আজ শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২০ ইং

করোনার সাথে আগাম বন্যা যেন 'মরার উপর খাড়ার ঘা'

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-০৪ ০২:১৯:৪০

আশরাফ আহমেদ, দিরাই থেকে :: শেষ আশ্রয়ের জায়গাটিও চলে গেছে পানির নিচে। ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় উঠবো, কি বা খাব বুঝে উঠতে পারছি না। ভাইরাসের কারণে অনেকদিন ধরেই কাজ নেই। কিছু সবজি চাষ করছিলাম। এগুলোও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। আমার আর বাঁচার উপায় নাই ভাইজান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন নুরুল ইসলাম।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তেতৈয়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম। শহরের একটি কারখানায় কাজ করে ৬ সদস্যদের পরিবারের ভরনপোষণ করতেন। করোনা ভাইরাসের কারণে কাজ হারিয়ে বাধ্য হয়েই চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। এলাকায় কিছু না পেয়ে নিজেই শুরু করেন সবজির চাষ। ফলন ভাল হওয়ায় আশার আলো দেখছিলেন নুরুল। কিন্তু আগাম বন্যায় তলিয়ে গেছে তার শেষ সম্বলটুকুও। বাড়িতে হাটুঁ পানি। থাকার জন্য অন্য কোন উঁচু জায়গা খুঁজতে বের হয়েছেন। একদিকে ভাইরাস আর অন্যদিকে আগাম বন্যার কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

শুধু নুরুল ইসলামই না, ভাটির দেশ সুনামগঞ্জ জেলার অধিকাংশ উপজেলার মানুষেরই প্রায় একই অবস্থা। ভারি বর্ষণ আর উজান থেকে ধেঁয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে অঞ্চলটিতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। প্লাবিত হয়ে গেছে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসেব মতে, জেলার ১১ টি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের ৪৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেসরকারি হিসেবে যার পরিমাণ এরচেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

জেলার সুরমা, কুশিয়ারা, জাঁদুকাটা, কালনী সহ আশপাশের নদীগুলোর পানি বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত দু'দিনে পানির গতিবিধি কিছুটা কমলেও, বন্যা পরিস্থিতি আরও কিছুদিন থাকবে বলে মনে করছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

বর্ষার শুরুতেই এমন আকস্মিক বন্যায় বসতবাড়ি ও দোকানপাটে ঢুকে পড়েছে পানি। ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক লাখ ভানবাসি মানুষ। রাস্তায় হাটু পানি, কোথাও আবার কোমর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। যার দরুন অনেক অঞ্চলই হয়ে পড়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় খামারিদের মাছগুলো বের হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে গু খাদ্য। কৃষকের সবজিক্ষেতগুলো চলে গেছে পানির নিচে। এমন অবস্থায় অঞ্চলটিতে ইতিমধ্যেই খাবার ও সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। প্লাবিত হওয়া এলাকাগুলোর স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। এতে পানি দূষিত হয়ে বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভানবাসি মানুষের স্বাস্থ্য পতিত হতে যাচ্ছে চরম হুমকির মধ্যে। চারিদিক প্লাবিত হওয়ায় পরিবারগুলো শিশুদের নিয়ে চরম দুঃচিন্তায় আছেন। পানিতে পড়ে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় রকমের কোন দুর্ঘটনা।

এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আগাম বন্যার ফলে মানুষজন চরম দুরবস্থার মধ্যে পতিত হয়ে পড়েছেন। করোনা ভাইরাসের কারণে কাজ হারিয়ে এমনিতেই তারা অসহায় জীবনযাপন করছিলেন। এখন আবার বন্যায় প্লাবিত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দেশের উত্তর পূর্বের জেলাটির মানুষেরা। সংশ্লিষ্টরা বললেও, অনেক দুর্গত এলাকাতে সরকারি সহায়তা এখনও পৌঁছায় নি। আর যাদেরকেই ত্রান দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় সেটিও খুব অপ্রতুল।

জিয়াউর রহমান নামে জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার এক ভানবাসি বলেন, ভাইরাস আর বন্যায় আমাকে শেষ করে দিল ভাই। এ যেন "মরার উপর খাড়ার ঘা"। এখনও কোন সরকারি সহায়তা পাইনি। জিয়াউর বলেন, পরিবার নিয়ে কোথায় যাবো, কি করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সব গজব বুঝি গরিবের জন্য, ভাইজান"।

একই সময়ে ভাইরাস আর আগাম বন্যার ফলে অসহায় মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যায় প্লাবিত হওয়া কিছু পরিবার বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মাথাগোঁজার ঠাঁই পেলেও অধিকাংশই রয়ে গেছেন এর বাইরে। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দি মানুষগুলো। চারদিকে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছেন না তারা।

এলাকার সুধিজনেরা মনে করেন, ভাইরাস ও বন্যার ফলে অসহায় হয়ে পড়া এসব মানুষের জন্য সরকারি সহায়তাগুলো আরও বাড়ানো উচিত। এবং সচ্ছতার সাথে ভানবাসি এসব মানুষের কাছে দ্রুত ক্রাণসহায়তা পৌঁছে দেওয়া দরকার। সাথে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানান, দুর্গত মানুষকে সহায়তার জন্য প্রাথমিকভাবে ৪১০ মেট্রিকটন চাল, ২৯ লাখ ৭০ হাজার নগদ টাকা ও ৫ হাজার পরিবারের জন্য শিশুখাদ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে উল্লেখ করে আব্দুল আহাদ বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনের সকল বিভাগকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

দিরাই উপজেলা খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক প্রশান্ত সাগর দাস বলেন, একই সাথে দুটি দুর্যোগ সামনে চলে আশায় মানুষগুলো অসহায় হয়ে পড়েছে। অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছেন ভানবাসি এসব মানুষ। সরকার, এনজিও সহ সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদেরকে এখনই উচিত ভানবাসি এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/৪ জুলাই ২০২০/এএ/ডিজেএস

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন