আজ বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০ ইং

আমি নিজে মৌলভীবাজারকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করি

বিশেষ সাক্ষাৎকারে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-১২-০৮ ১২:১২:৪৭



‘১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর ভোরে আমি নিজে মৌলভীবাজারকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর্শীবাদে রাজনীতিতে যোগদানের কারণে আজও দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারছি। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন চলাকালে বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক সফরে সিলেটে আসেন। বঙ্গবন্ধু পিঠে থাপ্পড় মেরে বলেন, ‘২৫ বছরে না বুঝলে কবে বুঝবে?’ তার পরই আমি রাজনীতিতে সক্রিয় হই। সত্তরের নির্বাচনে প্রথম ২৭ বছর বয়সে এমপি নির্বাচিত হই।’

সিলেটভিউ২৪ডটকম এর নিজস্ব প্রতিবেদক (কুলাউড়া) শাকির আহমদকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে কথাগুলো বলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪নং সেক্টরের রাজনৈতিক সমন্ময়কারী, স্বাধীনতা পরবর্তী গণপরিষদ সদস্য, বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান।

প্রতিবেদক :: কার অনুপ্রেরণায় আপনি রাজনীতিতে এলেন? কিভাবে?

আজিজুর রহমান :: ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন সারাদেশে ব্যাপকতা লাভ করে। ওই সময় বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক সফরে মৌলভীবাজার হয়ে সিলেটে আসেন। আমি তখন পারিবারিক কাজে সিলেটে ছিলাম। সিলেটের দেওয়ান ফরিদ গাজী (গাজী ভাই) এর অনুপ্রেরণায় আমি সিলেটের একটি বাসায় বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে যাই। বঙ্গবন্ধু আমাকে রাজনীতিতে প্রবেশের জন্য উৎসাহ দেন। বঙ্গবন্ধু পিঠে থাপ্পর মেরে আমাকে বলেন, ‘২৫ বছরে না বুঝলে কবে বুঝবে? বৃহত্তর সিলেট জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মুমিনকে তিনি বলেন, ‘আজিজ আওয়ামীলীগে যোগদান করবে। আগামীকাল তাকে দিয়ে যোগদানের বিবৃতিতে সংবাদ মাধ্যমে পাঠিয়ে দেবে। এর পর শুরু হয় আমার সক্রিয় রাজনীতি।

প্রতিবেদক : মুক্তিযুদ্ধে আপনি অংশগ্রহণ কালে কোন লোমহর্ষক স্মৃতি?
আজিজুর রহমান :: পাকহানাদার বাহিনী কর্তৃক ২৬ মার্চ মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসক এবং মহকুমা পুলিশ প্রশাসক সহ বাড়ি ঘেরাও করে আমাকে বন্দি করে নিয়ে যায়।... বন্দি করে মৌলভীবাজার ও সিলেটে নিয়ে আমাকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। ওদের নির্যাতনে অনেকবারই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।..৮ এপ্রিল সিলেট শহর কিছু সময়ের জন্য বীর মুক্তিবাহিনীরা মুক্ত করেছিলো এবং মুক্তিবাহিনীরা আমাদের মুক্ত করে নিয়ে আসে। তখন আমার শারীরিক অবস্থা এত খারাপ ছিল যে, একজন মানুষ কথা বললে মনে হত হাজার মানুষ কথা বলছে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো শারীরিক অবস্থা ছিলো না। ‘সাধারণ মানুষ জানতো হানাদার বাহিনী আমাকে মেরে ফেলেছে।’ কখনো কখনো মনে হয়েছিলো তারা আমাকে মেরে ফেলবে। বন্দি থাকাবস্থার ঘটনার সংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি এবং ভয়েজ অব আমেরিকাসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিলো। মুক্ত হয়ে আমি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ আওতাধীন ৪ নং সেক্টারে রাজনৈতিক সমন্বয়কারী হিসাবে দায়িত্ব পালন কালে অসংখ্য গেরিলা অপারেশন, কোথাও সরাসরি আক্রমণ নিত্যদিনের ঘটনা ছিলো। এসময় ৪নং সেক্টারের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় কমলপুরে (বর্তমান ধলই চা বাগান)। এ যুদ্ধে সিপাহী হামিদুর রহমান (বীরশ্রেষ্ঠ) সহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ওই দিনের স্মৃতি এখনও আমি ভুলতে পারছি না।

প্রতিবেদক : যুদ্ধকালীন সময়ে আপনার সুখের কোন মুহূর্ত?
আজিজুর রহমান :: মূলত যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে আমার কিছু মুহূর্তগুলো মনে করলে এখনো তৃপ্তি পাই। যেমন, ৩ ডিসেম্বর সকাল ৯ ঘটিকার সময় শমসেরনগর পুলিশ ক্যাম্পে, শমসেরনগর সার্কিট হাউস ও স্কুলে আনুষ্ঠানিকভাবে আমি নিজে স্বাধীনতা পতাকা উত্তোলন করি এবং চাতলাপুর বিওপিতে তোয়াবুর রহিম এমপি পতাকা উত্তোলন করেন। বৃহত্তর সিলেটের পাকহানাদার বাহিনীর ব্রিগেইড হেড কোয়ার্টার মৌলভীবাজার শহরে ছিলো। ৫ ডিসেম্বর মুন্সিবাজারের যুদ্ধে হানাদারবাহিনী পরাজিত হয়ে মৌলভীবাজারের দিকে পালায়। ৬ ডিসেম্বর আমরা রাজনগরে উপস্থিত হয়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করি। তখন পাকহানাদার বাহিনী ফেঞ্চুগঞ্জের দিকে পলায়ন করে। রাজনগর থেকে দুটি কোম্পেনী কুলাউড়ার দিকে পাঠিয়ে দেই এবং বাকি সকল মুক্তিযোদ্ধা কোম্পেনীকে নিয়ে মৌলভীবাজারের দিকে অগ্রসর হই। অন্যদিকে ৬ ডিসেম্বর পাহাড় বর্ষিজোড়া, মাতারকাপন, সোনাপুর ও সালামী টিলায় পাকহানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, বিস্ফোরকদ্রব্য, মাইন, গ্রেনেড, গোলাবার”দ ফেলে পালায়। ৮ ডিসেম্বর মহকুমা হাকিমের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে আমি নিজে মৌলভীবাজারকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করি। তাই ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার হানাদারমুক্ত দিবস। স্বাধীনতা অর্জনের মুহুর্তগুলো আমার জীবনের এক তৃপ্তময় অধ্যায়।

আজিজুর রহমান পরিচিতি ::
২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ সালে জন্ম নেয়া আজিজুর রহমান মৌলভীবাজারের গুজারাই গ্রামের মরহুম আব্দুস সত্তার ও মরহুম কাঞ্চন বিবির ছেলে। শিক্ষাজীবনে তিনি শ্রীনাথ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক, মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি, মৌলভীবাজার সরকারী কলেজ থেকে এইচ.এস.সি, এবং হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৭০ এর নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন। স্বাধীনতার পর ১০৭২ সালে গণপরিষদ সদস্য, ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে এমপি, ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯১ সালে কার্যকরী কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগের ২ বারের সভাপতি, দুইবারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত মৌলভীবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির আহŸায়ক। ২০১১ সাল থেকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পুনরায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/৮ডিসেম্বর২০১৯/শাআ

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন