আজ সোমবার, ০১ জুন ২০২০ ইং

অন্যরকম বৈশাখ

:: অমিত দাশ ::

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-০৪-০৭ ২২:২৩:০৭

বসন্তের শেষ কচি কচি সবুজ পাতার ফাঁকে হঠাৎ করে নেমে আসা এক চিলতে বৃষ্টি গায়ে মেখে যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, দেখি অন্ধকার আকাশ মেঘের গর্জনে জানান দিচ্ছে বৈশাখ এসে গেছে। বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় উৎসব। জাত-মত-ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর আর কোথাও এত বড় উৎসব হয় বলে আমার ধারণা নাই। পরক্ষণেই আবার মন খারাপ হয়ে যায় যখন ভাবি উৎসবটা কি আসলেই সবার? নাকি শুধুই বিত্তবানদের? আকাশের সেই মেঘের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই ভাবছিলাম জীবন একটা খেয়াঘাট। এখানে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা থাকে খেয়া নৌকা। যে যে নৌকায় পারছে সে সেই নৌকায় উঠে মেতে উঠছে খেলায়। কিছু কিছু খেয়ানৌকা যেমন ভাটার টানে এগিয়ে চলে গন্তব্যে ঠিক একই ভাবে আরো কিছু খেয়ানৌকা স্রোতের বিপরীতে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে। সেই সব খেয়া নৌকা যারা তীরে পৌছাতে গিয়ে মুখোমুখি হয় লক্ষবার কালবৈশেখী ঝড়ের। তেমন কিছু ঝরে পড়া মুকুলের  সাথে এবারের বৈশাখ কাটালে কেমন হয়। চিন্তা ভাবনা শেষে একরখম ঠিক করে নিলাম এবং বেলায় চা আড্ডায় বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলাম এবারের পহেলা বৈশাখ সেই সব ছিন্নমূল শিশুদের সাথে কাটাব যারা বাস্তবতার কঠিন যুদ্ধে শুধু জীবন নিয়েই কেবল বেঁচে থাকার জন্য দিন কাটাচ্ছে। যাদের নববর্ষ, ঈদ, পূজা সব জায়গাতেই কেবল দু'মুঠো অন্যের সন্ধান খোঁজা। সেই সব পথশিশুদের সাথে এবারের পহেলা বৈশাখটা কাটানোর জন্য বন্ধুরাও সবাই একমত হয়ে গেলো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী নববর্ষের দিন সকালে ওদের জন্য আলাদা করে জমিয়ে রাখা কিছু টাকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি সিলেটের উদ্দেশ্যে। প্রথমে এমসি কলেজে গিয়ে বন্ধুদের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে সবাই মিলে বেড়িয়ে পরি উদ্দেশ্য সাধনে। প্রথমে নগরীর জেলরোড পয়েন্ট থেকে হাঁটা শুরু করে চৌহাট্টা পয়েন্ট ঘুরে জিন্দাবাজার হয়ে লামাবাজার পয়েন্টে যাই কিন্তু পথশিশুর দেখা নাই। তারপর মদন মোহন কলেজে গিয়ে দেখা হয় তিন শিশুর সাথে।

আরিফ(৯), মুন্না(১৩) ও সাগর(১০) এর সাথে। জীবিকার সন্ধানে বেলুন বিক্রি করে তিনজনই। কিন্তু এত বিশাল পৃথিবীতে এই ছোট্ট শিশুগুলো মাথায় এত বড় বড় চাপ নিয়েও সদা হাস্যোজ্জল। খুশির কোন কমতি নেই তাদের হাত, পা, চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো সকাল বেলা বেশ রঙ খেলেছে এরা।

আরিফ- মাত্র ৮ বছরের শিশু। ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার বড় সে। বাবা রিক্সাচালক আর মা বাসায় কাজ করেন। অভাবের সংসার আর বাবা-মায়ের অজ্ঞতায় পড়াশোনা করা হয়ে উঠেনি তার। সে রোজ রোজ বেলুন বিক্রি করে অভাবের সংসারে সামান্য যোগান দেয়। দৈনিক আয়ের প্রত্যেকটা টাকা তুলে দেয় মায়ের হাতে। পড়ালেখা করতে এখন আর ইচ্ছে করেনা তার। বড় ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। অনেক টাকার দরকার তার। তার সবচেয়ে ভালোলাগে বাংলাদেশের খেলা দেখতে সাকিব-আল-হাসান তার প্রিয় খেলোয়াড়। বিশাল এই পৃথিবীতে সংসারের দায়িত্ব এক বিশাল দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব মাথায় নিয়েও হাসিমুখে থাকে এই ছোট্ট শিশু আরিফ। আর আমরা এত সুখে থেকেও নিজেকে বেমানান মনে করি।

মুন্না-তিনজনের দলের সবচেয়ে বড় সে এবার ক্লাস সেভেনে পড়ে। তারও বাবা রিক্সাচালক আর মা বাসা বাড়িতে কাজ করেন। পরিবার ছোট হওয়ায় বাবা মা কষ্ট করে তাকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। অনেক অভাব অনটনের সংসার তাই বাবা মাকে খানিকটা সহযোগিতা করার জন্য মাঝে মাঝে বেলুন বিক্রিতে নামতে হয় তাকে। সে স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে প্লেনের ইঞ্জিনিয়ার হবে। ক্রিকেট খেলতে এবং খেলা দেখতে অনেক ভালবাসে সে। তার প্রিয় খেলোয়ার মাশরাফি-বিন-মর্তুজা। শান্ত স্বভাবের এই ছেলের স্বপ্নের কথা শুনলে যে কারো স্বপ্নের বেগ বেড়ে যাবে। অথচ আমরা রোজ রোজ স্বপ্ন পাল্টাই।

সাগর-দলের সবচেয়ে স্বল্পভাষী ৯ বছরের এই শিশু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। পরনে ময়লা শার্ট সারা শরীরে রঙের দাগ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আজ বেশ ধকল গেছে তার উপরে। এখনো চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সরকারি স্কুল তাই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারছে। সিক্সে উঠলে পড়তে পারবে কিনা সে জানে না। তারও বাবা রিক্সা চালান, মা বাসায় কাজ করেন। তিন জনের এই দলে সবচেয়ে মেধাবী সে। বেলুন কত টাকা কেনা কত টাকা বিক্রি কত টাকা লাভ সব কিছু গড়গড় করে বলে দেয় সে। এমনকি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সব খেলোয়াড়ের নাম তার মুখস্থ। মাশরাফি তার প্রিয় খেলোয়াড়। মাঝে মধ্যে উৎসব হলে বেলুন বিক্রি করে সে না হয় নিয়মিত স্কুলে যায়। তার স্বপ্ন সম্পর্কে সে জানেনা তবে অনেক বড় হয়ে গাড়ি কেনার ইচ্ছা করে তার।

এদের সাথে আড্ডা-গল্প-গান ছড়া টুকটাক হাসি ঠাট্টা শেষে সাধ্যমত খাওয়াদাওয়ায় অনেক ভালো কাটে সেবারের পহেলা বৈশাখ। তাদের আনন্দ উদ্দীপনা দেখে বোঝাই যায়না এতটা কষ্টের জীবন কাটায় তারা। কিন্তু আমরা একটু কষ্ট পেলেই ভেঙ্গে পড়ি। আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে আমরা কি পারিনা আমাদের এই সর্বজনীন উৎসবের দিনটিতে ধনী-গরীব, বিত্ত-প্রতিপত্ত, হিংসা-অহংকার ভুলে সবাই এক সাথে এক সুরে বরণ করে নিতে। ভালো থাকুক সেই সব বিন্দুহীন বৃত্ত। আমরাও হই নতুন আলোয় দীপ্ত।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/৭ এপ্রিল ২০১৯/পিডি

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন