আজ বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ ইং

মেঘ পাহাড়ের দেশে (পর্ব ৫)

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১০-১৮ ০০:৫৬:০৩

ফারজানা ইসলাম লিনু :: কি আর করা বিফল মনোরথে রওয়ানা দেই ওয়ার্ডস লেকে। গানের ছন্দে স্নিগ্ধ বাতাসে নিরাপদ গতিতে এগিয়ে চলে আমাদের গাড়ি। কৃত্রিম হৃদ যে এত দৃষ্টিনন্দন হতে পারে তা ওয়ার্ডস লেক না দেখলে বুঝতাম না। শরতের বিদায়ে শীতের আগমনী বার্তা চারদিকে। লেকের পাড়ের গাছপালা সবে পাতা ঝরাতে শুরু করেছে। হলুদ শুকনো পাতা মাড়িয়ে লেকের পাড় দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে নানা রঙের ফুল। সবুজ ঘাসের বিছানায় বসে খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার হাটা শুরু করি। নানাজাতের গাছে পাখপাখালির গুঞ্জনে কান ঝালাপালা হলেও ভালো লাগে। হৃদের পানিতে প্যাডেল বোট নিয়ে লোকজনের বিচরন দেখার মতো। প্যাডেল বোট থেকে পপকর্ণ বা অন্যকিছু পানিতে ছুড়লে বিশাল সাইজের মাছেরা হা করে ভেসে উঠে। খাবার মুখে পুরেই আবার অদৃশ্য। মাছেদের কান্ডকীর্তি দেখতে দেখতে আমাদের ইচ্ছে হল প্যাডেল বোট চড়ি। কিন্তু মধ্যাহ্ন বিরতির কারণে আপাতত বোটের টিকেট দেয়া বন্ধ। চড়তে হলে অপেক্ষা করতে হবে অনেক্ষন। এপাশ ওপাশ ঘুরে ওয়ার্ডস লেকের ভেতরেই মধ্যাহ্নভোজন সেরে ফেলি। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ছে আস্তে আস্তে। প্যাডেল বোট না চড়েই বেরিয়ে পড়তে হবে।

ওয়ার্ডস লেকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখে আমাদের শ্রীপুরের প্রাকৃতিক হৃদের কথা মনে হলো। এত সুন্দর একটা হৃদ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোন কাজে আসছেনা। পর্যটক আকর্ষনের যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে এই লেকে পর্যটকরাও উপচে পড়তো। একবার অস্তবেলায় শ্রীপুরের লেকে গিয়েছিলাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোন কমতি নেই। অস্তম্লান সূর্যের আলো হ্রদের পানির ভাসমান শাপলার ঝোপে ঝিলিক দিয়ে বিদায় নেয়। ঘন পল্লবের বৃক্ষরাজি, উঁচুনিচু সবুজ টিলা, গোধুলির ছায়ার নয়নকাড়া দৃশ্য যে কাউকেই বিমোহিত করবে। বেশ কয়েক বছর পর আবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল এই হ্রদের পাড়ে। হ্রদের স্বচ্ছ পানি আর অবশিষ্ট নেই। মানুষের অত্যাচারে শাপলার ঝোপ বিপন্ন প্রায়। দুষণে দুর্গন্ধে দৃষ্টিনন্দন হ্রদের অবস্থাও একেবারে জীর্ণ। গাড়িতে চড়ে বসতেই ভাবনা শ্রীপুরের লেক থেকে অন্য প্রসঙ্গে মোড় নেয়।

ওয়ার্ডস লেক থেকে বেরিয়ে লেডি হায়দরি পার্কে যাই। রোদ নামতে শুরু করেছে। দিনের আলো শেষপ্রান্তে। পর্যটক ছাড়াও স্থানীয় লোকজন বাচ্চাদের নিয়ে এসেছেন পার্কে। প্রকৃতির বুকে কৃত্রিমতার ছোয়ায় এই পার্কও অনেক দৃষ্টিনন্দন। বাচ্চাদের খেলার নানা উপকরণ, বয়স্কদের শরীরচর্চা ও বসার জায়গা সর্বপরি মিনি এক চিড়িয়াখানা এইখানকার প্রধান আকর্ষন। চিড়িয়াখানার বন্ধি জন্তু জানোয়ারে আমার কোন আগ্রহ নেই। সময় নষ্ট করে সরিসৃপ ও বানরদের বাদরামি দেখার কোন ইচ্ছা আমার নেই। বসে পড়ি কৃত্রিম ঝর্ণার পাড়ে। আমাকে ও মাকে রেখে সঙ্গীসাথীরা মূহুর্তে উদাও। রঙ বেরঙের প্রজাপতি ফুলের উপর উড়ে বসে। চিড়িয়াখানার ভেতরের বানরগুলোর কিচিরমিচির শুনা যায়। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেশিক্ষণ থাকা যাবে না এইখানে। নির্ধারিত আরেকটা দর্শনীয় জায়গায় যেতে হবে। ট্যক্সিওয়ালাদের সাথে সেভাবেই কথা হয়েছে।

ছানপোনারা আসতে চায় না দোলনা চড়বে, আরো কিছুক্ষণ খেলবে। মেঝো ছানাটা আবার দোলা দুলিতে নাই। সেও আমার মত নড়তে চায় না। ক্লান্তিতে কিছুটা কাবু যদিও বুঝতে দিতে চায় না। আমরা পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকি কিছুক্ষণ। বাকিরা ফিরে আসলে বেরিয়ে পড়ি লেডি হায়দরি পার্ক থেকে। আবারও ভেলপুরি,পানিপুরি ও আইসক্রিম ওয়ালার সাথে সাক্ষাৎ।
সবার চাহিদামত খাওয়া শেষে ট্যাক্সিতে চড়ে বসি। যেতে হবে ক্যাথেড্রাল অব মেরি হেল্প অব ক্রিস্টিয়ানস চার্চে। অনুকুল আবহাওয়ার কারণে বৃটিশ রাজকর্মচারীদের বৃটিশ খৃষ্টান মিশনারীরা ঘাঁটি গাড়েন শিলংয়ে। পাহাড়ি খাসিদের বসে আনতে শুরু করেন নানা মানবিক ও ধর্মীয় তৎপরতা। অবহেলিত খাসিয়ারা খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়ে শিক্ষাদীক্ষা ও চিকিৎসার নানা সুফল ভোগ করতে থাকেন। বৃটিশ মিশনারীদের প্রচেষ্টায় এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় সবচেয়ে পুরনো ও এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম চার্চ। যা বর্তমানে শিলংয়ের তিন লাখ ক্যাথলিকের একমাত্র উপাসনালয়। ১৯১৩ সালে আসাম মিশনের প্রথম এই চার্চ নির্মান করা হয়।

তখন দ্য চার্চ অব দ্যা ডিভাইন সেভিয়্যর নামে উপাসনার স্থানটি কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয়। ১৯৩৬ সালে কাঠের তৈরী এই স্থাপনাটি আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়। পরবর্তীতে রোমান ও রেনেসাঁ যুগের স্থাপত্য ধারার সমন্বয়ে গোথিক স্থাপত্য কৌশলে নতুন এই ক্যাথেড্রাল নির্মাণ করা হয়।

কিন্তু ভূমিকম্প প্রবণ মেঘালয়ে চার্চ নির্মাণেও ভাবনায় পড়তে হয় বৃটিশদের। ভুমিকম্প প্রতিরোধে ক্যাথেড্রাল ক্যাথলিক চার্চের ভিত্তি করা হয়েছে পাথর ও বালি দিয়ে।

উচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত চার্চের বিশাল আঙিনায় পা দিতেই চোখ চলে যায় চার্চের উচু চূড়াটার দিকে। দিনের বিদায়ী সূর্যটার শেষ আলোটুকু তখনো দোল খাচ্ছে চার্চের চূড়ায়। মনোমুগ্ধকর স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী চার্চে রয়েছে যীশুখৃষ্ট ও মেরীর অনেকগুলো মূর্তি। কোনটা উন্মুক্ত কোনটা কাচের বাক্সের ভেতর। বিশাল এক হল রুমে পিনপতন নিরবতায় চলছে প্রার্থনা। খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের কি একটা কনফারেন্সের প্রস্তুতি হিসেবে উপরের উঠানে চলছে বিশাল শামিয়ানা টানানোর কাজ। কতগুলো খাসিয়া শিশু আপনমনে সিড়ির রেলিং বেয়ে নামছে আবার উপরে উঠছে। আমার ছেলের একটুখানি শখ হল রেলিং বেয়ে উপরে উঠার। সময় স্বল্পতা ও সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে অনুমতি দেয়া হলনা। আমাদের ট্যক্সি ড্রাইভার গনেশ বাবু ও আলি সাহেব গাইডের ভুমিকায়। ঘুরেঘুরে পুরো চার্চ দেখালেন। রাস্তার অপর পাশে ক্রুশ বিদ্ধ যীশুর বিশাল এক মুর্তি দর্শন করে তড়িগড়ি করে ক্যাথেড্রাল অব মেরি হেল্প অব ক্রিস্টিয়ানস চার্চ থেকে বেরিয়ে পড়ি। বৃটিশদের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহনকারী ক্যাথেড্রাল চার্চের নির্মানশৈলীর প্রশংসা না করে পারা যায়না।

শিলংয়ের অলিতে গলিতে এলোপাথাড়ি চক্কর দিয়ে ঘরে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আসার সময় চার্জার কিনে আনার কথা ছিল, বেমালুম ভুলে যাই। গেস্ট হাউসের মাইল দেড়েকের মধ্যে চার্জার পাওয়ার কোন সম্ভাবনা যে নেই তা সকালে বুঝে গিয়েছি। এদিকে ছবি তুলতে তুলতে মোবাইলের চার্জ যা ছিল তাও একেবারে নিভু নিভু। সারাদিনের সঙ্গী গনেশ দাদা ও আলী ভাইকে বিদায় দিয়ে রুমে আসি। আসার সময় রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে এক কাপের চায়ের কথা বলতে ভুলি না। গোসল করে চায়ের কাপ হাতে নিতেই কলিংবেলের আওয়াজ। পুত্র কন্যার বাবা নিচে নেমে দেখেন গনেশ দাদা মোবাইলের চার্জার নিয়ে হাজির। দুর পরবাসে একজন ট্যক্সি ড্রাইভারের এমন বদান্যতায় আমি অনেকটা মুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ। রুমে এসে আমার মোবাইল চার্জ দিতে গিয়ে খেয়াল করি এই চার্জারে আমার মোবাইল চার্জ হচ্ছে না। নিজের উপর রাগ লাগে কেন যে চার্জার টা আনতে ভুলে গেলাম। অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি চার্জার ব্যাগে ঢুকিয়েছি। আর শিলং এসে খোঁজে পাচ্ছিনা। যাই হউক ভুতুড়ে ব্যাপারটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। হালকা তন্দ্রার মত আসে এতটুকু বিশ্রামে অনেক ঝরঝরে লাগে। ওয়াইফাই সংযোগ নেই, সীম কিনতেও অনেক বাধা। দেশের সাথে দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ফোনের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে মন্দ লাগেনা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে খানিক চিন্তাও হয়। ইশ কেউ তো দরকারে আমাদের ফোনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাবেনা। রান্নাঘরের ছেলেটা এসে জানতে চায় রাতের খাবার দিয়ে দিবে কিনা?
বললাম দিয়ে দাও। খাবারের মেনু আগেই বলে দেয়া ছিল। খাওয়া দাওয়া শেষ করে মনে হল একটু হেঁটে আসি। নিশি রাতের শিলংয়ে ঘুরতে মন্দ লাগেনা। বিশেষ করে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা না থাকায় ঘুরতে বেশি ভালো লাগে।

কনকনে শীতের রাতে মা আর ক্লান্ত ছেলেমেয়েরা বাইরে যেতে চাইলেন না। তাই আমরা যুগল রাতের শহর ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। পুজোর কারণে পুরো শহর সরগরম। গলির ভেতরের রাস্তাগুলোকে সড়কবাতি তেমন নেই। তাতে কিছু যায় আসেনা। চারিদিকে পুজার সাজ সাজ রব। মন্ডপগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভীড়। এখানে সবাই রাতে পুজায় ঘুরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রাস্তায় মানুষজনের আনাগোনা দেখে তাই মনে হল। ঐদিন ছিল শারদীয় দুর্গাপুজার মহা অষ্টমী। কুমারী পুজার জন্য সেজেগুজে রেডি ছোট মেয়েরা। হঠাৎ করে ঠান্ডা বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি আসে। সিলেটের ঝুমঝুম বৃষ্টির সাথে অনেক মিল। খালি অমিলটা হল বৃষ্টি আসলে সিলেটে হাতের কাছে রিক্সাওয়ালা মামাদের পাওয়া যায়। এখানে তো রিক্সাওয়ালা মামারা নেই। গত দুইদিন শিলংয়ের যানবাহন ও ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে একটু বেশিই প্রশংসা করেছিলাম। রিক্সা না পেয়ে একটু তুলোধুনো করলাম। তুলোধুনোটা যথাযথ কতৃপক্ষের কানে না গেলেও সমস্যা নেই। দৌড় দিয়ে অনেক রাস্তা চলে এসেছি। একেবারে কাকভেজা হয়ে গেস্ট হাউসে ফিরে টের পাই ঠান্ডার তীব্রতা। ঠান্ডার মাত্রাটা কম হলে বৃষ্টিস্নানটা অনেক আনন্দদায়ক হতে পারতো। কাপড় বদলে চুল শুকিয়ে ঘুমাতে গিয়ে দেখি অনেক রাত। ঝটপট ঘুমের আয়োজন। উঠতে হবে অনেক ভোরে। শিলং পিকের সূর্যোদয় কোনভাবেই মিস করা যাবে না।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন