আজ সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ ইং

মেঘ পাহাড়ের দেশে (পর্ব ৩)

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১০-১৬ ০২:০৮:২২

ফারজানা ইসলাম লিনু :: একবিংশ শতাব্দীর এই প্লাস্টিক যুগে পরিবেশ বান্ধব কলাপাতায় ভাতের পরিবেশনটাই বেশি ভালো লাগলো। সেই সাথে বুঝতে বাকি থাকলো না শিলং শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ছড়াগুলো কেন এত পরিস্কার। পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন ও প্লাস্টিকের ছড়াছড়িতে আমাদের ছড়া, নালায় বারো মাস জলাবদ্ধতা লেগেই থাকে। শিলংয়ে যে পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যাবহৃত হয় না তা না। তবে তুলনামূলক কম আর সে গুলো যত্র তত্র ফেলে পরিবেশের দূষণ ঘটানো হয় না।

এক আদিবাসী দোকানি মহিলা কে দেখলাম দোকানের ময়লা পানিটাকে বয়ে নিয়ে একটু তফাতে সন্তর্পনে ড্রেনে ঢালছেন। চাঁদের আলোয় রাস্তাঘাট অনেক পরিচ্ছন্ন লাগে।

 প্রধান সড়কে অনেক তফাতে একেকটা সড়ক বাতি লাগানো। গলির ভেতর আরো কম। কোন কোন গলিতে নেই বললেই চলে। আমাদের পাড়ায় পাড়ায় অত্যাধুনিক এলইডি লাইট লাগানো হয়েছে। লাইট গুলোর রক্ষণাবেক্ষণেও অনেক তৎপর কতৃপক্ষ। তারপরও ছিনতাই প্রতিরোধ করা যায় না। রাতে কি দিনের আলোয় ছিনতাইকারী মানুষের খালি মাল না জান নিয়েও চম্পট দেয়। আর ভিনদেশি মেহমান হলে তো কথা নেই। মাঝেমধ্যে পত্রিকার পাতায় চোখ পড়ে বিদেশি অতিথিরা ছিনতাইকারীর খপ্পরে পড়ে সবকিছু হারিয়ে কান্না করতে করতে প্লেনে উঠছেন। বিশেষ করে ক্যামেরা, মোবাইল বা ল্যাপটপের মত জিনিসগুলো হারিয়ে দিশেহারা হয়ে দেশে ফিরে যান তারা।

 কলকাতায়ও রাতে হাটতে বা ট্যক্সিতে চড়তে ভয় লাগে। বেশিরভাগ ট্যক্সি ড্রাইভার মদ খেয়ে বুদ থাকে। কিন্তু শিলংয়ের এই জিনিসটা আমার কাছে একটু আলাদা লেগেছে। রাতদুপুরেও ড্রাইভারদের মধ্যে মাতলামি দেখা যায়না। নিশুতি রাতে শিলংয়ের রাস্তায় মানুষের ঢল উৎসবের আমেজ জানান দিচ্ছে। জায়গায় জায়গায় মন্ডপে চলছে পুজার আনুষ্ঠানিকতা । পুলিশের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনা, তারপরও সবকিছু চলছে নিয়মমত। অনেকখানি হেঁটে এসেছি, এবার একটা ট্যাক্সি নিতেই হবে। পুজোর কারণে ট্যাক্সি পাওয়া কিছুটা ঝামেলার হলেও পেয়ে যাই একটা ট্যাক্সি।

পাঞ্জাবি ট্যাক্সিওয়ালা বাংলা বোঝেন ভালো। যেচেই কথা বলা শুরু করলাম। একথা সেকথা বলে যখন শান্তি প্রিয় খাসিয়াদের একটু প্রশংসা করলাম অমনি বেচারা পাঞ্জাবী ড্রাইভার গেলেন চটে। খাসিয়াদের ব্যাপারে অনেক কিছু বললেন। কিছুদিন পরপর খাসিয়ারা গন্ডগোল পাকায়। আজ বাঙ্গালী খেদাও তো কাল পাঞ্জাবী খেদাও। কাউকেই তারা বিশ্বাস করতে পারেনা বা বিশ্বাস করতে চায় না। ওরা বুঝতে চায় না শিলংয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সবার ভুমিকা রয়েছে। এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে কি একটা ইস্যুতে তারা পাঞ্জাবিদের উপর খেপে যায়। বেশ কয়েকদিন পুরো শিলং অচল ছিল। ভদ্রলোকের কথায় খাসিয়াদের উপর রাগ স্পষ্ট।

যদিও খাসিয়াদের আমার কাছে এতটা মারমুখি মনে হয় নি। ভদ্রলোকের কথা শুনে সিলেটি একটা প্রবাদের কথা আমার মনে পড়ে যায়,”নিমরা বিলাই হর খাইবার যম”। খাসিয়াদের সমস্যাটা কিছুটা বুঝতে পারি। আসলে তারা নানাজাতের মানুষের উপস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তাইতো চটে যায়।

 ট্যাক্সি চলে এসেছে লাবানে আমাদের গেস্টহাউসের কাছাকাছি। কিন্তু পুজোর দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবী ছেলেরা কোন মতেই গলিতে ঢুকতে দিবেনা। গলির শেষ মাথায় একটা পুজোর মন্ডপ। দিনের চেয়ে রাতের বেলা বেশি পুজার্থী আসছেন। সম্ভাব্য ঝামেলা এড়াতে যানবাহন ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না গলিতে। নেমে পড়ি ট্যক্সি থেকে। এত মানুষের আনাগোনা কিন্তু শব্দ যন্ত্রনা একেবারেই নেই। গলির ভেতরের রাস্তাটা অনেক উচু। হেঁটে আসতে নিঃশ্বাস ভারী হয়, বুকে চাপ লাগে। সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে ক্লান্ত অনেকটা। শ্রান্ত ক্লান্ত শরীর টেনে নিয়ে রুমে প্রবেশ করি।

 ফ্রেস হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সবাই গভীর ঘুমে। মোবাইলে চার্জ দিতে হবে। চার্জার খুজতে গিয়ে টের পেলাম চার্জার আনতে ভুলে গিয়েছি। বেশি খুঁজতে গেলে ঝাড়ি খাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। উপায়ান্তর না পেয়ে মোবাইল বন্ধ করে ঘুমাতে যাই। আমার ঘুম আসেনা। চার্জারের চিন্তায় নয়, জায়গা বদলে সবসময় আমার এই রকম হয়। অনেক ভোরে বের হতে হবে তাই না ঘুমিয়ে উপায় নেই। রাত বাড়ে, ঠান্ডাও বাড়ে। ক্লান্তি ও ভালোলাগার আবেশে বেশ ভালো এক পসলা ঘুম হয় সবার।

 সময়মতো ঘুম ভাঙলে যথারীতি প্রার্থনাটা শেষ করে জানালা খুলে পর্দা সরাই। শিলং পাহাড়ের কনকনে শীতের ঠান্ডা হাওয়া লাগে নাকে মুখে। আবার জানালা লাগিয়ে দেই।একটু পর পর্দার ফাঁক দিয়ে সুয্যি মামার হালকা উঁকি ঝুঁকিতে কৌতুহল জাগে। জানালার পর্দা সরাতেই দেখি দ্বিগবিজয়ী সূয্যিমামা পুর্বদিগন্ত রাঙিয়ে দূর পাহাড়ের আড়াল থেকে দাঁত কেলিয়ে হাসছেন। ঝলমলে হাসিতে পুরো শিলং শহর আলোকিত।

গায়ে চাদর চাপিয়ে বাইরে আসি। খোলা আবহাওয়ায় চলছে সুস্বাস্থ্য প্রেমীদের শরীর চর্চা। বারান্দায় চেয়ারে বসে মুগ্ধতা নিয়ে দেখি আশপাশের বাড়ির লোকজন বাসা বাড়ির পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। পুরদ্যমে চলছে বাগান ও ঘরবাড়ির পরিচর্যা। দেখে মনে হবে উৎসব উপলক্ষেই চলছে সাফ ছুতার কাজ। গেস্ট হাউসের রান্নাঘরের ছেলেটা চা নিয়ে আসলে জিজ্ঞেস করলাম, পুজা উপলক্ষ্যে কি এসব ঝাড়ামোছা হচ্ছে?
ছেলেটা অবাক হয়ে বলে, প্রতিদিনই চলে ঝাড়া মোছার কাজ। রাস্তা থেকে শুরু করে ঘরের উঠোন সবকিছু পরিষ্কার হচ্ছে মহাসমারোহে। আমাদের ছোট বেলা হুরুদাদীকে দেখতাম কাজের মানুষের পরোয়া না করেই সেই ভোরবেলা খরখরা হাতে নেমে পড়তেন পুরো বাড়ি ঝাড়ু দিতে। সেই বড় রাস্তার মোড় পর্যন্ত ঝাড়ু দিয়ে তবেই না শান্তি। গাছের শুকনো পাতা ও অন্যান্য ময়লা আবর্জনা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পরিষ্কার করতেন। ঝুমঝুম বৃষ্টিতেও দাদির শান্তি নেই। বৃষ্টিতে ভিজে খরখরা নিয়ে উঠান বাড়ি ঝাড়ু দিতে লেগে যেতেন। বৃষ্টির পরে নাকি আবর্জনা ভেজা মাটিতে লেগে থাকবে, তাই বৃষ্টির মধ্যেই এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান। দাদির হাতের ছোঁয়ায় বাড়ির সামনের পেছনের গাছতলা, পুকুর পাড়, উঠান সবকিছু ঝকঝকা ফকফকা।

লাবানের বাড়ি ঘর গুলো শহুরে বাড়িঘরের তুলনায় কিছুটা বড়। তাই ঝাড়ামোছায় সময় লাগছে বেশি। খাসিয়ারা বেশিরভাগ খৃস্ট ধর্মাবলম্বী। তাদের প্রধান উৎসব বড়দিন আসতে অনেক বাকি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নত দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি উৎসব আসন্ন। চা খেয়ে একটু হাটতে গেলাম। দুই তিনটা গেস্টহাউস এখানে পাশাপাশি। বাকি গুলোতে স্থানীয় লোকদের বাস। অত্যন্ত অভিজাত এই এলাকার প্রতিটা পরিবারের নিজস্ব গাড়ি রয়েছে। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান। বাহারি ফুলের মেলা প্রতিটা বাগানে। সুর্যের সোনালি আভায় বাগানের ফুল গুলো হাসে। রাতে মনে হয় হালকা বৃষ্টি হয়েছে, কোথাও একফোঁটা বালু নেই।

প্রতিটি বাড়িতে শিকল বাঁধা কুকুর আছে গোটা দুয়েক। কুকুরে বিড়ালে আমারে বড্ড এলার্জি। কুকুরদের অনাবশ্যক উঁকি ঝুকিতে বিরক্ত লাগে। রাস্তায় ঘোরাঘুরি অসমাপ্ত রেখে ঘরে চলে আসি রুমে।

আরেক কাপ চা খেতে হবে। চায়ের অর্ডার দিয়ে খেয়াল করি পুত্র কন্যাদের ঘুম ভেঙেছে। কোথাও যেতে হলে রেডি হওয়ার তাড়া দিতে দিতে মুখে ব্যাথা। এখন নিজের গরজে আগেভাগে রেডি। উল্টো আমাকে রেডি হওয়ার তাড়া দেয়া হচ্ছে। শিলংয়ের বাগানের তাজা পাতার চায়ে চুমুক দিয়ে আরো ঝরঝরে লাগে। কিন্তু ভোরের স্নিগ্ধতাকে নষ্ট করার জন্য সিগারেটের কড়া গন্ধ যথেষ্ট। পাশের রুমের উড়িয়া বয়স্ক ভদ্রলোক আয়েশে ধোয়া উড়িয়ে সিগারেট টানছেন একটার পর একটা। বুক ভরে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করছেন পরম তৃপ্তিতে। ধুমপানে শরীর ও পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে সে দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

আমাকে দেখে যেচেই জিজ্ঞেস করলেন, আজকে কোথায় যাব?
বললাম, আমরা আজকে শিলংয়েই থাকবো।
 উড়িয়া ভদ্রলোক বললেন, আজকে চেরাপুঞ্জি গিয়ে থাকবো। তারপর ডাউকিতে একদিন থেকে শিলংয়ে ফিরে আসবো। শিলংয়ে থেকে আরো কোন ফরেস্টের বাংলোয় সপ্তাহ খানেক কাটিয়ে উড়িষ্যায় ফিরে যাবো।
 প্রতি বছর পুজোর সময় সপরিবারে বেরিয়ে পড়েন ভদ্রলোক। এইবারও এসেছেন স্ত্রী, ছেলে ছেলের বউ ও নাতিকে নিয়ে।

 আমাদের কথা বলার মধ্যেখানে ভদ্রলোকের স্ত্রী বেরিয়ে এলেন। আমার সাথে উড়িয়া অথবা হিন্দিতে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। ভাষা পুরোপুরি না বুঝলেও মাথা নেড়ে শুভেচ্ছার প্রত্যুত্তর দেই।

আমার সাথে কথা শেষ করে মহিলা স্বামীকে অধিক হারে সিগারেট খাওয়ার কারণে কড়া ভাষায় কিছু একটা বললেন। আমার সামনে স্ত্রীর ভর্ৎসনায় ভদ্রলোক কিছুটা বিব্রত হলেও সিগারেট ছাড়তে নারাজ। আমি অপেক্ষায় থাকি এরপর মহিলা কি করেন। মনে মনে বলি, সিগারেটের প্যাকেটগুলো ছুড়ে ফেলে দিতে পারো না?

স্বাস্থ্যকর জায়গায় এসে অস্বাস্থ্যকর ধুমপান একেবারে বন্ধ করা উচিত। খুকখুক কাশতে কাশতে ভদ্রলোক রুমের দিকে পা বাড়ান।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন