আজ রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ ইং

মেঘ পাহাড়ের দেশে (পর্ব ৮)

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১০-২৩ ০০:৩৩:২৮

ফারজানা ইসলাম লিনু :: সবার পছন্দ মত খাবারের অর্ডার দিয়ে একটু বিশ্রামের আশায় রেস্টুরেন্টের বারান্দার রেলিংয়ে গিয়ে বসি। খাবার আসতে অনেক দেরী হবে রেস্টুরেন্টে বিয়ে বাড়ির ভীড়। নানা ভাষার নানা বয়সী মানুষের কিচিরমিচিরে সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।

দক্ষিণ ভারতীয় একটি যৌথ পরিবারের অনেক লোক একসাথে বেড়াতে এসেছেন চেরাপুঞ্জিতে। মা বাবা, তিন ছেলে, ছেলেদের স্ত্রী আর গোটা পাচেক নাতি নাতনী মিলে বিশাল এক বহর। পুরো রেস্টুরেন্টই তাদের দখলে। বাচ্চাদের চারটাই একেবারে ছোট্ট শিশু। সবচেয়ে বড় মেয়েটার বয়স এগারো বারো বছরের মত হবে। বাকি চারটা বাচ্চার কিলবিলানিতে থেকে বাঁচতে বড় মেয়েটা দাদা দাদীর সাথে দূরে বসেছে। বাকি গুলো মা বাবাদের জান ভাঁজা ভাঁজা করছে। বেচারা দাদার সহ্য হচ্ছেনা। উঠে এসে একটাকে কোলে নিলেন। অমনি আরেকটা কোলে উঠবে। একটাকে নামান তো আরেকটাকে তুলেন।

এই করতে করতে আমাদের সবার খাবার চলে আসে। ফ্রেস ও খোলামেলা আবহাওয়ায় যা খাই তাই স্বাদ লাগে। পাহাড়ি লালচালের তৈরী ফ্রায়েড রাইস আমাদের দেশের রেস্টুরেন্টের তৈরী ফ্রায়েড রাইসের মত নজরকাড়া না হলেও অনেক সুস্বাদু ছিল। লুচির সাথে ছোলা বাটুরা ও পাহাড়ি লালমরিচের ঝাল সসটাও অনেক স্বাদের ছিল। আরেক প্লেট ভাত ভাজি খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সময় স্বল্পতায় খাওয়া যাবে না। নতুন করে অর্ডার করলে দিতে অনেক সময় লাগবে।

এদিকে দক্ষিণ ভারতীয় বাচ্চাগুলোর কিলবিলানিতে মাথা ধরার অবস্থা। আমার হঠাৎ করে চোখ যায় ওদের টেবিলে। ইয়া মাবুদ, প্রত্যেক বাবার কোলে একটা বাচ্চা আর মায়েরা বাচ্চাগুলোর মুখে চাওমিন তুলে দিচ্ছেন। মায়ের হাত থেকে চামচ নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। দেখাদেখি বাকিরাও একই কাজ করছে। চামচ ছোড়াছুড়ির প্রতিযোগিতায় কেউ কম যায় না। একজন আরেকজনের চেয়ে জোরে ছুড়ছে চামচগুলো। সবগুলো চামচের জায়গা হয়েছে পাহাড়ের একেবারে পাদদেশে। তুলে আনার কোন সম্ভাবনা নেই। অপারগ মায়েরা হাত দিয়েই বাচ্চাদের মুখে চাওমিন গুজে দিচ্ছে।

বিশালদেহী দাদী অতি ধীরেসুস্থে খাবার শেষ করে উঠে দাড়ালেন। বাচ্চাদের দুষ্টামী দেখেও না দেখার ভান করে বাইরের দিকে পা বাড়ান। বড় নাতনিটার হাত ধরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বুদ হয়ে উপভোগ করতে থাকেন মেঘ আর রোদের খেলা। দেখে মনে হল বেচারি দাদী বাড়িতেও নাতি নাতনীগুলোর যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ।

বাচ্চাদের বাবা মায়েরা অসীম ধৈর্য্যের পরিচয় দিলেও খাবার অসমাপ্ত রেখেই উঠে পড়েন।টেনেটুনে একেকটা কে নিয়ে গাড়িতে তুলেন। বড় ছেলের বউয়ের সাথে খানিক আলাপ করে জানা গেল তারা চেরাপুঞ্জিতে দিন দুয়েক থাকবেন। হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডায় এসে পড়ায় বাচ্চাদের একটু ঠান্ডা লেগেছে। এজন্য ত্যক্ত করছে বেশি। ওরা চলে যাওয়ায় কয়েকটা টেবিল খালি হল।

অপেক্ষমান ক্ষুধার্ত পর্যটকরা টেবিল পরিষ্কার করার আগেই টেবিল জুড়ে বসেন। ঝালমরিচের ভর্তা দিয়ে লুচি খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে আমরাও রওনা দেই নতুন গন্তব্যে। আজকের রাতটা চেরাপুঞ্জিতে থাকবো। এদিক ওদিক এলোপাতাড়ি ঘুরাঘুরি করতে করতেই বিকেল। বিকেল গড়িয়ে এবার রাত। ঠান্ডা মনে হয় শিলংয়ের চেয়ে বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল শহরে আমরা শীতার্ত রাত কাটাবো।

হোটেলে এসে ফ্রেস হয়ে বিশ্রাম নিতে গিয়ে টের পার পাই পা তো আর চলেনা। অতিরিক্ত ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন। শিলংয়ের মত রাতের সোহরা দেখার খায়েশ আজকের মত বন্ধ। চেরাপুঞ্জিকে স্থানীয় ভাষায় সোহরা বলা হয়। সন্ধ্যার আগে গনেশ দাদা ও আলী ভাই বিদায় নিয়ে শিলংয়ের পথে যাত্রা করেন। পরের দিন ভোরে যাত্রী নিয়ে দুজনেই ডাউকি যাবেন। কাজ সেরে আমরা চাইলে আমাদেরকেও ডাউকি পৌছে দিবেন। আমরাতো একবাক্যে রাজি। গাইড হিসেবে দুজনেই চমৎকার। সময়জ্ঞানও অনেক ভালো।

রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পালা। এক ঘুমেই রাত পার। শিলংয়ের মত ভোরে ঘুম ভাঙলেও বের হতে পারি না, বেশ ঠান্ডা এইখানে। রোদ উঠার পর আস্তে আস্তে বের হয়ে আসি। আশেপাশে ঘুরে এসে গোসল সেরে নাস্তা খেয়ে সব গুছিয়ে নিতে নিতে গনেশ দাদারা এসে হাজির।

এবারের গন্তব্য ডাউকি। চেরাপুঞ্জির ফুলের বাগান, অর্কিড দিয়ে সাজানো মনোরম ইকো পার্ক, উঁচু টিলা বেয়ে নেমে আসা ফলস সবকিছু পেছনে ফেলে আমরা বেরিয়ে আসি শহর থেকে।

ছোট ছোট গ্রাম, সবুজ উপত্যকা, খন্ড খন্ড কৃষিজমি, পাইন গাছের ছায়া, নাসপাতি ও কমলা বাগান রয়েছে পুরো চেরাপুঞ্জি জুড়ে। চেরাপুঞ্জির বিখ্যাত ও সু স্বাদু কমলা পাকার সময় হয় নি, তাই ইচ্ছা থাকলেও আনা হয় নি।

প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ চেরাপুঞ্জির রাস্তার দুপাশের কাছের দুরের পাহাড়ে চলছে খনন করে কয়লা ও নানা ধরনের পাথর উত্তলনের কাজ। পুরো ভারতের কয়লা ও মুল্যবান পাথরের বড় যোগান যায় এই অঞ্চল থেকে। প্রাকৃতিক সম্পদের এই মজুদ নাকি একশ বছরেও শেষ হবার নয়।

এই অঞ্চলে সবুজে ঢাকা পাহাড় ও টিলা আছে। এসব টিলায় বিশাল শতবর্ষী গাছের দেখা না মিললেও নানা ধরনের বাঁশ, বেত ও লতাগুল্মের বিশাল সমাহার রয়েছে। আসামের আশপাশ তথা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় বাঁশের ভেতর ভাত রান্না করে খাওয়ার প্রচলন চলে আসছে সেই অনেক কাল আগে থেকে। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় চুঙ্গাপিঠা। চুঙ্গাপিঠা তৈরীর বিশেষ বাঁশের দেখা মিলে চেরাপুঞ্জি ও ডাউকিতে। আমাদের এলাকার জনপ্রিয় এই চুঙ্গাপিঠা এখন বিলুপ্তির পথে। নির্বিচারে বাঁশ কেটে উজাড় করায় চুঙ্গাপিঠা এখন চাইলেও বানানো যায় না। অথচ আসামের করিমগঞ্জ ও বদরপুর অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী এই খাবারের বিপুল প্রচলন এখনো রয়েছে। হাইব্রিড ধানের বিস্তারে আমাদের আঠালো ও সুগন্ধি বিন্নিচাল বিলুপ্ত প্রায়। অথচ আসামের বিন্নি চালের সুগন্ধ এখনও অটুট। শুনেছি বিন্নি ভাত ছাড়াও ডাউকি বা চেরাপুঞ্জিতে বাঁশের ভেতর রান্না করা নানা পদের সুস্বাদু খাবার অনেক রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায়। যদিও আমাদের খাওয়া হয়নি।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন