আজ মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮ ইং

একজন বোকামানবের জন্ম কিংবা একটা গাধাকে ভালোবাসার গল্প

:: রৌশনী রাফা মজুমদার ::

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৮-১০-০৮ ২০:৪৮:২৬

২০০৩ সাল। আমার বয়স তখন কেবল সাত। আমি সবসময় আম্মুর সাথে আম্মুর রুমে ঘুমাই। এক রাতে ঘুম ভেঙে গেলো। দেখি, আম্মু পাশে ছটফট করছে! আম্মু ঘুমাতে পারছে না, গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার, আমাদের বাসায় তখন এসি দূরে থাক, আইপিএস ও ছিল না (তখনো আইপিএসের প্রচলন হয় নাই সম্ভবত)। আমি কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম, "আম্মু, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে?" আম্মু অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, "না মা, তুমি ঘুমাও।" এরকম করে আরো কিছুদিন... দেখি, আম্মুর পেট ফুলে উঠলো, পায়ে পানি উঠলো। আম্মুর পায়ের পানি ওঠার দৃশ্য দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলতাম! আমার এতো ভয় লাগতো, সেটা বলার মত না! আর আম্মু বরাবরের মতই বলতো, "আমার একটুও ব্যথা লাগছে না। তুমি চেপে দেখো। এখানে শুধু পানি, আর কিচ্ছু নাহ!" আমার তাও সেই সাহস হতো না! ততোদিনে আমি মোটামুটিভাবে জেনে গেছি, আমার একটা ছোট ভাই কিংবা বোন আসতে যাচ্ছে, সে এখন আম্মুর পেটে বসত গড়ে আম্মুকে ক্রমাগত যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে। আম্মু খেতে পারতো না, ঘুমাতে পারতো না, টেবিলে বসেবসে নামাজ পড়তো, কিছুদিন পর থেকে আমি আর আম্মুর সাথে স্কুলেও যেতে পারতাম না, আব্বু গিয়ে দিয়ে আসা শুরু করলো। আমি সেই পেটের মানুষটার উপরে দিনকে দিন বিরক্ত হতেই থাকলাম! একদিন গেলাম বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে! আম্মু একদিন দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় ব্যথায় আস্তে করে "আঃ" করে উঠলো, আমি আর আব্বু দুজনেই জিজ্ঞেস করলাম, "কী হইসে?" আম্মু বলে, "বাবু হুট করে লাথি দিসে তো, তাই ব্যথা লাগলো।" আমার মেজাজ এতো খারাপ হলো, সেটা বলার মতো না! এই মানুষটা এতো বেয়াদব, আমার মায়ের পেটে লাথি দেয়! ফাইজলামির একটা সীমা-পরিসীমা থাকা দরকার! আমি ততোদিনে ঘোষণা দিয়েই বসছি- "আমার ভাইবোন দুনিয়ায় কিচ্ছু লাগবেনা, তুমি এই আপদ পেট থেকে ফালাও তো!" -_- একদিন ছাদে খেলতে যেয়ে কে যেন আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "রৌশনী, তোমার ভাই চাই না বোন চাই?" আমি নির্লিপ্ত গলায় বললাম, "একটা হইলেই হইলো। পছন্দ না হইলে ভাই বা বোন কিছুই বানাবো না, আবার ফেরত দিয়ে আসবো।"

একদিন আম্মু আর আব্বুর সাথে হাসপাতালে গেলাম। কি একটা রুমের সামনে দাঁড়ালাম, ডাক্তার আমাকে ঢুকতে দেবে না কিছুতেই, বিভিন্ন রশ্মিতে আমার সমস্যা হইতে পারে ভেবে, আব্বুর জোরাজুরিতে ঢুকলাম। আম্মুকে বিভিন্ন তারতুর লাগায়ে শোয়ানো হলো বিশাল একটা কম্পিউটারের সামনে বসে আমি প্রথমবারের মতো আমার ভাইকে দেখলাম!! সে এক আশ্চর্য অবস্থা! আব্বু দেখায়ে, "এইটা ভাইয়ের হাত, এইটা পা...." আমার সে দৃশ্য দেখেই যাইতে ইচ্ছা হচ্ছিলো, কিন্তু বিধিবাম! আমাকে বুঝায়ে-সুঝায়ে বাইর করে আনা হইলো রুম থেকে। সেদিন থেকে একটা ভাইভাই ফিলিংস কাজ করা শুরু করলো বুকের ভেতর। আম্মু ভাইয়ের জন্য কাঁথাকাপড় বানায় (আমার জন্য কেও কিছু বানায় না), বাবা পলিথিন, ন্যাপকিন, তোয়ালে, বেবি লোশন এসব কিনে আনে, দিন নাকি আর বেশি বাকি নাই!

ভাইয়ের আগমন উপলক্ষ্যে আমার ফুফুরা গ্রাম থেকে এলো। একদিন আমাকে বাসায় রেখে আমার আম্মুকে ধরে নিয়ে আব্বু আর আম্মু হাসপাতালে চলে গেলো! তখন পর্যন্ত আমার তেমন কোন অনুভূতি কাজ করে নাই, ভাবটা এমন ছিল- গেসে, আবার চলেও আসবে। রাতে ঘুমানোর আগে দিয়ে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো! আমি আমার সারা জন্মে আম্মুর বুকে হাত না রেখে ঘুমাতে পারি নাই! ইন ফ্যাক্ট, আমি বালিশে মাথা রেখেও ঘুমাই নাই কোনদিন, আম্মুর হাতের উপর ঘুমাইতাম! সেই আমাকে বলা হলো, আজকে ফুফুর সাথে ঘুমাতে হবে, আম্মু  হাসপাতাল থেকে আসতে পারবে না। মেজাজ আমার কি পরিমাণ খারাপ হইলো, বলতে পারবো না। সারা জন্মে কাঁদতে পারতাম না, রাগ হইলে ফোঁসফোঁস করতাম খালি! আমি সেই পেটের মানুষটার উপরে রাগের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেলাম!

সকালে উঠে পছন্দমত খাবার পাই না, আম্মু নাই বাসায়, তো খাওয়াবে কে? স্কুলে যাওয়ার আগে মনের মতো কেও চুল বেধে দিতে পারে না, স্কুলে যেয়ে দেখি ইংলিশ ফর টুডে বই আনতে ভুলে গেছি! নিজে নিজে এই প্রথম ব্যাগ গুছালাম, আম্মু যেহেতু নাই, ভুল তো হবেই। টিচার জিজ্ঞেস করার পর বললাম, "আম্মু ভাইকে আনতে হাসপাতাল গেসে, ব্যাগ নিজে গুছাইসি।" টিচার কিছু না বলে আমার মনের অবস্থা বুঝে সেদিনকার টিফিন আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে গেলো। তারপর একদিন আমারে স্কুলে নেয়ার মতই কেও ছিল না বাসায়, আমাকে কেও স্কুল টাইমে ডাকেও নাই, আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি, ঘড়িতে নয়টা বাজে! রাগের পরিমাণ আরো বাড়তে থাকলো সেই লোকের ওপর...

অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ, সালটা সেই একই, দিনটা বুধবার, রোদ ঝলমলে দিন... সময় সকাল এগারোটা। উপরের তলার কেয়া আন্টি এসে জানান দিলো, "রৌশনী, তোমার একটা ছোট ভাই হইসে! তোমাদের ল্যান্ডফোন নষ্ট বলে জাকির ভাই আমাদের বাসায় ফোন দিয়ে জানালো। খুব খুশি লাগছে, না মা?" আমার তখন কি হইলো, কে জানে! আন্টি এমন খুশিখুশি গলায় বলসিলো যে আমি আমার যাবতীয় বিরক্তি ঝেড়ে "আমার ভাই আসবে, আমার ভাই আসবে" বলে আব্বুর বিছানার উপর লাফাতে লাফাতে বেতের বিছানাটার একপাশ ভেঙেই ফেললাম!

ওইদিন রাতে ঘুমাতে যেয়ে আবার মেজাজ খারাপ... গত দুই রাতের মতো এই রাতেও একই অবস্থা, আম্মুকে ছাড়া ঘুমাতে হবে। এবার ছোটজনের উপর থেকে রাগ সরে আম্মুর উপর গিয়ে পড়লো! এই মহিলার কি একবারো আমার কথা মনে পড়ছে না?! এভাবে মানুষ মানুষকে ভুলে যাইতে পারে? এর মধ্যে ফুপা বিকেলবেলাতে এসেই খবর দিয়েছিলো, "তোমার আম্মার জ্ঞান ফিরে আসছে।" তাইলে তো এখন হিসাবমতে আম্মুর চলে আসার কথা! আম্মু তাও আসেনা ক্যান? নানা খেয়াল সেই সময় মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিলো! আশেপাশের বাসার আন্টিরা নানান রকমের খাবার বানায়ে আমার জন্য দিয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু আমার তো আম্মুকেই চাই! মনের মধ্যে ভেতরে ভেতরে রাগতাম, বাইরের কাওকে মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতাম না, কিচ্ছু জিজ্ঞেস ও করতাম না!

পরেরদিন সকালবেলা ফুপা আম্মুদের জন্য সকালবেলা খাবার নিয়ে যাওয়ার সময় ফুপার হাতে করে আম্মুর জন্য একটা চিঠি পাঠালাম। "প্রিয় আম্মু,
কী খবর? ছেলেকে পেয়ে তো আমার কথা ভুলেই গেছো। বাসায় যে একটা মেয়েকে রেখে গেছো, সেইটা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য চিঠি লিখলাম। আমি আসবো না দেখতে। তুমি তোমার ছেলেকে নিয়েই থাকো।
ইতি-
রৌশনী"
পরে শুনেছি, আম্মু নাকি সেই চিঠি পেয়ে হাসপাতালের বিছানায় বসে হাউমাউ করে কেঁদেছিলো! এখন মনে হলে এতো অনুশোচনাবোধ হয়! আম্মু এখনো সেই চিঠির কথা মনে করিয়ে দিয়ে আমারে ক্ষেপায়।

আমাকে অনেক মানুষ ধরেবেঁধে হাসপাতালে নিয়ে যাইতে চাইতো। কিন্তু হাসপাতালে গেলেই তো ভাইকে দেখতে হবে, ওই ছেলেরে আমি বিন্দুমাত্র দেখবো না, মরে গেলেও না, আবার এদিকে আম্মুকেও একটু একটু দেখতে ইচ্ছা হয়, কতোগুলা দিন ধরে দেখিনা! তারপর একদিন সকালে আব্বু নিজে এসে আমাকে ধরেবেঁধে ওসমানী মেডিকেলে নিয়ে গেলো, ৩০৩ নম্বর কেবিন ছিল খুব সম্ভবত! আমি ঢুকে দেখি, এক বিছানায় আম্মু শোয়া, আরেক বিছানায় সেই বিরক্তিকর ইনসান! আমি যেয়ে ফুপুর পাশে বসার পর ফুপু আমার হাতে সেই বিরক্তিকর মানবকে তুলে দিলো। আমি কোলে নিয়ে বলি- "ভাই তো কালো! যাহ... এইটা আমার ভাই না!" আশেপাশের মানুষজন আমার রিএকশন দেখে যারপরনাই অবাক! এতোদিন ধরে আমার মাথায় তোমার "খুব সুন্দর" একটা ভাই হবে, কথাটা শুনতে শুনতে "খুব সুন্দর" এর যে চিত্র গেঁথে গেছিলো, আমি আসলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারি নাই। পরে আমাকে সবাই মিলে অনেক বোঝালো, আম্মু অনেক আদর-টাদর করলো, ভাইয়ের উপর থেকে রাগ একটু কমলো।

আমি বড় হয়ে আসল কাহিনী শুনেছি- আমার ভাইটাকে জন্মের পরপর ই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রাখতে হয়েছিলো। ও জন্মের পর কাঁদে নাই, শরীর নীল! পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখা গেলো, বাচ্চার জণ্ডিস! রীতিমতো বাঁচামরা নিয়ে টানাটানি! তিন দিন পর ওকে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট থেকে মুক্তি দিসে। কিন্তু ডাক্তার সাথে এইটাও বলে দিসে, "ও খুবই দুর্বল বাচ্চা। প্রথম পাঁচ বছর একদম চোখেচোখে রাখতে হবে!"

যাই হউক, একদিন দুপুরে স্কুল থেকে আনতে যেয়ে স্কুলের গেটে দাঁড়ায়েই আব্বু বললো, "বুড়ি, ছোট ভাই তো আজকে বাসায় চলে আসছে!" আমি নাচতে নাচতে রাস্তাতেই এক্সিডেন্ট করে ফেলি টাইপ অবস্থা। আমার ধারণা, ভাই আসার চাইতেও আম্মু চলে আসছে ভেবে আমি বেশি খুশি ছিলাম সম্ভবত! বাসার নিচে দেখলাম, এম্বুলেন্স দাঁড়ানো, এই এম্বুলেন্সে করেই নাকি ভাই আসছে! দোতলায় উঠতে উঠতে অনেক মানুষ আমারে কংগ্রাচুলেশনস জানালো (এর কোন অর্থ খুঁজে পাই নাই আমি!) বাসায় ঢুকেই কেডস খুলে একদৌড়ে বেডরুমে যেয়ে ভাইকে কোলে নিয়ে সেইই কি আনন্দ! মেবি আই ওয়াজ দ্যা হ্যাপিয়েস্ট কিড অন দিস প্ল্যানেট অ্যাট দ্যাট মোমেন্ট!! আম্মু তখন বললো, "সাবধান! বাবু হিশু করে দিলে কিন্তু স্কুলের জামা নষ্ট হয়ে যাবে!" আমি তখন সাথেসাথে আবার ওরে বিছানায় রেখে দিই। দুপুরে আম্মুর হাতে গরম ভাত খাইলাম, বহুদিন বাদে কলিজায় পানি ফিরে আসছে মনে হইলো! রাতে ঘুমানোর সময় বাঁধলো বিপত্তি! আমারে বোঝানো হইলো, খাটটা যেহেতু ছোট, বাবুও ছোট, আমাকে তাই এখন থেকে আব্বুর সঙ্গে ঘুমাতে হবে। আমার চোখে রীতিমতো পানি চলে আসলো, আমারে সবাই মিলে বোঝানো শুরু করলো, বড় বোন হইতে হইলে এইটুকু স্যাক্রিফাইস তো করতেই হয়! এরপরে আমার বড় খালা এবং বড় চাচা তাদের ভাইবোনদের জন্য কী পরিমাণ কষ্ট করেছে এবং তার পরিণামে আজকে যে আমি আমার আম্মু-আব্বুকে এই অবস্থায় দেখতে সক্ষম হয়েছি, এ জাতীয় ইতিহাস শোনানো শুরু করলো। শেষমেশ আমাকেও বড় খালার মতো বড় বোন হইতে হবে দীক্ষা নিয়ে আমি আব্বুর সাথে ঘুমাতে রাজি হলাম। আব্বু সাথে ঘুমানো খুব কষ্ট! একটু নড়াচড়া করলেই আব্বু পিঠে গাট্টি মারে, আমাকে সারাটাক্ষণ স্টিপ হয়ে শুয়ে থাকতে হয়। আবার, আম্মুর মতো হাত রাখার তো আর কোন জায়গাও খুঁজে পাই না, রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে প্রায় রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতাম।

আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এক রাতে আব্বুর উপর কি জন্যে জানি ভীষণ রাগ হলো, এবার আমি আর আব্বুর সাথে ঘুমাবোই না, আম্মুর সাথেই ঘুমাবো বলে বেঁকে বসলাম। সে রাতে আম্মু, আমি আর বাবু মিলে ঘুমালাম। আমি নাকি মাঝরাতে বাবুর বুকের উপর পা দিয়ে ফেলেছিলাম, বাবু নিঃশ্বাস নিতে পারছিলনা। সেই রাতের পর আজ অব্দি বাবুই আম্মুর কাছে ঘুমায়, আমার আর ঘুমানো হয়ে ওঠে নাই।

আমাদের দেশের মানুষজনের কিছু একটা সমস্যা আছে বোধহয়! ছোট ছোট বাচ্চাদের দেখলেই প্রশ্ন করবে, "পিচ্চি, বড় হয়ে কী হতে চাও তুমি?" তখন সেই পিচ্চি যদি বলে ডাকপিওন, তখন হাসির রোল উঠবে, যদি বলে ডাক্তার, তখন ছেলের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত ভেবে সবাই একসাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। ঠিক এরকম যাদের নতুন ভাইবোন হয়, তাদেরকে দেখলে বলবে, "আব্বু কাকে বেশি আদর করে? তোমাকে না ভাইয়াকে?" স্বাভাবিকভাবেই যেই শিশুর বয়স মাত্র কয়েকটা দিনের সমষ্টি, তার দিকে বাবা-মা কে একটু বেশি কেয়ার দিতে হয়, বড়জনের মনের অবস্থা তখন এমনিতেই কাহিল থাকে, তাকে আরো নাজেহাল করবার অর্থ আমি খুঁজে পাই না কখনো! আমাকেও এরকম প্রশ্ন করতো, আর মনের মধ্যে প্রশ্নেরা দানা বাঁধতো, "আচ্ছা, আম্মু কি আসলেই এখন আমাকে কম আদর করবে?" বাচ্চারা আস্তে আস্তে কমপ্লেক্সিসিটিতে ভোগা শুরু করে দেয়!

একটা ছোট ভাই বা বোন জন্মায়, তখন একইসাথে একটা 'বড়' ভাই বা বোনের ও জন্ম হয়। তাকেও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে, পরিবর্তনগুলোর সাথে অভ্যস্ত হতে, নতুনজনের জন্য ছাড় দেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে, সবচাইতে বড় কথা, "স্যাক্রিফাইস" করার মতো চিন্তাধারা তৈরি হতে হতে একটু সময় লাগে... পরিবেশটাকে তখন তার জন্য সহজ না বানিয়ে উলটা অদ্ভুত সব ভিত্তিহীন প্রশ্ন করে যেটা শিশুমনে আঘাত দিয়ে একটা আলগা দেয়াল গড়ে তুলে দেবার জন্য যথেষ্ট ইফেক্টিভ, এরকম অনর্থক বিবেকহীন কাজগুলো না করলেই কী নয়?

একটা ছোট শিশুর জন্য বড়দের কী পরিমাণ পেইন খাওয়া লাগে, সেটা তারা কখনওই বুঝবে না! আমি আমার বন্ধুবান্ধবদের দেখি, বড় ভাইবোনকে লিটারেলি হেইট করে তারা! আমি মাঝেমধ্যে আশ্চর্য হয়ে যাই! এই ভাই বা বোনটাকে ছোটবেলায় তার কারণে কি কি পরিস্থিতি ফেস করে যেতে হয়েছে, সে সম্বন্ধে তাদের নূন্যতম আইডিয়াও যদি থাকতো, তারা বোধহয় এরকম রুচিহীন কার্যকলাপ কমাতো কিছুটা!

এই ছেলেটা প্রথম যেদিন ভাত খেলো, প্রথমদিকে যখন "বাবু বলো, আআআআআলুউউউউ!" বলে ভাত খাওয়ানো লাগতো, প্রথম যেদিন হেলান দিয়ে বসতে শিখলো, প্রথম যেদিন হামাগুড়ি দিতে দিতে হুট করে আধ ইঞ্চি জায়গা হাঁটলো, হাঁটতে হাঁটতে হোচট ও খেলো, আস্তে আস্তে একদিন বল খেলা শিখলো! প্রথম যেদিন পটি ছেড়ে বাথরুম ব্যবহার করা শিখলো, বড় বোল ছেড়ে বালতির পাশে দাঁড়িয়ে গোসল করা শুরু করলো, প্রথম যেদিন বাবার হাত ধরে জুম্মার নামাজ পড়তে গেলো... টুপি মাথায় সাইজে লাগে নাই বলে সেই কি মন খারাপ, প্রথম যেদিন স্কুলের নীলসাদা ড্রেসটা পরে কাঁদতে কাঁদতে স্কুলে গেলো, প্রথম যেদিন পরীক্ষা দিতে যেয়ে বাংলা পরীক্ষায় ইংলিশ এ বি সি ডি লিখে দিয়ে এসে "পলীক্ষা খুব ভালো হইতে" বলে নর্তনকুর্দন করলো, প্রথম যেদিন সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে কব্জির কাছটায় কেটে ফেললো, প্রথম যেদিন খেলতে গিয়ে মারামারি করে আসলো, মায়ের এপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের সময় প্রথম যেদিন বাবার সাথে ঘুমালো, মা লণ্ডনে পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রী নিতে যাওয়ার পর যখন ওকে ঘুম পাড়ানোর জন্য পায়ের ওপর নিয়ে দোলাতে দোলাতে পা দুটো ব্যথা হয়ে যেতো , মা হজ্বে যাওয়ার জন্য ঢাকার বাসে উঠার সাথে সাথে যেদিন টুপ করে হাতটা ভেঙে ফেললো, সবকিছু পঙ্গু মানুষদের মতো করে যখন ওর কারণে চিন্তা করা লাগতো.... সব স-বকিছুই একটা একটা ইতিহাস!

এই ছেলের মাথায় লিটারেলি সমস্যা আছে। আমি যদি ওরে কানে ধরে দাঁড়ায়ে থাকতে বলি, ও এখনো চুপচাপ কানে ধরে দাঁড়ায়ে থাকবে, একবারো জিজ্ঞাসা করবেনা, "আপু, আমার ভুলটা কোথায়?" ওরে যদি সমানে পিটায়ে লাল করে ফেলি, একবারো বাঁধা দেবে না। যদি ঠাণ্ডায় জমেও যায়, তাও বলবেনা, "আপু, এসির টেম্পারেচার বাড়াও। আমার ঠাণ্ডা লাগতেসে।" এই ছেলে এক কথায় আপু বলতে অজ্ঞান! মুখে দেয়ার অযোগ্য খাবার ও যদি কেও ওর সামনে "তোর আপু এইটা একটু আগে খুব মজা করে খেয়ে গেসে তো!" বলে খেতে দেয়, ও সেই আতেলা-আঝালা তরকারিও নির্দ্বিধায় খেয়ে নেবে! ওরে যদি আমি কাচা ঘুমের মাঝেও ডেকে তুলে বলি, "বাবুউউউউ, কাঁথা দে", ও চুপচাপ এসে কাঁথা গায়ে দিয়ে যাবে। "বাবু, পানি দে", "বাবু, ফ্যান ছেড়ে দে", "বাবু, মাথা টিপে দে", "বাবু, স্কেল খুঁজে দে", "বাবু, বাবারে ফোন দিয়ে ফ্লেক্সি দিতে বল" সারাদিন ধরে একটার পর একটা বলতেই থাকি এবং শুধুমাত্র ছোট হওয়ার অপরাধে সে সারাদিন ধরে আমার ফরমাশ খাটতে থাকে; এবং, এতো সবের পরেও যদি কেও তার সামনে তার আপুর নামে একটা কোন কটু কথা বলে, সে ওই মানুষের সাথে সারাজীবনের জন্য কথা বলা বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকে!

আমি ছিলাম এক বান্দর, আমার ভাইটা হচ্ছে লক্ষ্মী শব্দের প্রতিমূর্তি। দুনিয়ার সবচাইতে শান্তশিষ্ট নির্ঝঞ্ঝাট পাবলিকের খাতায় ওর নাম ওঠা উচিৎ! তারপরেও আমি তার উপরে কারণে-অকারণে বিরক্ত হই। ফজরের নামাজের পর এসে যখন সে পড়তে বসে, আর আমি তার পড়ার সাউন্ডের অত্যাচারে দ্বিতীয় দফা ঘুমাইতে যেতে পারি না, তখন বিরক্ত হই। সে যখন আমার রুমে ঢুকে বসে থাকে আর বাথরুমের বাইরে থেকে আমারে নানান আজব সব খবর দিতে থাকে- "নানাভাই আসছে, জানো আপু? তাড়াতাড়ি বের হও! নানাভাইয়ের কি জানি একটা সমস্যা হইসে! প্লেন ধরে চলে আসছে।" এই জাতীয় উদ্ভট সব খবর দিতে দিতে বিরক্ত করে করে মেরে ফেলে। সে খুব ভালো করে জানে, আমি কি পরিমাণ ক্রিকেটপাগল মানুষ, তবু বাংলাদেশের খেলা থাকলে "আজকে তো বাংলাদেশ হারবেই" জাতীয় কথাবার্তা বলে আমার মাথায় রাগ উঠায়ে দেয় যখন, তখন বিরক্তির চোটে আমার তারে ধরে পিটাইতে মনে চায়! প্রায় দিন ই এই ফাজিল আবার আমার জন্য দুপুরবেলা না খেয়ে বসে থাকে, তার ফোনের যন্ত্রণায় প্রায় দিন ই আমারে শুধুমাত্র উনার সাথে দুপুরে খাওয়ার জন্য যখন বাসায় আসা লাগে, তখন বিরক্ত হই। আমার মোবাইল ঘেঁটে ছবি বের করে আমার সব ছেলে বন্ধুদের নামে যখন আম্মুর কানের কাছে উল্টাপাল্টা বকতে থাকে, তখনো বিরক্ত হই। আবার, মাঝেমধ্যে দুনিয়ার মানুষের উপর বিরক্ত হয়ে যাবতীয় বিরক্তি ওর উপরই ঝাড়ি!

এই বিরক্তিকর রকমের ভালো মানুষটার আজ জন্মদিন। ফেসবুকের "অন দিস ডে" ঘেঁটে যখন দেখলাম, এতো বছরে কতো কি লিখলাম, অথচ ভাইটার জন্মদিন নিয়ে কোনদিন কিচ্ছু লিখি নাই, তখন এই রচনা লেখার কথা মাথায় আসলো! জন্মানোর পর থেকে আজ অব্দি আমার হাড় জ্বালা করে পিসপিস বানায়ে ভাজিভাজি করে খেয়ে আসলেও এরে আমি ভালোবাসি।

যারা উপরের পুরাটুকু না পড়ে স্ক্রল করে নিচে আসলেন, তাদের বলি-  আমার ভাইটার জন্মদিন শুভ হোক, বলবার তেমন প্রয়োজন নেই। নিজের যোগ্যতায় জীবনের প্রতিটা দিন শুভ বানাবার দায়িত্বটা ওর ই! ওর আকাশ ও ই রাঙাক, রঙের জোগান দেয়ার জন্য আমি তো আছি ই! শুধু বলি, ওর জন্যে একটু দুইটা মিনিট হাত তুলে দোয়া করবেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিচ্ছু হবার প্রয়োজন নেই, মানুষের মতো মানুষ হোক এটুকুই চাওয়া। এগারো বছর বয়সে যেদিন ও প্রথমবারের মতো চোখমুখ শক্ত করে বলেছিলো, "তুমি যদি পিএসসি প্রশ্ন ল্যাপটপে নামাও, আমি পরীক্ষা দিতেই যাবো না", সেদিন আমার কি যে গর্ব লেগেছিলো, আমার জায়গায় না থাকলে কেও বুঝবে না।  আমার ফ্রেন্ডলিস্টে একজন মানুষ আছে, যার ছোট বোনের কার্যকলাপে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নাই। আমার তারে দেখলে প্রচণ্ড বিরক্ত লাগে! ভাইবোন বিপথে গেলে তার কিছুটা হলেও দায়িত্ব বড়জনের কাঁধে বর্তায়, এটা সে চাইলেও বোধ করি অস্বীকার করতে পারবে না। রাস্তাঘাটে যখন ছেলেরা টিজ করে, মনটন খুব খারাপ হয়- এদের বড় বোন এদের কিচ্ছু শেখাতে পারে নাই ভেবে! আমার ভাইটা নাহয় একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হোক, মেয়েদের সম্মান দিতে শিখুক, আজকে আমার ভাই পরিবর্তন আনুক, কাল নাহয় ওর বন্ধু, পরশু নাহয় ওর ছেলে... এভাবে একটু একটু করেই শিলং এর রাস্তায় যেভাবে নির্বিঘ্নে হাঁটতে পেরেছিলাম, একদিন নিজের দেশে হাঁটবো। আমি না হোক, আমার জায়গায় অন্য কোন আমি হাঁটবে, স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? মানুষ তো আশায় ই বাঁচে!

লেখক :: শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •   সিলেটে দিঘীতে ‘ভাসমান রেস্টুরেন্ট’: শিগগিরই কাজ শুরু
  •   বিকেলে সৌদির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী
  •   অভিযানের শুরুতেই জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণ
  •   প্যারিসে অধ্যক্ষ আব্দুল মুকিত স্মরণে শোক সভা
  •   তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতীয়কে ফেরত পাঠালো পুলিশ
  •   ট্রাক উল্টে প্রাণ গেল একই পরিবারের তিনজনের
  •   ‘ঘিরে রাখা দুই বাড়িতে জঙ্গি ও গোলাবারুদ রয়েছে’
  •   আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সম্পাদক পরিষদের মানববন্ধন
  •   ঢাকায় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল: সিলেটে খেলবে টেস্ট ম্যাচ
  •   জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে দু’টি বাড়িতে অভিযান
  •   একসাথে চার সন্তান প্রসব
  •   ছেলের জন্য ঠিক করা মেয়েকে বিয়ে করলেন বাবা!
  •   প্রেমিকের কবরে কনের সাজে প্রেমিকা
  •   ক্লিনটনের যৌন কেচ্ছা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য হিলারির
  •   ফেসবুক প্রোফাইল গোপন রাখবেন যেভাবে
  • সাম্প্রতিক ফিচার খবর

  •   নামিদামি স্কুলে পড়লেই কি শিশুরা মেধাবী হয়?
  •   রেলের উন্নয়নে বৃটিশদের ছাড়িয়ে গেল বর্তমান সরকার
  •   সিলেট টু ঢাকা: ভার্চুয়াল যুগ; ননভার্চুয়াল ভালোবাসা
  •   আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস
  •   বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন ‘বুর্জ খলিফা’র অজানা ইতিহাস
  •   পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
  •   হুমায়ূন আহমেদের ঠাট্টা
  •   বাংলাদেশের বদলে যাওয়া: দক্ষিণ এশিয়ার উদাহরণ, বিশ্বের বিস্ময়
  •   ইসলামে ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব
  •   দোয়ারাবাজার উপজেলার ইতিহাস ও কিছু কথা
  •   মীরজাফরের বংশধর ইস্কান্দার মির্জা
  •   অনলাইন সাংবাদিকতায় সম্মাননা পেলেন আহমেদ জুয়েল
  •   চমকে দিলেন তোফায়েল, পয়েন্ট অব নো রিটার্নে রাজনীতি?
  •   আচার্য শ্রীল প্রভুপাদ ও তাঁর অবদান
  •   ওসমানীকে র‌্যাঙ্ক দিতে বাধ্য হন পাকিস্তানি জেনারেল