আজ মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১ ইং

'আল্লামা' শব্দের অপব্যবহার ও কিছু কথা

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১২-২২ ২১:০৬:১৫

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল :: প্রকৃত নায়েবে রাসুল আলেম-উলামাদের সম্মানার্থে আমরা বিভিন্ন উপাধি বা লকব ব্যবহার করে থাকি। জ্ঞানী ও সম্মানিত মানুষকে বিভিন্ন উপাধিতে সম্মান জানানোর মাধ্যমে তার প্রকৃত অবস্থান মানুষের মধ্যে  তুলে ধরা হয়। যেমন,আল্লাহ তায়ালা ঈসা আঃ কে 'মসীহ' ইব্রাহীম আঃ কে 'খলিলুল্লাহ ' উপাধিতে ভূষিত করেছেন।প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবায়ে কেরামদেরকেও বিভিন্ন উপাধিতে সম্মানিত করেছেন, যেমন হযরত আলী রা. কে 'আসাদুল্লাহ' উসমান রা. কে 'যিন্নুরাইন' আবু বকর রা. কে ' সিদ্দিক ' উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

তাই,প্রকৃত জ্ঞানী -গুণী আলেম-উলামাদেরকেও বিভিন্ন সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু সম্মানজনক এমন কোনো উপাধি কারো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিৎ নয় ; যে উপাধীর যোগ্যতা তার মধ্যে নেই।  

আল্লামা একটি সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি,তাই যেখানে -সেখানে অপাত্রে আল্লামা শব্দের ব্যবহার মোটেই উচিৎ নয়। আজকাল আমাদের দেশে আলেমদের নামের আগে আল্লামা শব্দের ব্যবহার এতো বেশি বেড়েছে যে,যে লোকটি আরবি এবারত ছাড়া ৪/৫ লাইন পড়তেও পারে না। কিংবা কুরআন-হাদীসের জ্ঞানে মোটেই পারদর্শী নয়, তার নামের আগেও আল্লামা শব্দের ব্যবহার দেখা যায়,যা খুবই দুংখজনক ও হাস্যকর। এ বিষয়ে মুফতী রফী উসমানী বলেন,বর্তমান সময়ে আল্লামা একটি মাজলুম এসতেলেহাত বা নিপীড়িত,মাজলুম পরিভাষা।  

আল্লামা এতো সহজ একটি উপাধি নয় যে,যে কারো নামের আগে আল্লামা লাগিয়ে দিলেই তিনি আল্লামা হয়ে যাবেন বরং আল্লামা হওয়া একটি কঠিন ব্যাপার।

তাহলে জানা যাক,আল্লামা শব্দের অর্থ কি? কাদেরকে আল্লামা বলা যায়?
ইলম (জ্ঞান)শব্দ হতে আলিম (জ্ঞানী)আলিম শব্দটিতে দু'বার আধিক্যের অর্থ সৃষ্টি করে আল্লামা হয়েছে। এককথায় বলা যায়,যিনি ধর্মের মৌলিক সকল শাখায় বিশেষ পারদর্শী হবেন, একমাত্র তাঁকেই আল্লামা বলা যাবে।

আল্লামা হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে,সেই শর্তসাপেক্ষে কাউকে আল্লামা বলা যেতে পারে। ইসলামি গবেষকদের মতে,আল্লামা তাদেরকে বলা যায়,"যারা জামে'উল মানকুলাত -ওয়াল মা'কুলাত বিষয়ে অভিজ্ঞ অর্থাৎ উলূমে নাকলিয়া এবং উলূমে আকলিয়ায় সমানভাবে যিনি দক্ষ হবেন তিনিই আল্লামা"।

ইলমে মানকুলাত বলতে ওই শাস্ত্রকে বোঝানো হয়, যা উক্তি ও বর্ণনানির্ভর, যার মধ্যে কিয়াস বা যুক্তি চলে না। যেমন- ইলমে আকাইদ,ইলমে ফারায়িয,ইলমে হাদীস,ইলমে নাহব,ইলমে সরফ,ইলমে রিজাল,ইলমে তারীখ,ইলমে বালাগাত,ইলমে লুগাত,ইত্যাদি।  

আর ইলমে মা'কুলাত বলতে ওই শাস্ত্রকে বোঝানো হয়, যার মধ্যে কিয়াস, যুক্তি ও বুদ্ধি খাটাতে হয়, যেমন-ইলমে ফিকহ,ইলমে মানতিক, ইলমে কালাম,ইলমে হাইয়াত,ইলমে ফালসাফা ইত্যাদি।
তাহলে আল্লামা তাঁকেই বলা যাবে,যিনি একই সাথে মুহাদ্দিস, মুফতী, মুফাসসির, মুফাক্কির, হাদীসবিশারদ, আরবী ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, ফায়লাসুফ, ইতিহাসবিদ, মানতিকবিদ ও অলঙ্কার শাস্ত্রবিদ তথা ইলমে শরিয়তের সব শাস্ত্রে দক্ষ-অভিজ্ঞ হবেন।
উপরের শর্তসাপেক্ষে বলা যায়,যিনি শরীয়তের মৌলিক শাস্ত্রে অভিজ্ঞ, একমাত্র তাকেই আল্লামা বলা যেতে পারে।বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিকে সেই বিশেষ বিষয়ের উপাধি দেওয়া যায়,যেমন -যিনি হাদীস শাস্ত্রে অভিজ্ঞ তাকে শায়খুল হাদীস, যিনি ইলমে ফিকহ শাস্ত্রে অভিজ্ঞ তাকে মুফতী, কিংবা তাফসীর শাস্ত্রে অভিজ্ঞ তাকে শায়খুত তাফসীর বা মুফাসসির, যিনি কেরাত শাস্ত্রে অভিজ্ঞ তাকে শায়খুল কুররা বলা যায়। কিন্তু কাউকে আল্লামা বলতে হলে, অনন্তপক্ষে উপরের বিষয়গুলো প্রতি খেয়াল রেখে তাকে যদি যোগ্য মনে করেন তাহলে আল্লামা বলতে পারেন।

আলিম যে কাউকে বলা যায়,প্রত্যেক জ্ঞানী লোক এক একজন আলিম।কিন্তু আল্লামা এতো সহজ উপাধি নয় যে,কেউ সামান্য গরম ওয়াজ কিংবা সামান্য সুর দিয়ে ওয়াজ করতে পারলেই তাকে আল্লামা উপাধি দিয়ে দিবেন।সুতরাং কাউকে আল্লামা বলতে হলে একটু চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ।যাকে আল্লামা বলা হচ্ছে, তিনি কি উল্লিখিত সকল বিষয়ে পারদর্শী?
ভারতীয় উপমহাদেশে এ উপাধিটি প্রথম ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ভারতীয় মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালের ব্যাপারে।তিনি ভারতবর্ষের প্রথম খ্যাতিমান ‘আল্লামা’।যদিও তাকে আল্লামা বলা নিয়েও উলামাদের মধ্যে ইখতেলাফ রয়েছে, কিন্তু তার আল্লামা উপাধিটি সর্বমহলে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছে।

তার পূর্বে ভারতবর্ষের জগদ্বিখ্যাত আলেমদের নামের সঙ্গেও এতোটা বিস্তৃত পরিসরে আল্লামা ব্যবহার করা হতো না।তাদের নামের সঙ্গে ব্যবহৃত হতো মাওলানা বা মৌলভি। খুব বেশি হলে শায়খুল হাদিস,শায়খুত তাফসীর,শায়খুল ইসলাম,শায়খুল আদব,মুফতী ইত্যাদি।যেমন, মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহঃ, সাইয়েদ মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহঃ, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহঃ,মাওলানা আবুল হাসান নদভী,মুফতী তাকি উসমানী।একবার মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেবকে কোন ওয়াজে আল্লামা বলা হলো, তিনি সাথে সাথেই রাগ করে বলে উঠলেন,যেখানে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আলেম আশরাফ আলী থানবী, শামসুল হক ফরিদপুরী কিংবা শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানীকে মাওলানা বলা হয়,সেখানে আমার নামের আগে আল্লামা বলছ, তোমাদের সাহস ত কম না? চিন্তা করুন, তার মতো মহান ব্যাক্তি যেখানে নিজের নামের আগে আল্লামা শব্দের ব্যবহার করতে সাহস করেন নি, সেখানে আমাদের প্রাইমারী লেভেলের আলেমরা নিজেদের নামের আগে আল্লামা ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন।সময়ের বিবর্তনে আল্লামা শব্দের ব্যবহার বর্তমানে সবচেয়ে বেশি।বিশেষ করে এই আল্লামা শব্দের ব্যবহার আমাদের দেশের ওয়াজী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ব্যবহার হয়ে থাকে।

এবার চিন্তা করুন!
আল্লামা শব্দের উপাধীর প্রতি আমাদের দেশে কি পরিমাণ জুলুম করা হচ্ছে? আসুন, আল্লামা শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হই।সাধারণ একজন কামিল পাশ/দাওরায়ে হাদীস পাশ ওয়াজী হুজুরের নামের সাথেই যেনো  আল্লামা উপাধি লাগিয়ে না দেই।কারণ আল্লামা শব্দের অপব্যবহারে প্রকৃত আল্লামাদেরকে অবমাননা করা হচ্ছে।আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে একনিষ্ঠ ভাবে তার ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক  majharul276@gmail.com

সিলেটভিউ২৪ডটকম/২২ ডিসেম্বর ২০২০/জুনেদ



শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন