আজ শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১ ইং

‘এন্টিবায়োটিক-এর কার্যকারিতা রক্ষা করতে এখনই দরকার সতর্কতা এবং সচেতনতা’

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১১-২৪ ১২:৪৫:৪৪

ডা: মো: আব্দুল হাফিজ শাফী :: আমাদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে নানাবিধ রোগ হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলোকে যেসব ঔষধ ধ্বংস করতে পারে সেগুলো এন্টিবায়োটিক। তাই এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার বিশ্ববাসীর জন্য ছিল আশীর্বাদস্বরুপ। এই ঔষধগুলো সাধারণত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার প্রাচীর বা ভিতরের বিভিন্ন অংশের সাথে যুক্ত হয়ে ব্যাকটেরিয়াগুলোকে নিস্ক্রিয় করে বা ভেঙে ফেলে৷ সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘদিন এক জাতীয় ওষুধ নিয়ম না মেনে প্রয়োজন ছাড়া যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে, টিকে থাকার তাগিদে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের গঠনগত পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট সেই ওষুধকে অকার্যকর করে ফেলতে পারে। তাই এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের কথা মনে করিয়ে দিতে প্রতি বছর নভেম্বর মাসের এই সময়ে সপ্তাহব্যাপী বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ পালিত হয়ে থাকে। এবছর ১৮ থেকে ২৪ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী এই বিশেষ সচেতনতা সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা সপ্তাহ ২০২০ সালের থিম বা স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে “Antimicrobials: handle with care.” অর্থাৎ অত্যন্ত যত্ন এবং দক্ষতার সাথে এন্টিমাইক্রোবায়ালস্/এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে এবং পরিচালনা করতে হবে।

***এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কি? :

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে 'অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স' হলো এমন একটি অবস্থা, যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এরা অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে নিজেদের গঠন পরিবর্তন করে ফেলে, তখন ধ্বংস না হয়ে নিজেদের স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। আগে যে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে তাদের রোগ সেরে যেত, এখন আর সেই অ্যান্টিবায়োটিকে সেই অসুখতো কমেইনা, বরং ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থাৎ কোনো মানুষ এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয় না, হয় তার শরীরে যে ব্যাকটেরিয়া আছে সেগুলো।

***কেন হয় এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স?
১) সঠিক পরিমাণে এবং সময়মতো এন্টিবায়োটিক ওষুধ গ্রহণ না করলে। ওষুধের মাত্রা (dose) নিয়মতান্ত্রিকভাবে মেনে না চলা, অবহেলা করা আমাদের দেশে অন্যতম সমস্যা। একদিকে কম মাত্রায় ওষুধ গ্রহণ করলে জীবাণু ধ্বংস না হয়ে তা জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উস্কে দেয়; আবার অন্যদিকে অতিমাত্রায় গ্রহণ করলে তা দেহে বিষক্রিয়া ছড়ায়।

২) প্রয়োজন ছাড়া যথেচ্ছভাবে এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে। যেমন: ভাইরাল জ্বরে এন্টিবায়োটিক এর যথেচ্ছ ব্যবহার। মৌসুমি জ্বর, পেট খারাপ, সর্দি–কাশি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাইরাসজনিত। ভাইরাসের বিপরীতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।
৩) রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ফার্মেসী থেকে নিজ থেকে এন্টিবায়োটিক খাওয়ার কারণে। তা ছাড়া, এখনো গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতার হার কম। দেখা যায় অসুখ করলে উপায়ন্তর না ভেবে অনেকেই কাছের গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে ছুটে যান। তখন সেই পল্লী চিকিৎসক যথাযথভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই বা নিশ্চিত না হয়ে সকল রোগেরই চিকিৎসায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিচ্ছেন। এন্টিবায়োটিক যেন তাদের কাছে সর্বরোগের দাওয়াই। এক্ষেত্রে গুণগত মানহীন কোম্পানীর এন্টি বায়োটিক ও আর্থিক লাভ তাদের প্ররোচিত করে।
৪) অনেক সময় দেখা যায়, চিকিৎসক পরামর্শ দিলেও সেই অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক এর কোর্স কমপ্লিট করা হয় না। বিষয়টা হচ্ছে সাধারণভাবে বোঝালে ব্যাপারটি এইরকম- মনে করুন কারো গলার টনসিলে Acute infection/প্রদাহ হয়েছে ব্যাকটেরিয়া-জনিত কারণে, এবং চিকিৎসকের পরামর্শে  টনসিলাইটিস এর জন্য এক ধরণের এন্টিবায়োটিক খাবার ওষুধ ব্যবহার করা শুরু করলেন। ডাক্তার বললেন যে অন্তত সাতদিন ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু চারদিনের মাথায় দেখা গেল গলা ব্যথা-জ্বর ভালো হতে শুরু করেছে এবং রোগী তখন এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন ; তখন টনসিল ইনফেকশন ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে যে আসলে সব ব্যাকটেরিয়া মরে নি, যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ওই ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। এটা বিপজ্জনক।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে করণীয় :

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সালের পর এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এর কারণে বেশীর ভাগ এন্টিবায়োটিকেরই কার্যকারিতা থাকবে না। এর মারাত্মক ভয়াবহতা এড়াতে আমাদের যা করতে হবে--
১) ওষুধ খাবার শুরু করার পর সুস্থ অনুভব করলেও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক এর কোর্স অবশ্যই সম্পূর্ণ করতে হবে।  মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না।
২) ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত নিজ থেকে কোনো এন্টিবায়োটিক সেবন করা যাবেনা। নিম্নমানের এন্টিবায়োটিক গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩) ওষুধ বিপণনে যুক্ত ফার্মেসী ব্যবসায়ীদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা নিতে হবে । সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি করতে হবে।

সুতরাং, আসুন এখন থেকে সচেতন হই। রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কিনে এবং তা খেয়ে নিজেকে ও সমাজকে ঝুঁকির মধ্যে যেন ঠেলে না দিই।

লেখক:
ডা: মো: আব্দুল হাফিজ শাফী,
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),
নাক-কান-গলা বিভাগ,
বিএসএমএমইউ (প্রেষণে), ঢাকা।


সিলেট ভিউ ২৪ ডটকম/ ২৪ নভেম্বর ২০২০/পিটি

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন