আজ সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং

ধরা পড়া সব লুটেরার টাকাই বিদেশে

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৯-১৫ ১৪:১৯:০৭

সিলেটভিউ ডেস্ক :: চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্যাসিনো কারবার, মানবপাচারসহ নানা অপকর্মে যাদের ধরা হচ্ছে, তাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধেই বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের তথ্য মিলছে। আর এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে এমন অনেক অপরাধী, যারা অবৈধ পন্থায় হাতিয়ে নেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে—জনমনে এমন বিশ্বাসই প্রবল। এই অর্থপাচার কিভাবে থামবে, কিভাবে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার হবে, আদৌ হবে কি না, তার স্পষ্ট উত্তর মিলছে না। এ ক্ষেত্রে নজিরও কম। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত আনা ছাড়া এ বিষয়ে সাফল্য নেই।

ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নিশান মাহামুদ শামীম একাই দুই হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে সম্প্রতি তথ্য মিলেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট পাচার করেছেন ১৯৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ক্যাসিনো কারবারের সঙ্গে জড়িত সেলিম প্রধান, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল, তারেক রহমানের সহকারী একান্ত সচিব মিয়া নূর উদ্দিন অপু শত শত কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অপু ৩০০ কোটি টাকা পাচার করেন দুবাইয়ে। কুয়েতে আটক পাপুল কুয়েত ও ইউরোপে শতকোটি টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভুইয়াকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ৪১ কোটি টাকা পাচার করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়ার অর্থপাচারের তথ্য জানতে অনুসন্ধান চলছে।

জানা গেছে, অনলাইনে ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে মাসে কোটি কোটি টাকা আয় করতেন ব্যবসায়ী সেলিম প্রধান। থাইল্যান্ডে এ টাকা  বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব পেয়ে যান তিনি। ফিলিপাইন, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রেও যাতায়াত ছিল তাঁর।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট একাই ১৯৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা সিআইডি। সিঙ্গাপুরে তাঁর বাড়ি-গাড়ি থাকারও তথ্যও মিলছে। বিদেশে তাঁর আরো সম্পদ রয়েছে কি না তার অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে সিআইডি।

গত ৭ আগস্ট জি কে শামীম ও তাঁর সাত দেহরক্ষীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় সিআইডি। তাতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশের ১৮০টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিনি ছয় হাজার ৫৮ কোটি ৪৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৪২ টাকা লেনদেন করেন।  চার্জশিটে বলা হয়, শামীমের ব্যাংক লেনদেনে সর্বমোট ক্রেডিট হয় তিন হাজার ৪২ কোটি ৮৩ লাখ ৪৮ হাজার ৯১ টাকা। আর  ডেবিট হয়েছে তিন হাজার ১৫ কোটি ৬৬ লাখ তিন হাজার ৭৫১ টাকা। দেশের ১৮০টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩৩৭ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে শামীমের। এ ছাড়া ঢাকায় দুটি বাড়িসহ প্রায় ৫২ কাঠা জমির মালিক তিনি। এসবের দাম ৪১ কোটি টাকা। সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আয় করা অর্থ শামীম বিদেশে পাচার করার চেষ্টা করছিলেন।

গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর গেণ্ডারিয়ার দুই ভাই, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়ার আস্তানা থেকে পাঁচ কোটি টাকা ও আট কেজি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছিল র‌্যাব। এরপর গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁদের বাড়ির ভল্টে পাওয়া যায় সাড়ে ২৬ কোটি টাকা, এক কেজি স্বর্ণ, বিদেশি মুদ্রা ও পাঁচ কোটি টাকার এফডিআর। মানি লন্ডারিং মামলা তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি তাঁদের ১২১টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পায়। এই দুই ভাই বিদেশে টাকা পাচার করেছেন কি না তার অনুসন্ধান চলছে।

গত ২১ আগস্ট উত্তরা এলাকা থেকে ফরিদপুর ছাত্রলীগের সভাপতি নিশান মাহামুদ শামীমকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। আদালতে পাঠানো হলে তিনি দুই হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের কথা স্বীকার করেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য বলছে, বিদেশে টাকা পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই এখন বাংলাদেশের অবস্থান। জিএফআইর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার ২৭০ কোটি ডলার বা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। চারটি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এগুলো হলো বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এদিকে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা।

টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল : আইনজীবীরা জানিয়েছেন, টাকা ফেরত আনতে হলে আগে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হতে হবে। আদালতে প্রমাণ করতে হবে বেআইনিভাবে টাকা পাচার হয়েছে। এরপর ওই টাকা ফেরত আনা বা জব্দ করার বিষয়ে আদালতের আদেশ থাকতে হবে। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট-২০১২ অনুযায়ী টাকা ফেরত আনতে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন দেবে। ওই দেশের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে ওই টাকা বাংলাদেশের টাকা। সেটা প্রমাণ করা গেলেই কেবল তাঁদের কাছ থেকে টাকা ফেরত আনা যাবে।

এর আগে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট-২০১২ অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। এই আইনের অধীনেই সিঙ্গাপুর থেকে আরাফাত রহমান কোকোর টাকা ফেরত আনে বাংলাদেশ। এ ছাড়া চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের অর্থ বিদেশে জব্দ করা অবস্থায় রয়েছে। এরও আগে ইউনাইটেড নেশন এগেইনস্ট দ্য করাপশন (আনকাট) অ্যাগ্রিমেন্টের অধীনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টাকা ফেরত আনার বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত চাইতে পারত বাংলাদেশ।

দুদক যা বলছে : দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট-২০১২ অনুযায়ী বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা যায়। এই আইনের ১৪ ও ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। টাকা ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ। তবে আগের মতো এখন দীর্ঘ সময় লাগে না। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের আদালতে প্রমাণ হতে হবে যে রাষ্ট্রের টাকা বেআইনিভাবে পাচার হয়েছে, অপরাধ হয়েছে। এরপর আদালত থেকে ওই টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা আসতে হবে। এরপর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশে আবেদন করবে, টাকা ফেরত আনার বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মানি লন্ডারিংয়ের পুরো বিষয়টি দুদকের দেখার সুযোগ নেই। ২০১৫ সালের আইনে সেটা রহিত করা হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের ২৭ অপশনের মধ্যে মাত্র একটি অপশন নিয়ে কাজ করতে পারে দুদক, পাশাপাশি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ, মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর ও কাস্টমসের একটি করে বিষয়ে কাজ করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের ২২ থেকে ২৪টি অপশনই কাজ করছে সিআইডি। দুদক এখন শুধু ঘুষ এবং দুর্নীতির বিষয়ে কাজ করতে পারে বিশেষ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে।

দুদকের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পাচার হয়ে যাওয়া টাকা বিদেশ থেকে ফেরত আনতে মানি লন্ডারিং আইনে বেশ কয়েকটি দেশে আবেদন করা হয়েছে। বিদেশ থেকে পাচারের টাকা ফেরত আনা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, দুদকের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করছে।

এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয় :  অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানে বড় ভূমিকা রাখছে কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এ পর্যন্ত ৬৮টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে সংস্থাটি। টাকা পাচারের তথ্য আদান-প্রদান করার জন্যই মূলত এই সমঝোতা স্মারক। বিএফআইইউর কর্মকর্তারা জানান, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৫ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

বিএফআইইউ প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান বলেন, ‘পাচার করা অর্থ ফেরত আনার কাজটি এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান করতে পারে না। এর সঙ্গে বিএফআইইউসহ দেশের বিভিন্ন সংস্থা জড়িত। পাচারের টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে বিএফআইইউ প্রাথমিক তথ্য আনার কাজটি করে থাকে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স চুক্তির আওতায় এমএলএ করে আরো তথ্য আনতে হয়। এ কাজে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস, দুদক, এনবিআর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইনভলবমেন্ট থাকে। কারণ অর্থপাচারের জন্য দেশে প্রথমে মামলা করতে হয়। এরপর ওই মামলার রায় বিদেশে পাঠাতে হয়। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস আদালতে অর্থ ফেরতের মামলা করবে এবং এ মামলার রায় পক্ষে এলেই অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর সব দেশের জন্য একই। প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে বর্তমানে অনেক মামলা চলমান রয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মামলা-মোকদ্দমায় না গিয়েও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা যায়, যদি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনে তেমন কোনো জটিলতা না থাকে। তবে সংশ্লিষ্ট দুই দেশকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থা এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হতে হবে। এ ক্ষেত্রে এক দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস অন্য দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পাসপোর্ট নম্বরসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করবে। ওই দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য যাচাই-বাছাই করবে। এতে তথ্যের গড়মিল না পেলেই কেবল পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে।

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

সিলেটভিউ২৪ডটকম/১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০/ডেস্ক/মিআচৌ

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন