আজ মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১ ইং

অণুজীব ও বিস্ময়

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২১-০১-১৮ ১১:৩০:৪৯

ড: তামান্না জেরিন :: আমাদের চারিদিকে এক অদেখা ভূবনের বাসিন্দা এই আণুবীক্ষণিক জীবরা। রূপকথার গল্পের চেয়েও বৈচিত্র্যময় তাদের রাজত্ব। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, আর্কিয়া, শৈবাল, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি এই অনুজীবের অন্তর্ভুক্ত। ধারণা করা হয়, আমাদের গ্যালাক্সিতে যত না তারা আছে তার চেয়েও বিস্তৃত এই পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রজাতির অণুজীবরা। শুধু অসুস্থ হলেই তাদের উপস্থিতি হয়তো আমরা অনুধাবন করি যদিও এই ক্ষতিকারক রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীবের সংখ্যা পাঁচ শতাংশেরও কম। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, যদি পৃথিবী থেকে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যায়, তবে সকল প্রাণের জন্য তা হবে হুমকিস্বরূপ। আজ তাদের বিস্ময়কর কিছু অবদান সম্বন্ধে জানবো।

পৃথিবীর জন্মের পর প্রথম যে জীবন এই ধরায় আবির্ভূত হয়েছিল তা ছিল অণুজীব। সময়ের পরিক্রমায় কিছু বিশেষ অণুজীব এই পৃথিবীতে অক্সিজেনের আবির্ভাব ঘটায় যা ধীরে ধীরে প্রাণের উৎপত্তির জন্য অনুকূল একটি পরিবেশ তৈরি করতে সমর্থ হয়। এই পৃথিবীতে প্রায় এক থেকে দুই মিলিয়ন প্রজাতির প্রাণী আছে যাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন অত্যাবশ্যকীয়।  

অণুজীব ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। পরিবেশ যতটা প্রতিকূলই হোক না কেন তাদেরকে পাওয়া যায় সর্বত্র। মাটি, গাছপালা, সমুদ্র থেকে শুরু করে কিছু অনুজীব (যাদেরকে এক্সট্রিমোফাইলস বলা হয়) হিমবাহ, ভূগর্ভস্থ সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট, উষ্ণ প্রস্রবণ এমনকি আগ্নেয়গিরির গলিত লাভায়ও খুঁজে পাওয়া যায়। এই ধরনের এক্সট্রিমোফাইলসের ব্যবহার পিসিআর প্রযুক্তি, জৈব জ্বালানি তৈরিতে এবং জৈব খননে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এবার আসা যাক কীভাবে মিনারেল এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানগুলো চক্রাকারে প্রকৃতিতে আবর্তিত হয়।  গাছের ঝরে যাওয়া লতাপাতা বা মৃত্যুর পর উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ অনুজীবরাই পঁচিয়ে এই উপাদানগুলো মাটিতে মিলিয়ে দেয় যা কিনা আবার গাছ মাটি থেকে নিয়ে তাদের পুষ্টি মেটায়। আর কিছু প্রাণী সেই গাছপালা সরাসরি খেয়ে বা কিছু প্রাণী গাছপালা খায় এমন প্রাণীকে খেয়ে জীবন ধারণ করে। ভাবতেই অবাক লাগে, যদি পৃথিবী থেকে সকল অনুজীব তুলে নেয়া হতো তাহলে পৃথিবীতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহের স্তুপ হয়ে যেত। আবার প্রকৃতিতে কিছু অনুজীব আছে যারা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করে, যাদেরকে খেয়ে বেঁচে থাকে কিছু অনুজীব ও পোকামাকড় যারা আবার অন্যের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এভাবেই আমাদের খাদ্যচক্র বা খাদ্যজালে এই পচনকারী ও খাদ্য উৎপাদনকারী অণুজীবের ভূমিকা অপরিসীম।

আমরা জানি গাছ থেকে আমরা অক্সিজেন পাই। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীর ৫০ শতাংশের বেশি অক্সিজেন আসে তার বিশাল জলীয় ভাগের পৃষ্ঠতলে বসবাসকারী সালোকসংশ্লেষণকারী অণুজীব (ফাইটোপ্লাংটন) থেকে যারা নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করতে পারে।

ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে অনুজীব ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন খাদ্য তৈরিতে যেমন সয়াসস, চিজ, দই, অ্যালকোহল, রুটি, কেক ইত্যাদি। তাছাড়া বিভিন্ন ঔষধ, এন্টিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক, এনজাইম, হরমোন, ভ্যাকসিন এবং বিভিন্ন বায়োমোলিকিউলস তৈরিতে অনুজীব গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরিতে বা তার উৎপাদন বাড়াতে, আবার কখনো জিন আদান-প্রদানের জন্য অনুজীব খুবই উপযোগী বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কৃষি ক্ষেত্রে কীটনাশক ও সার হিসেবে নির্দিষ্ট অণুজীবের ব্যবহার প্রকৃতি ও প্রাণীকুলের জন্য পরিবেশ বান্ধব হতে পারে যা অনেক উন্নত দেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। আমাদের দেশেও সার ও কীটনাশক হিসেবে অনুজীব বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার হলেও তার পরিমাণ খুবই নগণ্য। পরিবেশ বান্ধব এই অণুজীবের ব্যবহার বাড়লে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক বা সারের ব্যবহার অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হবে। অণুজীবের ব্যবহার রোগ প্রতিরোধী বীজ ও গাছ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। শুধু তাই নয়, নির্দিষ্ট অনুজীব শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর বর্জ্য, যত্রতত্র ব্যবহৃত প্লাস্টিক, সমুদ্রে ভাসমান তেল ইত্যাদি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি মজার বিষয় হলো, আমাদের শরীরকে এই অনুজীবরা দখল করে রেখেছে আমাদের নিজের কোষের  চেয়ে প্রায় ১ থেকে ১০ গুণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। আমাদের দেহের ওজনের এক থেকে তিন শতাংশ অধিকার করে আছে এই অনুজীবরা। আমাদের শরীরে কি তাদের ভূমিকা! আমাদের অন্ত্রে যে অনুজীব আছে তারা রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীব থেকে আমাদের রক্ষা করে, খাদ্য হজমে সহায়তা করে, ভিটামিন তৈরি করে, এমনকি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উজ্জীবিত করে। খুব সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার প্রকাশনায় দাবি করা হয় অন্ত্রের অণুজীবরা সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে আমাদের অনুভূতি, মুড, ডিপ্রেশন এবং ক্ষুধাসহ আমাদের বয়োবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত।

যা কিছু দৃষ্টিসীমার বাইরে তা কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা সাম্প্রতিক কোভিড ১৯ এর মহামারীর ভয়াবহতায় হয়তো আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এই অদেখা ভূবনের বাসিন্দারা আমাদের জীবন  ও পরিবেশে রেখে চলেছে সীমাহীন অবদান। যারা অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করেছে বা গবেষণা করেছে তাদেরকে অণুজীব বিজ্ঞানী (মাইক্রোবায়োলজিস্ট) বলা হয়। অণুজীববিজ্ঞানে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করে অণুজীববিজ্ঞানীদের ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি কোম্পানি, হসপিটাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মাসিউটিক্যালস, রিসার্চ অর্গানাইজেশন এবং শিক্ষকতাসহ দেশে-বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের বা গবেষণার সুযোগ আছে। সময় এসেছে অণুজীব সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলাবার। এই আণুবীক্ষণিক জীবের ইতিবাচক অবদানকে মূল্যায়ন করা ও দেশে-বিদেশে তাদের নিয়ে গবেষণার ব্যাপ্তি ও প্রসার ঘটানো।

লেখক: সহকারি অধ্যাপক
অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগ
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
ই-মেইল: tzerin1983@gmail.com

সিলেটভিউ২৪ডটকম/১৮ জানুয়ারি ২০২১/ডেস্ক/মিআচৌ-১৬

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন