আজ শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ ইং

‘মৌসুমি কোকিলদের বয়কট করবে ভাটির মানুষ’

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-৩১ ১৬:৩৮:১০

আশরাফ আহমেদ :: করোনার সাথে আগাম বন্যা। যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আগাচ্ছে, দেশের কয়েক কোটি মানুষ। চাকরি চলে গেছে। খাবার নেই ঘরে। জমানো টাকাও ফুড়িয়ে গেছে। হতাশা আর দুশ্চিন্তার মধ্যেই সময় পার হচ্ছে তাদের। বৈশ্বিক সমস্যায় আক্রান্ত ৫৬ হাজার বর্গমাইলও।

চলছে জাতীয় দূর্যোগ। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের মানুষকে ভাল রাখার গুরুদায়িত্ব নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ত্রাণ, প্রণোদনাসহ এগিয়ে আসছে মানুষের পাশে। সেই সুযোগে অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার আহার নিয়ে হরিলুটের মঞ্চে মেতে উঠেছেন একদল জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্তা ব্যক্তিরা। রক্ষক হয়ে করছেন ভক্ষকের মতো নোংরামি। ভিন্ন সব কৌশলে দুর্নীতির মহা আয়োজন করে পকেট বারি করে যাচ্ছেন দেশের অভিশপ্ত এই মানুষগুলো।

সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানরাও যাচ্ছেন অসহায়ের দুয়ারে। সারা বছর টিফিনের জমানো অর্থ দিয়ে পাশের বাড়ির অনাহারের ঘরে চাল ডাল কিনে দিয়ে আসছে জয়পুর হাটের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র মিয়াদ। টেলিভিশন কিংবা পত্রিকায় পাওয়া এখন খবরে উচ্ছ্বসিত হয় দেশের মানুষ। কেউবা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের শখের গাড়িটি বিক্রি করে এগিয়ে আসে অসহায়ের পাশে। এমন নিউজে বরাবরই  বেঁচে থাকার উৎসাহ পায় পিছিয়ে পড়া মানুষ।

সে ভিন্ন আলোচনা।
এবার আসি ভাটির দেশে। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা। দিরাই শাল্লা নামে দুই থানা নিয়ে সুনামগঞ্জ-২ সংসদীয় আসন। প্রায় চার লক্ষ্য মানুষের বসতি নিয়ে চলা বিশাল এক অঞ্চল। যেকারণে ভাটি এলাকার রাজনীতির আঁতুড়ঘরই ধরা যায় সুনামগঞ্জ-২ আসনটিকে। অঞ্চলটিতে দেশ কাঁপানো জাতীয় নেতাদের পদচারণা সর্বদাই ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ জিয়াউর রহমান, হুসেন মুহাম্মদ এরশাদরাও আসেন, ভাটির এই অবহেলিত জনপদটিতে।

অনেক পার্থীর আনাগোনা থাকলেও স্বাধীনতা পরবর্তী অধিকাংশ নির্বাচনেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কেই সংসদে পাঠায় এখানকার জনগণ। সুরঞ্জিতের মৃত্যুর পর তার গড়া আসনে অধিষ্ঠিত হন, সহধর্মিণী জয়া সেন গুপ্তা। সুরঞ্জিত বিহীন দিরাই শাল্লা আওয়ামী লীগ গ্রুপিং আর ভাঙা গড়ার খেলায় মেতে উঠলেও সংসদ সদস্য হিসেবে জয়া সেন গুপ্তা এখনও আছেন জনগণের পাশে।

গেল জাতীয় নির্বাচনে তিনিসহ আওয়ামী লীগ থেকেই ডজনখানেক নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে মাঠে ঘাটে প্রচারণা চালান। হাটে-ঘাটে বাজারে কিংবা বাড়িতে সবখানেই দেখা মিলতো কোন না কোন এমপি হওয়ার স্বপ্নে বিভোরদের। অবশ্য এর আগে কাউকে দেখার তেমন সুযোগ হয় নি কালনী পাড়ের মানুষের। মৌসুমি এসব কোকিলেরা নিজেদের  কুহুকুহু কণ্ঠে গাইতেন জনগণের পাশে থাকার হাজারো আপন গীতি। তাদের মন ভুলানো গানে ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখত সরলমনা মানুষগুলো।

অবশেষে নির্বাচন এলে আওয়ামী লীগ থেকে জয়া সেন গুপ্তাকেই কার্ড দেওয়া হয়। আর বিএনপি থেকে মনোনয়ন করা হয় নাসির উদ্দীন চৌধুরীকে। দলের হাই কমান্ডের সিদ্ধান্তে অনেকের আশার আলোতে পানি পড়লেও, মেনে নেওয়া ছাড়া কেউই কিছু করতে পারেন নি।

নির্বাচনে অংশ নিতে আসা প্রায় ডজনখানেক নেতারা তখন থেকেই মাঠ ছাড়তে শুরু করেন। উড়ে এসে জুড়ে বসার কৌশল পাতা সাধুবাবাদের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আর দেখতে পায়নি এলাকার মানুষ। একই অবস্থা ছিল, ইউনিয়ন, পৌরসভা কিংবা উপজেলার নির্বাচনগুলোতেও। নানা রংয়ে ডংয়ে অবতীর্ণ হওয়া অগণিত পার্থীর পদচারণায় ভাটির আকাশে উঠতো বেমৌসুমি সব বিশ্রী ধুলো। নির্বাচন চলে যাওয়ার সাথে সাথে যাদেরকে আর খোঁজে পাওয়া যায় নি। সর্বদা জনগণের পাশে থেকে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রতি দেওয়া মৌসুমি কোকিলেরা এখন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের খেলায় মত্ত। দেশের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তাদেরকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

নির্বাচনের আগে কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে ভোট অর্জনে পারঙ্গম নেতারা আজ এলাকার মানুষের দুর্দিনে কোথায়? তারা এখন কভিড-১৯’র সংক্রমণ আতঙ্কে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দী। গুজবে, আতঙ্কে, খাবারের সন্ধানে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো যখন দিশেহারা তখনো সমাজসেবী হওয়ার ভঙ্গি ধরা এসব সুবিধাবাদীদের কোনো সামাজিক কর্মযজ্ঞে দেখা যাচ্ছে না। অনলাইন কিংবা অফলাইন কোথাও সরব নেই তারা। উল্টো ভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে তাদের অনুসারী নেতাদেরও ঘরে থাকতে বলছেন। ফলে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ঘর বন্দী বেকার, দুস্থ ও অসহায় মানুষরা হিসাব কষছেন আগামী নির্বাচনে কাকে ভোট দিবেন। প্রশ্ন রাখছেন, যারা পাশে থাকার কথা বলছিল করোনায় কোথায় আমাদের সেই শুভাকাঙ্ক্ষীরা?

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অসংখ্য প্রার্থী দেখেছে ভাটির মানুষ । যাদের মুখে ছিল মানুষের পাশে থেকে জনসেবা করার গল্প। “তোমাদের পাশে আছি, ভবিষ্যতেও থাকবো” এমন তসবিহ পড়ে ভাটি অঞ্চল ঘুরে বেড়ানো সেই জনদরদীরা কোথায় এখন?

অথচ এখনই, অস্তিত্ব সংকটে পতিত হওয়া ভাটির মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল।  দুর্দিনে পাশে থাকা মানুষকেই মনে রাখা মানব সমাজের মজ্জাগত স্বভাব। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে জনগণের পাশে থেকে তাদের মন জয় করার এখনই ছিল উপযুক্ত সময়। যেটা পরবর্তী নির্বাচনে যে কারো ক্ষেত্রেই ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করত।

দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে দেয়া যায়, একমাত্র জয়া সেন গুপ্তা কেই  মাঝে মধ্যে এলাকার মানুষের পাশে থাকতে দেখা গেছে। সময়ের প্রয়োজনের তুলনায় তাও ছিল যৎসামান্য। বিরোধী দলের সাবেক এমপিও নিরব নিভৃতে জনগনের সাথে এই দুর্দিনে অবস্থান করে সাহস দিয়ে যাচ্ছেন। যা নিঃসন্দেহে  প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। মাঝে মধ্যে এড. শামসুল ইসলাম কে উনার নিজ গ্রামের আশপাশে অবস্থান  করতে দেখা গেছে ।

কিন্তু আওয়ামী লীগের এতোসব এমপি প্রার্থীরা আজ কোথায়? তাদের কানে কি জনগনের দুঃখ দুর্দশার কথা পৌঁছে না? নাকি দেখেও না দেখার, শুনেও না শুনার ভান করে পালিয়ে বেড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।

উনারা কি আদৌও ভাটি এলাকার মানুষের পাশে থাকার, ভাগ্য পরিবর্তন করার সেনাপতির যোগ্যতা রাখেন? তাদের উদ্দেশ্য জনসেবা করা না অন্য কিছু তা এখন স্পষ্ট। এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভবিষ্যতে এসব সুবিধাবাদীদের নিঃসন্দেহে বয়কট করবে কালনী পাড়ের জনগণ।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, এমসি কলেজ সাংবাদিক সমিতি।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন