আজ মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং

ক্যান্সারের সাথে বসবাস

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-২৮ ০০:৪২:৪৮

ডা. নূরুল হুদা নাঈম :: একটা সময় ছিল কারো ক্যান্সার হয়েছে এই কথাটা ঐ ব্যক্তিকে না জানানোর প্রচেষ্ঠা চলতো খুব। আর এখন কিছু সংখ্যক রোগী শরীরের কোথাও টিউমারের মতো ফোলা হলে নিজে থেকেই চলে যান ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের কাছে, হয়তো বা উনার ক্যান্সার হয়নি। ক্যান্সার কে আড়ালে রাখার প্রবনতা যে একেবারেই নেই এমনটি বলা যাবে না। যা হোক ক্যান্সারের প্রকোপ এখন এমনই উর্ধ্বগতি যে শীঘ্রই ভয়াবহ আকার ধারন করবে। কাজ করি ওসমানী মেডিকেলে। এই হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের ৮০% রোগী এখন হেড-নেক ক্যান্সাওে আক্রান্ত, এবং অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে এই সব গরীব মানুষেরা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগকে গুরুত্ব না দিয়ে কবিরাজ, হোমিওপেথী, ফুঁ ইত্যাদির মাধ্যমে যখন কিছুই হয় না শেষ পর্যায়ে শরণাপনড়ব হন সরকারী হাসপাতালে। যখন আমরা ও অনেকটা অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ি। এই হাসপাতালে বা উপযুক্ত জায়গায় আগে আসলেও তো ভালো কিছু করার সুযোগ থাকে। ক্যান্সারের সাথেই এখন আমাদের বসবাস। সবারই অন্তত আত্মীয় স্বজন হলেও কেউ না কেউ এ রোগে আক্রান্ত। সুতরাং চিকিৎসার পাশাপাশি আমাদের প্রতিরোধের ব্যবস্থা ও সচেতন হওয়া আবশ্যক।

আজ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। মানুষের মধ্যে সচেতনতা কারণসমূহ দূরীকরণ, ক্যান্সার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় সহ সর্বোপরি ক্যান্সার জয়ীদের উৎসাহিত করার লক্ষে এ দিবসের আয়োজন। প্রতিবছর বিশ্বে অসংখ্য মানুষ ক্যান্সারে মারা যায়। ক্যান্সারের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। তবে বয়স, খাবার, জীবনযাপনের ধারা, পারিবারিক ইতিহাস, পরিবেশ এবং পেশাগত কারণে ক্যান্সার হতে পারে। বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর শরীর অসংখ্য ছোট ছোট কোষের সমন্বয়ে গঠিত। এই কোষগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর মারা যায়। এই পুরনো কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ এসে জায়গা করে নেয়।

সাধারণভাবে কোষগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে এবং নিয়মমতো বিভাজিত হয় নতুন কোষের জন্ম দেয়। যখন এই কোষগুলো কোনও কারণে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে তখনই ত্বকের নিচে মাংসের দলা অথবা চাকা দেখা যায়। একেই টিউমার বলে। এই টিউমার বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারকেই ক্যান্সার বলে। সাধারণত জনগনের মাঝে ক্যান্সার বা টিউমার নিয়ে নানা বিভ্রান্তি আছে। প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পরে না, দ্রুত বৃদ্ধির কারণের ফলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ভালো কোনও চিকিৎসা দেয়াও সম্ভব হয় না। ক্যান্সার সারানোর জন্য বিভিনড়ব ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরলে এই রোগ সারানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেকখানি। ২০০ প্রকারেরও বেশি ক্যান্সার রয়েছে। প্রত্যেক ক্যান্সারই আলাদা আলাদা এবং এদের চিকিৎসাপদ্ধতিও আলাদা। সাধারণত বয়স যত বাড়তে থাকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে, কারণ এ সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

এক হিসেবে দেখা যায় যত মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তাদের শতকরা ৭০ ভাগেরই বয়স ৬০ বছরের ওপর। খাবার এবং জীবনযাপনের ধারার সাথে ক্যান্সারের গভীর সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। যেমন- ধুমপান বা মদ্যপানের সাথে ফুসফুস, মুখ ও কণ্ঠনালীর এবং যকৃৎ বা লিভারের ক্যান্সারের যোগাযোগ রয়েছে। তেমনই ভাবে পান-সুপারি, জর্দা, তামাক, মাংস, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ইত্যাদি খাবারের সাথেও ক্যান্সারের যোগসূত্র রয়েছে। যারা সাধারণত শারীরিক পরিশ্রম কম করেন তাদের মধ্যেও ক্যান্সারের প্রবণতাটা বেশি। ক্যান্সারের সাথে জিনগত সম্পর্ক রয়েছে বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই কারণে পরিবারের কারো যদি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা থাকে তাহলে অন্যদেরও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকখানি বেড়ে যায়। একেক ক্যান্সারের জন্য একেক ধরণের লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে।

তবে সাধারণত কিছু লক্ষণ হচ্ছে-খুব ক্লান্ত বোধ করা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, শরীরের যে কোনো জায়গায় চাকা বা দলা দেখা দেয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা গলা ভাঙ্গা, মলত্যাগে পরিবর্তন আসা (ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা মলের সাথে রক্ত যাওয়া), জ্বর, রাতে ঠান্ডা লাগা বা ঘেমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ওজন কমা, অস্বাভাবিক রক্তপাত হওয়া, ত্বকের পরিবর্তন দেখা যাওয়া। ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিভিনড়ব ধররেন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। যেমন- অস্ত্রোপচারঃ যে জায়গাটি ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলো এবং তার আশেপাশের কোষগুলোকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কেটে সরিয়ে ফেলা হয়। ক্যান্সার যদি অল্প একটু জায়গা জুড়ে থাকে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে তাহলে এ ধরনের চিকিৎসা দেয়া হয়। রেডিওথেরাপিঃনিয়ন্ত্রিতভাবে শরীরের অংশবিশেষ তেজস্ত্রিয় রশ্মি প্রয়োগ করে সেই জায়গার কোষগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। কেমোথেরাপিঃ এই ব্যবস্থায় ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করতে অ্যান্টি-ক্যান্সার (সাইটোটক্সিক) ড্রাগস বা ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ৫০ টিরও বেশি ধরনের কেমোথেরাপির ওষুধ রয়েছে এগুলোর কোনকোনটা ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল হিসেবে খেতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ওষুধগুলোকে স্যালাইনের সাথে বা অন্য কোনভাবে সরাসরি রক্তে দিয়ে দেয়া হয়। রক্তের সাথে মিশে এই ওষুধগুলো শরীরের যেখানে যেখানে ক্যান্সার কোষ রয়েছে সেখানে গিয়ে ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। ক্যান্সারের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের মানসিক চিকিৎসার ব্যাপারে লক্ষ রাখতে হবে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর রোগীরা বেশ মানসিক কষ্টের মধ্যে পড়ে যান, অনেকে মানসিকভাবে ভেঙ্গেও পরেন। এই কারণে অনেক সময় তাদের অবস্থা বেশি গুরুতর না হলেও অনেক দ্রুত মারা

যান। গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত কিছু ব্যাপারে মেনে চললে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকখানি কমানো যায়। যেমন- প্রত্যেকদিন নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা যেমন-দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, একাধারে বসে না থেকে অন্তত প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর হাঁটাচলা করা। সম্প্রতি জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব রিগেনসবার্গের গবেষকরা একটি গবেষণার দেখেছেন, দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বসে থাকার কারণে জরায়ু, নাড়ি ও ফুসফুসে ক্যান্সারের আক্রমণের সম্ভাবনা শতকরা ১০ ভাগে বেড়ে যায়। ধূমপান বা মদ্যপান ছেড়ে দেয়া বা পরিমাণ কমিয়ে আনা। পান-সুপারি, জর্দা, তামাকপাতা খাওয়া বন্ধ করা, চর্বিজাতীয় পর্দাথ কম খাওয়া। প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল, গ্রীন টি এবং আঁশজাতীয় খাবার খাওয়া। অনেক আছেন মাংস ঝলসিয়ে খেতে ভালবাসেন। তবে মাংস সরাসরি আগুনে ঝলসালে তাতে ক্যান্সারের সাথে সংশ্লিষ্টি রাসায়নিক পর্দাথ থাকতে পারে। সম্প্রতি আমেরিকান গবেষকরা বলছেন, মাংস ঝলসানোর আগে তা ম্যারিনেড করে নেয়া ভাল। ম্যারিনেড করার পদ্ধতি হচ্ছে, আপনি একটু লেবুর রস, দুই চামচ জলপাইয়ের তেল ও এক চামচ টাটকা মধু সরিষার তেল দিয়ে মাংস মিশিয়ে নেয়া এবং তারপর আগুনে ঝলসানো বা রানড়বা করা।

এতে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে না। বিভিনড়ব ধরনের ইনফেকশনর ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে প্রতিটি ইনফেকশন যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা করা যায় তাহলে ক্যান্সার থেকে দূরে থাকা সম্ভব। ব্যক্টেরিয়া জনিত ইনফেকশনের কারনে পাকস্থলীতে ক্যান্সার হতে পারে। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, এপস্টিন-বার ভাইরাস, হেপাটাইসি বি ভাইরাস, ক্যাপোসি সারকোমা হার্পিস ভাইরাসের জন্য ক্যান্সার হতে পারে। এক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের ইনফেকশনের জন্য দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপনড়ব হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে এবং নিয়মিত ফলো আপে থাকতে হবে। মধ্য বয়সের পর থেকে নিয়মিত চিকিৎসকের ফলো আপে থাকা বাঞ্চনীয়। অনেক সময় ক্যান্সার হলে তা যদি দ্রুত ডায়াগনোসিস করা যায়, তাহলে চিকিৎসা করে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে উঠা সম্ভব। তাই মধ্য বয়সের পর থেকে নিয়মিত চিকিৎসকের ফলো আপে থাকা উচিত।

প্রচলিত কথায় আছে “আগে হাঁটলে চোর ও পথ খুঁজে পায়।” তাই আমাদের মনে রাখতে হবে স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য সচেতন হতে হবে সময় দিতে হবে, বাজেট ও প্রয়োজন হবে। তাই নিয়মিত টেস্ট এবং রোগ বা লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথেই কষ্ট করে হলেও সঠিক জায়গায় চিকিৎসা করাতে হবে, তবেই এ রোগের ভয়াবহতা কমানো সম্ভব বলে মনে করি।

লেখক-
সহকারী অধ্যাপক, নাক, কান, গলা ও হেড-নেক
বিশেষজ্ঞ লেজার সার্জন, সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, সিলেট।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন