আজ রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ইং

আমার বাবা, আমার পৃথিবী

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯-০৬-১৬ ১১:৫৫:৩৩

বদরুল আলম :: বাবার জীবনটা অসম্ভব সাদা সিদে জীবন। প্রথম জীবনে একজন সফল কৃষক ছিলেন। মাঠে সোনা ফলানোই ছিল বাবার একমাত্র কাজ। পরিবারের একমাত্র অবলম্বন-ই ছিলেন বাবাই। একজন সফল কৃষক হিসেবে বাবার বেশ নাম-দাম ও ছিল। মধ্য বয়সে সন্তান-সন্ততি আর পরিবারের ভাগ্য বদলে তিনি পাড়ি দেন মধ্যপ্রাচ্যে। তারপর রচিত হয় নতুন এক সংগ্রামের ইতিহাস। কোন এক কবি বলেছিলেন, এখনো বেশ বাকী তবুও কিছু বলি। কিছুটা বলি। বিদেশে কত যে সমস্যার মুখামুখি হয়েছেন তিনি, তাঁর সঠিক হিসেব জানিনি।

ভিসা সংক্রান্ত সমস্যায় কত যে চোখের পানি ঝরেছে সেই পবিত্র ভূমিতে, তার হিসেব কেবল তিনিই জানেন। তারপর ভালো একটা চাকুরি ও পেয়েছিলেন। দেশে প্রত্যার্তন পর্যন্ত তিনি এই চাকুরীতেই নিয়োজিত ছিলেন। এখন বাবা জীবনের শেষ প্রান্তেই আছেন। সেদিন আমার প্রিয় ছোট ভাই সেবুল ইসলাম (মায়ের দেয়া নাম,শানু নামে বেশ পরিচিত) জিজ্ঞেস করেছিল, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কেমন আছেন? তিনি বলেছিলেন, শুকরিয়া বেশ ভালো। দোয়া রইলো পৃথিবীর সব বাবারা যেন ভালো থাকেন। এই দিনে এই হোক মোদের প্রাথর্না।

অত্যন্ত সজ্জন হিসেবে বাবার পরিচিতির কমতি নেই। বাবার কথা বলতেই সবার মাঝে একজন আদশর্ , সৎ আর সরস-নিরস মানুষেরই প্রতিকৃতি চোখে ভাসে। তিনি জীবনে কাউকে কঠু কথা বলেননি। সহ্য করেছেন কত যন্ত্রণা। অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা। মা গল্প করেছেন বাবার পরিশ্রমের কথা কিন্তু বাবার প্রাপ্তি ছিল শুণ্য। তাঁর পা থেকে মাথা পযর্ন্ত ঘামের গন্ধ এখনো আমাদের অনুপ্রেরনা। আমার সব সময় মনে হয় যে, এলাকার মানুষের জন্য বাবার ছিল একবুক ভালোবাসা। তিনি অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন মানুষের কল্যানের প্রতি। তাই বারবার সুখে-দুখে, বিপদে-আপদে, সংশয়-সংকটে এলাকার মানুষের কাছেই থাকতেন। মানুষ তাঁকে দেখে আশ্বস্থ হয়েছে, ভরসা পেয়েছে, আস্থা ও বিশ্বাস হারায়নি।

খুব কাছ থেকে বাবার চোখের পানি দেখেছি। তিনি পাথর্িব বিষয়ে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসেব কষতেন আর কাঁদতেন। আমাদের সান্তনা এডিয়ে গোপনে শুধু কেঁদেছেন। জানি, দুনিয়াতে এ কান্নার কোন দাম নেই কিন্তু আল্লাহর কাছে অনেক অনেক দাম। এ কান্না ছিল নেহাতই সন্তান সন্ততির জন্য। মা প্রায়ই বাবাকে সান্তনা দিতেন আর বলতেন , আল্লাহর ঘর খালি নেই। সকল নাজ নেয়ামতের মালিক তিনিই। তিনি পরম দয়ালু সৃষ্টিকতর্া। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁকে রাজত্ব দান করেন, যাকে ইচ্ছা তার কাছ থেকে রাজত্ব কেড়ে নেন। তিনি সবর্ বিষয়ে ক্ষমতাবান ।

"অসমাপ্ত আত্মজীবনী" গ্রন্থে রবাটর্ জেন্কিন্স কর্তৃক Poet of Politics খ্যাত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) উল্লেখ করেছেন " রেণু কয়েকদিন আমাকে খুব সেবা করল। যদিও আমাদের বিবাহ হয়েছে ছোটবেলায়। ১৯৪২ সালে আমাদের ফুলশয্যা হয়। জ্বর একটু ভাল হল। কলকাতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবতর্ী । লেখাপড়া তো মোটেই করি না। দিনরাত রিলিফের কাজ করে কূল পাইনা। আব্বা আমাকে এ সময় একটা কথা বলেছিলেন, "বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা , তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ, 'Sincerity of purpose and honesty of purpose' থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না। এ কথা কোনোদিন আমি ভুলি নাই। " বতর্মান প্রজন্মের কাছে এ বাতর্াটুকু পৌছে দিয়ে বলি, 'রাজনীতির কবি'র দেখানো পথে বদলে যাই। এখনই বদলের শ্রেষ্ঠ সময়।

 পৃথিবীর সব বাবারাও সততার কথা বলেন । ব্যতিক্রম খুবই কম।  ধমর্ কমর্ের প্রতি বাবার মনোযোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। ধামর্ীক হিসেবে তিনি প্রথম সারির-ই। রোজ সকালে বাবার যিকিরে , কুরআন তেলাওয়াতের শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙ্গে , এখনো। খুব মনে পডে বাবা সব সময় নামাজের কথা বলতেন, এখনো বলেন। নামাজের গুরুত্ব অনেক বেশি, তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলতেনও বেশি। কাজকে কম গুরুত্ব দেননি । তিনি বলেন, কাজে বড় হও, কথায় নয়। প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাসের মা কুসুমকুমারী দাসের কবিতা থেকে বলি-

    "আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
    কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
    মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
    মানুষ হইতে হবে’ – এই যার পণ ।"

পৃথিবীর সব বাবারা চান তাঁর ছেলেরা মানুষ হোক। চলুন এই দিনে আমরা মানত করি মানুষের মতো মানুষ হয়ে সব বাবাদের মুখে হাসি ফুটাবো।

আমার এই লেখা অপূর্নাঙ্গ, খন্ডিত এবং অসমাপ্তও বটে। কিন্তু সে আমার অক্ষমতা। পৃথিবীসম এমন একজন বাবাকে পুরোপুরি বলা যায় এ ক্ষুদ্র লেখায়। আমার জানা নেই, তবুও। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা সত্তেও আমার মনে হয়, এমন বাবাদের আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে হবে। না, ঔচিত্য থেকে নয়, কর্তব্য কারনেও নয়, দায়িত্ববোধ থেকেও নয়- শুধু ভালোবাসার তাড়ানায়, মমতার কারনে, আর হৃদয়ের তাগিদে। এই লেখা ওই তিনটিরই সমষ্টি আর কিছু নয়।

লেখক: গবেষক ও প্রভাষক, তাজপুর ডিগ্রী কলেজ, সিলেট।

@

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •   রেজিষ্ঠারী মাঠে মহানগর বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ মঙ্গলবার
  •   এমপি মানিককে নিয়ে কটুক্তি, মুকুটের বহিস্কার চাইলো ছাত্রলীগ
  •   বিপিএলে চট্টগ্রামে খেলবেন গেইল
  •   কোন পীর কারো জান্নাতের জামিন হতে পারেন না: সিলেটে পীর চরমোনাই
  •   এনসিএলের ১ম স্তরে উন্নীত হলো সিলেট
  •   বালাগঞ্জে এমপিওভুক্ত মাদরাসায় শ্রেণীকক্ষ সংকটে পাঠদান ব্যাহত
  •   সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত না করতে পীরোজপুরে সভা
  •   সব হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা ডেলিভারি সুবিধা দেয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
  •   ওসমানীনগরে সমাপনী পরীক্ষায় হল সুপারের প্রকাশ্যে ধূমপান, অনিয়মের অভিযোগ
  •   টুকের বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড
  •   মুসলিম ছাড়া অন্যদের নাগরিকত্ব দিতে ফের বিল আনছে বিজেপি
  •   শীতে ডায়াবেটিস রোগীদের সুস্থ রাখবে যে ৫ খাবার
  •   সিলেটে পেঁয়াজ এখন আদালতে!
  •   জকিগঞ্জে পিটিয়ে মেরে আত্মহনন বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগ
  •   হবিগঞ্জে ৫৫ টাকার বেশি পেঁয়াজ বিক্রি করলেই জরিমানা!
  • সাম্প্রতিক মুক্তমত খবর

  •   পিয়াজের দাম কত হলে মন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়া যায়?
  •   শিক্ষার প্রকারভেদে শিক্ষার্থী, পরিবার ও শিক্ষকের দায়িত্ববোধ
  •   রাঙ্গার নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া উচিত
  •   মেয়েরাও যৌতুক নেয়!
  •   একজন রেনু এবং তার ৪৬ বছরের রাজনৈতিক বর্নাঢ্য ক্যারিয়ার
  •   মাস্টার ও শিক্ষক শব্দের ব্যবচ্ছেদ
  •   কৃষির অগ্রযাত্রার সারথী সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
  •   স্মৃতিতে ধীরেশ স্যার
  •   প্রাইমারি শিক্ষক বাবা এবং আমার শৈশবের স্মৃতিচারণ
  •   শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরিক্ষা ও আমার ভাবনা
  •   শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধির আন্দোলন প্রসঙ্গে
  •   'বিসিবি ভেঙে বঙ্গবন্ধুর খুনির আত্মীয়দের সরাতে হবে'
  •   সাবেক ছাত্রনেতা জাকিরকে বিয়ানীবাজার আ.লীগে মুল্যায়ন করা উচিত
  •   আমাদের ব্যর্থতায় ক্ষমতার বাহাদুরি দেখাচ্ছেন আরিফ
  •   মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর সংগঠন আমার হৃদয়ে গাঁথা