আজ শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২০ ইং

সব আয়োজন এমনি করেই শেষ হয়

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৩-২৭ ০১:২৮:৪৪

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন :: স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বহিঃবিশ্বে একবারই যুদ্ধ করতে গেছে। সে যুদ্ধে বহুজাতিক বাহিনীর সাথে বিজয়ী হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধের মাঠে বহুজাতিক এ সেনাযুদ্ধে অধিনায়কদের একজন ছিলেন আমাদের স্বজন ব্রিগেডিয়ার( অবঃ) জোবায়ের সিদ্দিকী।

২৪ মার্চ মঙ্গলবার। করোনা ভাইরাস নামের তাণ্ডবে পুরো আমেরিকায় একধরনের অবরুদ্ধ। টানা দুই সপ্তাহ ঘরে বসে দুঃসংবাদের শব্দমালা সাজাই। জানালা দিয়ে দেখি গুমুট আকাশ। সদা চঞ্চল নগর জনপদ যেন থমকে গেছে। যেন কোন প্রলয় নেমে এসেছে।ফোন আসে। একের পর এক দুঃসংবাদের ফোন। সিলেট নগরীর এক সময়ের দাপুটে স্মাজিক মানুষ হক ট্রেডার্সের এনামুল হক ১১ বছর মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সংবাদ। ধাতস্থ হচ্ছি। এনাম ভাইয়ের স্বজনদের ফোন আসছে। মন ফিরে যাচ্ছে আশি আর নব্বই দশকের নাগরিক জীবনে। এরমধ্যয়েই তালহা সিদিকীর ফোন। এম্ন সময়ে সংবাদকর্মিদের ছাড়া অন্য কারো ফোন আমার ধরার কথা নয়। তালহা আমার প্রাণের বন্ধু শামীম সিদ্দিকীর ছেলে। নিউজার্সীতে আমার কাছেই থাকে। তালহার ফোন ধরতেই কথা নয়, বিলাপ শুনি। এ বিলাপের অর্থ জানি। বিলাপের মধ্যেই তালহা জানায়, বড় চাচ্চু আর নেই!
জীবনের সব আয়োজন এমনি শেষ হয়! (অবঃ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়ের সিদ্দিকী তাঁর জীবনের সব আয়োজন শেষ করেছেন, সংবাদটি আর সংবাদ থাকে না সংবাদ নিয়ে কাজ করা অধম এক সংবাদকর্মির কাছে।        

একজন মহান সমর নায়ককে যৌবনের শুরুতে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি বঙ্গবীর ওসমানী। যুদ্ধ জয়ের গল্প বলতেন।কাছে বসে রাশভারী মানুষটির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নানা কাহিনী শুনেছি। সামরিক যুদ্ধের নানা বিষয়, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের গেরিলা কৌশল নিয়ে তাঁর আত্মকথন শুনেছি যৌবনের বিমুগ্ধতায়। অনেকক্ষন গল্প করে দরজা বন্ধ করে খট খট করে টাইপ করে যেতেন দিনের পর দিন। বলতেন, অনেক অজানা কথা লিখে যাচ্ছেন। কাছে থাকলেও কোনদিন লিখাটি ছুঁয়ে দেখার অবকাশ হয়নি। সেই সাহসও ছিল না। রহস্যময় এ সমরনায়ক মারা যাওয়ার পর তাঁর লিখা পাণ্ডুলিপি কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। এখন আর সেই পাণ্ডুলিপির খোঁজ কেউ করেও না। জেনারেল ওসমানীরই খোঁজ আর কে রাখে?

জোবায়ের সিদ্দিকী আমাদের আরেক সমর নায়ক। স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী একবারই দেশের বাইরে গিয়ে অন্য দেশের হয়ে যুদ্ধ করেছে। সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নিলে, দেশটি মুক্ত করতে আন্তর্জাতিক বাহিনীর সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যোগ দেয় যৌথ বাহিনীতে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমাদের সেনাবাহিনীর অধিনায়কদের একজন ছিলেন জোবায়ের সিদ্দিকী।

প্রথম গালফ ওয়ারের বিজয় নিয়ে আমেরিকা সদা উচ্চকণ্ঠ। জোবায়ের সিদ্দিকী আমেরিকা সফরে আসলে, টিভি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাঁর পরিচয় উপস্থাপন করেছিলাম। আমেরিকার নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর অন্যতম সামরিক অধিনায়ক আমাদের জোবায়ের সিদ্দিকী। আমেরিকায় বসে বেশ অহংকারের সাথেই তা উচ্চারণ করেছিলাম।
জোবায়ের সিদ্দিকী আমাদের”বড় ভাই”। আমার সঙ্গের নিত্য অনুষঙ্গ শামীম সিদ্দিকীর অগ্রজ হওয়ার কারনে তাঁর সাথে মেলামেশা। রাজনীতি, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে শামীমের ঈদগাঁর বাসায় দিনরাত আসা যাওয়া। সেনা কর্মকর্তা জোবায়ের সিদ্দিকী সিলেট এলে দেখা হয়ে যেত। গল্পে-আড্ডায় অবলীলায় তিনি আমারও” বড় ভাই” হয়ে উঠেন। একজন সৎ, দম্ভহীন, কোমল হৃদয়ের দেশপ্রেমিক মানুষটি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন পরিচয়ের শুরুতেই।

সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দেশের সর্বোচচ ক্ষমতাধর ব্যক্তির আশেপাশে ছিলেন তিনি। কিন্তু কোনদিন ক্ষমতার প্রকাশ দেখিনি। চলনে, বলনে এক আপাদমস্তক বিনয়ী মানুষ ছিলেন জোবায়ের সিদ্দিকী। যতই দেখেছি, শ্রদ্ধা বেড়েছে। একাত্তরে পাকিস্তানের কারাগারে আটক সময়ের গল্প শুনেছি। তিনি লিখেছেনও তাঁর বইয়ে। বৃটিশদের বানানো দূর্গে কিভাবে বাঙালী সেনা কর্মকর্তাদের আটক থাকতে হয়েছে। প্রতিদিন অনিশ্চয়তা নিয়ে ভোর আসতো। দূর্গ ভেদ করে পালিয়ে এসে দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে যোগ দেয়ার প্রচেষ্টা কিভাবে ব্যর্থ হলো- তাঁর লোমহর্ষক বিবরণ শুনে শিহরিত হয়েছি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এ এক অন্য ইতিহাস। এ ইতিহাস নিয়ে, আমরা খুব চর্চা করিনি। যদিও বন্দিত্ব নিয়ে, ত্যাগ নিয়ে উপহাস করেছি নানাভাবে। আমাদের এ দীনতায় দেশের খাঁটি সন্তানের ত্যাগ বৃথা হয়ে যায়না ! খাটো হয়েও যায়না।

জোবায়ের সিদ্দিকী নিজেকে এক সাধারন সৈনিক হিসেবেই পরিচয় দিতেন গর্বের সাথে। বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের পর “অবসরে” দিন কাটাননি।

আমেরিকায় আসলেন। অভিবাসনের সুবিধা তাঁর। আত্মীয় পরিজন এখানে। দেশের সন্তান দেশেই ফিরে গেলেন।সিলেটের শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য ভুমিকার জন্য অবসর জীবনে এক আইকন হয়ে উঠেছিন তিনি। আওয়ামীলীগের এম পি হাফিজ মজুমদার তাঁর ট্রাস্টের মাধ্যমে সিলেটের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখতে এগিয়ে আসলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন “স্কলার্স হোম” নামের শিক্ষা প্রতিষ্টান। প্রবাসী বহুল সিলেটে ইংরাজী মাধ্যমের এ প্রতিষ্ঠানের সাফল্য প্রবাস থেকে বড় বেশী টের পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীরা লন্ডন আমেরিকায় পৌঁছে অথৈ সাগরে পড়ে না। জিজ্ঞাসা করলেই বলে, স্কলার্স হোমে পড়ে এসেছে। প্রিন্সিপ্যাল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল(অবঃ) জোবায়ের সিদ্দিকীর নামে এসব অগুনতি শিক্ষার্থীর চোখে শ্রদ্ধার ঝিলিক উঠে। গর্বে বুকটা ভরে যায়।
দেশে গেলেই স্বল্প সময় থাকলেও স্কলার্স হোমে ঢু মারি। ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাটা জানিয়ে আসি। দেশের খাঁটি সন্তান হিসেবে সক্রিয় জোবায়ের সিদ্দিকীকে দেখে গর্বিত হই। দূর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানান। নিজের যাপিত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন। জীবনের বেলাভূমে দাঁড়িয়ে মাটির সন্তান হিসেবে নিজের কাজটি করে যাচ্ছিলেন খুব যত্নে।

আপত্য স্নেহ পেয়েছি। সময়ে অসময়ে অনেক জ্বালাতনও করেছি। ভাবীকে নিয়ে আমেরিকা আসলে আমরা ঘুরে বেড়াই। তাঁদের সন্তানদের খোঁজ নেই। ধ্বসে পড়া টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপে গড়ে উঠা আকাশচুম্বী ফ্রিডম টাওয়ারের পাশে দাঁড়ান জোবায়ের সিদ্দিকী। নিউইয়র্কের আকাশে তখন ঝকঝকে রোদের ঝিলিক। পৃথিবী বদলে দেয়ার এ স্মারক স্থম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে আমি নীরবে স্যালুট জানাই আমার একান্ত স্বজন এক কর্মবীর জোবায়ের সিদ্দিকীকে।

যেখানে থাকেন ভালো থাকুন অগ্রজ, মাটির খাঁটি সন্তান জোবায়ের সিদ্দিকী।

তাঁকে নিয়ে বহু স্মৃতি আজ ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছু মানুষ আছেন যারা নানাভাবে আশেপাশের লোকজনকে প্রভাবান্বিত করে যান নানাভাবে। জোবায়ের সিদ্দিকীও এমনই একজন ছিলেন।

দেশের জুন্য, সমাজের জন্য আপনার পথ চলা আমৃত্যু ছিলো। মাটির খাঁটি সন্তনারা এমনি হয়ে থাকেন। তারা পথ চলা দেখিয়ে যান। এ পথ মসৃণ না হলেও একমনে এগিয়ে যেতে হয় , তা এক সৈনিকের মতই দেখিয়ে গেছেন। পরিবার, স্বজন, সমাজ ও দেশকে ঋদ্ধ করে গেছেন। একজন সফল মানুষের এ প্রস্থান বীরত্বের। অন্তিম অভিবাদন জানাতে গিয়ে দেশের সেনা সদস্যদের বিউগলে তা উচ্চারিত হয়েছে। সেনা প্রধানের শোকবার্তায় , তা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আমাদের বিমূর্ত আকুতিতে বীরের এ প্রস্থান অনুরণন করে যাবে।

জীবনের সব আয়োজন এমনি করেই শেষ হয় ! কারো কারো জীবন থমকে দাঁড়ায়! বৃক্ষহীন তল্লাটে উর্বর জমি বিরান হয়। পরিবার , সমাজ , প্রতিবেশ সব এ পরিবর্তন একসময় মেনে নেয়। নিতে হয়।

ভালো থাকেন প্রিয় অগ্রজ সাথী ভাই! স্মৃতির শ্রদ্ধায় সতত মাথা হেট হবে। বিলাপ আর ভালোবাসার উচ্চারণে ব্যক্তিগত বিচরণের স্মৃতি ধারণ করে যাব বাকীটা জীবন।

লেখক: আবাসিক সম্পাদক, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন