১টি পূজামন্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে। যা গতবারের তুলনায় ১ হাজার ১৬০টি কম। আর ঢাকা মহানগরীর এবারের পূজামন্ডপের সংখ্যা ২৩১টি, যা গত বছরের তুলনায় ৬টি কম। করোনার কারণে পূজামন্ডপের সংখ্যা কমেছে।

শারদীয় দুর্গাপূজার প্রথম দিনে আগামীকাল ষষ্ঠীতে দশভূজা দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস। ষষ্ঠীতিথিতে সকাল ৯টা ২৯ মিনিটের মধ্যে দেবীর ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। সায়ংকালে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল দুর্গোৎসব। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি পূজামন্ডপের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, র‌্যাব ও বিডিআর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মন্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট সূত্রে জানা গেছে, এই বছর সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সার্বজনীন আয়োজনে ৪৯টি ও পারিবারিক আয়োজনে ১৫টি পূজো অনুষ্ঠিত হবে।

সিলেট সদর  উপজেলায় সার্বজনীন ৫৭টি ও পারিবারিক ২টি। দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ২০টি ও পারিবারিক ৩টি। গোলাপগঞ্জ উপজেলায়  সার্বজনীন ৫৫টি ও পারিবারিক  ৩টি। বালাগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ২৮টি ও পারিবারিক ১টি। কানাইঘাট উপজেলায়  সার্বজনীন ৩৫টি। জৈন্তাপুর উপজেলায় সার্বজনীন ২২টি। বিশ্বনাথ উপজেলায় সার্বজনীন ২২টি ও পারিবারিক ৪টি। গোয়াইনঘাট উপজেলায় সার্বজনীন ৩৯টি। জকিগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৮৪টি। বিয়ানীবাজার উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৩৮টি, পারিবারিক ১৩টি। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ২৮টি। ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৩৭টি । ওসমানীনগর উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ২৬টি ও পারিবারিক ৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়াদশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় দেবীপক্ষ। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া।

এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে। দূর্গা পূজাকে সামনে রেখে সিলেট নগরীর বিভিন্ন পূজা মন্ডপগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা তৈরীর কারিগরা। তার পাশাপাশি নগরীর মন্ডবগুলোকে বর্ণিল সাজে সাজানোর ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যায় । প্রতি বছর এই পূজাতে নগরীতে নতুন নতুন সাজ-সজ্জা দেখা চোখে পড়ে। সম্প্রতির নগরী সিলেটে হিন্দু হিন্দুধর্মালম্বীদের এই পূজাতে সকল ধর্মের মানুষকেই আনন্দ ভাগ করে নিতে দেখা যায়। গত মাসের ১৭ সেপ্টেম্বর বুধবার অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র মহালয়া।

২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার মহাষষ্ঠী, ২৩ অক্টোবর শুক্রবার মহাসপ্তমী, ২৪ অক্টোবর শনিবার মহাঅষ্টমী, ২৫ অক্টোবর রবিবার মহানবমী, ২৬ অক্টোবর সোমবার বিজয়া দশমী ।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/২২ অক্টোবর ২০২০/এসজি/এসডি

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন