আজ শনিবার, ৩০ মে ২০২০ ইং

সুন্দরবন আমাদের বাঁচায় নাকি আমরা বাঁচিয়ে রাখি?

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৫-২৩ ২২:২৯:৫২





|| মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন ||


বাংলাদেশে সাইক্লোন এলেই সুন্দরবন আলোচনায় আসে। বিশেষত ‘সুন্দরবন এবারও বাঁচিয়ে দিলো আমাদের’ ধরনের আলোচনায় সরগরম হয়ে ওঠে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। প্রশ্ন হলো, সুন্দরবন আগে না বাঙালি আগে? অর্থাৎ গাঙেয় উপত্যকার এই বঙ্গভূমিতে সুন্দরবন আগে তৈরি হয়েছে নাকি মানুষ আগে বসবাস শুরু করেছে? সম্ভবত সুন্দরবন আগে তৈরি হয়েছে। সম্ভবত বললাম এই কারনে যে, উপকূলবর্তী জেলাগুলো বাদ দিলে উত্তরের জেলাগুলোর জনপদকে সাইক্লোন থেকে বাঁচাতে সুন্দরবনের উপস্থিতি জরুরি নয়। আর উত্তরদিক থেকে মানুষের বসতি শুরু হবার সাথে সাথেই তাদের পক্ষে সুন্দরবনের হদিস পাওয়া সম্ভব ছিলো না। তাই মানুষ আসার আগে থেকেই সুন্দরবন ছিলো নাকি পরে জন্ম নিয়েছে সেকথার ঐতিহাসিক কোনো দলিল নেই আমাদের কাছে। হতে পারে আগে-পরে, হতে পারে সমসাময়িক। তবে সুন্দরবন আগে থেকেই তৈরি হয়ে না থাকলে এর আশেপাশের অঞ্চলে মানুষের নির্বিঘ্ন বসবাস সম্ভব হতো না। অপরদিকে বাঘ-ভাল্লুক প্রভৃতি হিংস্র প্রাণী অধ্যূষিত সুন্দরবনের কাছে গিয়ে মানুষ সাধ করে বসতি স্থাপন করেনি, করেছে বাধ্য হয়ে। আবার সুন্দরবনের স্থানে একদা মনুষ্য বসতি ছিলো, ছিলো নগরও, এমন একটি তত্ত্ব রয়েছে। পরবর্তীতে সমগ্র অঞ্চলটি হঠাৎ মাটিতে ডেবে যায় এবং তদস্থলে বনভূমির উৎপত্তি হয়।

ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় সমুদ্র থেকে এসে স্থলভাগের স্পর্শ পাওয়ামাত্রই দুর্বল হতে থাকে। স্থলভাগে ঘূর্ণিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় বলেই। ঘন জঙ্গল এইক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক কিনা আমি নিশ্চিত নই। তবে অনুমান করি, জঙ্গলের মধ্যে বাতাসের ঘূর্ণি অধিকতর বাধার মুখে পড়ে এবং দুর্বল হয়। সুন্দরবনের মতো বিস্তৃত বনাঞ্চল না থাকলে এই দুর্বল হওয়াটা অপেক্ষাকৃত বিলম্বিত হবে ঠিক। তবে সেটি মেঘালয় কিংবা হিমালয়ের পর্বতমালা পর্যন্ত একই শক্তি নিয়ে এগিয়েও যাবে না। পথিমধ্যেই ‘ক্ষতিকর নয়’ রকম দুর্বল হয়ে পড়বে।

তাহলে সুন্দরবন আমাদের বাঁচিয়ে দিলো, কথাটা কাদের জন্য প্রযোজ্য? দেশের প্রায় মধ্যভাগ থেকে দক্ষিণের সমুদ্রের তটরেখা পর্যন্ত যে ভূখন্ড রয়েছে, সেখানকার জন্য নয় কি? তাও আবার সুন্দরবন বরাবর যে ভূখন্ড রয়েছে সেটুকু। বাকি অংশকে বাঁচায় কে? তদুপরি ঘূর্ণিঝড় যতো ভয়ংকরই হোক না কেন, মধ্যাঞ্চল পার হলে তার উপর সুন্দরবনের প্রভাব থাকুক না-থাকুক, দুর্বল হয়ে পড়বেই। সুন্দরবন না থাকলেও সেটি দুর্বল হবেই। তাহলে সুন্দরবন বাঁচিয়ে দেয় কাকে? উপকূলবর্তী তথা সুন্দরবনের কাছাকাছি উত্তরে অবস্থিত জনপদকে বাঁচিয়ে দেয়। সুন্দরবন বুক চিতিয়ে ঘূর্ণিঝড়কে মোকাবেলা করে-- একথা সত্য। কিন্তু অতি আবেগে ভেসে যাবার আগে আমাদের সত্যটিও খুঁজে দেখা দরকার।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রকাশ, বাংলা ভূখন্ড একটি সক্রিয় ব-দ্বীপ। অর্থাৎ এটি এখনো গঠন-প্রক্রিয়াতে আছে। হিমালয় থেকে বিভিন্ন নদ-নদী দ্বারা প্রবাহিত পলি জমে ক্রমেই প্রসারিত-গঠিত হচ্ছে এই ভূমি। সমুদ্রের দিকে ক্রমশ এর সীমানা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় এই ভূখন্ড ছিলোই না। হিমালয়ের পাদদেশ ধরে দক্ষিণের অংশে এক চিলতে তটরেখাই ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে আজকের ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য একে বরাবর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ করে রেখেছে। পৃথিবীর ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের বেশিরভাগই এই উপসাগরে জন্ম নেয়। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব সহ্য করা বঙ্গভূমির এক প্রকার নিয়তিই। বারবার এই ঝড় ও জোয়ারের মুখে টিকে থাকতে গাছেদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দরকার হয়, যা শ্বাসমূলের মাধ্যমে সুন্দরী গাছ অর্জন করেছে। আর তাই সুন্দরবনের মতো বিশাল বিস্তৃত বনভূমির অস্তিত্ব টিকে থাকতে পেরেছে।

সুন্দরবন এখানে কাউকে রক্ষা করতে বা বাঁচিয়ে দিতে অবস্থান করছে না। বরং সমুদ্র তীরবর্তী বিপুল প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে নিজেই টিকে থাকার প্রাণপণ লড়াই চালায় এবং উপজাত হিসেবে ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটা সামলে পার্শ্ববর্তী স্থাপনাসমূহকে খানিকটা নিরাপদ রাখে। সুন্দরবন আমাদের ঘূর্ণিঝড় থেকে বাঁচানোর জন্য দাড়িয়ে নেই। তার চেয়ে অর্থকরী উপাদানের অফুরন্ত ভান্ড হয়ে সুন্দরবন আমাদের কাছে লোভনীয় আধার। কাঠ, পাতা, প্রাণী, মধু ইত্যাদির অর্থকরী মূল্য আমাদের জন্য বাড়তি পাওয়া। সুন্দরবন থেকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হই। সুতরাং সুন্দরবনের গুরত্ব প্রথমত অর্থকরী উপাদানের জন্য, দ্বিতীয়ত ঘূর্ণিঝড় ঠেকানোর জন্য। উপজাত হিসেবে সুন্দরবন আমাদেরকে অংশত ঘূর্ণিঝড়ের ধকল থেকে বাঁচায়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে আবেগী সংলাপ ছড়িয়ে বাস্তবতা আড়াল করা উচিৎ নয়। সত্যটা জেনে-বুঝে-মেনে অতপর সংলাপ ছড়ানো উচিৎ।

লক্ষ্য বছর পূর্বে এই ভূখন্ডে মানুষ বাস করতে এসে প্রথমেই সমুদ্র তীরে চলে যায়নি। প্রথমে উত্তর অংশে বসবাস শুরু করেছে, অতপর দক্ষিণ প্রান্তে সুন্দরবনের উপস্থিতিকে আত্তীকরণ করে নিয়ে বসতি সম্প্রসারণ করেছে। এই আত্তীকরন পর্যন্ত পৌছুতে মানুষের লেগেছে হাজার হাজার বছর। সুন্দরবন আছে কি নেই, সেই তথ্যও তাদের কাছে ছিলো না। অত দূর থেকে সুন্দরবন সরাসরি কোনো প্রভাব রাখতে পারে না জনপদের উপর। সুন্দরবন মানে ঘন জঙ্গলের সুপরিসর সীমানা। এমন জঙ্গল বাংলা মুল্লুকের সর্বত্রই গুচ্ছ গুচ্ছ উপস্থিত ছিলো, এখনো কম-বেশি আছে। সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ হলো, জঙ্গলের চেয়ে সবুজ বৃক্ষ-লতা-গুল্মের উপস্থিতি জরুরী। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় একটি ভূখন্ডের পঁচিশ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। শুধু জঙ্গল দিয়ে ভূমি ঢেকে রাখলেই সেটি হয়ে যায় না। যত্রতত্র গাছপালা ছড়িয়ে থাকলেও সেটি হয়ে যেতে পারে। আমরা গাছকে বাঁচিয়ে রাখি, সবুজকে টিকিয়ে রাখি পর্যাপ্ত পরিমানে।

আমরা সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখি রয়েলবেঙ্গল টাইগারের জন্য, অফুরন্ত কাষ্ঠ ভান্ডারের জন্য, খাটি মধুর জন্য, পশু-পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে, জীববৈচিত্র টিকিয়ে রাখতে। পতিত জমির অন্য কোনো লাভজনক ব্যবহার সম্ভব নয় বলে সুন্দরবন হিসেবেই ভূমিটুকু দেশের কল্যাণে লাগুক-- এই কারনেও বাঁচিয়ে রাখবো সুন্দরবনকে। তদুপরি সবুজ ও অক্সিজেনের প্রাকৃতিক সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিরোধ করতে, বনায়নের অনুপাত বৃদ্ধি করার আন্তর্জাতিক তাগিদ থেকেও সুন্দরবনকে আমরা বাঁচিয়ে রাখবো। সর্বপ্রানবাদীর ন্যায় সুন্দরবনকে অলৌকিক দেবতার আসনে বসিয়ে পৌত্তলিকের আবেগ ছড়ালে চেতনার অন্ধকার দূর হবে না। সুন্দরবন আমাদের বাঁচায় না, আমরাই বাঁচিয়ে রাখি সুন্দরবনকে নিজেদের কল্যাণার্থে।

লেখক: কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন