আজ শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২০ ইং

ভালো থাকুক ভালোবাসার জুড়ী

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-০২ ০০:৩১:১৭

মঞ্জুরে আলম লাল :: জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘ তেত্রিশ মাস কর্মরত থেকে চাঁদপুুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে সোমবার জুড়ী ছেড়ে যান অসীম চন্দ্র বনিক। পরদিন নিজের ফেসবুক আইডিতে জুড়ীকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন। যেখানে মাত্র ৭৬ শব্দে তিনি তাঁর আবেগ, অনুভূতি, পরামর্শ, প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেন। পাঠকের জন্য তা তুলে ধরা হল।

‘বিদায় জুড়ী। জুড়ীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে কাজ করেছি দুই বছর আট মাস সাতাশ দিন। জুড়ীতে কাজ করে এই উপলব্ধি হয়েছে যে, জীবন অনেক সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। সাধারণ মানুষের শক্তি অসাধারণ। কখনোই অন্যের কথায় অন্যায় কাজে জড়িত হওয়া যাবে না। অন্যায় যেই করুক সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা স্পষ্ট অবস্থান তৈরি করতে হবে। এটাই জীবনের সৌন্দর্য। আমি তারুন্যের শক্তির পক্ষে। ভালবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। ভালো থাকুক আমাদের সকলের ভালোবাসার জুড়ী। ভালো থাকুক জুড়ীর জনগণ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের মেধাবী শিক্ষার্থী, ২৯তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এ কর্মকর্তা ২০১১ সালের ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে ২০১৪ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদেন। ২০১৬ সালে যোগদান করেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে। ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে জুড়ী উপজেলায় যোগদেন।

এখানে কাজের শুরুতে উপজেলা কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরীণ ও বিভিন্ন দপ্তরের নানা সমস্যা তাঁর চোখে পড়ে। পথ বের করে তা সমাধান করতে থাকেন। পাবলিক টয়লেট সংস্কার, কমপ্লেক্স ভবনগুলোর অন্ধকারাচ্ছন্নতা দুর করে বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত করে নতুন রঙ্গে রাঙ্গিয়ে তুলেন। বিভিন্ন দপ্তরের কার্যালয় নানাবিধ সাজে সজ্জিতকরণ, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয় করেন। কমপ্লেক্স অভ্যন্তরে পুকুরের ঘাট নির্মাণ ও বেশ কয়েকটি বেঞ্চ স্থাপন করে একটি মিনি পার্কে পরিণত করেন। এ সব কাজে তাঁর নান্দনিক মনের প্রকাশ ঘটে।

জনতার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উপজেলা কমপ্লেক্স অভ্যন্তর, কমপ্লেক্স সংলগ্ন জাঙ্গিরাই ত্রিমোহনী এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে কুলাউড়া-বড়লেখা সড়কের পাশে দখল করা খাল খনন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ গরুরহাট অপসারণের মত দুঃসাহসিক কাজ সহজেই সাধন করতে সক্ষম হন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্ধারিত স্থানে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন থেকে নির্মাণ কাজ বন্ধ ছিল। তাঁরই জোরালো ভূমিকায় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অভ্যন্তরীণ স্থাপনা অপসারণের মাধ্যমে দ্রæত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়।

জুড়ী উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত উপজেলা ঘোষণায় তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। তালিকাভূক্ত ৬৪ জন ভিক্ষুককে পূনর্বাসনের লক্ষ্যে গ্রহণ করেন নানা পদক্ষেপ।

উপজেলার শতবছরের ঐতিহ্য কামিনীগঞ্জ লামাবাজার প্রায় দুই দশক থেকে খালি পড়েছিল। উপজেলা শহরের ডাকঘর সড়ক, শিশুপার্ক চত্ত্বর ও ফুলতলা সড়কে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকানপাট গড়ে ওঠায় একদিকে শহরে দীর্ঘ যানজট লেগে থাকত। অপরদিকে মূলবাজার করছিল হাহাকার। এমতাবস্থায় পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় কোন বল প্রয়োগ ছাড়াই সকল অবৈধ স্থাপন উচ্ছেদ করে বাজার ফিরিয়ে নেন তার আপন ঠিকানায়। যৌবন ফিরে পায় মৃতপ্রায় লামাবাজার। প্রতিষ্ঠা পায় জুড়ীবাসীর দীর্র্ঘদিনের দাবি।

করোনাভাইরাস কেন্দ্রিক শ্রমিক সংকটে পড়া কৃষকের সাহায্যার্থে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ, রাজনৈতিককর্মী, শিক্ষক, স্কাউটদের নিয়ে কৃষকের ধান কেটে দেয়ার পাশাপাশি ভর্তূকি মূল্যে দুইটি হার্ভেস্টার মেশিনের ব্যবস্থা করেন। ভোর বেলা শুধু চা খেয়েই হাওরাঞ্চলে ধান কাটতে গিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে দুপুরের খাবার খাওয়া ৫০০ কৃষি শ্রমিককে নিজের বেতনের টাকায় দুপুরের খাবার খাইয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এ নিরহংকারী কর্মকর্তা।

করোনার ডেঞ্জার জোন ঢাকায় স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত প্রিয়তমা স্ত্রী-সন্তান রেখে জুড়ী উপজেলার মানুষকে করোনামুক্ত রাখতে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশিল রাখতে ছিলেন কঠোর অবস্থানে। নিয়মিত চালিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদালত। করোনাভাইরাস কেন্দ্রিক কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় মানুষের মধ্যে সরকারি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে কঠোর মনোভাব পোষন ও নিয়মিত তদারকি করেন। নিশ্চিত করেন শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। মোবাইল ফোনে সংবাদ পেয়ে গভীর রাতে অসহায় মানুষের বাড়িতে ছুটে যান খাদ্যসামগ্রী নিয়ে। স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী (পিপিই) প্রদান। করোনা মহামারীর বৈশ্বিক যুদ্ধে উপজেলায় নেতৃত্ব দিয়ে ভয়ার্ত মানুষকে যুগিয়েছেন সাহস, মনোবল বৃদ্ধিতে আক্রান্তদের বাড়িতে পাঠান প্রধানমন্ত্রীর উপহার সামগ্রী। প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত ২৫০০টাকা উপকারভোগীর তালিকা প্রণয়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন।

এ উপজেলায় যোগদানের পর স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন মত-পথ, ধর্র্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সহিত সমন্বয় করে পথ চলা শুরু করেন। রাজস্ব আদায়সহ সরকারের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করেন। গতাণুগতিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষের আহŸানে ছুটে যান গ্রাম থেকে গ্রামে। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ বিভাগ, উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততায় ইভটিজিং, মাদক, সন্ত্রাস, চোরাচালান নির্মূলসহ সকল কাজেই ঈর্ষণীয় সফলতা অর্জন করেন এ জেলার পার্শ্ববর্তী জেলা হবিগঞ্জ সদরের এ বাসিন্দা। যাবার কালে উপজেলা কমপ্লেক্স অভ্যন্তরীণ রাস্তা উন্নয়ন কাজের জন্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যান।

এখানকার মানুুষের সুখ-দুঃখকে একান্ত নিজের করে নিয়ে ছিলেন তিনি। সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে জুড়ীবাসীর মন জয় করতে সক্ষম হন কঠোর ও উদার মনের অধিকারী এ কর্র্মকর্তা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর প্রশংসনীয় কর্মকান্ড গুলো উঠে আসায় তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক আলোচিত হয়ে ওঠেন এ আলোকিত ব্যক্তি। অর্জন করেন কয়েকটি পদক।

এক প্রতিক্রিয়ায় সবার দোয়া/আশির্বাদ কামনা করে অসীম চন্দ্র বনিক বলেন, ‘কর্মকালে জুড়ীবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। দায়িত্ববোধ থেকে সার্বিক বিষয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। উচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ক্ষমতা স্থায়ী নয়, জীবন অনেক সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষকে সম্মান করতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে’।

জুড়ীর সাধারণ মানুষের মত তিনিও জুড়ীবাসীকে ভালবেসে ছিলেন। তাঁর শেষ কথা ছিল-‘ভালবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। ভালো থাকুক আমাদের সকলের ভালোবাসার জুড়ী। ভালো থাকুক জুড়ীর জনগণ’।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/২ জুলাই ২০২০/লাল/পিডি

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন