আজ শনিবার, ৩০ মে ২০২০ ইং

করোনা আপদকালীন সময়ে অনলাইন হতে পারে শিক্ষার মাধ্যম

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৫-২১ ১৫:২৯:৪০

শেখ মো. নজরুল ইসলাম :: আমাদের প্রিয় নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জীবনের একটি কাহিনী দিয়ে শুরু করতে চাই। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বাড়ি বরিশালে। ফজলুল হকের মায়ের জবানীতে পাওয়া যায়-১৮৭৬ সালে ৩১ অক্টোবরে বরিশালে প্রচণ্ড বন্যা ও ঘূর্ণিঝয় হয়। এতে অনেক ঘর বাড়ি জান মালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এমন অবস্থা যে, ঘর বাড়ি জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যাচ্ছে। পিতার সামনে পুত্র পানিতে তলিয়ে মারা যাচ্ছে। অনেক পরিবারের সদস্যকে ঘূর্ণিঝড় বিছিন্ন করে দিচ্ছে। ঐ সময়ে সবাই অসহায়। এই দৃশ্য দেখে এ কে ফজলুল হকের মা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। নিজে কিভাবে বাঁচবেন আর ছেলেমেয়েদেরই কিভাবে বাঁচাবেন। মা নিজের জীবন দিয়ে সবসময় সন্তানদের বাঁচান।

ঘরের ভিতর বড় তামার পাতিল ছিল। ৩ বছরের শেরে বাংলা ও ছোটবোনকে পাতিলের মধ্যে রেখে হাতে ঠিকানা লিখে আল্লাহর নামে পানিতে ভাসিয়ে দিলেন। ঝড় থামার পর প্রতিবেশী শেরে বাংলা ও তাঁর ছোট বোনকে পাতিলের ভিতর থেকে বের করে মাকে দিলেন। মা আনন্দে আত্মহারা হলেন। দুর্যোগের পর আমরা পেলাম আমাদের মহান নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে।

বর্তমান করোনার মহা দুর্যোগে আমরা কী করব! বৈশ্বিক মহামারীর প্রেক্ষাপটে আমরা অনেকেই হয়তো বাঁচব না। আমরা শতর্ক থেকে আমাদের প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে পারি। তাঁরা গড়বে ক্ষুধা দারিদ্র্য দুর্নীতিমুক্ত স্বপ্নের বাংলাদেশ। আধুনিক যুগ বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগ। বাংলাদেশ তথা বিশ্বের প্রতিটি দেশে তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তির জয় জয়কার। সভ্যতা আজ নির্ভর করছে বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর। আমাদের জীবনের প্রাত্যহিক কাজ কর্মে আইসিটির প্রভাব ব্যাপক। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইসিটির প্রয়োগ লক্ষনীয়। স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ। অবস্থা দেখে মনে হয় স্মার্টফোন না হলে জীবন অচল। আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে। প্রাত্যহিক কাজের অংশ হয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এর অন্যতম হলো ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ওয়াটসআপ,ভাইভার ইত্যাদি।

অভিভাবক শিক্ষার্থী শিক্ষক প্রত্যেকেই দুইএকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন। শিক্ষক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতায় দেখলাম প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মা ই বেশী তদারকি করেন। কথা প্রসঙ্গে এইচ.এস. সি. শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর মা বললেন “স্যার আমার মেয়ে আপনার কলেজে পড়ে।সে কলেজের নোটিশ বিজ্ঞপ্তি ফেসবুক গ্রুপ থেকে সংগ্রহ করে। “শিক্ষার্থী ফেসবুক গ্রুপে সহপাঠীদের সাথে যোগাযোগ করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীর পড়াশুনা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বায়নের মহামারী করোনার কারণে আমরা আজ লকডাউন। অভিভাবক শিক্ষার্থী শিক্ষক সবাই গৃহবন্দী। আইসিটির যুগে লকডাউন থাকাকালীন সময়ে আমরা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বন্ধ করতে পারিনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাতে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অলস সময় কাটাচ্ছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এ থেকে শিক্ষার্থীদের পরিত্রাণের পথ হচ্ছে অনলাইন শিক্ষা।

আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই, আমার দুই মেয়ে ৩য়, ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। করোনাকালীন সময়ে তাদের পড়ালেখায় মনোযোগ নেই। বিভিন্ন অজুহাতে তার পড়তে বসতে চায় না। একদিন শ্রেণি শিক্ষক ফোন দিয়ে বললেন আগামী এত তারিখ এই সময়ে তাদের অনলাইনে ক্লাস হবে। তাদের প্রস্তত করে রাখবেন। আমি লক্ষ্য করলাম এরপর থেকে আমার দুই মেয়ে পড়ালেখার জন্য তৎপর। কখন কী ক্লাস হবে, কী হোম ওয়ার্ক দেওয়া হবে তা নিয়ে ব্যস্ত। যথারীতি নির্দিষ্ট তারিখে জুমে ক্লাস হলো, শিক্ষার্থীরা অংশ গ্রহণ করে শ্রেণি কার্যক্রমে মজা পেল। এখন নিয়মিত অনলাইনে ক্লাসে অংশগ্রহন করে। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেল। আগে যে পড়তে চাইত না এখন সে অনলাইন ক্লাস ও হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত।

তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আইসিটি জ্ঞানে সমৃদ্ধ। বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষক প্রতি প্রতিষ্ঠানে আছেন। গ্লোবালাইজেশনের যুগে ডিজিটাল কন্টেন্টসহ পাঠদান অনুশীলনে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। লকডাউন চলাকালীন সময়ে অনলাইনে শ্রেণিকার্যক্রম শিক্ষার অন্যতম একটি মাধ্যম হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগী হবে। শিক্ষার্থীদের একঘেয়েমি কমবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক উন্নয়নে শিক্ষা এগিয়ে যাবে। লকডাউনের সামাজিক ও পারিবারিক সংকট কমবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই দেখতে পাই, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ভাল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে পাঠদান করতে সক্ষম। স্বস্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানের নির্দেশনায় শিক্ষক শিক্ষার্থীর সংযোগ সাধন করতে পারলেই আমরা অনলাইন ক্লাসের সুফল পাব।


কিভাবে অনলাইনে ক্লাস নিবেন?
আমরা সোসাল মিডিয়ার যুগে বাস করছি। শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবক কোন না কোন সোসাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। তাই বহুল প্রচলিত সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনলাইন পাঠদান সম্পাদন করতে হবে। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যম হলো- zoom, coursera, YouTube live, Google classroom, facebook live, Microsoft team etc. ফেসবুক লাইভ ও জুমে ক্লাস নেওয়া অধিকতর উপযোগী। অনলাইনে স্বল্প সময়ে শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। যে অ্যাপে ক্লাস নিতে চান ঐ অ্যাপ ডাউনলোড করে নিতে হবে। ধরে নেয়া যাক আমি জুম এ অনলাইন ক্লাস নিব। জুম অ্যাপ ডাউনলোড করে নিব। জি-মেইল একাউন্টের মাধ্যমে জুমে একটি একাউন্ট খুলতে হবে।

জুমে ৪টি অপশন পাওয়া যাবে- new meeting, Join, Schedule, Share screen
শিক্ষক হোস্ট হিসাবে ক্লাসের জন্য নিউ মিটিং অপশনে যাবেন, মিটিং কল করে Manage participation গিয়ে Invite এ শিক্ষার্থীদের যে কোন যোগাযোগ মাধ্যমে Invite করবেন।
New meeting Manage participation Invite শিক্ষার্থীরা জুম অ্যাপে গিয়ে জয়েন এ ক্লিক করে আই ডি পাসওয়ার্ড দিয়ে অংশ গ্রহণ করবে।
জুমে আরো চারটি অপশন Chat, Screen share, Record, Reaction শিক্ষক শিক্ষার্থী এই অপশন ব্যবহার করে পাঠদান আরো আকর্ষনীয় করতে পারেন। শিক্ষক Screen share এর মাধ্যমে ফাইল ইমেজ শিক্ষার্থীদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। ভার্চুয়াল ক্লাস রুমে অংশ গ্রহণ মূলক পদ্ধিতিতে পাঠদান সম্পাদন করতে পারবেন।ভার্চুয়াল ক্লাস রুমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব ক্লাসরুমের স্বাদ পেয়ে শিক্ষায় মনোযোগী হবে।

অনলাইন ক্লাস রুমে যা লাগবে-
•স্মার্ট ফোন/ ল্যাপটপ/ কম্পিউটার
•হেড ফোন
•উচ্চ গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট
•প্রয়োজনীয় অ্যাপস।

অভিভাবক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের পজেটিভ মনোভাব থাকলে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম শিক্ষার অন্যতম একটি বাহন হবে। তথ্যের আদান প্রদান বৃদ্ধি পাবে। সহজেই তথ্য আহরণ করা যাবে। অনলাইন মিডিয়ার ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বায়নের বাণিজ্যে বাংলাদেশ প্রাগ্রসর হবে। সৃজনশীল বিনোদনে সবাই আকৃষ্ট হবে। শিক্ষার প্রসারের ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। অনলাইন প্রসারের ফলে উপকারের সাথে সাথে নেতিবাচক দিক ও অস্বীকার করা যায় না। নেতিবাচক সাইটগুলো থেকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বর্তমানে সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উত্তম হাতিয়ার। যে দেশে তথ্য যোগাযোগ বেশি উন্নত সে দেশ তত বেশি উন্নত। ইন্টারনেটবিশ্ব দেশের মানচিত্র পরিবর্তন করে নেট ব্যবহার কারীদের বিশ্বায়নের নাগরিকে পরিণত করছে। তাই আমরা দেখতে পাই এম.সি. কলেজের শিক্ষার্থী আমেরিকার নাসায় চাকুরী করে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থী গুগল কোম্পানীর সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। তাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা হবে অনলাইনের বহুমাত্রিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। এতে সম্ভব হবে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর উন্নত ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন।

লেখক:
মাস্টার ট্রেইনার, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
এম.সি. কলেজ, সিলেট।
Email: najrul78mc@gmail.com

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন