আজ বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ ইং

হে দিঘী তুমি কথা কও

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১১-২১ ১৫:৫২:২৩

আব্দুল হাই আল-হাদী :: সেকালের পশ্চাৎপদ চিন্তার (!) রাজা-বাদশাহ, আমির-ওমরাহ, সুফি-দরবেশ-সন্ন্যাসীরা জনগণের পানির চাহিদা নিবারণের জন্য দীঘিগুলো খনন করেছিলেন। জনগণও তাদের সেসব কাজকে গ্রহণ করেছিলেন বিন্ম্র শ্রদ্ধায়। প্রজাহিতৈষী সেসব মানুষগুলোর মহৎ কাজগুলো যে একসময় ’আদিম-সেকেলে-বন্য’ হিসেবে বিবেচিত হবে, তা হয়তো ছিল তাদের কল্পনারও বাইরে। সময়ের পরিক্রমায় তাদেরই উত্তরসূরীদের হাতে সেসব কাজগুলো যে অবিবেচক ও অদূরদর্শী হিসেবে বিবেচিত হয়ে ধ্বংস হবে-এটা জানলে হয়তো তারা পানির বিকল্প চিন্তা করতেন। এমনও হতে পারতো যে, তারা প্রজাদের জন্য পানিচিন্তা বাদ দিয়ে অন্যপথ ধরতেন। আধুনিক, স্মার্ট, উন্নত, প্রগতিশীল, চিন্তাশীল, দূরদর্শী, জনগণের জন্য জানকোরবান উত্তরসূরীদের জন্ম দিতে পেরে নিশ্চয়ই তারা ওপার থেকে গর্ববোধ করছেন ! পূর্বসূরি হিসেবে এরচেয়ে বড়াই করার কী-ই বা আর হতে পারে!
মাত্র দেড়দিন বিদ্যুৎ ছিলনা। গণমাধ্যমে পানির জন্য লম্বা লাইন আর দৌড়াদৌড়ির খবর প্রকাশিত হয়েছে। আমির-ফকির, আশরাফ-আতরাফ, সমাজের উচুঁতলা থেকে নিচতলা-সবাই-ই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন কত ধানে কত চাল। কিন্তু এমনটি তো হওয়ার কথা ছিলনা। বিশেষ করে, দিঘী আর জলাধারের নগরে এমনটি কখনও প্রত্যাশিত ছিল না। যে নগরের প্রত্যেকটি পাড়া-মহল্লায় একেকটি দিঘী আছে কিংবা ছিল, সে নগরে পানির জন্য ’বদনাদৌড়’ সত্যিই হাস্যরসের সৃষ্টি করে।

সিলেট মহানগরীর কথা যে বলছিলাম, তা সচেতন পাঠক ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন। সিলেটে এত সংখ্যক দিঘী ছিল যে অনেকেই এটাকে ’দিঘীর শহর’ বলে আখ্যায়িত করতেন। নগরের প্রায় প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় কমপক্ষে একটি হলেও দিঘী ছিল। সে দিঘীগুলো কেবল পানির উৎস-ই ছিল না, ছিল ঐতিহ্যের নিদর্শন। কত মিথ, কিংবদন্তি আর কেচ্ছা-কাহিনী জড়িয়ে আছে এসব দিঘীর সাথে। প্রবীণদের মতে, নগরীতে এক যুগ আগেও ছোট বড় অন্তত: ২০টি দিঘী ছিলো। নগরীর উল্লেখযোগ্য দিঘীগুলোর মধ্যে ছিল- লালদিঘী, রামের দিঘী, মাছুদিঘী, বেকাদিঘী, মজুমদার দিঘী, দস্তিদার বাড়ি দিঘী, সাগরদিঘী, চারাদিঘী, ধোপাদিঘী, রাজার মাই দিঘী, মুরারি চাঁদ দিঘী, ইন্দ্রাণীর দিঘী, কাজলদিঘী, কাস্টঘর দিঘী, কাজিরদিঘী, ব্রাহ্মণশাসন দিঘী, লালাদিঘী প্রভৃতি। সব মিলিয়ে ছোট-বড় ৪০/৫০ টি দিঘী আর জলাধার ছিল নগরজুড়ে। ব্যক্তিমালিকানায় পুকুরেরও কমতি ছিল না। এসব দিঘীর মধ্যে হাতেগোনা ৪/৫ টি এখনো টিকে আছে। ২০/২৫ টি মহল্লার নামকরণে সেসব হারানো দিঘীর গন্ধ পাওয়া যায়।

শুধু দিঘী নয়, প্রায় ২০/২৫ টি খাল ও ছড়া ছিল সিলেট নগর জুড়ে। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এইসব ছড়া ছিল নগরবাসীর পানির প্রধানতম উৎস। এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। যে কয়েকটি এখনো টিকে আছে, সেগুলো এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সিসিক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৩টি বড় ছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এসব ছড়ার দুপাশ দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এই ছড়াগুলো উদ্ধারে এ পর্যন্ত তিনটি প্রকল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন।

কিন্তু কিভাবে এ দিঘীগুলো হারিয়ে গেল? এক্ষেত্রে সিলেট সিটি কর্পোরেশন যেমন দায়ি তেমনি দায়ি প্রত্যেক দিঘীপারের মানুষজন। জনপ্রতিনিধিরা ’উন্নয়ন বড়ি’ দেখিয়ে যখন দিঘী ভরাট করান, তখন স্থানীয় মানুষও নিরব থেকেছেন কিংবা উন্নয়নের সস্তা বড়ি হজম করেছেন। কখনও উচ্ছিষ্টও অনেক স্থানীয়দের কপালে জুটেছে। এজন্য আজ পর্যন্ত কোথাও দিঘী ভরাটের বিরুদ্ধে কোনও পাড়া-মহল্লার লোকদের এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। এটা যেন পরিবেশবাদীদের উপর অর্পিত এক মহান(!) দায়িত্ব।

দিঘী সভ্যতার অন্তরায়, দৃষ্টিকটু কিংবা আধুনিক নগরধারণার বিরোধী-এরকম এক  বদ্ধমূল ধারণা যেন সিলেটের জনপ্রতিনিধি কিংবা নাগরিকদের মানসপটে শেকড় গেড়েছে। দিঘী সৌন্দর্যের এক চমৎকার উপাদান, প্রকৃতির এক আদর্শ বন্ধু। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা অগ্নিকান্ডসহ যেকোন কৃত্রিম সংকটে দিঘী এক প্রয়োজনীয় উপাদান। পানির চাহিদা পুরণে এর ভূমিকা অস্বকীকার করার কোন উপায় নেই। এসব দিঘী থাকলে সামান্য বিদ্যুৎহীনতায় নগরবাসীকে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়তে হতোনা।   

এসব দিঘী কিংবা জলাধার ভরাট শুধু অনৈতিক কাজ নয়, এটা আইনবিরোধীও। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন -২০০০ অনুসারে এটা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু নগরের কর্ণধার কিংবা সরকারের কোন সংস্থা সে আইনের কখনো ধার ধারেনি। দিঘী ভরাটের জন্য কখনো কোনদিন তাদেরকে আইনের সামনেও দাঁড়াতে হয়নি। এজন্য বেপরোয়া হয়ে তারা ক্রমশ: দিঘী ভরাটের মতো বেআইনি কাজে লিপ্ত হচ্ছে। মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে নগরীতে একটি পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে যেটিকে রক্ষার নামে মাত্র বছরখানেক আগেও প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছে। নানা অজুহাত, কৌশল, স্বপ্ন আর উন্নয়নের নামে নগরীর দিঘী, জলাধার, খাল, ছড়াকে নগরায়নের নামে অপরিকল্পিতভাবে দখল ও ভরাট করা হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির জন্য ভোগান্তি আমাদের নীতিনির্ধারক আর নগরবাসীকে খানিকটা হলেও ভাবার অবকাশ দিয়েছে। ’দিঘীর শহর’ এর এখনো টিকে থাকা দিঘীগুলো যেন রক্ষা পায়- কায়মনে এটাই এখনকার আমাদের প্রার্থনা। একইসাথে এটা যেন পূর্বপুরুষের কৃতকর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এক বাহণ হিসেবে কাজ করুক।

আব্দুল হাই আল-হাদী, লেখক ও পরিবেশ সংগঠক।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন