আজ শনিবার, ৩০ মে ২০২০ ইং

মায়েরা বড্ড মিথ্যেবাদী হয়!

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৫-১০ ১৯:৫৩:২৮



|| আশরাফ আহমেদ ||
বছর সাতেক আগের কথা। বর্ষার বৃষ্টিটা মুষলধারেই নেমে পড়েছে। বন্ধুদের সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে শরীরে প্রচন্ড জ্বর চলে আসে। রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। একটু পর মায়ের ডাক। বাবা সামান্য কিছু হলেও খেয়ে ঔষধ খাও। নিজের হাতে জোর করে খাইয়ে দিয়ে ঔষধও খাইয়ে দেন মা। তারপর মাথায় পাতলা কাপড় বেঁধে পানি দেওয়ার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি আমি। কোরআন তেলাওয়াতের শব্দে মাঝ রাতে ঘুম ভাঙলে দেখতে পাই, আমাকে জড়িয়ে ধরে সুস্থতার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে পার্থনা করছেন আমার মা। সন্তানের একটুখানি কষ্টে এমন হাজারও রাত না জাগা মায়ের গল্ল নিজ চোখেই দেখে আসছি আমি।

নিজে না পড়ে, না খেয়েও সন্তানের জন্য খেয়েছি কিংবা পরেছি বলে আজীবন নিজেকে বিসর্জন দেওয়া প্রতিটা  মায়ের মিথ্যে বলার ধরণটা প্রায় একই রকমের হয়। সন্তানের জন্য  পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকারকারী সেই মায়েদের জানাই লাল সালাম।

আজ বিশ্ব মা দিবস। যদিও মায়েদের জন্য বিশেষ কোন দিন বা দিবসের কোন প্রয়োজন নেই। মায়েরা ১২ মাসের ৩৬৫ দিনই মায়ের মতোই।  কোন উপাধি উপমা এই শব্দটায় বড্ড বেমানান।

ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, প্রাচীন গ্রীসে মা দিবসের’ প্রচলন শুরু হয় । অপর একটি তথ্য মতে-সর্বপ্রথম ১৯১১ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার আমেরিকাজুড়ে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি বিশেষ দিন উদযাপন করা হয়। ১৯১৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন দিবসটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। এরপর পৃথিবীর দেশে দেশে মা দিবসটি পালনের রেওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে। বিভাজনের এই  পৃথিবীতে সবদেশেই মা শব্দটিই একমাত্র  সর্বজনীন। দেশ-জাত আর শ্রেণিবৈষম্যহীনতা একমাত্র মা শব্দের সাথেই যায় না।

স্বার্থের পৃথিবীতে একমাত্র মায়েরাই হন সন্তানের জন্য  নিঃস্বার্থভাবি একজন মানুষ। মায়েদের সব ব্যক্তিগত স্বার্থ চাহিদা সব কিছু বিলিন হয় সন্তানের একটুখানি সুখের জন্য। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে রক্ত থেকে নিঃসৃত স্তনের দুধ খাওয়ানো, মায়েদের চাপিয়ে যায় এমন কোন মানুষ পৃথিবীতে আজও পাওয়া যায় নি।

নিজের গাঁ দেওয়া পোষাকটি যে মেয়ে কখনও ধুয়ে দেখে নি, অথচ বিয়ের পর সন্তানের ময়লাগুলো নিজ হাতে ধুতে এতোটুকুও কার্পন্য থাকে কোন মায়ের মনেই। মায়েদের কোন ভবিষ্যৎ থাকে না। সন্তানের মঙ্গল কামনা করাই তার সাধনা বাসনার মূল বিষয় হয়ে দ্বারায়। যেকারণে পৃথিবীর সব ধর্মেই মায়েদেরকে অনন্য এক মর্যাদার আসনে অদৃষ্টিত করা হয়েছে। ইসলাম বলে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। সনাতনেও মায়ের সম্মানে আছে কঠোর নির্দেশনা । খ্রিষ্টানরা বলে মায়েরা হলো ঈশ্বরের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় উপহার।

সন্তানের জন্য  ব্যক্তিগত সুখ সাচ্ছন্দ্যগুলো  কত সুন্দর ভাবে হাসি মুখেই বিলিয়ে দেন একেকজন মা। আঁতুড়, লোলা, সুন্দর -কুৎসিত যাইহোক প্রতিটা সন্তানই মায়েদের কাছে অমূল্য রত্নতূল্য হয়।

মার মাধ্যমেই আমরা প্রথম কথা বলা শিখি। যেজন্য মায়ের ভাষা হয় মাতৃভাষা। মা হচ্ছেন মমতা-নিরাপত্তা-অস্তিত্ব ও নিশ্চয়তার আশ্রয়। মা সন্তানের অভিভাবক, পরিচালক, ফিলোসফার, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও বড় বন্ধু। মায়ের দর্শনেই সন্তান হয়ে পারিবারিক সামাজিক। মায়ের শিক্ষাই শিশু হয় জাতির ভবিষ্যৎ। আর এজন্যই নেপোলিয়ন বলেছিলেন, আমাকে একজন শিক্ষক মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষক জাতি দেব।

বড় হয়ে জেনেছি। মা'রা অনেক মিথ্যেবাদি হয়। না খেয়েও সন্তানের জন্য রেখে দিয়ে মুখে রহস্যের হাসি ফুটিয়ে  কত সহজভাবেই না বলে দেয়, আমি আগেই খেয়েছি, কিংবা ক্ষিদে নেই বাবা। মায়েদের এই অভিনয়গুলোর রহস্যের মুলে যে আমরাই,  কটা সন্তানই তা বুঝার ক্ষমতা রাখে।

হতাশা কিংবা বিষন্নতা যখন ঘিরে ধরে আমাদের চারপাশ। মায়ের আঁচল মাধেই তখন লুকিয়ে থাকে শান্তির স্নিগ্ধ পরশ। সন্তান হাজারটা অপরাধ  করলেও দিনশেষে  মায়েদের কোন অভিযোগ অনুযোগ  প্রকাশ পায় না।  সন্তান জন্ম কিংবা   লালন করার মতো যুদ্ধে বাবা মা উভয়েরই ভূমিকা অতুলনীয়।  মায়েরা তাদের ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো হাসিমুখে বিলিয়ে দেন। যদিও আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মায়েদের এই ত্যাগ বরাবরই হয়, কুংখীত আর অবহেলিত।  সন্তান লালনকে  যদি পেশা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পেশাদার হবেন একেকটা মা। মায়েদের এই বিষয়গুলো যদি যুদ্ধের কাতারে ফেলা হয়, তাইলে পৃথিবীর প্রতিটা মা'ই হবেন একেকজন বীর সেনানী।

করোনার আঘাতে চন্দ হারানো পৃথিবীতে, সবাই এখন ঘর বন্দি। ব্যস্ততার কারণে সময় দেওয়া হয় না, আমার মায়েদের। সবকিছু চাপিয়ে আগামীর দিনগুলো হউক মায়েদের জন্য। মা দিবসে পৃথিবীতে সব মায়েদের প্রতি রইল অকৃত্রিম ভালবাসা। ভাল থাকুক  স্নেহ ভালোবাসার এসব খোরাকগুলো।

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন