আজ রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ ইং

অবাক অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি!

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৯-১৮ ১২:৩৬:৩৪



|| সালেহ আহমদ ||

এ কথা আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর বা পঁয়ত্রিশ বছর আগেও শুনেছি, ঢাকার আকাশে-বাতাসে নাকি টাকা উড়ে বেড়ায়! শুধু ধরতে পারলেই হলো। পুরো লেখাটি পড়লেই উড়ে বেড়ানো টাকা আর টাকা ধরার কৌশলের সন্ধান পেয়ে যেতে পারেন।

মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) একটি বড় অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তিতে মনোনীত হয়েও এটি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছি। চিঠি কুরিয়ার সার্ভিসে এসেছে ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০। ঠিকানায় আমার নামের নিচে লিখা আছে- ভাইস প্রিন্সিপাল এম. সি. কলেজ, সিলেট।

প্রায় ন’মাস আগে প্রিন্সিপাল হিসেবে জয়েন করেছি। সঙ্গত কারনেই একটু সন্দেহ দেখা দিল মনে। এর আগেও আমাকে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ‘মহাত্মা গান্ধী গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড, সমাজ সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য', ‘মাদার তেরেসা গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড’- এর জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে প্রদত্ত মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে জানতে চাই তাঁদের জুরিবোর্ড কিসের ভিত্তিতে আমাকে মনোনীত করলো, ওপাশ থেকে কোন উত্তর নেই!

আমার সহকর্মী ড. আ স ম আজিজুল ইসলাম তখন ঢাকার নয়াপল্টনে তার বাসায় ছিল। তাকে বললাম, সেগুনবাগিচায় ওদের অফিসে একটু যোগাযোগ করতে। আজিজ খোঁজ নিয়ে জানালো-ওই ঠিকানায় এরকম কোন সংস্থার অফিস নেই। আমি ভয়ে আর ঢাকা যাইনি।পরে দেখলাম, আমার পরিচিত, আমার এলাকার হাই স্কুলের এক হেড টিচার, আমার ক্লাবের একজন মেম্বার এসব অ্যাওয়ার্ড রিসিভ করে, প্রত্যেকেই মহা আনন্দে ফেইসবুক-এ বিরাট একখানা পোস্ট দিয়েছে। আমার আরেক অগ্রজ একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন, ‘শেরে বাংলা গোল্ড মেডেল’! কত টাকা তাঁর খরচ হয়েছিল জানি না। তবে তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা ব্যাপক প্রচার করেছেন ফেইসবুকে।

এবার আসি আজকের চিঠির বিষয়ে: ‘আপনি শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ অবদানের জন্য মুজিব শতবর্ষে মুজিব অ্যাওয়ার্ড-২০২০ প্রাপ্তিতে মনোনীত হয়েছেন।’ চিঠিতে সবশেষে এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবিসহ সংযুক্ত একটি ফরম পূরণ করে ই-মেইলে পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রধান সমন্বয়কারীর মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে, প্রথমে আমার পদবীর কথা বললাম। তারপর বললাম বর্তমান মহামারী পরিস্থিতিতে আমার ঢাকা যাওয়ার অপারগতার কথা। তিনি বললেন কিচ্ছু হবে না, চলে আসেন। তারপর বললেন, এটা একটা বিরাট কাজ, অনুষ্ঠান বাবদ অনেক খরচ, ইত্যাদি, ইত্যাদি। তারপর বললেন, আপনি একটু সহযোগিতা করুন। এখনই দুই হাজার টাকা বিকাশ করে পাঠিয়ে দেন আর ৩ অক্টোবর ঢাকা আসার সময় আরো পাঁচ হাজার টাকা ক্যাশ নিয়ে আসবেন।

উত্তরে আমি বললাম ভাই শুনেন, বিমান ফ্লাইটে করে ঢাকা আসা-যাওয়া, হোটেল ভাড়া বাবদ খরচ হবে দশ হাজার, আপনাদের দিতে হবে সাত হাজার, সব মিলিয়ে সতের হাজার টাকা। এত টাকা খরচ করে এক হাজার টাকা দামের একটি ক্রেস্ট-এর আমার প্রয়োজন নেই, শ’খানেক ক্রেস্ট আছে-রাখার জায়গা নেই! কিছু বস্তায় ফেলে রেখেছি।

এরা সারাবছরই এই বিনা পুঁজির ব্যবসা করে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। ধরেন ২০০ জন। তাহলে বছরে ১৪ লাখ টাকা (৭,০০০x২০০ জন), মন্দ কি? মাসে ১ লাখ ১৬ হাজারের অধিক আয়!  সেই সাথে কর্পোরেট সেক্টরের কমপক্ষে ১০টি  স্পন্সরশীপ থেকে প্রাপ্ত অর্থ!

পাঠকরা এখন নিশ্চয়ই বিনা পুঁজিতে ব্যবসার বিষয়টি বুঝেছেন। এই পাতি ‘সাহেদরাই’ আস্তে আস্তে বিরাট একটা কিছু-সাহেদ বনে যায়। তারপর টকশো -তে এসে শুধুই বয়ান, শুধুই সুবচন! এরাই একটা পেশার আড়ালে, (যেখানে জাতির পিতার কন্যাদ্বয় কখনও মুজিব কোট পরেননি) একখানা মুজিব কোট গায়ে দিয়ে সাংঘাতিক শিশু পাচারকারী লোপা বনে যায়।

লেখক: অধ্যক্ষ, এম.সি. কলেজ, সিলেট।

(মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব)

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন