আজ শনিবার, ৩০ মে ২০২০ ইং

হাফ-ডজন স্বপ্ন ও আমার ভাবনা

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৫-১২ ০০:১৯:০২

বদরুল আলম :: স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। স্বপ্নের কথা কে না বলতে চায়, কে না জানাতে চায় সবাইকে। হ্যাঁ জানিয়ে দিতে চাইছি স্বপ্নের কথা। জানুক সবাই স্বপ্নের কথা, জানুক সবাই আশাবাদের কথা। ১৯৬৩ সালে মাটর্িন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ ভাষণে বলেছিলেন, আমার একটি স্বপ্ন আছে যে একদিন, জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে, সাবেক দাসের সন্তান আর সাবেক দাস-মালিকের সন্তান একসঙ্গে বসতে সক্ষম হবে ভ্রাতৃত্বের আসনে। তিনি আরো স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমার একটি স্বপ্ন আছে যে আমার ছোট চারটি সন্তান একদিন এমন একটি জাতির মধ্যে বসবাস করবে, যেখানে গাত্রবর্ণ দিয়ে আর তাদের বিচার করা হবে না, করা হবে চরিত্রগুণ দিয়ে। আজ একটু ভিন্ন ফ্রেমে যদি জনাব কিং এর মতো স্বপ্ন দেখি আর স্বপ্নের সত্যতার প্রত্যাশা রাখি। ভয় নেই আলো আসবেই।

(১)
প্রসঙ্গ যখন ঈদের শপিং। এবার ঈদে শপিংয়ের কথা না ভেবে না খাওয়া মানুষের কথা ভাবুন। পুরো প্রোগ্রামটা বদলে দিলে কেমন হয়। নিধর্ারিত অথর্ বিলিয়ে যদি দেই অনাহারির তরে। তাহলে বেশ ভালো হবে মনুষ্য জাতির। খবরের কাগজে দেখলাম, আসন্ন ঈদে শপিং না করে গরিব অসহায় ও কর্মহীনদের মাঝে অর্থ বিতরণ করতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মাননীয় মন্ত্রী আপনার মন্তব্যের প্রশংসা করছি। ধন্যবাদ ও বটে। এবার ঈদ এসেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন বাস্তবতায়, দেশ পার করছে সংকট কাল। এ পরিস্থিতিতে আমাদের শপিং না করে এর অর্থ অসহায়, দরিদ্র কর্মহীন জনগণের মাঝে বণ্টনের যদি স্বপ্ন দেখি।

(২)
সিলেট বিভাগের প্রচলিত অনেক প্রথার মধ্যে মেয়ের বাবার গলার কাটা হয়ে আজও ঝুলে আছে ইফতারের প্রথা। রমজান আসলেই তার দু, তিন মাস আগে থেকে চিন্তা করতে হয়- কি করে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানোর টাকা জোগার করতে হবে। অনেক বাবা ইফতারের এই আয়োজনের জন্য নিজের গরু ছাগল এমনকি হাস মোরগও বিক্রি করেন। সুদে টাকা এনে তা মেটাতে বছর পার করেছেন অনেকেই। সিলেটের বাইরে এর প্রচলন কতটুকু ঠিক জানা নেই। এই ইফতার প্রথা পুরাতন এক ঐতিহ্য। বাবার বাড়ি থেকে রমজানে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানো হয়। সে ইফতার শুধু মেয়ের বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। ছেলের শ্বশুড়বাড়ি থেকে যেদিন ইফতার আসবে সেদিন বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত দেওয়া হয়। সেই সাথে একটি নিরব প্রতিযোগিতা চলে- কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বেশী আইটেমের ইফতার এলো, কে তার শ্বশুরবাড়ির ইফতার কয়শত মানুষকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াল। অন্ধ এক প্রতিযোগিতা। যার শ্বশুরবাড়ী থেকে যত বেশী ইফতার আসে তার তত সুনাম। তেমনি যে মেয়ের বাবার সে সক্ষমতা কম, তিনি ইফতারি দিয়ে খুশি করতে না পারলে- অনেক ক্ষেত্রে কথা শুনতে হয়। এই বছর করোনা সংকটের কারণে প্রথম দিকে এই ইফতার পাঠানো থেকে নিস্তার মিললে ও, দোকানপাঠ খোলায় অনেকেই ইফতার পাঠিয়েছেন। এই খবর দেখি। আমরা যদি এমন সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে নেই কোন অন্যায়, নেই কোন পাপাচার। আছে শুধু শান্তি। এককথায় মদিনার সমাজের প্রত্যাশা রাখছি। স্বপ্ন দেখছি।

(৩)
আর ক'দিন ঈদুল আযহা'র শুভাগমন হবে। চলছে রমজানুল মোবারক মাস। সিয়াম সাধনার মাস। রোজা আমাদের প্রেম প্রীতির চেতনাকে জাগিয়ে তুলে। করোনা সংকটে গৃহকর্মীকে পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ছুটি দিয়েছেন অথবা আসতে বারণ করেছেন। গৃহকর্মী কাজ করে এই মাইনে দিয়ে পরিবারের ভরণ-পোষন করেন। এই দিনগুলিতে আপনার গৃহকর্মী কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত বলে লজ্জা করে মাইনে না চাইতে পারে অথবা নিজের বে-খেয়াল যদি বাদ পড়ে (একটু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এই প্রয়াস) তাহলে কষ্ট পাবে মানুষ, কষ্ট পাবে মানবজাতি। আমাদের নৈতিক দ্বায়িত্ব এবং কর্তব্য হলো তাদের পরিবারের কথা বিবেচনা করে তাদের পাশে দাঁড়ানো। চলুন,আমরা নিজে তাদের পাশে দাঁড়াই এবংঅন্যকে ও উৎসাহিত করি। খেয়াল করে পরিশোধ করি মাইনে'টা।

(৪)
করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে গেছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন রাজধানীসহ সকল শহরে বসবাসরত নিম্ন আয়ের মানুষ। মহামারির সময় দু'মাস বা তিন মাস অথবা নিতান্ত এক মাসের বাড়ি ভাড়া মওকুফ করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ রাখছি। চাকরি ও ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পরিবারকে খাওয়ানোর মতো পর্যাপ্ত টাকাও নেই অনেকের কাছে। পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষণ না থাকায় জীবন-জীবিকার বিষয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। লকডাউনের সময় কাজ হারানো নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। বিশেষ করে রিকশা চালক, পরিবহন শ্রমিক, দিনমজুর, হকার, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন দোকান, মার্কেটের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। মহামারির সময় আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য বাসা ভাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে দেশের মানুষ বেশ উপকৃত হবে। বাড়িওয়ালাদের প্রতি অনুরোধ করছি বিষয়টি আমলে নেবেন। স্বপ্নের দেশ গঠনে সামিল হন সবাই। সেই স্বপ্ন দেখছি।

(৫)
অভিজাত স্কুলের প্রসঙ্গে আসি। এই সংকটকালীন সময়ে স্কুলের বকেয়া চেয়ে আদায় করা সমীচীন মনে করছি না। মালিক পক্ষ বেশ বিত্তবান কিন্তু অভিবাবক পক্ষ বেশ অসহায়। সিলেটের কথা যদি বলি, স্কলার্সহোম, আনন্দনিকেতন, বিবিআইএস, খাজান্সিবাড়ি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, কুমারপাড়াস্থ ইংলিশ গ্রামার স্কুলসহ অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অভিভাবকদের কাছে বার বার বেতন পরিশোধের নোটিশ পাঠাচ্ছে। খবরটি বেশ বেদনাদায়ক। আমরা রীতিমত মর্মাহত। কিছুদিন আগে দেখলাম খবরের কাগজে ঝড় বয়ে গেল। গোল টেবিলের আলোচনার বিষয়ও ছিল বিষয়টি। করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। মানুষ যখন মানবেতর জীবন যাপন করছে তখন অভিভাবকদের কাছে বেতন চেয়ে নোটিশ দেওয়া ঠিক নয়, এটা অমানবিক। সরকারী নির্দেশনা জারির পূর্বেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি উপলব্দি হলে ভালো। নতুবা জনগণের কথা চিন্তা করে সরকার যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা করছি।

(৬)
খাবারের কথা ভাবছি। এই সময়ে খাবার বিলিয়ে দিতে পারি সামথর্্যবানরা। খাবার বিলিয়ে দেবার এক মোক্ষম সুযোগ মনে করছি। ইসলামে অভুক্তকে খাবার খাওয়ানো সীমাহীন পুণ্যের কাজ। চলুন আমরা সবাই সামর্থ অনুযায়ী অভুক্তদের পাশে দাঁড়াই। রোজা আমাদের মানবিক গুণাবলি বিকাশে সহায়ক। রোজা পালনের মাধ্যমে ধনীরা গরিবের দুংখ বোঝে, ক্ষুৎপিপাসার জ্বালা অনুভব করে। বুঝতে পারে অসহায় নিরন্ন মানুষের ও খাদ্যের সম্মান। মযর্াদা দিতে শেখে ক্ষুধাকে ও ক্ষুধাতর্ মানুষকে। উপলব্ধি করে, কেন অন্নহীন গরিব মানুষ একমুঠো খাবারের জন্য অন্যের ঘরে কাজ করে। অনুধাবন করে দুস্থ গরিব লোকেরা ধনী হওয়ার লোভে নয়, সম্পদের নেশায় নয়, ভোগ-বিলাসের মোহে নয়, শুধুই জীবন বাঁচানোর তাগিদে সবার অগোচরে দৃষ্টির আড়াল হলে সামান্য বাসি খাবারের প্রতি হাত বাড়ায়। কেন গরিব মা তাঁকে খেতে দিলে নিজে না খেয়ে আঁচলে বেঁধে নেন তাঁর অভুক্ত সন্তানের জন্য। অনুভব করে ক্ষুধায় কাতর মানুষ কেন তার আত্মসম্মান বিসজর্ন দেয়,মর্যাদা ভুলে যায়, মান-ইজ্জত বিকিয়ে দেয় খাবারের জন্য। তাদের ঘৃনা ও উপেক্ষা নয়, তাদের জন্য ভালোবাসা ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। খাবার বিলিয়ে দিতে হবে।

করোনা সংকট সবাই মিলে কেটে উঠতে হবে আমাদের। পারস্পরিক সৌহাদর্ আর সম্প্রীতি ছাড়া করোনা মোকাবেলা করা অসম্ভব। আজ শুভ কামনা করি সবার জন্য। সবার মধ্যে নতুন অনুভূতি হোক 'সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই'। এ সংকট কাটতে পারলে আমাদের ভবিষ্যত অনেক সুন্দর হবে। 'আনন্দরূপ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশা ও আনন্দ জাগিয়ে রাখতে বলেছেন। বলেছেন, ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে, ক্ষুদ্র অহমিকা দূর করে নিজের অন্তঃকরণকে একবার জাগিয়ে তুলতে। বলেছেন, ‘নিজের এই ক্ষুদ্র চোখের দীপ্তিটুকু যদি আমরা নষ্ট করিয়া ফেলি, তবে আকাশভরা আলো তো আর দেখিতে পারবো না।’ আমরা আকাশভরা আলো দেখতে চাই। নামকরা শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবুর মতোই এই আশাবাদ বুকে ধরে রাখি। ‘ভোর হয়নি, আজ হলো না, কাল হবে কি না, তা-ও জানা নেই, পরশু ভোর ঠিক আসবেই'।

লেখক: গবেষক ও প্রভাষক, তাজপুর ডিগ্রি কলেজ। সিলেট।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন