আজ শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০ ইং

মেঘ পাহাড়ের দেশে (পর্ব ৯)

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১০-২৪ ০০:০১:৪৯

ফারজানা ইসলাম লিনু :: জঙ্গলঘেরা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় ক্লান্তিহীন এগিয়ে চলা আমাদের। নংরিয়াট গ্রাম এবারের গন্তব্য। ডাউকিতে এসে ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ না দেখে চলে গেলে আফসোস থাকবে। তাইতো এই রুদ্ধশ্বাস ছুটে চলা।

জীবন্ত বৃক্ষের শিকড় দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরী হয়েছে এই ব্রীজ। নংরিয়াট গ্রামে উমশিয়াং নদীর উপর এই শিকড় ব্রীজে যেতে হলে আড়াই হাজার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়। ঘন জঙ্গলে পথ হারাবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। বৃষ্টি বাদলার দিনে জায়গাটার সৌন্দর্য কয়েকগুন বেশি হলেও চলাচলের ঝক্কিও কম নয়।

গনেশ দাদা বললেন আমাদের ভাগ্য ভালো যে বৃষ্টি হচ্ছে না। আসলেই ঝকঝকে সোনালী রোদের মাখামাখিতে প্রকৃতি অনেক মনোরম। পর্যটকদের ঢ্ল নেমেছে নংরিয়াট গ্রামে। যানবাহনের ভীড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। রাবার গাছের শিকড় দিয়ে পেছানো সেতুর কাছে ঘন্টা খানেকের মত লাগলো। দুর্বল চিত্তের মানুষ হিসেবে সেতুতে উঠার সাহস হলো না। ছেলেমেয়েরা বাপ কে নিয়ে সেতু দর্শনে গেলে আমি ফিরে আসি গাড়ির পাশে। পায়ে হেটে ঘন্টা খানেক পর গাড়িতে ফিরে আসি। মা গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক একটু দেখছেন। মাকে নিয়ে আমিও আশপাশটা একটু ঘুরে আসলাম। সুন্দর একটা শান্ত পাহাড়ি গ্রাম। আমাদের বড়লেখা বা বিয়ানিবাজারের ভূপ্রকৃতির আদলে টিলা গুলো হলেও টিলা কেটে স্থাপনা তৈরির কোন দৃশ্য চোখে পড়েনি। যদিও পর্যটকদের বসবাসের জন্য অত্যাধুনিক কিছু ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে বা হয়েছে। পাথুরে লাল মাটির টিলাগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখেই নির্মান করা হচ্ছে প্রতিটি স্থাপনা। বাঁশ, সুপারী, কলা সহ নানা ফলফলাদির বৃক্ষে সমৃদ্ধ এক গ্রাম, কিন্তু খাওয়ার লোকজন খুব বেশি আছে বলে মনে হল না।

হঠাৎ দেখি কতগুলো পাহাড়ি শিশু কিশোর বইয়ের ব্যাগ কাধে বাড়ি ফিরছে। বুঝতে বাকি থাকলো না ওরা স্কুল থেকে আসছে। ইউরোপের কোন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের একটি দল শিশু কিশোর দের থামিয়ে কথা বললেন। অবাক হওয়ার মত ব্যাপার প্রতিটা শিশু অত্যন্ত সুন্দর করে ইংরেজিতে কথা বলছে। প্রতিদিন পাঁচ ছয় মাইল হেটে বাচ্চাগুলো স্কুলে যায়।

মিশনারীদের কল্যাণে আর নিজেদের সদিচ্ছায় এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার আলো অনেক আগেই পৌছেছে। মানুষকে সভ্য হওয়ার জন্য যা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হল নিজের সদিচ্ছা। মরুভূমির যাযাবরদের সরকারিভাবে আধুনিক বসতবাড়ি বানিয়ে দেয়া হয়। যাতে তারা আধুনিক মানসম্মত একটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারে। কিন্তু মন টিকে না এক জায়গায় বেদুইনদের। রাতের আধারে পালিয়ে যায় তারা। নিজেদের সদিচ্ছা না থাকায় একবিংশ শতাব্দীতে কিছু উন্নত দেশেও বেদুইনরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায়।

পাহাড়ি আদিবাসী শিশু কিশোরদের কথা ভাবতে ভাবতে দেখি আমার ছানাপোনারা লিভিং রুট ব্রীজ দেখে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে। বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে বললাম কি দরকার ছিল সেতুতে নামার? অমনি সবার প্রাণশক্তি পুনঃস্থাপিত হয়ে যায়।

কি বলেন! এত সুন্দর জায়গাটা না দেখে চলে যাব? না দেখে যাবে কেন? আরেক বার গিয়ে দেখে আসো। পরে যখন আসবো তখন দেখবো। এখন নতুন জায়গা দেখতে যাবো।

মাওলিনং গ্রামে যাবো এখন। কিছুদুর গিয়েই গাড়ি থামলে আমারা নেমে পড়ি ব্যালান্সিং রক দেখতে। অতি ক্ষুদ্র একটা পাথরের উপর অনেক বছর থেকে মৌন হয়ে দাড়িয়ে আছে বিশাল এক পাথর। ঘন বাঁশঝাড়ের জঙ্গলের ভেতর এই পাথর দেখতেও পর্যটকের ভীড়। প্রবেশ মুখে ছোট টংঘরে বসা এক বৃদ্ধের কাছ থেকে দশটাকা দিয়ে টিকেট কিনে প্রবেশ করতে হয়। নিরব শান্ত এই জায়গায় ঘন বৃক্ষের দেয়াল ভেদ করে রোদ ঢুকতে পারেনা। দিনের বেলায় সন্ধ্যার আভা। কেমন ভুতুড়ে লাগে আমার দৌড়ে বেরিয়ে আসি। বিস্ময়কর পাথরটা আসলেই দেখার মত জিনিস।

ধুমপানমুক্ত এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের তালিকায় নাম লিখিয়েছে প্রত্যন্ত গ্রাম মাওলিনং। গ্রামের ভেতর পা দিতেই মনে হল গ্রাম সম্পর্কে এক চুলও মিথ্যা শুনিনি। সাজানো গোছানো ছবির মত সমৃদ্ধ এক গ্রাম। অল্প উচ্চতার ছোট ছোট মানুষগুলোর মধ্যে কোন উচ্চবাচ্য নেই। যে যার কাজে ব্যস্ত। আদিবাসী মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে পুরুষরা বেশ আয়েশে ঘরের কাজ ও সন্তান লালন পালনে ব্যস্ত। মহিলারাও ঘরে বাইরে, ক্ষেতে খামারে কাজ করছে। ঘরের উঠান থেকে রাস্তা কোথাও ময়লা আবর্জনা চোখে পড়েনি।

গির্জা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটোই রয়েছে গ্রামটিতে। তেজপাতা ও দানব আকৃতির মানকচু গাছ নজর কেড়েছে বেশি। এত বড় মানকচুর গাছ আমি জীবনেও দেখিনি। এই অঞ্চলের তেজপাতা সারা ভারতের প্রয়োজন মিটিয়ে বাংলাদেশে ও অন্যান্য দেশে রফতানি হয়। চালতা, বাতাবি লেবু, পেপে সহ নানা জাতের ফলমুল ও সব্জিতে সমৃদ্ধ প্রতিটি বাড়ির আঙিনা। একটা বিশাল পাথরের উপর অনেক বড় সাইজের পায়ের ছাপ লক্ষ্য করলাম। আমাদের কৌতুহল দেখে বয়স্ক এক মহিলা বললেন, এটা ডাইনোসর যুগের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ঢাউস সাইজের কোন প্রাণির পায়ের ছাপ। যদিও সে রকম বৈজ্ঞানিক কোন প্রমানাদি আজ পর্যন্ত মেলেনি। তারপরও যুগ যুগ ধরে তারা কথাটা বিশ্বাস করে আসছেন। ওদের বিশ্বাসের চাইতে আমার পুত্রের উত্তেজনাই বেশি। বাড়ির প্রায় কাছে ডাইনোসর থাকতো এ যেন পরম সৌভাগ্য। অন্তত বন্ধুদের বলা তো যাবে, আমি ডাইনোসরের পায়ের ছাপ দেখে এসেছি।

পরিচ্ছন্ন এই গ্রামকে ঘিরে পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে গত কয়েক বছর থেকে। গ্রামের ছেলেরা স্বেচ্ছা সেবার মাধ্যমে পর্যটকদের অনেক উপকার করে থাকেন। পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যে রাত্রি নিবাসের জন্য তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন আবাস।

পথের মোড়ে মোড়ে স্থানীয় আদিবাসীদের হাতের তৈরী জিনিসপত্রের পসরা নিয়ে বসেছেন মহিলারা। দৃষ্টিনন্দন জিনিসপত্র দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ি একটা বাড়িতে। গৃহকত্রী হাসিমুখে ঘরে নিয়ে বসালেন। থরেথরে সাজিয়ে রাখা লেপ কম্বলের স্তুপ দেখে মনে হল শীতটা রাতে ভালোই ঝেঁকে বসে।

অবস্থাপন্ন প্রতিটা পরিবারের জীবনযাপনে স্বচ্ছলতার ছাপ। প্রচন্ড পরিশ্রমী আত্মপ্রত্যয়ী মানুষগুলো এক মুহুর্ত বসে নেই। নিজেদের ইচ্ছা ও পরিশ্রমের জোরেই দুর্গম পাহাড়ি গ্রামটাকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছে। নিজেরা হয়েছে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ও পরিশ্রমী মানুষের রোল মডেল। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লোকজন এসে ডাউকির এই গ্রাম ও গ্রামের মানুষকে দেখে অভিভুত হয়ে ফিরে যান নিজ দেশে।

সব সুখস্মৃতি নিয়ে আমাদেরও ফিরে আসতে হবে। পায়ে হেঁটে গ্রামটা আরেকবার দেখে ফিরে আসি গাড়িতে। বর্ডারে এসে বহন করার ঝামেলায় অনেক অর্গানিক ফলমুল আনতে গিয়েও আনা হয় নি। দুটো বুনো ধনে পাতার গাছ শিকড় সুদ্ধ তুলে বর্ষীয়ান এক খাসিয়া মহিলা প্লাস্টিকের বোতলে মাটি সমেত আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। উপহারটা অনেক পছন্দ হল আমার। সযত্নে গাড়িতে রাখলাম। মাওলিনং গ্রাম ছাড়িয়ে আমাদের গাড়ি দুটো ছুটে চলছে।

গ্রামের প্রবেশমুখে এসেই পড়লাম বিপত্তিতে। পুরো শিলং চেরাপুঞ্জি ভ্রমণে আমরা এ পর্যন্ত কোন সমস্যার মুখোমুখি হইনি। এইবার পড়লাম সমস্যায়। বিশাল গাড়ি বহরের লাইন।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন