আজ শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০ ইং

বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শিক্ষায় অপরিহার্য তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান চর্চার ভারসাম্য

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৬-০৭ ০১:০৫:৫০

গাজী সাইফুল হাসান :: উচ্চশিক্ষা গ্রহণ পর্যায়ে সকল বিষয়ে পাঠদান প্রক্রিয়া সমান নয়। বিষয়ের সাথে বিষয়ের পার্থক্য, অর্জিত বিদ্যাকে কর্মজীবনে প্রয়োগের সুযোগ, ধরণ ও প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় শিক্ষাদান পদ্ধতি। বিশেষত পেশাগত ডিগ্রি এবং একাডেমিক ডিগ্রি অর্জনের জন্য পাঠদান ও পাঠগ্রহণ প্রক্রিয়া একটি অন্যটি থেকে ভিন্নতর হয়। আইন বিষয়ে প্রদত্ত ডিগ্রি একটি পেশাগত ডিগ্রি। পেশাগত ডিগ্রি বলতে বোঝায়, যেখানে বিশেষ কোনো পেশা বা পেশাসমূহকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। আইন, প্রকৌশল, মেডিকেল, অ্যাকাউন্টিং ইত্যাদি বিষয়ে প্রদত্ত ডিগ্রিকে পেশাগত ডিগ্রি বলা হয়। কতিপয় পেশা যেমন: আইনজীবী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, প্রকৌশলী, শিক্ষকতা (উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে) ইত্যাদি হতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থী যেন ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট পেশায় নিযুক্ত ও সফলভাবে পেশা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে সে উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষাজীবনেই লাভ করে থাকে। পেশাগত ডিগ্রি প্রোগ্রামে তত্ত্বীয় বিষয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যত পেশায় বিদ্যমান কর্মকাণ্ডকে লক্ষ্য রেখে ব্যবহারিক শিক্ষারও হাতেখড়ি দেয়া হয়।

পেশাগত ডিগ্রি প্রদান কার্যক্রমে সফলতা মূলত তত্ত্বীয় শিক্ষা ও ব্যবহারিক শিক্ষার ধরণ ও ব্যাপ্তির উপর নির্ভর করে। বিভিন্ন ধরণের পেশার মধ্যে আইনে ডিগ্রি অর্জনকালীন তত্ত্বীয় শিক্ষা ও ব্যবহারিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নানা প্রসঙ্গে এই প্রবন্ধে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, চিকিৎসা বিষয়ক ডিগ্রি অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীরা মেডিকেল কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানে তত্ত্বীয় জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারিক শিক্ষা লাভ করে থাকে। প্রথমবর্ষ থেকে শুরু করে মেডিকেল শিক্ষার শেষ অর্থাৎ ইন্টার্নশিপ পর্যন্ত নানা মাত্রায় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় জড়িত হওয়ার মাধ্যমে পরবর্তী পেশাগত জীবনের জন্য শিক্ষার্থীরা নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারে। অন্যদিকে প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষার্থীরা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত প্রয়োজনীয় ল্যাবের মাধ্যমে ব্যবহারিক শিক্ষা লাভ করে থাকে।

এবার আসি আইন প্রসঙ্গে। আইনের ক্ষেত্রেও যেহেতু পেশাগত ডিগ্রি অর্জিত হয়। তাই আইনের একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনেই ভবিষ্যতে আইন পেশায় প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব অপরিহার্য।

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং আদালত বা আইন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষার মধ্যে ব্যবধান অনেক’ এই কথাটি প্রায়শই শিক্ষাজীবন শেষে পেশাগত জীবনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মন্তব্য হিসেবে শোনা যায়। প্রয়োজনীয় ডিগ্রি অর্জনের পরও পেশাগত জীবনে অতিদ্রুত খাপ খাওয়াতে না পারার উদাহরণও বিরল নয়। এরূপ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তত্ত্বীয় শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদান করছে না? নাকি ব্যবহারিক শিক্ষাদানের কলাকৌশল সময়োপযোগী হচ্ছে না? অথবা যথাযথভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব বুঝতে পারছে না? নাকি ব্যবহারিক শিক্ষার যথাসম্ভব কলাকৌশল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের শেখানো বিষয়সমূহ তাদের অবহেলাজনিত কারণে বা পেশাগত ডিগ্রির মর্মার্থ বুঝতে ব্যর্থতার কারণে প্রয়োজনীয় শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর সাথে জড়িত পরিস্থিতিসমূহের বাস্তবচিত্রের উদাহরণ আমাদের সমাধানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে বলে আশা করছি।

আইন শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহারিক বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত বা চর্চার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতে আইন সংশ্লিষ্ট যতগুলো পেশায় নিযুক্তির সুযোগ রয়েছে তা বিবেচনা করতে হয়। এক্ষেত্রে আদালত (বিচারক ও অ্যাডভোকেট হিসেবে), বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে (সরকারি, বেসরকারি ও এনজিও) আইন কর্মকর্তা, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইন সংশ্লিষ্ট) কর্মকর্তা সকল ক্ষেত্র বা সুযোগকেই বিচেনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের কারিকুলাম তৈরি করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ গবেষণা এই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে যে, তত্ত্বীয় শিক্ষা ব্যবহারিক শিক্ষার প্রারম্ভেই অবস্থান করে। পেশাগত ডিগ্রির ক্ষেত্রে ব্যবহারিক বা প্রয়োগিক কলাকৌশল সংক্রান্ত শিক্ষার ভিত্তি নিহিত থাকে তত্ত্বীয় শিক্ষার মধ্যে। তত্ত্বীয় শিক্ষার অপূর্ণতায় তার ব্যবহারকালে অসুবিধার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। প্রয়োগিক ক্ষেত্রে সফলতার জন্য তত্ত্বীয় জ্ঞান অত্যাবশ্যক। আবার তত্ত্বীয় জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি যেখানে ব্যবহারিক জ্ঞানার্জন প্রয়োজন সেখানে শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মূল উদ্দেশ্য সাধন করা কষ্টকরই বটে।

এখন আসি আইন শিক্ষা কার্যক্রমে কিভাবে তত্ত্বীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পশাপাশি হাসপাতাল আর ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য ল্যাব স্থাপনের মতোই আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল’ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা সারাবিশ্বে বেশ জনপ্রিয় ও কার্যকর একটি পদ্ধতি বটে। ল’ ক্লিনিকে শিক্ষক ও আইন পেশাজীবীদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা আইন সংক্রান্ত প্রকৃত অথবা তৈরিকৃত সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। ক্লিনিকের কার্যক্রম হিসেবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা জীবনেই ভবিষ্যত আইন পেশাগত জীবনের নানা কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ লাভ করে থাকে। আইন পেশায় বিভিন্ন অঙ্গণের পেশাজীবীদের সাথে ক্লিনিকের সংযোগ স্থাপন করে শিক্ষকমণ্ডলী ব্যবহারিক শিক্ষাদানের প্রয়াস চালিয়ে থাকেন।

কিন্তু, সংশ্লিষ্টদের ক্লিনিকের গুরুত্ব ও প্রকৃত কাজ বা উদ্দেশ্য বোঝার ব্যর্থতা ও বাস্তবিক নানা কারণে ক্লিনিকসমূহ স্থায়ী রূপলাভে ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষেত্রে শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞান গ্রহণ করে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হয়।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজের পাশাপাশি হাসপাতাল আর ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য বৈজ্ঞানিক ল্যাব ছাড়া যদি তাদের শিক্ষা অকল্পনীয় হয়, আইন শিক্ষার ক্ষেত্রেও সমান বোধ যতদ্রুত তৈরি হবে ততই শিক্ষার্থীদের জন্য মঙ্গল।

ল’ স্কুলে ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম চালিয়ে নিতে আইনের শিক্ষার্থীদের পূর্ণমাত্রায় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার দরকার পড়ে। এরূপ পরিস্থিতির ব্যত্যয় পেশাগত জীবনে প্রাথমিক ধাক্কায় অন্তত অন্যকে দোষারোপ চলে না। প্রায়শই আইন সংশ্লিষ্ট নানা পেশায় প্রবেশের জন্য অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ধরণেও ব্যবহারিক বিষয়ে দক্ষতা যাচাই প্রক্রিয়ার অভাব শিক্ষার্থীদের পেশায় প্রবেশের পূর্বে ব্যবহারিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন ও দক্ষতা বা শিক্ষাদান সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় মাত্রায় ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদান কার্যক্রমে আগ্রহের অভাব দৃষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ল’ ক্লিনিকের কার্যক্রম হিসেবে বা অতিরিক্ত কার্যক্রম হিসেবে ‘স্ট্রিট লইয়ারিং’ প্রোগ্রাম বা ‘কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট’ প্রোগ্রামের আওতায় শিক্ষার্থীদের আইনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের বাইরে আনার যে প্রচেষ্টা গৃহীত হতে দেখা যায় তা আইনের শিক্ষার্থীদের সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে এনে অধিকার সম্পর্কে তাদের ধারণা, অধিকার ভঙ্গের ধরণ ইত্যাদি প্রসঙ্গে জ্ঞান লাভ করতে সহায়তা করে থাকে।

ল’ ক্লিনিক বা অন্যান্য কার্যক্রমের উপস্থিতিতে অথবা ল’ ক্লিনিকের অনুপস্থিতিতেও বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরণের কার্যক্রম গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে ব্যবহারিক শিক্ষাদানের প্রচেষ্টা কিছু মাত্রায় গৃহীত হয়।
 
মুটকোর্ট ও মক ট্রায়ালের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের আদালতে মামলা-মোকদ্দমা দায়ের থেকে শুরু করে অন্যান্য পর্যায়গুলোকে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিচিত করানো হয়। মক ট্রায়ালে বিচারক, অ্যাডভোকেট, স্বাক্ষী ইত্যাদি সকল প্রয়োজনীয় চরিত্রে শিক্ষার্থীরা দায়িত্ব পালন করে থাকে। সংশ্লিষ্ট কোর্স শিক্ষকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এসকল বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকে শিক্ষার্থীরা। উপরোক্ত কর্মসম্পাদনে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পেশাজীবীদেরও সংযোগ ঘটানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিশেষ কোর্সের অধীনে বা বিভাগের স্বতন্ত্র পরিকল্পনায় প্রায়শই শিক্ষার্থীসহ আদালতে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে আদালতের নানা কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা স্থির করে শিক্ষার্থীদের পূর্ণ ধারণা প্রদান করা হলে উদ্দেশ্যপূর্ণ হতে পারে। আদালতে উপস্থিতির জন্য নির্ধারিত সময় এবং উপস্থিতিকালীন করণীয় বিষয়সমূহ কোর্সের বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিভিন্ন ধরণের আদালত প্রত্যক্ষ করানো, আদালতের অন্যান্য দপ্তর প্রত্যক্ষ করানো, আদালতে বিভিন্ন ধরণের দলিলাদি পর্যবেক্ষণ করানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের সাথে পূর্ব যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মসম্পাদন নিশ্চিত করতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক হয়ে এবং উক্ত কার্যক্রমের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে সহযোগিতা প্রদান করলে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

আদালতের মতোই অন্যান্য আইন পেশা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য উপস্থিতির ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনেই আত্নবিশ্বাসী হতে শুরু করে। ভবিষ্যত কর্মজীবনে নানা প্রতিষ্ঠান বা নানা দপ্তরের কাজ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার মাধ্যমে তত্ত্বীয় শিক্ষার সাথে ব্যবহারিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন করতে পারে।
 
অন্যদিকে স্বল্প পরিসরে শিক্ষার্থীদের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে হাতে কলমে খুঁটিনাটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দান করা হয় ওয়ার্কশপের মাধ্যমে। ওয়ার্কশপে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়।

এছাড়াও সেমিনারের মাধ্যমে আইনের শিক্ষার্থীদের সরাসরি কর্ম সম্পর্কিত অভিজ্ঞদের সান্নিধ্যে এসে জ্ঞান আহরণের সুযোগ পায়। সেমিনার হলো একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর জন্য আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠান। সেমিনারের আয়োজনে সময়সীমা খুব স্বল্প সময়ের জন্য হয়ে থাকে। সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিষয় সম্পর্কে বিস্তর জানার সুযোগ তৈরি হয় সেমিনারগুলোতে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে মুখ্য আলোচক বা মুখ্য প্রবন্ধ উপস্থাপক হিসেবে বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো পেশায় কর্মরত বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে ধারণা রয়েছে এমন মানুষদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় সেমিনার। সেমিনারে প্রশ্ন-উত্তর ও আলোচনার মাধ্যমে সকলে নতুন তথ্য আরোহণে বা বিষয় সম্পর্কিত যে কোনো জটিল প্রশ্নে সম্ভাব্য সমাধানে পৌঁছাতে এই কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ওয়ার্কশপ ও সেমিনার কিছু মাত্রায় ব্যবহারিক শিক্ষা বা জ্ঞানার্জনের সুযোগ তৈরি করলেও সিম্পোজিয়াম ও কনফারেন্স একাডেমিক উন্নতি সাধনই বেশি করে থাকে। তবে যেহেতু এসকল ক্ষেত্রে নানাভাবে পেশাজীবীদের সম্মিলনের একটি সুযোগ থাকে তাই কিছু মাত্রায় হলেও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

সিম্পোজিয়ামে বিশেষ বিষয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সিম্পোজিয়ামে বিষয়ের প্রতি আগ্রহী এবং অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ বিষয়ে গবেষণা উপস্থাপন ও আলোচনা এবং শুধু শ্রোতা হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। কনফারেন্স সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের তুলনায় বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। নিজের গবেষণা কর্ম উপস্থাপন ও শ্রোতা হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে কনফারেন্সে। দেশ ও কিছু ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত থাকেন কনফারেন্সে। একদিনের ক্ষেত্রবিশেষ দুই বা তিন দিনব্যাপী কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবহারিক শিক্ষা পদ্ধতির প্রচলন কম বা বেশি যাই থাক না কেন মূলত এসকল পদ্ধতিসমূহ থেকে সুবিধা গ্রহণের মাত্রা নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের উপর। পেশাগত ডিগ্রির মর্মার্থ উপলব্ধি করা একজন আইন শিক্ষার্থীর জন্য খুবই জরুরি। অন্যান্য একাডেমিক ডিগ্রির মতো শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞান আহরণেই সন্তুষ্ট থাকলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারিক শিক্ষার নানা প্রচেষ্টাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করলে বা নিজেকে সেসকল কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখলে পেশাগত জীবনের শুরুতে কিছু অসুবিধা যোগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অসম্পূর্ণ বা দুর্বল কাঠামোর উপর ভিত্তি করে টিকে থাকা কষ্টকর বটে। তাই ঘাটতি পূরণ করতেই হয়। কিন্তু সময়ের চাহিদায় নিজেকে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থতা যদি অভ্যাসে পরিণত হয় তবে সফলতা অর্জন সুদূরেই থেকে যায়। সকল সুযোগ সুবিধার উপস্থিতি সকল শিক্ষার্থীর সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে পারে না যতক্ষণ না শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ সুবিধাকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করে। তেমনিভাবে অনেক ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ সুবিধার অনুপস্থিতিতেও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য অর্জনে নানা পথ খোলা থাকে। প্রয়োজনে শিক্ষকদের পরামর্শক্রমে শিক্ষার্থীরা বিকল্প পদ্ধতিতে হলেও লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যেতে পারে। তত্ত্বীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞানের অপরিহার্যতা থাকলেও যে পক্ষের ব্যর্থতায়ই হোক না কেন তা সঠিকভাবে অর্জিত না হলে তাতে হাহুতাশ করলে চলবে না। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে পেশাগত যে কোনো ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণের বিকল্প নেই।

একাডেমিক ডিগ্রির ক্ষেত্রে প্রায়শই পড়ার বিষয়ের সাথে চাকুরি ক্ষেত্রের সামঞ্জস্য দেখা যায় না। চাকুরি গ্রহণের পর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিভিন্ন মেয়াদে চাকুরিতে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে একজন কর্মকর্তাকে তাঁর দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড পালন করতে দক্ষ করে তোলা হয়। এধরণের ব্যবহারিক কার্যক্রম/প্রশিক্ষণের সাথে পেশাগত ডিগ্রি পরবর্তী ব্যবহারিক কর্ম বা প্রশিক্ষণের মৌলিক পার্থক্য হলো পেশাগত ডিগ্রির মতো একাডেমিক ডিগ্রি গ্রহণকালীন তত্ত্বীয় বিষয়ে অর্জিত জ্ঞানসমূহের সাথে সংযোগ সাধনের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু পেশাগত ডিগ্রির ক্ষেত্রে পরবর্তীতে ব্যবহারিক প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হিসেবে তত্ত্বীয় বিষয়সমূহের সাথে সংযোগ স্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে। তাই পেশাগত ডিগ্রি অর্জনকালীন তত্ত্বীয় বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানার্জনে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকে না। অন্যথায় পরবর্তীতে শুধু ব্যবহারিক জ্ঞানার্জন পেশাগত কর্মের ভিত্তিকে মজবুত করতে বাঁধ সাধে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন