আজ বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২০ ইং

খামারিদের সংগঠন, নেতৃত্ব ও ডেইরি উন্নয়ন বিষয়ক ভাবনা

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-১১-১৯ ১৭:২৪:২৪

শাকিল জামান:: বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ বিশেষ করে ডেইরি শিল্পে এক নবদিগন্তের সূচনা হচ্ছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের শিক্ষিত যুব সমাজের একটা বড় অংশ লেখাপড়া শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে গরুর খামার করে স্বাবলম্বী হওয়া এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই খাতকে অর্থনীতির এক মজবুত ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান সরকার বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দেশের প্রাণিসম্পদের উন্নয়নের জন্য 'লাইভস্টক এন্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)' হাতে নিয়েছে।

এলডিডিপি প্রজেক্ট সাজানো হয়েছে মূলত খামারিদেরকে সংঘবদ্ধ করে দেশের প্রাণিসম্পদের একটি মজবুত ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানোর প্রয়াস নিয়ে। খামারিরা যাতে তাদের উৎপাদিত দুধকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভোক্তার দোরগোড়ায় পৌছাতে পারে এবং ন্যায্যমূল্য পায় এক্ষেত্রে যেসকল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার, সেটাই এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয় বরং একই এলাকায় গড়ে ওঠা সকল খামারিই এর সুফল ভোগ করবে।

এই প্রকল্পকে সফল করতে সবার আগে দরকার ছিলো খামারিদের সংঘটিত করা। ইতোমধ্যেই কয়েকটি বিভাগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উপজেলা ডেইরি এসোসিয়েশন এবং উপজেলা এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে জেলা এসোসিয়েশন এবং সকল জেলার নেতৃবৃন্দ মিলে বিভাগীয় এসোসিয়েশন গঠন করেছে। বাকি বিভাগগুলোতেও এই প্রক্রিয়া চলমান। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই সকল বিভাগে খামারিদের নিয়ে বিভাগীয় এসোসিয়েশন গঠন সম্পন্ন হবে।

উল্লেখ্য যে, পূর্বে বাংলাদেশের খামারিদের সরাসরি অংশগ্রহণে একেবারে উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে বিভাগে এসোসিয়েশন গঠন করা হয় নি। তবে পৃথকভাবে কয়েকটি সংগঠন কাজ করেছে এবং কিছু কিছু জেলায় তারা কমিটিও দিয়েছে। দেখা গেছে একই জেলায় দুইটি সংগঠনের নামে আলাদা দুটি শাখা কমিটি আছে এবং তারা বিভক্ত হয়ে আলাদাভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এতে করে খামারিরা বিভ্রান্ত হয়ে এসকল এসোসিয়েশন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং জেলা পর্যায়ে এগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে।

ইতোপূর্বে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে খামারিদের নিয়ে গঠিত কোনো এসোসিয়েশন না থাকায় আলাদাভাবে অনেক সংগঠন নিজেদেরকে খামারিদের অভিভাবক হিসেবে জাহির করে বিভিন্ন প্রভাব খাটানো ও ফায়দা নেয়ার কথা শুনা গেছে। তবে সেই সংগঠনগুলো কখনোই সত্যিকার অর্থে খামারিদের প্রতিনিধিত্ব করে নি।

বিগত বছরে বাজেট প্রণয়নের পূর্বে সারাদেশের খামারিরা সংঘবদ্ধ হয়ে বাজেটে আমদানিকৃত গুঁড়োদুধে কর বৃদ্ধি করা, খামারিদের ভর্তুকি প্রদানসহ বিভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও প্রেরণ করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে যখন আমদানিকৃত গুঁড়োদুধে মাত্র ৫% শুল্ক বাড়ানো হয় (যেখানে দাবি ছিলো ৫১% এ উন্নীতকরণ) তখন খামারিরা এর প্রতিবাদ করতে থাকে। তখন নিজেদেরকে খামারিদের অভিভাবক দাবি করা একটি সংগঠনের সেক্রেটারি ফেসবুকে 'ফিলিং হ্যাপি' অনুভূতি জানিয়ে পোস্ট করেন। খামারিরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রুপে তাদের মতামত প্রকাশ করলে তিনি তাদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে সেটি মুছে দেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ খামারি ব্যক্তিত্বকে গ্রুপ থেকে ব্লক করে দেন। এরপর থেকেই কার্যত পরিষ্কার হয়ে যায় এটি খামারিদের কোনো সংগঠন না; বরং ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য খামারিদের ব্যবহার করছে কতিপয় সিন্ডিকেট। বিভিন্ন খামারিদের ফেসবুকে দেয়া পোস্ট থেকে উক্ত সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনো খামারই নেই এবং গুঁড়োদুধ আমদানিকারকদের থেকে বড় অংকের আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও গুঞ্জন ওঠে।

এরপর যখন এলডিডিপি প্রকল্পের কাজ শুরু হয় তখন থেকেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সারাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলা পর্যায় থেকে এসোসিয়েশন গঠন শুরু হয় এবং পরবর্তীতে জেলা ও বিভাগেও এসোসিয়েশন গঠিত হয়। প্রত্যেকটি জেলা ও বিভাগের খামারিদের নিয়ে যখন কেন্দ্রীয়ভাবে ফেডারেশন গঠন করার আলোচনা হচ্ছে খামারি ও সরকারি পর্যায়ে। ঠিক তখনই, একটি সংগঠন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে জেলা, উপজেলা এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দকে দাওয়াত করে নিয়ে গিয়ে আবারো খামারিদের সংগঠনের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নেয়ার পায়তারা করছে।

এলডিডিপি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের সকল খামারিদেরকে আঞ্চলিকভাবে সংঘটিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ডেইরি উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে। খামারি এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে সঠিক খামারিদেরকে নিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে লিপ্ত ব্যক্তি কিংবা কোনো শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে এসোসিয়েশনের নেতৃত্ব গেলে এই প্রজেক্টের সফলতা মুখ থুবড়ে পড়বে।

এক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। প্রত্যেকটি জেলা পর্যায়ে গঠিত এসোসিয়েশনের নেতৃত্বেই কেন্দ্রীয় ভাবে ফেডারেশন গঠন করতে হবে। যেসকল স্বঘোষিত সংগঠন নিজেদেরকে খামারিদের অভিভাবক দাবি করেছে এদেরকে ব্যান করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত উপজেলা, জেলা, বিভাগ হতে উঠে আসা নেতৃত্বের ভিত্তিতে ফেডারেশন গঠন করতে হবে। যারা কথা বলবে দেশের খামারিদের পক্ষে, কাজ করবে দেশের ডেইরি সেক্টরের উন্নয়নে তথা দেশের সার্বিক উন্নয়নের অংশীদার হবে। তবেই সফল হবে এলডিডিপি, উন্নয়ন হবে প্রাণিসম্পদের।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সিলেট ডেইরি ফার্মারস এসোসিয়েশন

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন