আজ সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ ইং

রমজানে কী খাব, কী খাব না

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৮-০৫-২৫ ০০:৫২:২৯

অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ :: আমাদের দেশে রমজান মাস এলেই খাওয়া-দাওয়ার ধুম পড়ে যায়। মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে কী খাবে, কী খাবে না। আসলে সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা ইসলামের বিধান অনুযায়ী একই নিয়মে রোজা পালন করেন। বিভিন্ন দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং বিভিন্ন রকম খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। তাই স্থান কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্নরকম খাওয়া-দাওয়ারও তারতম্য রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষের যে ধরনের খাদ্যাভ্যাস রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করব।

রোজা পালনের জন্য প্রয়োজন সঠিক ডায়েট নির্বাচন, শারীরিক সুস্থতা, মানসিক শক্তি এবং অদম্য ইচ্ছা ও আনুগত্য। আর চিকিত্সক ও পুষ্টিবিদদের মতে, কিছু নিয়মনীতি ও পরামর্শ অনুসরণ করলে, কষ্ট ছাড়াই রোজা পালন করা যায়।

রোজায় প্রতিদিনের খাবারের মেন্যুতে আসে ভিন্নতা, তার সঙ্গে সময়ের ব্যবধান তো রয়েছেই। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের অনেকেরই মনে হতে পারে যে, রোজায় ১৪/১৫ ঘণ্টা না খেয়ে থেকে স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে। তাই ইফতারে বেশি বেশি খাওয়া ভালো। রোজায় খাবারের বিরতি কম হওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া হয়ে যায়। আবার অনেকেই বলেন, রোজায় খাবারের হিসাব নেই। তাই রোজায় রকমারি খাবারের আয়োজন বেড়ে যায়, যা কিনা স্বাস্থ্য উপযোগী নয়। তবে দৈনিক চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখেই খাদ্য নির্বাচন করা দরকার।

ইফতারিতে কি কি খাবেন?
রমজান মাস এলে বিকালবেলা থেকেই ইফতারের জন্য নানা খাবার তৈরি ও বিক্রির হিড়িক পড়ে। হরেকরকম ইফতারির পসরা সাজিয়ে দোকানিরা রাস্তার ধারে, ফুটপাতে, অলিতে-গলিতে, হাটে-বাজারে সাজিয়ে রাখে। এসব ইফতারির মধ্যে রয়েছে ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, ডাল বড়া, সবজি বড়া, আলুর চপ, খোলা খেজুর, হালিম, জালি কাবাব, জিলাপি, বুন্দিয়া ইত্যাদি। আরও রয়েছে বিভিন্ন ফল ও ফলের রস, আখের গুড়ের শরবত, নানা রং মিশ্রিত বাহারি শরবত। তাছাড়া মুখরোচক বিরিয়ানি ও তেহারি তো আছেই।

প্রশ্ন হলো এসব মুখরোচক খাবার স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি করা হয়েছে কিনা। ভেজাল তেল, বেসন ও কৃত্রিম রং মেশানো হয়েছে কিনা সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। যে তেলে ভাজা হয় সে তেল একবারের বেশি ব্যবহার উচিত নয়। কারণ একই তেল বারবার আগুনে ফুটালে কয়েক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি হয়, যেমন পলি নিউক্লিয়ার হাইড্রোকার্বন, যার মধ্যে বেনজা পাইরিন নামক ক্যান্সার হতে পারে এমন পদার্থের মাত্রা বেশি থাকে। তাছাড়া অপরিষ্কারভাবে ইফতারি তৈরি করলে পেটের পীড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সুস্থভাবে বাঁচার জন্য যত্রতত্র খোলা খাবার না খাওয়াই উচিত। খুব কম ফলই পাওয়া যাবে, যা ভেজালমুক্ত। শরবতের কথা তো বলাই বাহুল্য। রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে রকমারি শরবত তৈরি করা হয়। আমাদের জানতে হবে এসব শরবত যে পানি দিয়ে বানানো হয় সে পানি বিশুদ্ধ কিনা। তাছাড়া ইফতারের জন্য তৈরি প্রায় সব খাবার তেলও উচ্চ চর্বিযুক্ত। সাধারণত এসব খাবার মানসম্মত তেলে এবং সঠিক নিয়মে ভাজা হয় না, তাই এসব স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

একজন রোজাদার ইফতারে কি খাবেন তা নির্ভর করবে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ও বয়সের ওপর। পারতপক্ষে দোকানের তৈরি ইফতারি ও সাহরি না খাওয়াই ভালো। সুস্থ, স্বাস্থ্যবান রোজাদারের জন্য ইফতারিতে খেজুর বা খুরমা, ঘরের তৈরি বিশুদ্ধ শরবত, কচি শসা, পেঁয়াজু, বুট, ফরমালিন অথবা ক্যালসিয়াম কার্বাইডমুক্ত মৌসুমি ফল থাকা ভালো। কারণ ফলে ভিটামিন ও মিনারেল পাওয়া যায়। ফল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় এবং সহজে তা হজম হয়।

রুচি অনুযায়ী বাসার রান্না করা নুডলসও খেতে পারেন। বেশি ভাজি ভুনা তেহারি, হালিম না খাওয়াই ভালো। কারণ এতে বদহজম হতে পারে। রুচি পরিবর্তনের জন্য দু-একটা জিলাপি খেতে পারেন। তাছাড়া গ্রীষ্মকালীন রমজানে পরিমাণ মতো বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত। এশা ও তারাবির নামাজের পর অভ্যাস অনুযায়ী পরিমাণ মতো ভাত, মাছ অথবা মুরগির মাংস, ডাল ও সবজি খাবেন।

কি খাবেন সাহরিতে :
রমজানে স্বাভাবিক নিয়ম পরিবর্তন করে সুবহে সাদিকের আগে ঘুম থেকে ওঠে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিতে হয়। সকালের নাস্তার পরিবর্তে খুব ভোরে সারাদিনের উপবাসের সময় চলার মতো খাওয়ার প্রয়োজন হয়। শরীরটাকে সুস্থ রাখার জন্য সাহরি খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখতে হবে, সাহরির খাবার মুখরোচক, সহজপাচ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া প্রয়োজন। অধিক তেল, অধিক ঝাল, অধিক চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়া একদম উচিত নয়। ভাতের সঙ্গে মিশ্র সবজি, মাছ অথবা মাংস খাবেন। অনেকেই মনে করেন যেহেতু সারাদিন না খেয়ে থাকতে হবে তাই সাহরির সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশি বেশি খাবার খেতে হবে, তা মোটেই ঠিক নয়, কারণ চার-পাঁচ ঘণ্টা পার হলেই খাদ্যগুলো পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে গিয়ে হজম হয়ে যায়। তাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি না খাওয়াই ভালো, বরং মাত্রাতিরিক্ত খেলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।

পিপাসা নিবারণ হয়, সেই পরিমাণ পানি নিজের অভ্যাস অনুযায়ী পান করতে হবে। দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং পানিশূন্যতার কারণে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়। তাই ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে অন্তত দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করবেন। অনেকে পানির পরিবর্তে লেমন অথবা রোজ ওয়াটার, ফ্রট ওয়াটার, নানা ধরনের শরবত, ভিটামিন ওয়াটারসহ নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত পানীয় পান করেন।

এ ব্যাপারে বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশনিস্ট ফারা নাজার এর অভিমত-

রোজাদারদের শুধু বিশুদ্ধ পানি পান করাই ভালো। তার মতে, কার্বোনেটেড ও সুগার ড্রিংক, চা ও কফি পান করলে শরীর থেকে অধিক পানি বের হয়ে যায়। তাই কার্বোনেটেড, বেভারেজ ও সুগার ড্রিংক বা নানা ধরনের শরবত পরিহার করা উচিত। এছাড়া কফি ও চায়ের ডাই ইউরেটিক ইফেক্টের কারণে ইফতার ও সাহরিতে চা-কফি কম পান করা ভালো। রোজাদারদের প্রচুর সবুজ শাকসবজি, ফলমূল আহার করা উচিত।

রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহজেই তার স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে, যদি ঠিক ডায়েট অনুসরণ করা হয়। কখনোই শুধু পানি খেয়ে রোজা রাখবেন না। অতিভোজন থেকেও বিরত থাকুন। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খান, যা আপনার হজমে সহায়ক হবে। ইফতার ও সাহরি সময়ের মধ্যে অন্ততপক্ষে আট গ্লাস পানি পান করুন। গ্লাস গুনে পানি খেতে অসুবিধা হলে, সমপরিমাণ পানি বোতলে ভরে রাখুন এবং ইফতার থেকে সাহরি সময়ের মধ্যে তার পুরোটা পান করুন। এনার্জি ড্রিংক, কার্বনেটেড ড্রিংক এবং সোডাজাতীয় পানীয়গুলো বর্জন করুন। এগুলো গ্যাস্ট্রিক এসিডিটি বাড়িয়ে দেয়।

ইফতার ও সাহরি নিয়ে কিছু টিপস-
ইফতারে বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ এবং সহজে ও তাড়াতাড়ি হজম হয় এমন খাদ্য গ্রহণ করুন। সাহরিতেও সহজপ্রাচ্য খাবার খান। ভাজা পোড়া ও অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাদ্য বুক জ্বালাপোড়া এবং বদহজমের সমস্যা তৈরি করে। তাই এগুলো বর্জন করুন। রান্নার সময় মুরগি ও হাঁসের ডালডা পরিবর্তে সয়াবিন তেল ব্যবহার করুন, তবে যতটা সম্ভব পরিমাণ কম করে ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত লবণ ও লবণাক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কারণ এসব রোজার সময় পানির পিপাসা বৃদ্ধি করে।

যাদের চা, কফি, সিগারেট, মদ প্রভৃতি বাজে আসক্তি আছে তারা এগুলোকে কমিয়ে আনতে চেষ্টা করুন। হঠাত্ এগুলো ছেড়ে দিলে মাথাব্যথা, রোষ প্রবণতা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ঘুমানোর আগে ও সাহরির পরে অবশ্যই দাঁত ব্রাশ করতে ভুলবেন না। রোজা রাখা অবস্থায় সকালে ব্যায়াম না করে ইফতারের পর ব্যায়াম করা উচিত। খাওয়ার আগে অবশ্যই হাত ধুতে ভুলবেন না।

এ সময়ে হাঁচি, কাশির মতো ছোঁয়াচে রোগ বেশি দেখা যায়, তাই যারা এতে আক্রান্ত, তাদের কাছ থেকে সাবধান থাকা উচিত। দিনে গরম সময়ে ঠাণ্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা উচিত। সম্ভব হলে শারীরিক পরিশ্রম কম করুন। দৈনিক কাজকর্ম এমনভাবে ঠিক করুন, যেন বেশ ভালোভাবে ঘুমানো যায়।

লেখক : ডিন, মেডিসিন ফ্যাকাল্টি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •   শাবিতে ন্যাশনাল ডিবেট ক্যাম্পেইনে চ্যাম্পিয়ন পার্কভিউ
  •   ছাতক-দোয়ারার ২২ ইউনিয়নে এমপি মানিকের পৃথক মতবিনিময় সভা
  •   কুলাউড়ায় ভোক্তা অধিকার আইনে ৪টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
  •   জকিগঞ্জে ইয়াবাসহ নারী আটক
  •   জকিগঞ্জে দপ্তরী নিয়োগ বাতিলের দাবিতে মানববন্ধনে পুলিশের বাঁধা
  •   সিলেটভিউ পরিবারের সাথে ড. মোমেনের সৌজন্য সাক্ষাৎ
  •   ফেঞ্চুগঞ্জে ইভটিজিংয়ের জেরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষের আশংকা
  •   বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই: হুইপ শাহাব উদ্দিন
  •   লিডিং ইউনিভার্সিটিতে ‘কোয়ালিটি এ্যাসিউরেন্স এন্ড এ্যাক্রিডিটেশন’ বিষয়ক কর্মশালা
  •   ৩০ অক্টোবরের পর যেকোনো দিন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা
  •   ‘সবুজ-শ্যামল পৃথিবী গড়তে বেশী করে গাছ রোপণ করুন’
  •   শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে শিক্ষার মান ঊর্ধ্বমুখী: এমপি সামাদ
  •   মদিনা মার্কেটে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আলোর ভুবনের দুর্গোৎসব
  •   মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে লায়ন্স ক্লাব অব সিলেট সুরমার ফল বিতরণ
  •   বিশ্বনাথ উপজেলা বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন
  • সাম্প্রতিক জীবন ধারা খবর

  •   খালি পেটে বাদাম ধরে রাখবে যৌবন
  •   ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে যা খাবেন
  •   অসময়ে চুল পড়ার কারণ
  •   রাস্তার মাঝে হলুদ-সাদা দাগের অর্থ কী?
  •   ইস্ত্রি ছাড়াই কাপড়ের কুঁচকানো ভাব দূর করুন
  •   দেরিতে বিয়ে হলে যেসব মানসিক সমস্যায় ভোগেন নারীরা
  •   ফ্যাশনে পরিবেশ বিপর্যয়
  •   ঘরকে পোকামুক্ত রাখার কিছু সহজ উপায়
  •   মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হার রোধে সরকারের অভাবনীয় সাফল্য
  •   ভাগ্য ফেরাতে পারে ফিটকিরি!
  •   ঘুমালেই যৌন স্বপ্ন, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
  •   দেরিতে বিয়ে হলে যেসব মানসিক সমস্যায় ভোগেন নারীরা
  •   অফিসে বসেই মেদ কমাবেন যেভাবে
  •   যেসব কারণে ছেলেরা সম্পর্কে জড়াতে চান না!
  •   অ্যালার্জিজনিত নাকের সমস্যা