আজ শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮ ইং

তারাবির নামাজে রাকাত সংখ্যা কত- বিশ, নাকি তারও কম

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৮-০৫-১৫ ১৯:৩১:০১

আলী ফজল মোহাম্মদ কাওসার ::  রমজানে তারাবির নামাজে রাকাত সংখ্যা নিয়ে অনেকের মধ্যে মত-পার্থক্য আছে। বর্তমানে কিছু কিছু আলেম ও সাধারণ মুসলিম ভাইদের দেখা যাচ্ছে যারা অনলাইনে ও অফলাইনে তারাবির রাকাত সংখ্যা ৮ এটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ প্রচেস্টা চালাচ্ছেন। তারাবীহ ও তার রাকাত সংখ্যা নিয়ে চলমান ধুম্রজাল সৃষ্টির ফলে সরলমনা মুসলিমদের ২০ রাকাতের পরিবর্তে ৮ রাকাত পড়তে উবুদ্ধ করছেন, যার কুফল বিভ্রান্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এমনকি অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে বলছে, এত দ্বিধা দন্দ কেন ইসলামের এই বিষয় গুলোতে! আবার কেউ কেউ পূর্ববর্তী আলেমদেরকে কটাক্ষও করছেন, যে উনাদের কারণেই নাকি ইসলামের এই অবস্থা। সর্বোপরি নাজুক একটা পরিস্থিতি।

নবীজির (সা) প্রাণ প্রিয় খলিফা হযরত উমর (রা) এর আমলে তারাবির নামায বিশ রাকাত হওয়ার উপর সমস্ত সাহাবাদের ঐকমত বা ইজমাহ হয়েছে। এরপর হতে অদ্যাবধি মক্কার হারাম শরিফ এবং মদিনার মসজিদে নববীতে তারাবির নামাজ বিশ রাকাত পড়া হচ্ছে। মুজাতাহিদ ইমামগনও এই বিষয়টাতে ঐক্যমত প্রকাশ করে আমল করে আসছেন ১৪০০ বছর যাবত। "নতুন সৃষ্ট ফেরকার" এই বিভ্রান্তির জবাবে তারাবীহ সালাতের রাকাত নিয়ে দলিল ভিত্তিক আলোচনা করেছেন অনেক বিজ্ঞ আলেম ও উলামা। আজ দলিল ভিত্তি একটি লেখাটি সংগ্রহ করেছি আমি, এবং এই ফেরকার ফেতনা থেকে মুক্ত হয়ে স্পষ্ট ভাবে বুঝে নিতে দ্বিনি ভাইদের উদ্দেশ্যে শেয়ার করছি লেখাটি, পোস্টটির মূল লেখক মার্কাজুল উমর ফেনী মাদরাসার পরিচালক মাওলান নুরুন্নবি ভাইজান। আল্লাহ্ উনাকে উত্তম জাযা দিন – আমীন।

সমগ্র দুনিয়ায় মাযহাবের গুলোর অনুসারীরা ২০ রাকাত তারাবির উপর আমল করে যাচ্ছেন, যা সাহাবীদের যুগ থেকেই তাবেঈ তাবে তাবেঈনদের আমলের মধ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত চলমান। শুধুমাত্র "নতুন সৃষ্ট ফেরকার" অনুসারীরা, সহিহ হাদিসের চটকদার স্লোগানের অন্তরালে সম্প্রতি তারাবীহ আট রাকাত হওয়ার কথা বলে জনমনে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টি করে চলেছে, সরল প্রান মুসলিমদের হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চেষ্টা করছে তারাবীহ ২০ রাকাত নয়। অথচ তারাবীহ আট রাকাত হওয়ার পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস নেই, এখানে সবার সম্মুখে বিশদভাবে তুলে ধরবো, ইনশাআল্লাহ।

নতুন এই ফেরকার ভাইরা তারাবি আট রাকাত হওয়ার পক্ষে নিচের হাদিস দ্বারা দলিল (?) দিতে চায়ঃ

হাদিসঃ ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺳﻠﻤﺔ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺃﻧﻪ ﺳﺄﻝ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ ﻛﻴﻒ ﻛﺎﻧﺖ ﺻﻼﺓ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ؟ ﻓﻘﺎﻟﺖ : ﻣﺎ ﻛﺎﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺰﻳﺪ ﻓﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﻭﻻ ﻓﻲ ﻏﻴﺮﻩ ﻋﻠﻰ ﺇﺣﺪﻯ ﻋﺸﺮﺓ ﺭﻛﻌﺔ ﻳﺼﻠﻲ ﺃﺭﺑﻌﺎ ﻓﻼ ﺗﺴﻞ ﻋﻦ ﺣﺴﻨﻬﻦ ﻭﻃﻮﻟﻬﻦ ﺛﻢ ﻳﺼﻠﻲ ﺃﺭﺑﻌﺎ ﻓﻼ ﺗﺴﻞ ﻋﻦ ﺣﺴﻨﻬﻦ ﻭﻃﻮﻟﻬﻦ ﺛﻢ ﻳﺼﻠﻲ ﺛﻼﺛﺎ فقلت يا رسول الله أ تنام قبل أن توتر ؟ قال يا عائشة ان عيني تنامان ولا ينام قلبي.

অনুবাদঃ আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আয়েশা রা. কে জিজ্ঞাসা করেন যে, রমযানে নবীজীর নামায কেমন হত? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে এবং রমযানের বাইরে এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না! এরপর আরও চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা তো বলাই বাহুল্য! এরপর তিন রাকাত (বিতর) পড়তেন।

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) [আরো] বলেন, আমি রাসূল (সা)- কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ’র রাসুল! আপনি কি বিতিরের নামায আদায়ের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েন? উত্তরে তিনি বললেন, হে আয়েশা, আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার অন্তর ঘুমায় না।” [এ পর্যন্ত হাদিসের অনুবাদ সমাপ্ত হল]

{সহীহ বুখারী ১/১৫৪, হাদীস ১১৪৭; সহীহ মুসলিম ১/২৫৪, হাদীস ৭৩৮; সুনানে নাসায়ী ১/২৪৮, হাদীস ১৬৯৭; সুনানে আবু দাউদ ১/১৮৯, হাদীস ১৩৩৫; মুসনাদে আহমদ ৬/৩৬, হাদীস ২৪০৭৩}

দলিলের অযৌক্তিকতা ও খণ্ডন উল্লিখিত হাদিসকে কয়েকটি কারণে আট রাকাতের দলিল বানানো যুক্তিসংগত নয়। বিস্তারিত নিম্নরূপ –

যুক্তি খন্ডন - ১ : “তারাবীহ” (تراويح) শব্দটি বহুবচন। তার একবচন হল “তারবীহ” (ترويح)। কিন্তু আভিধানিক অর্থে “তারবীহ” (ترويح) বলা হয় একবার বিশ্রাম নেয়াকে। শরিয়তের পরিভাষায় রামাদ্বানের রাতে তারাবীর প্রতি চার রাকাত বা’দ বিশ্রাম নেয়াকে (একবচনে) “তারবীহ” (ترويح) বলা হয়। পরবর্তীকালে এটিই তার আভিধানিক অর্থে রূপান্তরিত হয়ে যায়। [সূত্র— মেসবাহুল লুগাত, পৃষ্ঠা ৩২২]

বুখারি শরিফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “ফাতহুল বারী” কিতাবে আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার (রহ) তিনিও লিখেছেন, তারাবীহ (تراويح) বহুবচন শব্দ, তার একবচন “তারবীহ” (ترويح)। তার মানে হল, একবার বিশ্রাম নেয়া। সে হিসেবে দুই বার বিশ্রাম নেয়াকে “তারবিহাতান” বা “তারবিহাতাঈন” ترويحتان او ترويحتين বলা হবে।

এখন বুঝুন, আরবীতে বচন হয় তিনটি। একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন। রামাদ্বানে প্রত্যেক চার রাকাত বা’দ আরাম করা হয়। যদি তারাবির নামায আট রাকাত হত, তাহলে ৪+৪= ৮ রাকাত তারাবির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দুই বারই বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ থাকে। যা বচনের ক্ষেত্রে দ্বিবচন হয়। ফলে তাকে আরবী ভাষায় (বহুবচনে) তারাবীহ (تراويح) বলা যাবেনা, বরং দুই বার বিশ্রাম নেয়ার কারণে (দ্বিবচনে) “তারবিহাতান” বা “তারবিহাতাঈন” ترويحتان او ترويحتين বলা যেতে পারে।

অথচ আরবী ভাষায় (বহুবচনে) তারাবীহ (تراويح) হতে হলে তিনের অধিক বার বিশ্রাম নিতে হয়। তাই অভিধান অনুসারে তিনবার বা ততোধিক বার বিশ্রাম নিতে হলে তখন তারাবির রাকাত সংখ্যা আট রাকাত হওয়ার মোটেই সুযোগ থাকেনা, বরং তখন তারাবির রাকাত সংখ্যা বারো অথবা তার চেয়েও অধিক তথা বিশ রাকাতই হতে হয়, যা যুক্তিক ও বিবেকগ্রাহ্য।

অতএব তারাবির রাকাত সংখ্যা আট রাকাত নয়, বরং তার চেয়েও অধিক তথা বিশ রাকাত।

যুক্তি খন্ডন ২ : মূলত তাহাজ্জুদ নামাযের সাথেই উক্ত হাদিসটির সম্পর্ক। কারণ হযরত আয়েশা (রা) রামাদ্বান এবং অন্যান্য মাস তথা পুরো বছরের কথা উল্লেখ করেছেন। উনার ভাষ্য হল : ﻓﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﻭﻻ ﻓﻲ ﻏﻴﺮﻩ অর্থাৎ “রামাদ্বান এবং অন্যান্য মাসে এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না”। তার মানে রাসূল (সা) রামাদ্বান ছাড়াও পুরো বছর ব্যাপী এ এগার রাকাত আদায় করতেন। অথচ তারাবির সম্পর্ক তো শুধু মাহে রামাদ্বানের সাথে। যার বাহিরে অন্যান্য মাসে তা পড়া হয় না। ফলে বুঝা গেল, হাদিসটিতে উল্লিখিত বিতির সহ মোট এগার রাকাতের সম্পর্ক তারাবির সাথে নয়, বরং তাহাজ্জুদের নামাযের সাথেই সম্পর্ক। সুতরাং প্রমাণিত হল যে তারাবির রাকাত সংখ্যা আট নয়, বরং বিশ রাকাত।

যুক্তি খন্ডন ৩ - তারাবির নামায রাসূল (সা) থেকে এশার পর আদায় করার কথা যেমন উল্লেখ রয়েছে, তেমনি উল্লেখ রয়েছে শেষ রাতে বিতির সহ তাহাজ্জুদের নামায আদায় করার কথা। হাদিসে এ বাক্যটি রয়েছে এরকম যে يا رسول الله ا تنام قبل أن توتر؟ অর্থাৎ হে আল্লাহ’র রাসূল! আপনি কি বিতির পড়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়েন? এ বাক্যাংশটি দ্বারাও এ কথা প্রমাণ হল যে, উক্ত হাদিসটির সম্পর্ক তাহাজ্জুদের সাথে, তারাবির সাথে নয়। কারণ ঘুমিয়ে পড়লে তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত পেরিয়ে যাওয়ার আশংকা থাকতে পারে। তাই রাতের শেষাংশে রাসূলের বিতির পড়ার যে নিয়ম, তা উপেক্ষা করে রাতের প্রথমাংশে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন কিনা এ ব্যাপারে সতর্ক করাই উক্ত বাক্যাংশের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

সামগ্রিক ভাবে প্রমাণ হল, উল্লিখিত হাদিসে বিতির সহ এগার রাকাতের সম্পর্ক তারাবির সাথে নয়। কেননা রাসূল (সা) তিনি রাত্রের প্রথমাংশে ঘুমাতেন এবং বিতিরের নামায তাহাজ্জুদের সাথে আদায় করতেন। বুখারি শরিফে এ কথার সমর্থনে গোটা এক খানা হাদিসই উল্লেখ রয়েছে। যেমন – সহিহ বুখারির অপর আরেকটি হাদিসে এসেছে :

ﻭﻓﻲ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻋﻦ ﺍﻷﺳﻮﺩ ﻗﺎﻝ ﺳﺄﻟﺖ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ ﻛﻴﻒ ﻛﺎﻧﺖ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺑﺎﻟﻠﻴﻞ؟ ﻗﺎﻟﺖ: ﻛﺎﻥ ﻳﻨﺎﻡ ﺃﻭﻟﻪ ﻭﻳﻘﻮﻡ ﺁﺧﺮﻩ ﻓﻴﺼﻠﻲ ﺛﻢ ﻳﺮﺟﻊ ﺇﻟﻰ ﻓﺮﺍﺷﻪ. ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ .

অনুবাদঃ বিশিষ্ট তাবেয়ি হযরত আসওয়াদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা) -কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলের (সা) রাত্রিকালীন নামায কেমন ছিল? তিনি উত্তরে বললেন, রাসূল (সা) তিনি রাত্রের প্রথমাংশে ঘুমাতেন আর শেষাংশে কিয়ামুল লাইল করতেন তথা তাহাজ্জুদ পড়তেন। এরপর সালাত আদায় শেষে তিনি বিছানায় তাশরিফ নিতেন। সূত্র— সহিহ বুখারি শরিফ।

যুক্তি খন্ডন ৪ - হাদিসটির খন্ডাংশ “ولا في غيره অর্থাৎ অন্য মাসেও” হযরত আয়েশা (রা) -এর এ জবাবটি দ্বারা রাসূলের পুরো বছর তাহাজ্জুদ পড়া প্রমাণিত। প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, আল্লাহ’র রাসূল (সা) মাহে রামাদ্বানেও তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেন, নাকি তারাবির কারণে তা ছেড়ে দেন? প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তিনি জ্ঞানগর্ভ জবাব দিয়েছেন।

হযরত আয়েশা (রা)-এর জ্ঞানগর্ভ জবাবটি হল : “আল্লাহ’র রাসূল (সা) রামাদ্বান এবং রামাদ্বানের বাহিরে বিতিরের নামায সহ এগার রাকাত আদায় করতেন। চার চার রাকাত করে মোট আট রাকাত আর তিন রাকাত বিতিরের নামায আদায় করতেন।

"নতুন সৃষ্ট ফেরকার" ভাইরা জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে কিংবা তাদেরকে (নতুন গাজানো শায়েখগন কতৃক) ভুল বুঝানোর ফলে বুখারি শরিফের উক্ত হাদিসটি দ্বারা তারাবির আট রাকাতের পক্ষে দলিল (?) দেয়। এটি ছাড়া তাদের মেরুদণ্ডহীন মতবাদটির পক্ষে দ্বিতীয় আর কোনো দলিল নেই। মজার ব্যাপার হল, বুখারি শরিফের উক্ত হাদিসটিতে রাসূলেপাকের (সা) উক্ত আট রাকাত দু সালামে চার চার রাকাত করে পড়ার কথাই উল্লেখ পাওয়া যায়। বিতিরের নামাযের রাকাত সংখ্যা “তিন” হওয়ার কথাও প্রমাণিত।

যুক্তি খন্ডন ৫ - হযরত আয়েশা (রা)-এর উক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা যদি তারাবিই বুঝানো উদ্দেশ্য হত, তাহলে হযরত উমর (রা)-এর খেলাফত আমলে যখন বিশ রাকাতের উপর উম্মাহ’র ইজমা হল, তখন হযরত আয়েশা (রা) তার বিরুধিতা করেননি কেন? হক্বকথা বলা থেকে তিনি চুপ ছিলেন কেন? অথচ তিনি তখনো জীবিত ছিলেন। হযরত আয়েশা (রা) নবীজি (সা) থেকে মোট ২২১১টি হাদিস রেওয়ায়েত করেছিলেন এবং ৫৭ বা ৫৮ হিজরীতে ইন্তিকাল করেছিলেন।

যুক্তি খন্ডন ৬ - আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন- “আর আমার কাছে এটি প্রকাশিত হয়েছে যে, ১১ রাকাতের থেকে না বাড়ানোর রহস্য এটি যে, নিশ্চয় তাহাজ্জুদ ও বিতরের নামায রাতের নামাযের সাথে খাস। আর দিনের ফরয যোহর ৪ রাকাত আর আসর সেটাও ৪ রাকাত আর মাগরীব হল ৩ রাকাত, যা দিনের বিতর। সুতরাং সমতা-বিধান হল রাতের নামায দিনের নামাযের মতই সংখ্যার দিক থেকে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত হওয়া। আর ১৩ রাকাতের ক্ষেত্রে সমতা-বিধান হল, ফযরের নামায মিলানোর মাধ্যমে। কেননা এটি দিনের নামাযই তার পরবর্তী নামাযের মত। (ফাতহুল বারী শরহুল বুখারী-৩/১৭)

ইবনে হাজার (রহ) এর এই রহস্য বা হিকমত বর্ণনা কি বলছেনা, এই হাদিস দ্বারা তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য, কিন্তু তারাবীহ উদ্দেশ্য নয়? এই বক্তব্যে তাহাজ্জুদের কথা স্পষ্টই উল্লেখ করলেন ইবনে হাজার (রহ)।

তাহাজ্জুদ ও তারাবীহের মাঝে পার্থক্যঃ

কথিত আমার "নতুন সৃষ্ট ফেরকার" ভাইরা ইদানীং বুলিও পাল্টেছেন এখন উনাদের কেউ কেউ বলেন, “তাহাজ্জুদ আর তারাবীহ একই”।

নিম্নবর্ণিত কারণে তাদের এই দাবিটিও ভুল।

১. তাহাজ্জুদের মাঝে ডাকাডাকি জায়েজ নয় তারাবীহতে জায়েজ।
২. তারাবীহের সময় ঘুমানোর আগে তাহাজ্জুদের সময় নির্ধারিত নয় তবে উত্তম ঘুমের পর।
৩. মুহাদ্দিসীনে কিরাম তাহাজ্জুদ ও তারাবীহের অধ্যায় ভিন্ন ভিন্ন লিখেছেন।
৪. তাহাজ্জুদ নামাযের হুকুম কুরআন দ্বারা প্রমাণিত যথা সূরা ইসারার ৭৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ﻭَﻣِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ﻓَﺘَﻬَﺠَّﺪْ ﺑِﻪِ ﻧَﺎﻓِﻠَﺔً ﻟَّﻚَ ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥ ﻳَﺒْﻌَﺜَﻚَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻣَﻘَﺎﻣًﺎ ﻣَّﺤْﻤُﻮﺩًﺍ অর্থাৎ আর রাতে তাহাজ্জুদ পড় এটি তোমার জন্য নফল, অচিরেই তোমাকে তোমার রব প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।
আর তারাবীহের ব্যাপারে আল্লাহর নবী বলেন-নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা রামযানের রোযা তোমাদের উপর ফরয করেছেন আর আমি তোমাদের উপর এতে কিয়াম করাকে সুন্নত করেছি। (সুনানে নাসায়ী-১/৩০৮)। সুতরাং বুঝা গেল তাহাজ্জুদ আল্লাহর আয়াত আর তারাবীহ নবীজীর বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত।
৫. তাহাজ্জুদের হুকুম মক্কায় হয়েছে আর তারাবীহের হুকুম মদীনায় হয়েছে।
৬ . ইমাম আহমাদ রহঃ ও তারাবীহ তাহাজ্জুদ আলাদা বিশ্বাস করতেন। (মাকনা’-১৮৪)।
৭ . ইমাম বুখারী (রহ)- এর ক্ষেত্রে বর্ণিত আছে, তিনি রাতের প্রথমাংশে তার সাগরীদদের নিয়ে তারাবীহ পড়তেন আর শেষ রাতে একাকি তাহাজ্জুদ পড়তেন। (ইমাম বুখারী রহঃ এর জীবনী)।

আফসোস! এই ফেতনা বাজ "নতুন সৃষ্ট ফেরকার" ভাইরা তারাবির নামায চার চার রাকাত করে মোট দুই সালামে আদায় করার বিপরীতে দুই দুই রাকাত করে মোট চার সালামে তা আদায় করে। বিতির আদায় করে শুধু এক রাকাত। এছাড়াও হাদীসে রমদ্বান ও অন্যান্য মাসের কথাও উল্লেখ রয়েছে , অথচ তারা তাদের হাদীস অনুযায়ী ৪ রাকাত করে ত পড়েই না বরং অন্যান্য মাসে তারাবীহ পড়ে না (হাদিস অনুযায়ী ই আমল করতে চাইলে)। যা সুস্পষ্টভাবে তাদেরই উদ্ধৃত সহিহ হাদিসের খেলাফ এবং চরম বিভ্রান্তিকর। আবারো প্রমাণিত হল, উক্ত হাদিসটি মোটেও (কথিত) আহলে হাদিসের দাবির পক্ষে নয়, বরং তা দ্বারা বিতির সহ মোট এগার রাকাত তাহাজ্জুদের নামাযই প্রমাণিত।

এই "নতুন সৃষ্ট ফেরকার" আলেমরা রামাদ্বানের বাহিরে এর নাম দিয়ে থাকে “তাহাজ্জুদ” আর মাহে রামাদ্বানের তারাবিকে কখনো “ক্বেয়ামে রামাদ্বান” আবার কখনো “ক্বেয়ামুল লাইল” নাম দিয়ে থাকে। আসলে তারা এরকম দোটানা আচরণ করে কি বুঝাতে চাচ্ছে যে, তারাবির নামায বলতে কিছুই নেই??

তারাবি নামায ২০ রাকাত হওয়া বিষয়েঃ
তারাবি নামায ২০ রাকাতের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, প্রখ্যাত সাহাবায়ে কেরামগণ (রাঃ) তারাবি নামায ২০ রাকাতের পক্ষে বর্ণনা করেছেন। আর তাঁরা হলেন, খলিফা হযরত উমর ফারুক (রাঃ)। তাফসিরে ইবনে কাসির প্রণেতা উল্লেখ করেছেন, রাসূল (সাঃ) উনার চাচা

* হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ),
* হযরত আবুযর গিফারী (রাঃ),
* হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ),
* হযরত হাসান (রাঃ),
* হযরত ইবনে আবিল হাসনা (রাঃ),
* হযরত আবদুল আজিজ ইবনে রুফাহ (রাঃ)।

প্রমূখ সাহাবায়ে কেরামগণ (রাঃ)-ও তারাবি নামায ২০ রাকাতের পক্ষে বর্ণনা করেছেন।

মোল্লা আলী ক্বারী (রাঃ) তাঁর পূর্বের ইমামগণ হতে সংগৃহীত একটি হাদিস মিরকাত শরহে মিশকাতের ২য় খণ্ডের১৩৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। হাদিসটি হচ্ছে “রাসূল (সাঃ)-এর এরশাদ হচ্ছে, সাহাবায়ে কেরামের (রাঃ) ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত শরয়ী বিধান নিঃশর্তভাবে অনুসরণ করা উম্মতের জন্য আবশ্যক”। সুতরাং এরূপ ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করা ইমান নষ্ট হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাসূল (সাঃ) ২০ রাকাত তারাবি নামাজ আদায় করতেন, এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ হচ্ছেঃ

* আল সুনানুল কুবরা বায়হাকীর ২য় খণ্ডের ৬৯৮ পৃষ্ঠার ৪২৮৬ নং হাদিস, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবি ও বিতির নামাজ আদায় করতেন।

* মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ-এর ২য় খণ্ডের ১৬৩ পৃষ্ঠায় ৭৬৮০ নং হাদিসে হযরত শুতাইর ইবনে শাকাল (রাঃ) এবং হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ), তারীখু জুয়জান হামযাহ সাহমী (রাঃ) গ্রন্থের ১৩১৭ পৃষ্ঠায় ৫৫৭ নং হাদিসটিতেও একই রকম বর্ণনা রয়েছে।

এ ছাড়া হযরত আবু যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত সুনান তিরমিজির ৩য় খণ্ডের ১৬১ ও ১৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ৮০৬ নং হাদিসটিতে তিনি উল্লেখ করেন। তারাবির নামাজে রাসূল (সাঃ) কিয়ামুল লাইলও করতেন বলে উল্লেখ করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদা হযরত উমর ফারুক (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), ২০ রাকাত তারাবি নামাজ আদায় করতেন। আর এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ হলো:

* ছিয়া-ছিত্তাহ হাদিস গ্রন্থসমূহের অন্যতম আবু দাউদ শরীফ-এর ২য় খণ্ডের ১৪২৯নং পৃষ্ঠায় হযরত হাসান (রাঃ) বলেন, হযরত উমর খাত্তাব (রাঃ) সকলকে হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রাঃ) এর পেছনে একত্র করলেন, তখন ইবনে কা'আব (রাঃ) তাদের ইমামতি করে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করলেন।

* সুনানু বাইহাকীর ২য় খণ্ডের ৬৯৯ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ৪২৮৯ নং হাদিসে হযরত সায়ীব ইবনে ইয়াজিদ (রাঃ) বলেন, হযরত উসমান ইবনে আফকান (রাঃ) এর খিলাফতের সময়ে নামাজিরা দাঁড়ানোর কষ্টে লাঠিতে ভর দিতেন তবুও ২০ রাকাত তারাবির নামাজ কম পড়তেন না।

* মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাইর ২য় খণ্ডের ১৬৩ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ৭৬৮১ নং হাদিসে হযরত ইবনে আবিল হাসনা (রাঃ) বলেন, হযরত আলী (রাঃ) এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিলেন রমজানে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়তে।

এ প্রসঙ্গে আরো হাদীসঃ
# -জামে তিরমিযী, হাদীস নং ৮০৬।
# -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৭৬৮০, ৭৬৮১, ৭৬৮২, ৭৬৮৩, ৭৬৮৪, ৭৬৮৫।
# -সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী, হাদীস নং ৪২৯০, ৪২৯১, ৪২৯২।
# -মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৭৭৩৩।
# -আল-মু’জামুল কাবীর লিত- তাবারানী, হাদীস নং ১২১০২।
# -আল-মু’জামুল আওসাত লিত-তাবারানী, হাদীস নং ৭৯৮।
# -কিতাবুল উম্ম ১/১৬৭। এ ছাড়াও আরো অসংখ্য দলীল রয়েছে। সংক্ষেপে অল্প কিছু সংখ্যক দলীল উল্লেখ করা হলো।

[বি: দ্র: হাদীস নাম্বার ও রেফারেন্সের ক্ষেত্রে “মাকতাবায়ে শামিলা” অনুসরণ করা হয়েছে।]

প্রিয় পাঠক! যে হাদিসের উপর তাদের "নতুন সৃষ্ট ফেরকার" নিজেদেরই আমাল নেই, সে হাদিসটি আমাদের আহলে সুন্নাহ’র মুসলিমদের বিপরীতে এবং তাদের স্বপক্ষে দলিল হতে পারে কিভাবে, তা কি একটু বলবেন? ?

মাযহাবের অনুসারীরা বিশ রাকাত তারাবির উপর আমল করে যাচ্ছেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) [মৃত্যু ২০২ হি.] বলেন—

ﻭﺃﺣﺐ ﺇﻟﻰ ﻋﺸﺮﻭﻥ ﻷﻧﻪ ﺭﻭﻯ ﻋﻦ ﻋﻤﺮ ﻭﻛﺬﻟﻚ ﻳﻘﻮﻣﻮﻥ ﺑﻤﻜﺔ – ﺃﻱ : ﺑﻌﺸﺮﻳﻦ – ﻭﻳﻮﺗﺮﻭﻥ ﺑﺜﻼﺙ

অর্থাৎ তারাবীহ ২০ রাকাআত আদায় করা আমার কাছে পছন্দনীয়। কেননা উমর (রা.) থেকে এমনই বর্ণিত আছে। আর মক্কাবাসীগণ তারাবীহ এভাবেই আদায় করেন এবং তিন রাকাআত বিতর পড়েন।” [কিতাবুল উম্ম, ১/১৪২]

ইমাম তিরমিযী (রহ.) তাঁর জামে’ তিরমিযীতে (৩/১৭০) ইমাম শাফেয়ীর উক্ত মতটি উল্লেখ করেছেন।

ইমাম আন নববী (রহ) বলেন, ﻓَﺼَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟﺘَّﺮَﺍﻭِﻳﺢِ ﺳُﻨَّﺔٌ ﺑِﺈِﺟْﻤَﺎﻉِ ﺍﻟْﻌُﻠَﻤَﺎﺀِ ﻭَﻣَﺬْﻫَﺒُﻨَﺎ ﺃَﻧَّﻬَﺎ ﻋِﺸْﺮُﻭﻥَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﺑِﻌَﺸْﺮِ ﺗَﺴْﻠِﻴﻤَﺎﺕٍ ﻭَﺗَﺠُﻮﺯُ ﻣُﻨْﻔَﺮِﺩًﺍ ﻭَﺟَﻤَﺎﻋَﺔ

অর্থাৎ সালাতুত তারাবীহ সুন্নাত, তা আলেমগণের ইজমা’ দ্বারা প্রমাণিত। আমাদের মাযহাব (শাফেয়ী) এর মত হল, তারাবীহ ২০ রাকাআত, ১০ সালামে। চাই একাকী পড়ুক কিংবা জামাআতের সাথে।” [আল মাজমূ’, ৩/৫২৬]

ইমাম ইবনে কুদামা হাম্বলী (রহ) বলেন, ﻭَﺍﻟْﻤُﺨْﺘَﺎﺭُ ﻋِﻨْﺪَ ﺃَﺑِﻲ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺭَﺣِﻤَﻪُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻋِﺸْﺮُﻭﻥَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﻭَﺑِﻬَﺬَﺍ ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟﺜَّﻮْﺭِﻱُّ ﻭَﺃَﺑُﻮ ﺣَﻨِﻴﻔَﺔَ ﻭَﺍﻟﺸَّﺎﻓِﻌِﻲُّ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻣَﺎﻟِﻚٌ ﺳِﺘَّﺔٌ ﻭَﺛَﻠَﺎﺛُﻮﻥَ ﻭَﺯَﻋَﻢَ ﺃَﻧَّﻪُ ﺍﻟْﺄَﻣْﺮُ ﺍﻟْﻘَﺪِﻳﻢُ ﻭَﺗَﻌَﻠَّﻖَ ﺑِﻔِﻌْﻞِ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟْﻤَﺪِﻳﻨَﺔ

অর্থাৎ আবূ আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)’র মতে তারাবীহ ২০ রাকাআত। একই মত সুফইয়ান সাওরী, আবূ হানীফা ও শাফেয়ী (রহ.)’রও। ইমাম মালিকের এক মতে ৩৬ রাকাআত। তাঁর মত অনুযায়ীই মদীনাবাসীগণ আমল করতেন।” [আল মুগনী, ১/৪৪৫]

শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নজদী (রহ.) বলেন, ﺻﻼﺓ ﺍﻟﺘﺮﺍﻭﻳﺢ ﺳﻨّﺔ ﻣﺆﻛﺪﺓ ﺳﻨّﻬﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠّﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ، ﻭﺗﻨﺴﺐ ﺇﻟﻰ ﻋﻤﺮ، ﻷﻧﻪ ﺟﻤﻊ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻋﻠﻰ ﺃﺑﻲّ ﺑﻦ ﻛﻌﺐ ”. ﻭﺍﻟﻤﺨﺘﺎﺭ ﻋﻨﺪ ﺃﺣﻤﺪ : ﻋﺸﺮﻭﻥ ﺭﻛﻌﺔ، ﻭﺑﻪ ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺸﺎﻓﻌﻲ . ﻭﻗﺎﻝ ﻣﺎﻟﻚ: ﺳﺘﺔ ﻭﺛﻼﺛﻮﻥ . ﻭﻟﻨﺎ ” : ﺃﻥّ ﻋﻤﺮ ﻟﻤﺎ ﺟﻤﻊ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻋﻠﻰ ﺃﺑﻲّ، ﻛﺎﻥ ﻳﺼﻠﻲ ﺑﻬﻢ ﻋﺸﺮﻳﻦ ﺭﻛﻌﺔ

অর্থাৎ সালাতুত তারাবীহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, তা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। উমর (রা) তিনি লোকদের উবাই ইবন কা’ব (রা.)’র পিছনে জামাআত বদ্ধ করে দেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)’র নিকট ২০ রাকাআত, ইমাম শাফেয়ীর মতও অনুরূপ। ইমাম মালিকের এক মতে ৩৬ রাকাআত। আমাদের (হাম্বলী) দলীল হলো, নিশ্চয়ই উমর (রা.) লোকদের উবাই ইবনে কা’ব (রা.)’র পিছনে জামাআত বদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা ২০ রাকাআত পড়তেন।” [কিতাব মুখতাসার আল ইনসাফ ওয়াশ শারহুল কাবীর লিশ শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াহহাব, ১/২১২

সুতরাং নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, কত রাকাতের আমল আমাদের করতে হবে !

তারাবীহ ৮ রাকাত হওয়ার কথা বলে জনমনে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টি করা কথিত "নতুন সৃষ্ট ফেরকার" আলেম ও তাদের অনুসারী ভাইদের ফেতনা ও ধোঁকা থেকে আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন, আমীন।

অবশেষে বলা যায়, নবীজির (সা) প্রাণ প্রিয় খলিফা হযরত উমর (রা) এর আমলে তারাবির নামায বিশ রাকাত হওয়ার উপর সমস্ত সাহাবাদের ঐকমত বা ইজমাহ হয়েছে এরপর হতে অদ্যাবধি মক্কার হারাম শরিফ এবং মদিনার মসজিদে নববীতে তারাবির নাম বিশ রাকাত পড়া হচ্ছে সবাইকে লেখাটি শেয়ার করে দেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ।
 
 
তারাবির রাকাত সংখ্যা কত—বিশ, নাকি তারও কম?
আহলে হাদিসদের তারাবি আট রাকাত হওয়ার দলিল ও আমাদের খন্ডন :
ভুমিকা : নবীজির (সা) প্রাণ প্রিয় খলিফা হযরত উমর (রা) এর আমলে তারাবির নামায বিশ রাকাত হওয়ার উপর সমস্ত সাহাবাদের ঐকমত বা ইজমাহ হয়েছে। এরপর হতে অদ্যাবধি মক্কার হারাম শরিফ এবং মদিনার মসজিদে নববীতে তারাবির নাম বিশ রাকাত পড়া হচ্ছে।
সমগ্র দুনিয়ায় চারো মাযহাবের অনুসারীরা বিশ রাকাত তারাবির উপর আমল করে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র আহলে হাদিস নামধারী বৃটিশ সৃষ্ট এ নতুন ফেরকার অনুসারীরা, যাদের উৎপত্তি- ইতিহাস গত ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের পরের; তারাই সহিহ হাদিসের চটকদার স্লোগানের অন্তরালে সম্প্রতি তারাবীহ আট রাকাত হওয়ার কথা বলে জনমনে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টি করে চলেছে। অথচ তারাবীহ আট রাকাত হওয়ার পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস নেই, যা এখানে আপনাদের সম্মুখে বিশদভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
কথিত আহলে হাদিসরা তারাবি আট রাকাত হওয়ার পক্ষে নিচের হাদিস দ্বারা দলিল (?) দিতে চায়।

হাদিস :
ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺳﻠﻤﺔ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺃﻧﻪ ﺳﺄﻝ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ ﻛﻴﻒ ﻛﺎﻧﺖ ﺻﻼﺓ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ؟ ﻓﻘﺎﻟﺖ : ﻣﺎ ﻛﺎﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺰﻳﺪ ﻓﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﻭﻻ ﻓﻲ ﻏﻴﺮﻩ ﻋﻠﻰ ﺇﺣﺪﻯ ﻋﺸﺮﺓ ﺭﻛﻌﺔ ﻳﺼﻠﻲ ﺃﺭﺑﻌﺎ ﻓﻼ ﺗﺴﻞ ﻋﻦ ﺣﺴﻨﻬﻦ ﻭﻃﻮﻟﻬﻦ ﺛﻢ ﻳﺼﻠﻲ ﺃﺭﺑﻌﺎ ﻓﻼ ﺗﺴﻞ ﻋﻦ ﺣﺴﻨﻬﻦ ﻭﻃﻮﻟﻬﻦ ﺛﻢ ﻳﺼﻠﻲ ﺛﻼﺛﺎ فقلت يا رسول الله أ تنام قبل أن توتر ؟ قال يا عائشة ان عيني تنامان ولا ينام قلبي.
অনুবাদ : আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আয়েশা রা. কে জিজ্ঞাসা করেন যে, রমযানে নবীজীর নামায কেমন হত? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে এবং রমযানের বাইরে এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না! এরপর আরও চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা তো বলাই বাহুল্য! এরপর তিন রাকাত (বিতর) পড়তেন।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) [আরো] বলেন, আমি রাসূল (সা)- কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ’র রাসুল! আপনি কি বিতিরের নামায আদায়ের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েন? উত্তরে তিনি বললেন, হে আয়েশা, আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার অন্তর ঘুমায় না।” [এ পর্যন্ত হাদিসের অনুবাদ সমাপ্ত হল]
– {সহীহ বুখারী ১/১৫৪, হাদীস ১১৪৭; সহীহ মুসলিম ১/২৫৪, হাদীস ৭৩৮; সুনানে নাসায়ী ১/২৪৮, হাদীস ১৬৯৭; সুনানে আবু দাউদ ১/১৮৯, হাদীস ১৩৩৫; মুসনাদে আহমদ ৬/৩৬, হাদীস ২৪০৭৩}
>> দলিলের অযুক্তিকতা ও খণ্ডন:
উল্লিখিত হাদিসকে কয়েকটি কারণে আট রাকাতের দলিল বানানো যুক্তিসংগত নয়। বিস্তারিত নিম্নরূপ –

১-
“তারাবীহ” (تراويح) শব্দটি বহুবচন। তার একবচন হল “তারবীহ” (ترويح)। কিন্তু আভিধানিক অর্থে “তারবীহ” (ترويح) বলা হয় একবার বিশ্রাম নেয়াকে। শরিয়তের পরিভাষায় রামাদ্বানের রাতে তারাবীর প্রতি চার রাকাত বা’দ বিশ্রাম নেয়াকে (একবচনে) “তারবীহ” (ترويح) বলা হয়। পরবর্তীকালে এটিই তার আভিধানিক অর্থে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
[সূত্র— মেসবাহুল লুগাত, পৃষ্ঠা ৩২২]
বুখারি শরিফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “ফাতহুল বারী” কিতাবে আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার (রহ) তিনিও লিখেছেন :
ﺗﻌﺮﻳﻒ ﺍﻟﺘﺮﺍﻭﻳﺢ ﻫﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺍﻟﺘﻲ ﺗﺼﻠﻰ ﺟﻤﺎﻋﺔ ﻓﻲ ﻟﻴﺎﻟﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ، ﻭﺍﻟﺘﺮﺍﻭﻳﺢ ﺟﻤﻊ ﺗﺮﻭﻳﺤﺔ، ﺳﻤﻴﺖ ﺑﺬﻟﻚ ﻷﻧﻬﻢ ﻛﺎﻧﻮﺍ ﺃﻭﻝ ﻣﺎ ﺍﺟﺘﻤﻌﻮﺍ ﻋﻠﻴﻬﺎ ﻳﺴﺘﺮﻳﺤﻮﻥ ﺑﻴﻦ ﻛﻞ ﺗﺴﻠﻴﻤﺘﻴﻦ، ﻛﻤﺎ ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺤﺎﻓﻆ ﺍﺑﻦ ﺣﺠﺮ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ، ﻭﺗﻌﺮﻑ ﻛﺬﻟﻚ ﺑﻘﻴﺎﻡ ﺭﻣﻀﺎﻥ
অনুবাদ : “তারাবীহ’র সংজ্ঞা হল, রামাদ্বানের রজনীতে জামাতে যে নামায আদায় করা হয়, তাই তারাবীহ। তারাবীহ বহুবচন, একবচনে তারবিয়াহ। তারাবীহ বলে নাম রাখার কারণ, মুসল্লিগণ প্রতি দুই সালামের মধ্যখানে বিশ্রাম নেয়।”

তাই বলা যায়, যেহেতু তারাবীহ (تراويح) বহুবচন শব্দ, তার একবচন “তারবীহ” (ترويح)। তার মানে হবে একবার বিশ্রাম নেয়া। সে হিসেবে দুই বার বিশ্রাম নেয়াকে “তারবিহাতান” বা “তারবিহাতাঈন” বলা হবে।
এখন বুঝুন, আরবীতে বচন হয় তিনটি। একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন। রামাদ্বানে প্রত্যেক চার রাকাত বা’দ আরাম করা হয়। যদি তারাবির নামায আট রাকাত হত, তাহলে ৪+৪= ৮ রাকাত তারাবির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দুই বারই বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ থাকে। যা বচনের ক্ষেত্রে দ্বিবচন হয়। ফলে তাকে আরবী ভাষায় (বহুবচনে) তারাবীহ (تراويح) বলা যাবেনা, বরং দুই বার বিশ্রাম নেয়ার কারণে (দ্বিবচনে) “তারবিহাতান” বা “তারবিহাতাঈন” ترويحتان او ترويحتين বলা যেতে পারে।
অথচ আরবী ভাষায় (বহুবচনে) তারাবীহ (تراويح) হতে হলে তিনের অধিক বার বিশ্রাম নিতে হয়। তাই অভিধান অনুসারে তিনবার বা ততোধিক বার বিশ্রাম নিতে হলে তখন তারাবির রাকাত সংখ্যা আট রাকাত হওয়ার মোটেই সুযোগ থাকেনা, বরং তখন তারাবির রাকাত সংখ্যা বারো অথবা তার চেয়েও অধিক তথা বিশ রাকাতই হতে হয়, যা যুক্তিক ও বিবেকগ্রাহ্য।
অতএব তারাবির রাকাত সংখ্যা আট রাকাত নয়, বরং তার চেয়েও অধিক তথা বিশ রাকাত।

২-
মূলত তাহাজ্জুদ নামাযের সাথেই উক্ত হাদিসটির সম্পর্ক। কারণ হযরত আয়েশা (রা) রামাদ্বান এবং অন্যান্য মাস তথা পুরো বছরের কথা উল্লেখ করেছেন।
উনার ভাষ্য হল : ﻓﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﻭﻻ ﻓﻲ ﻏﻴﺮﻩ অর্থাৎ “রামাদ্বান এবং অন্যান্য মাসে এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না”। তার মানে রাসূল (সা) রামাদ্বান ছাড়াও পুরো বছর ব্যাপী এ এগার রাকাত আদায় করতেন। অথচ তারাবির সম্পর্ক তো শুধু মাহে রামাদ্বানের সাথে। যার বাহিরে অন্যান্য মাসে তা পড়া হয় না। ফলে বুঝা গেল, হাদিসটিতে উল্লিখিত বিতির সহ মোট এগার রাকাতের সম্পর্ক তারাবির সাথে নয়, বরং তাহাজ্জুদের নামাযের সাথেই সম্পর্ক। সুতরাং প্রমাণিত হল যে তারাবির রাকাত সংখ্যা আট নয়, বরং বিশ রাকাত।

৩-
তারাবির নামায রাসূল (সা) থেকে এশার পর আদায় করার কথা যেমন উল্লেখ রয়েছে, তেমনি উল্লেখ রয়েছে শেষ রাতে বিতির সহ তাহাজ্জুদের নামায আদায় করার কথা।

হাদিসে এ বাক্যটি রয়েছে এরকম যে يا رسول الله ا تنام قبل أن توتر؟ অর্থাৎ হে আল্লাহ’র রাসূল! আপনি কি বিতির পড়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়েন? এ বাক্যাংশটি দ্বারাও এ কথা প্রমাণ হল যে, উক্ত হাদিসটির সম্পর্ক তাহাজ্জুদের সাথে, তারাবির সাথে নয়। কারণ ঘুমিয়ে পড়লে তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত পেরিয়ে যাওয়ার আশংকা থাকতে পারে। তাই রাতের শেষাংশে রাসূলের বিতির পড়ার যে নিয়ম, তা উপেক্ষা করে রাতের প্রথমাংশে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন কিনা এ ব্যাপারে সতর্ক করাই উক্ত বাক্যাংশের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

সামগ্রিক ভাবে প্রমাণ হল, উল্লিখিত হাদিসে বিতির সহ এগার রাকাতের সম্পর্ক তারাবির সাথে নয়। কেননা রাসূল (সা) তিনি রাত্রের প্রথমাংশে ঘুমাতেন এবং বিতিরের নামায তাহাজ্জুদের সাথে আদায় করতেন। বুখারি শরিফে এ কথার সমর্থনে গোটা এক খানা হাদিসই উল্লেখ রয়েছে। যেমন –
সহিহ বুখারির অপর আরেকটি হাদিসে এসেছে :
ﻭﻓﻲ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻋﻦ ﺍﻷﺳﻮﺩ ﻗﺎﻝ ﺳﺄﻟﺖ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ ﻛﻴﻒ ﻛﺎﻧﺖ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺑﺎﻟﻠﻴﻞ؟ ﻗﺎﻟﺖ: ﻛﺎﻥ ﻳﻨﺎﻡ ﺃﻭﻟﻪ ﻭﻳﻘﻮﻡ ﺁﺧﺮﻩ ﻓﻴﺼﻠﻲ ﺛﻢ ﻳﺮﺟﻊ ﺇﻟﻰ ﻓﺮﺍﺷﻪ. ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ .
অনুবাদ : বিশিষ্ট তাবেয়ি হযরত আসওয়াদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা) -কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলের (সা) রাত্রিকালীন নামায কেমন ছিল? তিনি উত্তরে বললেন, রাসূল (সা) তিনি রাত্রের প্রথমাংশে ঘুমাতেন আর শেষাংশে কিয়ামুল লাইল করতেন তথা তাহাজ্জুদ পড়তেন। এরপর সালাত আদায় শেষে তিনি বিছানায় তাশরিফ নিতেন। সূত্র— সহিহ বুখারি শরিফ।

৪-
হাদিসটির খন্ডাংশ “ولا في غيره অর্থাৎ অন্য মাসেও” হযরত আয়েশা (রা) -এর এ জবাবটি দ্বারা রাসূলের পুরো বছর তাহাজ্জুদ পড়া প্রমাণিত।
প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, আল্লাহ’র রাসূল (সা) মাহে রামাদ্বানেও তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেন, নাকি তারাবির কারণে তা ছেড়ে দেন? প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তিনি জ্ঞানগর্ভ জবাব দিয়েছেন।

হযরত আয়েশা (রা)-এর জ্ঞানগর্ভ জবাবটি হল : “আল্লাহ’র রাসূল (সা) রামাদ্বান এবং রামাদ্বানের বাহিরে বিতিরের নামায সহ এগার রাকাত আদায় করতেন। চার চার রাকাত করে মোট আট রাকাত আর তিন রাকাত বিতিরের নামায আদায় করতেন।
কথিত আহলে হাদিস নামধারী গায়রে-মুকাল্লিদরা মানুষকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে বুখারি শরিফের উক্ত হাদিসটি দ্বারা তারাবির আট রাকাতের পক্ষে দলিল (?) দেয়। এটি ছাড়া তাদের মেরুদণ্ডহীন মতবাদটির পক্ষে দ্বিতীয় আর কোনো দলিল নেই। মজার ব্যাপার হল, বুখারি শরিফের উক্ত হাদিসটিতে রাসূলেপাকের (সা) উক্ত আট রাকাত দু সালামে চার চার রাকাত করে পড়ার কথাই উল্লেখ পাওয়া যায়। বিতিরের নামাযের রাকাত সংখ্যা “তিন” হওয়ার কথাও প্রমাণিত।

৫-
হযরত আয়েশা (রা)-এর উক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা যদি তারাবিই বুঝানো উদ্দেশ্য হত, তাহলে হযরত উমর (রা)-এর খেলাফত আমলে যখন বিশ রাকাতের উপর উম্মাহ’র ইজমা হল, তখন হযরত আয়েশা (রা) তার বিরুধিতা করেননি কেন? হক্বকথা বলা থেকে তিনি চুপ ছিলেন কেন? অথচ তিনি তখনো জীবিত ছিলেন। হযরত আয়েশা (রা) নবীজি (সা) থেকে মোট ২২১১টি হাদিস রেওয়ায়েত করেছিলেন এবং ৫৭ বা ৫৮ হিজরীতে ইন্তিকাল করেছিলেন।

৬-
আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন- “আর আমার কাছে এটি প্রকাশিত হয়েছে যে, ১১ রাকাতের থেকে না বাড়ানোর রহস্য এটি যে, নিশ্চয় তাহাজ্জুদ ও বিতরের নামায রাতের নামাযের সাথে খাস। আর দিনের ফরয যোহর ৪ রাকাত আর আসর সেটাও ৪ রাকাত আর মাগরীব হল ৩ রাকাত, যা দিনের বিতর। সুতরাং সমতা-বিধান হল রাতের নামায দিনের নামাযের মতই সংখ্যার দিক থেকে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত হওয়া। আর ১৩ রাকাতের ক্ষেত্রে সমতা-বিধান হল, ফযরের নামায মিলানোর মাধ্যমে। কেননা এটি দিনের নামাযই তার পরবর্তী নামাযের মত।
(ফাতহুল বারী শরহুল বুখারী-৩/১৭)
ইবনে হাজার (রহ) এর এই রহস্য বা হিকমত বর্ণনা কি বলছেনা, এই হাদিস দ্বারা তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য, কিন্তু তারাবীহ উদ্দেশ্য নয়? এই বক্তব্যে তাহাজ্জুদের কথা স্পষ্টই উল্লেখ করলেন ইবনে হাজার (রহ)।

>> তাহাজ্জুদ ও তারাবীহের মাঝে পার্থক্য :
কথিত আহলে হাদিসরা ইদানীং বুল পাল্টে বলেন, “তাহাজ্জুদ আর তারাবীহ একই”। নিম্নবর্ণিত কারণে তাদের এই দাবিটি ভুল।
১- তাহাজ্জুদের মাঝে ডাকাডাকি জায়েজ নয়, কিন্তু তারাবীহতে জায়েজ।
২- তারাবীহের সময় ঘুমানোর আগে তাহাজ্জুদের সময় নির্ধারিত নয় তবে উত্তম ঘুমের পর।
৩- মুহাদ্দিসীনে কিরাম তাহাজ্জুদ ও তারাবীহের অধ্যায় ভিন্ন ভিন্ন লিখেছেন।
৪- তাহাজ্জুদ নামাযের হুকুম কুরআন দ্বারা প্রমাণিত যথা সূরা ইসারার ৭৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ﻭَﻣِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ﻓَﺘَﻬَﺠَّﺪْ ﺑِﻪِ ﻧَﺎﻓِﻠَﺔً ﻟَّﻚَ ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥ ﻳَﺒْﻌَﺜَﻚَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻣَﻘَﺎﻣًﺎ ﻣَّﺤْﻤُﻮﺩًﺍ অর্থাৎ আর রাতে তাহাজ্জুদ পড় এটি তোমার জন্য নফল, অচিরেই তোমাকে তোমার রব প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।
আর তারাবীহের ব্যাপারে আল্লাহর নবী বলেন-নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা রামযানের রোযা তোমাদের উপর ফরয করেছেন আর আমি তোমাদের উপর এতে কিয়াম করাকে সুন্নত করেছি। (সুনানে নাসায়ী-১/৩০৮)।
সুতরাং বুঝা গেল তাহাজ্জুদ আল্লাহর আয়াত আর তারাবীহ নবীজীর বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত।
৫- তাহাজ্জুদের হুকুম মক্কায় হয়েছে আর তারাবীহের হুকুম মদীনায় হয়েছে।
৬- ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহঃ তিনিও তারাবীহ আর তাহাজ্জুদ আলাদা আলাদা বিশ্বাস করতেন। (মাকনা’-১৮৪)।
৭- ইমাম বুখারী (রহ)- এর ক্ষেত্রে বর্ণিত আছে, তিনি রাতের প্রথমাংশে তার সাগরীদদের নিয়ে তারাবীহ পড়তেন আর শেষ রাতে একাকি তাহাজ্জুদ পড়তেন। (ইমাম বুখারী রহঃ এর জীবনী দ্রষ্টব্য )।
৮- যদি “সালাতুল-লাইল” দ্বারা তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ দুটি মিলে একই নামায উদ্দেশ্য হত, তাহলে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত নিচের সহিহ হাদিসগুলোর জবাব কী?
যেমন—সহিহ বুখারীতে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা)-এর “সালাতুল-লাইল” বা রাতের নামায ৭/৯/১১ রাকাত হতো, ফজরের সুন্নত ব্যতীত”। [সূত্র : সহিহ বুখারী ১/৩৪৫ হাদীস নং ১১৩৯] ৷

আয়েশা (রা) থেকে অপর আরেক বর্ণনায় রয়েছে, “রাসূল (সা) ফজরের সুন্নত ব্যতীতই ১৩ রাকাত পড়তেন ৷” [ সূত্র : বুখারী ১/৩৫৪, হাদীস নং ১১৭০]৷

# এবার লামাযহাবি কথিত আহলে হাদিসের নিকট জবাব চাই, যদি “সালাতুল-লাইল” বা রাতের নামায দ্বারা তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ দুটি মিলে একটি উদ্দেশ্য হয়; তাহলে যেখানে হযরত আয়েশা (রা) থেকেই ৭/৮/৯/১১/১৩ রাকাত বর্ণিত, সেখানে তারাবীহ’র রাকাত সংখ্যা শুধুই আট রাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন কেন? এটি কোন ধরণের সহিহ হাদিসের আমল! !
আফসোস! কথিত আহলে হাদিস নামধারীরা তারাবির নামায চার চার রাকাত করে মোট দুই সালামে আদায় করার বিপরীরে দুই দুই রাকাত করে মোট চার সালামে তা আদায় করে। বিতির আদায় করে শুধু এক রাকাত। যা সুস্পষ্টভাবে তাদেরই উদ্ধৃত সহিহ হাদিসের খেলাফ এবং চরম বিভ্রান্তিকর। অতএব আবারো প্রমাণিত হল, উক্ত হাদিসটি মোটেও কথিত আহলে হাদিসের দাবির পক্ষে নয়, বরং তদ্দারা বিতির সহ মোট এগার রাকাত তাহাজ্জুদের নামাযই প্রমাণিত।
আহলে হাদিস নামধারীরা মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য রামাদ্বানের বাহিরে এর নাম দিয়ে থাকে “তাহাজ্জুদ” আর মাহে রামাদ্বানের তারাবিকে কখনো “ক্বেয়ামে রামাদ্বান” আবার কখনো “ক্বেয়ামুল লাইল” নাম দিয়ে থাকে। আসলে তারা এরকম দোটানা আচরণ করে কি বুঝাতে চাচ্ছে যে, তারাবির নামায বলতে কিছুই নেই??

> তারাবি নামায ২০ রাকাত :
তারাবি নামায ২০ রাকাতের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, প্রখ্যাত সাহাবায়ে কেরামগণ (রা:) তারাবি নামায ২০ রাকাতের পক্ষে বর্ণনা করেছেন। আর তাঁরা হলেন, খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা:)।
তাফসিরে ইবনে কাসির প্রণেতা উল্লেখ করেছেন, রাসূল (সা:) উনার চাচা
√ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:),
√ হযরত আবুযর গিফারী,
√ হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা:),
√ হযরত হাসান (রা:),
√ হযরত ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রা:),
√ হযরত ইবনে আবিল হাসনা (রা:),
√ হযরত আবদুল আজিজ ইবনে রুফাহ (রা:) প্রমূখ সাহাবায়ে কেরামগণ (রা:)-ও তারাবি নামায ২০ রাকাতের পক্ষে বর্ণনা করেছেন।
মোল্লা আলী ক্বারী (রা:) তাঁর পূর্বের ইমামগণ হতে সংগৃহীত একটি হাদিস মিরকাত শরহে মিশকাতের ২য় খণ্ডের১৩৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। হাদিসটি হচ্ছে
“রাসূল (সা:)-এর এরশাদ হচ্ছে, সাহাবায়ে কেরামের (রা:) ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত শরয়ী বিধান নিঃশর্তভাবে অনুসরণ করা উম্মতের জন্য আবশ্যক”।
সুতরাং এরূপ ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করা ইমান নষ্ট হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
রাসূল (সা:) ২০ রাকাত তারাবি নামাজ আদায় করতেন, এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ হচ্ছে
√ আল সুনানুল কুবরা বায়হাকীর ২য় খণ্ডের ৬৯৮ পৃষ্ঠার ৪২৮৬ নং হাদিস, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, রাসূল (সা:) রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবি ও বিতির নামাজ আদায় করতেন।
√ মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ-এর ২য় খণ্ডের ১৬৩ পৃষ্ঠায় ৭৬৮০ নং হাদিসে হযরত শুতাইর ইবনে শাকাল (রা:) এবং হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:), তারীখু জুয়জান হামযাহ সাহমী (রা:) গ্রন্থের ১৩১৭ পৃষ্ঠায় ৫৫৭নং হাদিসটিতেও একই রকম বর্ণনা রয়েছে।
এ ছাড়া হযরত আবু যার গিফারী (রা:) হতে বর্ণিত সুনান তিরমিজির ৩য় খণ্ডের ১৬১ ও ১৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ৮০৬ নং হাদিসটিতে তিনি উল্লেখ করেন। তারাবির নামাজে রাসূল (সা:) কিয়ামুল লাইলও করতেন বলে উল্লেখ করেছেন।

খোলাফায়ে রাশেদা হযরত উমর ফারুক (রা:), হযরত উসমান (রা:), হযরত আলী (রা:), ২০ রাকাত তারাবি নামাজ আদায় করতেন। আর এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ হলো:
√ ছিয়া-ছিত্তাহ হাদিস গ্রন্থসমূহের অন্যতম আবু দাউদ শরীফ-এর ২য় খণ্ডের ১৪২৯নং পৃষ্ঠায় হযরত হাসান (রা:) বলেন, হযরত উমর খাত্তাব (রা:) সকলকে হযরত উবাই ইবনে কাআব (রা:) এর পেছনে একত্র করলেন, তখন ইবনে কাআব (রা:) তাদের ইমামতি করে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করলেন।
√ সুনানু বাইহাকীর ২য় খণ্ডের ৬৯৯ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ৪২৮৯ নং হাদিসে হযরত সায়ীব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, হযরত উসমান ইবনে আফকান (রা:) এর খিলাফতের সময়ে নামাজিরা দাঁড়ানোর কষ্টে লাঠিতে ভর দিতেন তবুও ২০ রাকাত তারাবির নামাজ কম পড়তেন না।
√ মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাইর ২য় খণ্ডের ১৬৩ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ৭৬৮১ নং হাদিসে হযরত ইবনে আবিল হাসনা (রা:) বলেন, হযরত আলী (রা:) এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিলেন রমজানে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়তে।

এ প্রসঙ্গে আরো হাদীস:
২-
জামে তিরমিযী, হাদীস নং ৮০৬।
৩-
মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৭৬৮০, ৭৬৮১, ৭৬৮২, ৭৬৮৩, ৭৬৮৪, ৭৬৮৫।
৪-
সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী, হাদীস নং ৪২৯০, ৪২৯১, ৪২৯২।
৫-
মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৭৭৩৩।
৬-
আল-মু’জামুল কাবীর লিত- তাবারানী, হাদীস নং ১২১০২।
৭-
আল-মু’জামুল আওসাত লিত-তাবারানী, হাদীস নং ৭৯৮।
৮-
কিতাবুল উম্ম ১/১৬৭। এ ছাড়াও আরো অসংখ্য দলীল রয়েছে। সংক্ষেপে অল্প কিছু সংখ্যক দলীল উল্লেখ করা হলো।
[বি: দ্র: হাদীস নাম্বার ও রেফারেন্সের ক্ষেত্রে “মাকতাবায়ে শামিলা” অনুসরণ করা হয়েছে।]
প্রিয় পাঠক! যে হাদিসের উপর তাদের নিজেদেরই আমাল নেই, সে হাদিসটি আমাদের আহলে সুন্নাহ’র মুসলিমদের বিপরীতে এবং তাদের স্বপক্ষে দলিল হতে পারে কিভাবে, তা কি একটু বলবেন? ?
অবশেষে বলা যায়, নবীজির (সা) প্রাণ প্রিয় খলিফা হযরত উমর (রা) এর আমলে তারাবির নামায বিশ রাকাত হওয়ার উপর সমস্ত সাহাবাদের ঐকমত বা ইজমাহ হয়েছে। এরপর হতে অদ্যাবধি মক্কার হারাম শরিফ এবং মদিনার মসজিদে নববীতে তারাবির নাম বিশ রাকাত পড়া হচ্ছে।
সমগ্র দুনিয়ায় চারো মাযহাবের অনুসারীরা বিশ রাকাত তারাবির উপর আমল করে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র আহলে হাদিস নামধারী বৃটিশ সৃষ্ট এ নতুন ফেরকার অনুসারীরা, যাদের উৎপত্তি- ইতিহাস গত ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের পরের; তারাই সহিহ হাদিসের চটকদার স্লোগানের অন্তরালে সম্প্রতি তারাবীহ আট রাকাত হওয়ার কথা বলে জনমনে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টি করে চলেছে। অথচ তারাবীহ আট রাকাত হওয়ার পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস নেই, যা ইতিপূর্বে আপনাদের সম্মুখে বিশদভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কথিত আহলে হাদিসের ধোঁকা থেকে হেফাজত করুন, আমীন।
 
তারাবীহ নামাজ নিয়ে আরো একটি পর্যালোচনা
 
তারাবীহ নামাজ কয় রাকাত?
তারাবীহ নামাজ ২০ রাকআত। যারা বলে ৮ রাকাআত তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। মুলত ধর্মপ্রান সাধারন মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষে আহলে হাদীস বা লামাজহাবী সম্প্রদায় ৮ রাকাআত তারাবীহ এই মতামতের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।
* সংশয় নিরসনের জন্য ৮ রাকআত বা এসংক্রান্ত বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্নিত হাদীস ও তার সঠিক মর্ম নিম্নে তুলে ধরা হল।
প্রথম হাদীসঃ-
আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন , রমজানে রাসুল (সাঃ) এর নামাজ কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বললেন , রাসুল (সাঃ) রমজানে ও অন্যান্য মাসে বিতির সহ এগার রাকআতের বশী পড়তেন না।
(বুখরী শরীফ হাঃ নং ১১৪৭)
দ্বিতীয় হাদীসঃ-
ইয়াহইয়া ইবনে আবু সালামা (রঃ) বলেন আমি রাসুল (সঃ) এর রাত্রী কালীন নামাজ সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, রাসুল(সঃ) রাত্রে তের রাকআত নামাজ আদায় করতেন। প্রথমে আট রাকাত পড়তেন , এর পর বিতির পড়তেন, তার পর দুই রাকত নামাজ বসে আদায় করতেন।

(মুসলিম শরীফ- হাঃ নং ১৭২৪)
এজাতীয় হাদীস দ্বারা লা মাজহাবী সম্প্রদায়- তারাবীহ ৮ রাকাত এর উপর দলীল পেশ করে থাকে।
উপরোক্ত হাদীস সমূহের উত্তরঃ-
প্রথম উত্তর: আয়েশা (রাঃ) থেকে উপরোক্ত হাদীস দুটি যেমনি ভাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে ঠিক তেমনি মুসলিম শরীফেই আয়েশা (রাঃ) থেকে দশ রাকাতের হাদীস ও বর্ণিত আছে। যেমন:
হাদীসঃ-
কাসেম ইবনে মুহাম্মদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন , আমি আয়েশা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রাসুল (সাঃ) রাত্রিতে দশ রাকাত নামাজ, এক রাকাত বিতির ,ও ফজরের দুই রাকাত সুন্নত সহ মোট ১৩ রাকাত পড়তেন।

(মুসলিম শরীফ- হাঃ নং ১৭২৭)
এমন কি আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হদীস গুলোর প্রতি লক্ষ করলে বোঝা যায় রাসুল (সাঃ) রাত্রীকালীন নামাজ- কোন রাত্রীতে ১১ রাকাত ,কখনো ১৩ রাকাত কখনো ৯ রাকাত, আবার কখনো ৭ রাকাত ও, আদায় করতেন। সুতরাং আয়েশা (রাঃ) এর হাদীস দ্বারা কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করা সম্পুর্ন অযৌক্তিক।
দ্বিতীয় উত্তরঃ-
প্রকৃত পক্ষে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস গুলো তাহাজ্জুদ সম্পর্কিত , তারাবীহ সম্পর্কিত নয়। একারনেই হাদীস গ্রন্থাকারগন এজাতীয় হাদীসকে তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন , তারাবীর অধ্যায়ে উল্লেখ করেননি।
তৃতীয় উত্তরঃ-
আহলে হাদীসগন তারাবী ৮ রাকাত হওয়ার স্বপক্ষে যে হাদীসগুলো পেশ করে থাকেন, সে অনুযায়ী তারা নিজেরাই আমল করেন না। কেননা হাদীসে রমজান ও অন্যান্য মাসের কথাও উল্লেখ রয়েছে , অথচ তারা তাদের হাদীস অনুযায়ী অন্যান্য মাসে তারাবীহ পড়ে না।
বিশ রাকাত তারাবীর দলীল সমুহ:
১ নং হাদীসঃ-
সায়ের ইবনে ইয়াজিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন সাহাবা গন উমর (রাঃ) এর খেলাফত কালে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন।
(বাইহাকী শরীফ-খঃ ২/৪৯৬ হাঃ নং ৪৬১৭)
২ নং হাদীসঃ-
ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ- হযরত উমর (রাঃ) এর যুগে সাহাবারা বিতির সহ তেইশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন। (মুয়াত্তা মালেক খঃ ১পৃঃ ১১৫)
৩ নং হাদীসঃ-
আতা ইবনে আবী রাবাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি সাহাবাদেরকে বিতির সহ তেইশ রাকাত তারাবী পড়তে দেখেছি ( মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা – ৫/২২৪)
(উল্লেখিত সবগুলো হাদীস সহীহ)

এছাড়াও অসংখ্য হাদীস দ্বারা একথা সুস্পষ্ট রুপে প্রমানিত হয় যে, তারাবীহ নামাজ ২০ রাকাত যার উপর খোলাফয়ে রাশেদীন ,সমস্ত সাহাবা , তাবেই, তাবে তাবেই, সালফে সালেহীন গন, ঐক্যমতে আমল করেছেন। এবং চার মাজহাবের ইমাম গনও এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষন করেছেন।
সুতরাং যারা ৮ রাকাত তারাবীর কথা বলেন ,তারা মুলত সরলমনা মুসলমানদের অন্তরে বিভ্রান্তির বিষ ঢেলে ইসলামকে বিতর্কিত করতে চান। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুক।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •   কাজীরবাজার মাদরাসার প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান আর নেই
  •   শনিবার সিলেট আসছেন জমিয়ত মহাসচিব নুর হোসাইন ক্বাসেমী
  •   ফিনল্যান্ড বিএনপির শারদীয় শুভেচ্ছা
  •   নগরীতে পূজামন্ডপ পরিদর্শন করলেন মেয়র আরিফ
  •   মঞ্চে উঠে অঝোরে কাঁদলেন জেমস
  •   অনুমতি না পেলেও সিলেট আসবেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা!
  •   মন্ত্রীসভার সদস্যদের অর্ধেকই নারী!
  •   আইয়ুব বাচ্চুর সুর চুরি করেছিল পাকিস্তানি বিজ্ঞাপনচিত্রে (ভিডিও)
  •   লাদেনের চেয়েও জনপ্রিয়তা বেশি তার সেই মডেল ভাইঝি'র!
  •   ‘ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে রাজনীতি ও ভোট হয় না’
  •   'আওয়ামী লীগের উচ্ছিষ্ট ও জাতীয় বেঈমানরাই জাতীয় ঐক্যে'
  •   আফগান লীগে ব্যাট হাতে দর্শক মাতালেন গেইল
  •   সঠিক ঘুমে সাহায্য করবে স্মার্টওয়াচ অ্যাপ
  •   কফিতেই বাড়বে আয়ু!
  •   নিউইয়র্কে জেবিবিএর সভাপতি দিদার, সম্পাদক কামরু
  • সাম্প্রতিক ফিচার খবর

  •   আপনার লেখা আরও ভালো করতে ৭টি কলাকৌশল
  •   নামিদামি স্কুলে পড়লেই কি শিশুরা মেধাবী হয়?
  •   রেলের উন্নয়নে বৃটিশদের ছাড়িয়ে গেল বর্তমান সরকার
  •   একজন বোকামানবের জন্ম কিংবা একটা গাধাকে ভালোবাসার গল্প
  •   সিলেট টু ঢাকা: ভার্চুয়াল যুগ; ননভার্চুয়াল ভালোবাসা
  •   আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস
  •   বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন ‘বুর্জ খলিফা’র অজানা ইতিহাস
  •   পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
  •   হুমায়ূন আহমেদের ঠাট্টা
  •   বাংলাদেশের বদলে যাওয়া: দক্ষিণ এশিয়ার উদাহরণ, বিশ্বের বিস্ময়
  •   ইসলামে ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব
  •   দোয়ারাবাজার উপজেলার ইতিহাস ও কিছু কথা
  •   মীরজাফরের বংশধর ইস্কান্দার মির্জা
  •   অনলাইন সাংবাদিকতায় সম্মাননা পেলেন আহমেদ জুয়েল
  •   চমকে দিলেন তোফায়েল, পয়েন্ট অব নো রিটার্নে রাজনীতি?