আজ রবিবার, ৩১ মে ২০২০ ইং

ঘৃণা করো পাপকে, পাপীকে নয়

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৫-২২ ১৪:৪৩:১২

দিলীপ রায় :: তখন নাম ছিল পারস্য, বর্তমানে ইরান। প্রাচীন পারস্যে প্রচলিত ছিল 'পারশি ধর্ম'। এই ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুশত্র (Zarathustra)। তিনি ছিলেন গভীর ধর্মীয় জ্ঞানের সাধক ও নেতা। তাঁর প্রচারিত মতবাদ ও আদর্শ একদা পারস্যবাসী গ্রহণ করেছিল। ইরানের রাজধানী তেহরানের উপকণ্ঠে রেজেস (Rheges) বা রাই(Ruy) নামক স্থানে ছিল জরথুশত্রের জন্মস্থান।
 
তাঁর আবির্ভাব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো পণ্ডিতবর্গ মনে করেন তাঁর জীবনকাল ৬২৮-৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। আবার, কারো কারো মত তিনি ১৭০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

এই হিসেবে দাবি করা হয়, তাঁর প্রচারিত ধর্মমত বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ধর্মমত। সনাতন হিন্দুধর্মের পরেই এর স্হান।

জরথুশত্র শব্দের অর্থ হলো 'বুড়ো উটওয়ালা'। তাই, এটা তার নাম না কি উপাধি সেটাও জানা যায় নি।

জরথুশত্রের আবির্ভাবের কাল পর্যন্তও একেশ্বরবাদের বিকাশ ঘটেনি। তখনও পারস্য ধর্মীয় বিষয়াদি বলতে নানা দেবদেবীর পূজা বোঝাতো। কিন্তু জরথুশত্রের এই প্রচলিত ধর্মকর্মে মন বসত না। তিনি এসবের ভেতরে গভীর কিছু খোঁজতেন। তাঁর ৩০ বছর বয়সে এক বসন্ত উৎসবের দিনে পাশের নদীর ধারের ঝরনা থেকে জল আনতে গিয়েছিলেন। সেখানে ঝরনার পবিত্র স্রোতধারার দিকে তাকিয়ে তাঁর হৃদয়ে নেমে এল এক বিষ্ময়কর অনুভূতি। হৃদয়ের গহীনে কিছু প্রশ্ন দেখা দিল। এই নির্মল জলধারার সৃষ্টি কে করেছেন? কে সৃষ্টি করেছেন এই অসম্ভব সুন্দর পৃথিবীটাকে? তিনি কে?
জনস্রোত আছে তারপর থেকেই তিনি ঈশ্বরের ধ্যানে একনাগাড়ে বিশ বছর কাটিয়েছিলেন দুর্গম পাহাড়ের কোনো নির্জনতায়। সাধনায় নিদ্ধিলাভ করে মনুষ্যসমাজে ফিরে আসেন। সকলের মাঝে প্রচার করেন এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের সত্যবাণী।
তাঁর মতে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর হলেন 'আহুরা মাজদা' (Ahura Mazda) বা 'ওহরমাজদ'(Ohrmazd)।

তিনি আলোময় ও মঙ্গলময়। শুধুই ভালো। ভালো মানেই আলো। সূর্য হলো আলোর প্রতীক। তাই, পারশি ধর্মের মন্দিরকে বলা হয় অগ্নিমন্দির।সে কারণে তাদের সব মন্দিরে সর্বক্ষণ আলো বা আগুন জ্বালিয়ে রাখার নিয়ম।

 এদের ধর্মগ্রন্থের নাম অবেস্তা (বা আবেস্তা) বা জেন্দাবেস্তা। পারসিক ধর্মের অনুসারীরা অগ্নি-উপাসক। আগুনের পবিত্রতাকে ঈশ্বরের পবিত্রতার সাথে তুলনীয় মনে করেন পারসিক জরথুস্ত্রীয়রা।এই ধর্ম গ্রন্থের সঙ্গে বেদের অনেক মিল আছে জেন্দাবেস্তা ও বেদ।
এই আহুরা মাজদাকে যারা বিশ্বাস করে না তারা পাপী। তারা অন্ধকারের বাসিন্দা। পাপ ও মন্দের প্রতীক হলো অন্ধকার। তার নাম 'আহরিমান'(Ahriman)। তিনি মোট ৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন।

জরথুশত্র তাঁর ধর্মমত বা বাণী পাঁচটি গাথাতে প্রকাশ করেন। তখন এগুলো কোনো গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করার সুযোগ ছিল না। এগুলো মানুষের মুখে মুখে প্রচার হতো। তিনি বিশ্বাস করতেন, এসব বাণী তিনি লাভ করেছেন ঈশ্বর বা আহুরা মাজদার কাছ থেকে। ঈশ্বরের বাণী প্রচার করলেও তাঁর প্রচারিত ধর্মমতে সহজে কোনো ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষিত করেন নি। তিনি প্রথম কয়েক বছরের মধ্যে মাত্র তাঁর এক মামাত বোনকে দীক্ষিত করেছিলেন।
ধর্মমত প্রচার শুরু করার কয়েক বছর পর রাজা ভিশতাসপা'র(Vishtaspa) রাজ্যে এলে রাজা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। সেখানে আজীবন তিনি নির্বিঘ্নে ধর্মমত প্রচার করেন। মৃত্যু ও পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে তিনি সুন্দর কথা বলেছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, যখন কোনো মানুষের আত্মা তার নশ্বর দেহ ত্যাগ করে পরলোকে যাত্রা করে তখন সেই আত্মা পাপপুণ্যের বিচারক 'মিথ্রা'(Mithra) এর সমীপে উপস্হিত হয়। সেখানে পাপ ও পুণ্যের সঞ্চয় নিক্তিতে ওজন করা হয়। যদি তার পুণ্যসঞ্চয়ের মাত্রা বেশি হয় তখন তার আত্মা স্বর্গে প্রবেশ করে। আর বিপরীত হলে নরকে। সেই নরকের শাসনকর্তা হলেন 'আগ্রা মাইনিউ'(Agra Mainyu)। সেই স্হানটি ভয়ংকর ও দু:খময়। পাপীরা তাদের পাপমোচন না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করে।

আত্মা সম্পর্কিত এই বিষয়টুকুতে জরথুশত্রের চিন্তার সাথে সনাতন ধর্মের অনেকটাই মিল রয়েছে। সনাতন ধর্মমতে আত্মার মৃত্যু নেই। আত্মা অবিনশ্বর।

পারশি ধর্ম অতি প্রাচীন হলেও বর্তমানে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা খুব সীমিত। বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে কালক্রমে উক্ত ধর্মের লোক পারস্য বা ইরান থেকে বিতাড়িত হয়ে এসে আশ্রয় নেয় ধর্মীয় স্বাধীনতার দেশ ভারতবর্ষে। বর্তমানে প্রায় এক থেকে দেড় লাখের মতো মানুষ ভারতের রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, মহিশূর প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাস করছেন। তাছাড়া ইউরোপ, আমেরিকায়ও কিছু সংখ্যক পারশি ধর্মের লোক রয়েছেন।

একসময় সংখ্যাগুরু হয়ে ওঠা ধর্মটা সময়ের পরিক্রমায় আজ প্রায় সংখ্যালঘুর কাতারে।

জরথুশত্র বলেছেন, আদিতে দু'টি শক্তির বিকাশ ঘটেছিল। একটি ভালো অপরটি মন্দ। যারা ভালো এবং বুদ্ধিমান তারা ভালোটা বেছে নেয়। আর বোকারা নেয় মন্দটা।
জরথুশত্র মতবাদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল- তিনি মন্দকে পরিত্যাগ করতে বলেন নি। তিনি বলেছেন, 'ঘৃণা করো পাপকে, পাপীকে নয়।'
আহুরা মাজদার সঙ্গে মিলিত হয়ে পাপ ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। পাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় হবেই। সত্যের কাছে অসত্যের পরাজয় অবধারিত।

পাদটীকা : করোনার এই দুর্যোগকালীন সময়ে যারা ত্রাণ নিয়ে নয়ছয় করছে, তারা এই সমাজেরই মানুষ। তাদের শোধরানোর সুযোগ দিতে হবে। পরকালে যাত্রার সময় একটি কানাকড়িও সঙ্গে নেয়া যাবে না, শুধু এই বোধটুকু তাদের ভেতর জাগ্রত হোক- এই প্রার্থনা।

লেখক: প্রভাষক, গণিত, মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ, সিলেট।
তথ্যসূত্র: শত মনীষীর কথা-ভবেশ রায়, উইকিপিডিয়া।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন