আজ শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ ইং

আইনের পাঠ্যবই নির্বাচন ও সংগ্রহ কৌশল

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৫-২৯ ০২:৪৪:১২

গাজী সাইফুল হাসান :: খুব সহজে আইন, আইন সম্পর্কিত সাধারণ আলোচনা, আইনের ব্যাখ্যা, আইনের প্রয়োগ ইত্যাদি শিখতে ও জানতে সব থেকে বেশি সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে যে মাধ্যমে তা হলো বই। নিজের সংগ্রহে থাকা আইনের একটি ভালো বইয়ের মাধ্যমে যে কোনো সময়ে তার সহায়তা গ্রহণ করা যায়। মনে উঁকি দেয়া প্রশ্নের সমাধান একটি বইয়ে না পেলে সাহায্য করতে পারে আরেকটি বই। এক সময় বইয়ের অবর্তমানে লেকচার পদ্ধতি জ্ঞানার্জনের জন্য খুব জনপ্রিয় মাধ্যম ছিলো। ধীরে ধীরে বইয়ের প্রতুলতার সাথে লেকচার পদ্ধতির উদ্দেশ্য ও ধরণেরও পরিবর্তন এসেছে। তাই বই পাঠ বা বই কেনাকে অনীহা করে আইন সম্পর্কিত বিষয়ে জ্ঞানার্জন দুরুহ ব্যাপার বটে। তবে একজন আইন শিক্ষার্থীর বই সংগ্রহের ধরণ ও পরবর্তীতে আইন সংশ্লিষ্ট নানা ধরণের পেশাগত জীবনে বই সংগ্রহের ধরণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই প্রবন্ধে শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আইন জানতে ও বুঝতে কোন্ কোন্ ধরণের বইয়ের সাহচর্য প্রয়োজন এই বিষয়ে ধারণা পেতে আইনের উৎস সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। বাংলাদেশে প্রণীত আইন, আদালতের নজীর, প্রথা এবং ধর্ম ও পেশাগত মতামতকে আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একাধিক উৎসের মধ্যে প্রয়োগ বিবেচনায় সর্বাধিক গুরুত্ব লাভ করে সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন। আনুষ্ঠানিক আইনের অভাবে বা বিদ্যমান আইন ব্যাখার প্রয়োজনে ক্রমান্বয়ে আদালতের নজীর, প্রথা এবং কতিপয় ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা সমাধানে বা কর্তব্য পালনে স্ব স্ব ধর্মীয় বিধান এবং সবশেষে আইন সংশ্লিষ্ট পেশাগত মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

আইন আলোচনা, ব্যাক্যা ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি পেশাগত মতামত প্রকাশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি মাধ্যম হলো বই। তাই শুধু আইন জানতে ও বুঝতে নয় বরং আইন তৈরিতে একটি উল্লেখযোগ্য সহায়ক মাধ্যম হতে পারে একটি মানসম্পন্ন বই। আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেশিয় আইন প্রয়োগে ব্যবহৃত আইনবিজ্ঞানের অনুরূপ আইনবিজ্ঞানের অনুপস্থিতি প্রায়শই আইন গবেষকদের প্রকাশিত বই বা অন্যান্য প্রকাশনাকে আন্তর্জাতিক নানা আদালতে আইনের উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। তথাপি দেশিয় আইনের উৎস হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের অনেক রায়ে কোনো নীতি প্রতিষ্ঠায়ও দেশি ও বিদেশি আইন গবেষকদের বইকে সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

একজন আইনের শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনেই একটি ভালো বইয়ের সন্ধান ও তা সংগ্রহ করা, বই পড়ার পদ্ধতি ও অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানোর কলা-কৌশল আয়ত্ত করা খুবই জরুরি। শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক বই নির্বাচন ছাড়াও সংশ্লিষ্ট নানা বইয়ের সাহচর্য দরকার হয় কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে। একটি কোর্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাধারণত মূল একটি বইসহ একাধিক বই সংগ্রহের ব্যাপারে নির্দেশনা দেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত জ্ঞান আহোরণের জন্য আরো একাধিক বইয়ের তালিকাও তিনি দিয়ে থাকেন।

কী কী ধরণের আইনের বইয়ের সংস্পর্শে আমাদের আসতে হয় তার উপর নির্ভর করে আইনের বই সংগ্রহের বিষয়টি। আইনের শিক্ষার্থীদের সর্বাপেক্ষা শুরুতেই মূল আইনের উল্লেখ রয়েছে এমন ধরণের বইয়ের পাঠ ও সংগ্রহ জরুরি। এরপর অধিকতর আইনকে বুঝতে আইনের সাধারণ আলোচনা বা ব্যাখা সম্বলিত বইয়ের দরকার পড়ে। গুরুত্বের ধারাবহিকতায় সংগ্রহ করতে হয় আইনের নজীরসমূহের সংকলন বই। আদালতের নজীর সংশ্লিষ্ট বইয়ের আলোচনা এই প্রবন্ধে আওতাভুক্ত করা হয়নি। প্রবন্ধটিতে শুধু মূল আইনের বই ও আইনের আলোচনা ও ব্যাখা সম্বলিত বই সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি আইনের প্রাথমিক উৎস হিসেবে আইনের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যেহেতু জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাশকৃত মূল আইন, রাষ্ট্রপতির জারিকৃত অধ্যাদেশ, আদেশ অথবা সরকার ও ক্ষেত্রবিশেষ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক জারিকৃত বিধি, প্রবিধি ইত্যাদি উপর নির্ভর করতে হয় তাই এক্ষেত্রে কোন্ ধরণের বই সংগ্রহ অনিবার্য তার ধারণা থাকা দরকার।

শুধু মূল আইনের (সকল ধরণের যেমন: অ্যাক্ট, অর্ডিন্যান্স. অর্ডার, রুলস্, রেগুলেসনস্ ইত্যাদি) প্রয়োজনে সরকারি গেজেট প্রকাশনা সংগ্রহ করা উত্তম। আইন তৈরি হওয়ার পর তা সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। নিকটস্থ বইয়ের দোকানগুলো থেকে আইন সম্বলিত গেজেট প্রকাশনা সংগ্রহ করা যেতে পারে। অনেক সময় আইনের সাধারণ আলোচনা ও ব্যাখ্যা সম্বলিত বইয়ে মূল আইনের উদাহরণ টেনে আলোচনা করা হয় অথবা বইয়ের শেষভাগে মূল আইনের উল্লেখ থাকে। এক্ষেত্রে একটি বইয়ের মাধ্যমে একাধিক চাহিদা পূরণ হতে পারে। যেকোনো সময়ে নানা আইনের সংশোধন হতে পারে। আইনের সংশোধিত অংশটুকু সতন্ত্রভাবে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় যা সংগ্রহ করা যেতে পারে। আবার মূল আইনের সাথে সংশোধিত অংশটুকু মিলিয়ে পুনরায় সম্পূর্ণ আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। শুধু অধিকাংশ মূল আইন পড়ার চাহিদা আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও পূরণ হতে পারে।

নিজের প্রয়োজনীয়তা ও আইনটির সংশোধনের মাত্রার উপর উপর ভিত্তি করে আইনটির আলোচনা ও ব্যাখা সম্বলিত নতুন আরেকটি বই ক্রয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিদ্যমান একটি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে নতুন আইন প্রণীত হলে নতুন বই সংগ্রহ করার প্রয়োজন পড়ে। তখন পূর্বে সংগৃহীত বইটিও মূল্যহীন হয়ে পড়ে না বরং বর্তমান আইনে পরিবর্তনসমূহ এবং পূর্বের আইনের সাথে তুলনামূলক আলোচনা করতে সহায়তা করে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, শুধু অধিকাংশ মূল আইন পড়ার চাহিদা আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও পূরণ হতে পারে।

যাহোক, আইনের সাধারণ আলোচনা ও ব্যাখা সম্বলিত বইগুলো কেনার ক্ষেত্রে কোন্ বইগুলো কিনতে হবে এবিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। এ সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোর্স শিক্ষকের সর্বাধিক সহায়তা গ্রহণ করা সমীচীন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম অনেকটা সহযোগিতা করতে পারে। আইন অধ্যয়নকালীন পাঠ্যবই সংক্রান্ত যথেষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় নির্ধারিত প্রোগ্রামের কারিকুলাম থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে কারিকুলামে বইয়ের সূচির পার্থক্য দেখা যায়। তবে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে যথাসাধ্য প্রয়োজনীয় গ্রন্থসূচি দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। কারিকুলামে প্রয়োজনীয় বইয়ের সূচিতেও দুই ধরণের বইয়ের নামোল্লেখ থাকে। একটি হলো প্রধান পাঠ্যবই এবং অন্যগুলো অধিকতর জ্ঞানার্জনের জন্য। সাধারণত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে শ্রেণিশিক্ষক কারিকুলামে নির্দেশিত প্রধান পাঠ্যবইয়ের অনুসরণ করে থাকেন এবং শিক্ষার্থীদের তা অনুসরণে উৎসাহিত করে থাকেন। তবে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর পরিবর্তন, সংযোজন, পরিবর্ধন ইত্যাদি করা হয়ে থাকে। তাই মধ্যবর্তী সময়ে ভালো কোনো বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেলে সে সংক্রান্ত তথ্য শিক্ষকের কাছে খুব সহজেই পাওয়া যায়।

একটি কোর্সের জন্য কতগুলো বই কিনতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনে আগ্রহ ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির উপর। শ্রেণিকক্ষে অনুসরণীয় বই ছাড়াও প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জনের জন্য একাধিক বইয়ের সান্নিধ্য প্রয়োজন হতে পারে।

শ্রেণি শিক্ষক ছাড়াও সিনিয়র শ্রেণির কারো কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, স্থানীয় বইয়ের দোকানগুলো থেকেও বিষয় সংশ্লিষ্ট নানা বইয়ের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। প্রতিনিয়ত আইনের গবেষক ও লেখকগণের প্রচেষ্টায় নতুন প্রকাশিত বই সম্পর্কে বিভাগের নোটিশ বোর্ড, লাইব্রেরি অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভাগের নিজস্ব পেজ-এ এতদসংক্রান্ত তথ্য প্রাপ্তির নজীর দেখা যায়।

প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশি বইয়ের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় অনলাইনে অনেকসময় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে প্রবেশ সম্ভব না হলে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে। বর্তমানে প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সদস্যভুক্তির চেষ্টা করে যাতে করে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনলাইনে বইসহ পড়াশুনার নানা উপাদানের সাথে পরিচিত ও সংগ্রহ করতে পারে।

বই পাঠের অভ্যাস আইন শিক্ষার্থীদের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়। আইন পেশার সাথে বই পড়ার অভ্যাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যা শুধু অন্যান্য দুই বা তিনটি পেশার মধ্যে দেখা যায়। শিক্ষা জীবনে বই সংগ্রহ ও পাঠের অত্যধিক আগ্রহ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত উজ্জ্বল পেশাগত জীবনের ইঙ্গিত বহন করে।

শিক্ষার্থীরা কোনো নির্দেশনা ব্যতিরেকে বা নির্দেশনার বাইরে ব্যক্তিগত পছন্দে যদি বই কিনতে আগ্রহী হয় তাহলে কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখলে একটি ভালো বই সংগ্রহের সুযোগ থাকে। বই পছন্দ করার ক্ষেত্রে আগে নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সের সাথে সংশ্লিষ্ট হয় তবে একটি বইয়ের সূচিপত্রের সাথে কোর্সের সূচির সাথে মিলিয়ে নেয়া যেতে পারে। অনেক সময় একটি বইয়ে কোর্সসূচির সব বিষয় পাওয়া না গেলে একাধিক বই সংগ্রহ করা উচিত। কোর্সসূচির যেখানে প্রধান্য নেই বিষয়বস্তু সম্পর্কে অধিকতর জানার আগ্রহ যেখানে মূল সেখানে বইয়ের সূচিপত্র সহযোগিতা করতে পারে। সূচিপত্রের বিষয়সমূহ যদি নিজের জানতে আগ্রহ রয়েছে এমন বিষয়সমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে তবে তা কেনার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। বইয়ের শিরোনাম দেখে সব সময় বই কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সমীচীন নয়। বিস্তর জানার আগ্রহ থাকলে সর্ববিষয়ে সংক্ষিপ্ত করে লেখা বই নিশ্চয়ই চাহিদা পূরণ করবে না। টেক্সট বই আর গবেষণাধর্মী বইয়ের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। টেক্সট বইয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা থাকে। কিন্তু গবেষণাধর্মী বইয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বিস্তর তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করে লেখা হয়ে থাকে। তবে সকল ধরণের টেক্সট বই সমান চাহিদা পূরণ করে না। লেখার মানে একটি বই অন্যটি থেকে ভিন্নতর মর্যাদা লাভ করে। একটি ভালো বইয়ের সন্ধান আরেকটি ভালো বই সন্ধানে সাহায্য করে। ভালো বইয়ের বৈশিষ্ট্যসমূহ তখন নিজেই উপলব্ধি করা যায়।

বই রচনায় লেখকের অন্যান্য সহায়ক গ্রন্থের তালিকা এবং তথ্য সন্নিবেশন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উপযুক্ত নজীরের উদাহরণের উপস্থিতি একটি ভালো বইয়ের নির্দেশক। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উদাহরণ দিয়ে আইনের আলোচনা ও ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ বই শিক্ষার্থীদের বেশ কাজে লাগে। তবে বইয়ে শুধু নজীরের উল্লেখ কিংবা তথ্য-উপাত্তের সন্নিবেশনই শেষ কথা নয়। বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের বা যেকোনো পেশাগত শ্রেণির কাছে তুলে ধরতে কাঠামোবদ্ধ পর্যায়ক্রমিক উপস্থাপনা সকলেরই জ্ঞান আহোরণে সহায়তা করতে পারে। আইনের আলোচনা ও ব্যাখার ক্ষেত্রে আইন বিজ্ঞানের সংযোগ এবং ভবিষ্যত পেশাগত জীবনে আইনসমূহের প্রায়োগ কৌশল ও ইতোমধ্যে বিদ্যমান সমস্যাসমূহের উদাহরণ দিয়ে সমাধান কৌশল সংযুক্ত থাকলে শিক্ষার্থীসহ সকলেরই এরূপ বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ বই সংগ্রহে আগ্রহ তৈরি হয়। মানসম্মত বইয়ের লেখকের অন্যান্য বা পরবর্তী বইসমূহ সংগ্রহরে বিষয়ে ঝোঁক তৈরি হয়। এটি নিশ্চয়ই উত্তম পন্থা। অনেক সময় প্রকাশনা সংস্থার ব্যাপারে আস্থা তৈরি হলে নির্দিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার বইয়ের প্রতি আস্থা স্থাপন করা যায়। তবে প্রকাশনা সংস্থার প্রবণতাকে যথেষ্ট নজরে রাখতে হয়। মানসম্মত বইয়ে প্রকাশে অনীহা বা প্রমাণ পাওয়ার সাথেই পাঠকেরও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়। বই সংগ্রহে মূল্য কম বা বেশি কিংবা বইয়ের মান নির্ণয়ে অসংশ্লিষ্টদের মন্তব্য ইত্যাদি বিবেচনা করলে তা সঠিক বই সংগ্রহে দ্বিধায় ফেলতে পারে।

আইনের শিক্ষার্থীরা বাংলা না ইংরেজি কিংবা দেশি না বিদেশি লেখকের বই সংগ্রহ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর মূলত প্রয়োজনীয়তার উপর নির্ভরশীল। বিশেষ ভাষা বা বিশেষ অঞ্চলের লেখক-গবেষক মানেই সর্ব পর্যায়ে উন্নত এরূপ ভাবা ঠিক নয়। একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানের আকাক্সক্ষা পূরণে মানসম্মত যেকোনো বই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দেশভেদে বইয়ে প্রয়োজনীয় আইনের উল্লেখ ও প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স সংশ্লিষ্ট দেশেরই হওয়া স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে তার প্রয়োজনীয়তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বই পছন্দ করতে হয়। একই ধরণের আইন ব্যবস্থার প্রচলন আছে এমন দেশগুলোতে আইনের সাধারণ নীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়কে একইভাবে গ্রহণ করা হয়। ফলে সাধারণ আইনের নীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের বই সংগ্রহে বেশ স্বাধীনতা পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে আন্তর্জাতিক আইন যেখানে বিষয়বস্তু সেখানেও বিদেশি লেখকের বই সমান কার্যকরী। এই উপমহাদেশে প্রণীত আইনের ইতিহাস, আদালতের নজীরের ইতিহাস ইত্যাদি বিবেচনায় পার্শ্ববর্তী দেশে প্রকাশিত বইসমূহ প্রায়শই আইনের শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণ করে থাকে। এদেশে এখনও অনেক আইন রয়েছে যা ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরী। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরও এমনকি ১৯৭১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্নপ্রকাশের পরও ঐ সকল আইনের কার্যকরিতা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিমার্জন সাপেক্ষে বর্তমানেও বহাল আছে। শুধু বাংলাদেশে নয় পার্শ্ববর্তী দেশসমূহেও অনুরূপ পরিবর্তন সাপেক্ষে আইনসমূহ বহাল রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের লেখক-গবেষকের বই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পিপাসা নিবারণ করতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, যেহেতু বইয়ের সান্নিধ্য ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর আইন শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না তেমনি বইয়ের গুণগত মানের উপর নির্ভর করে নির্ণীত হয় শিক্ষার্থীর আইন সংশ্লিষ্ট জ্ঞান অর্জনের গভীরতা। একজন শিক্ষার্থীর আইন সংশ্লিষ্ট বই পাঠের আধিক্যের দিকে যেমন দৃষ্টি দিতে হয় তেমনিভাবে প্রতিটি পঠিত বই যেন প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহোরণে সহযোগী হয় সেদিকেও একইসঙ্গে লক্ষ্য রাখা দরকার।

লেখক:
বিভাগীয় প্রধান, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন