আজ রবিবার, ০৭ জুন ২০২০ ইং

স্পেনে প্রতিদিন হাজারো মানুষের হাতে খাবার তুলে দেন বাংলাদেশের রনি

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৪-২২ ২১:৪৬:১৬

কবির আল মাহমুদ, স্পেন থেকে :: করোনার বিস্তার ঠেকাতে স্পেনে চলছে লকডাউন। লোকজন গৃহবন্দী। এ সময় রেস্টুরেন্ট এর কুক শেফরা ও ঘরে বসে আছেন। তাঁদের একজন বাংলাদেশী এস এইচ রনি। তিনি পেশাদার শেফ। পর্যটন নগরী বার্সেলোনা শহরে প্রসিদ্ধ বড়মুত (তাপাস বার) রেস্টুরেন্টে প্রতিদিন কয়েক শত গ্রাহকের জন্য খাবার তৈরি করতেন। এখন প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য তৈরি করেন খাবার। এসব খাবার প্রতিবেশী অসহায়, বৃদ্ধ ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে বিলিয়ে দেন। তাঁদের ক্ষুধা নিবারন করান।

মার্চের শেষ দিকের কথা। এস এইচ রনি দেশটির পর্যটন নগরী বার্সেলোনায় বড়মুত তাপাস রেস্টুরেন্টে কাজ করছিলেন। সে সময় করোনা রোগী শনাক্ত হয়, আর সবকিছু থমকে যায়।

এই করোনাকালের বর্ণনা দিতে গিয়ে এস এইচ রনি বলেন, ‘সবই থমকে যায়। সবার জীবনে ছন্দপতন ঘটে। বার, সিনেমা, থিয়েটার রেস্টুরেন্ট সব বন্ধ হয়ে যায়। আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। জানি না আবার আগের মতো সচল হবে কি না এই পর্যটনকেন্দ্র এবং রেস্টুরেন্টগুলো। এখন তো এমন দুঃসময়, শতাধিক পর্যটক-কাস্টমার ভরা কোনো বার রেস্টুরেন্টের কথা কল্পনাই করা যায় না!  একসময় লকডাউন উঠে যাবে। হয়তো এরপরও কয়েক মাস কেটে যাবে সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে। এমনও হতে পারে, আগে যেমন ছিল আমাদের জীবন, তেমনটি আর থাকবে না।’

কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না। সংকটের দিনেও বয়েই চলে। শেফ কুকরা ও বসে থাকতে পারেন না। এস এইচ রনি বলেন, ‘মার্চে আমার এক স্প্যানিশ সহকর্মী খুয়ান মানুয়েল উম্বার্ট একটা আহ্বান জানান। আমাদের রেস্টুরেন্টে যত শেফ-কুকরা আছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই যেন প্রতিদিন একত্রিত হয়ে আমাদের চার পাশের অন্ততঃ এক হাজার লোকের জন্য ফুড তৈরী করি। মানবতার সেবায় "ফুড ফর গুড (FOOD FOR GOOD)" নামে এসব খাবার প্রতিবেশী অসহায়, বৃদ্ধ ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিনা মূল্যে বিলিয়ে দেই। তাঁদের ক্ষুধা নিবারন করার চেষ্টা করি।

এস এইচ রনি বলেন, ‘প্রথম প্রথম আমাদের জড়তা ছিল। খটকা লাগত। কারণ, আমরা কি পারবো প্রতিদিন এতোসব মানুষের খাবার তৈরী করতে, আমরা আবার আটকে যাবো নাতো মাঝপথে? দ্বিধা নিয়েই আমরা শুরু করি ফুড তৈরীর কাজ। বার্সেলোনা শহরকে মোট দুইটি জোনে ভাগ করে চালু করি খাবার বিতরনের কাজ ।এসব খাবার দিয়ে আনন্দ পাই দেখে তাঁদের মুখে হাসি। খাবার পেয়ে তাঁরা ও বেশ খুশি। টের পাই, প্রতিবেশীরা মুগ্ধ । এরপর খাবার দিয়ে, তাঁদের উদ্দেশে বলি, কাল আবার আসবো খাবার নিয়ে, দেখা হবে।’

নিত্যদিনের এসব খাদ্যসামগ্রী তৈরী ও বিতরণে রনিকে সহযোগীতা করছেন তার সহকর্মীরাই। তারা ও বাড়িয়ে দিচ্ছেন সহযোগীতার হাত। তারা হচ্ছেন, আলেক্স (হন্ডুরাস), খসে (আর্জিন্টিনা), তাফাজ্জল হোসেন (বাংলাদেশ), ইব্রাহীম (বাংলাদেশ), হারজিন্দের (ইন্ডিয়া), গৌরভ (নেপাল) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ।

আমাদের এসব কার্জক্রমে মুগ্ধ হয়ে ইতিমধ্যে শহরের বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও এগিয়ে এসেছে আমাদের সহযোগিতায়। আমরা ও আনন্দের সাথে গ্রহণ করে চালিয়ে যাচ্ছি আমাদের এই কাজ।

এরপর থেকে প্রতিদিন চলছে তাদের এই কাজ। এস এম রনি তাঁর চারপাশের মানুষগুলোকে ফুড দিয়ে করছেন তাদের ক্ষুধা নিবারণ। তিনি বলেন, ‘গরীব ও দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু করার মতো সুযোগ প্রতিদিন আসে না এবং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এ সুযোগ সবাইকে দেয় না। তাই আমরা সর্বস্ব চেষ্টা করছি যে যারা না খেয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে তাদের মুখে যদি এক বেলার খাবারও পোঁছানো যায় তাহলে আমরা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করবো”। তিনি আরো বলেন, ‘জানি, আমার এসব খাবারে হয়তো কারও শরীরের অসুখ সারবে না, তবে আমাদের মনের রোগ তো সেরে যায়। সময় কেটে যায় তৃপ্ততায়।’

সিলেটভিউ২৪ডটকম/২২ এপ্রিল ২০২০/কবির/পিডি

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন