আজ মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০ ইং

জৈন্তিয়া থেকেই জৈন্তা

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-০৭-০২ ১১:৫৫:২৫

ফয়েজ আহমদ বাবর :: সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন তখন সম্রাট নিজামের এলাহাবাদ বাদে একমাত্র জৈন্তিয়া রাজ্যেই ১৮৩৫ সালের ১৬ই মার্চ পর্যন্ত আজাদীর প্রতীক রূপে ‘সিংহ চিহ্ন সম্বলিত’ পতাকা উড়তো পত্ পত্ করে।আর এ রাজ্যের অধিবাসীরাই বুক ফুলিয়ে সাহসের সাথে ঘোষণা করতে পারত যে, আমরা স্বাধীন।

নিম্নে জৈন্তিয়া রাজ্যের নামকরণ: ইতিহাসের আলোকে নব প্রজন্মরা যাতে মাথা উঁচু করে বলতে পারে ইতিহাস সমৃদ্ধ, গৌরব দীপ্ত এক জাতি আমরা জৈন্তাপুরী, সেই ক্ষুদ্র প্রয়াস করছি মাত্র।

প্রথমত: প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে লিখিত জৈমিনি মহাভারতে (পৃষ্ঠা ১০৮৭) জৈন্তিয়া রাজ্যের অধিশ্বরী বীর রমণীর প্রমিলার কথা উল্লেখ করা আছে। জৈন্তিয়াকে প্রমিলা রাজ্য বা নারী রাজ্য বলা হতো। প্রমিলার রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে মহাবীর অর্জুন তাকে বিয়ে করেছিলেন। কহলীন রজত রঙ্গিনী গ্রন্থের বর্ণনা মতে, ‘কাশ্মীরের রাজা জয়পীড় এয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে দ্বিগ্বিজয়ে বের হন। ’ তিনি পূর্ব দেশীয় রাজা ভীমকে পরাজিত করে নেপাল রাজ্যে প্রবেশ করেন। তারপর তিনি জৈন্তিয়া রাজ্য জয় করেন। সে সময় জৈন্তিয়া পাহাড়কে কেন্দ্র করে জৈন্তা রাজ্যের সীমানা ছিল। ষোড়শ শতকে খাসিয়া রাজবংশের সময় থেকে জৈন্তা রাজ্যের অন্তর্গত অঞ্চল ছিল ১২ পুঞ্জি নিয়ে জৈন্তিয়া পাহাড় সিলেটের উত্তরাংশে সমতলভূমি নওগাঁ জেলার গোভা ও ভিমারণ্য অঞ্চল। রাজ্যের উত্তর-সীমায় অহম কামরুপ, পূর্বে-কাছার, দক্ষিণে-ত্রিপুরা ও গৌড় রাজ্য অবস্থান ছিল। জৈন্তাপুর বিশেষভাবে পরিচিত। প্রত্নতত্ব, নৃতাত্বিক এবং ভূতাত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের মিলনক্ষেত্র হিসেবে জৈন্তাপুরকে বর্ণনা করা যথোপযুক্ত। প্রাচীনকালে জৈন্তিয়া একটি স্বাধীন ও সমৃদ্ধশালী রাজ্য ছিল। জাইন্তিয়া শব্দ থেকে জৈন্তিয়া শব্দের উৎপত্তি।

দ্বিতীয়তঃ প্রত্নতাত্বিক রাজমোহন নাথের মতে, যে জাইন্তিয়ার লোকেরা আদিতে টিন বংশের ছিলেন। চীন দেশ থেকে এসেছিল বলে তাদের সিটিং বলা হয়। সিন্টিং হতে জাইন্তিয়া শব্দ এসেছে। জাইন্তিয়া আদিবাসীগণ ঝুহঃবহম নামেও পরিচিত। ড. সুনীত কুমার চ্যাটার্জির মতে সিন্টেং শব্দ হতে জাইন্টেং শব্দটি উৎপত্তি লাভ করেছে এবং সংস্কৃতকরণ বা আর্যকৃত হয়ে জৈন্তিয়া বা জাইন্তিয়া হয়েছে। অনেকের মতেই জয়ন্তিয়া বা জাইন্তিয়া শব্দটি সিন্টেং শব্দ হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। টেং নামক আদি রাজমাতা হতেই জাইন্তিয়ার প্রাচীন রাজবংশের উৎপত্তি হয়েছিল। সম্ভবত জাইন্তিয়া শব্দটি খাসিয়াদের Youngteng (ইয়ংটেং) বা Youngtrai (ইয়ংট্রাই) শব্দ হতে এসেছে। খাসিয়া ভাষায় ইয়ং অর্থ ‘নিজ’ বা ‘আপন’ এবং টেং হলো কোন আদিমাতার নাম বিশেষ। Youngteng এর অর্থ হলো, ‘‘টেং- এর দেশ’’ ব আপন ভূমি। আদি জাইন্তিয়া ‘‘ইয়ান্তা’’ নামেই পরিচিত ছিল।

ইয়ান্ত শব্দটি (ইয়ংট্রাই) শব্দ হতে উৎপত্তি লাভ করতে পারে। ইয়াংট্রাই অর্থ স্বদেশ বা আদিভূমি বা নিজ ভূমি। মধ্যযুগ পর্যন্ত আ-খাসিয়াগণ জয়ন্তিয়াপুরের রাজধানী ‘জয়ন্তিয়াপুর কে’ ‘নিজ পাট’ বলে ডাকত। তাছাড়া সিন্টেং জাইন্তিয়ার আদিবাসী ‘‘পার ’’ নামে অভিহিত হতে বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। পার কথাটির অর্থ হলো নিজ। অহংকার করে নিজেকে স্বদেশের উত্তরাধিকারী বোঝাতে পার শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। পার এর অর্থবোধক শব্দ হলো আদি অধিবাসী। তাই বলা যায় যে খাসিয়াদের নিজ দেশ বলতেই ইয়ান্তা বা জাইন্তিয়া বা জয়ন্তিয়া শব্দটি ব্যবহৃত করা হয়েছে। জাইন্তিয়ার আদিবাসীকে বোঝাতে পার- এর অ-আদিবাসীকে বুঝাতে ‘ডিখার’ বা রায়ত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রাচীনকালে এই জাইন্তিয়াপুরের রাজধানীকে ‘জাইন্তিয়া পার বলা হতো। জাইন্তিয়া পার হতেই জাইন্তিয়াপুর বা জয়ন্তিয়াপুর অতঃপর জৈন্তাপুর নামকরণ করা হয়েছে।

তৃতীয়ত: হট্টনাথের পাঁচালীর বর্ণনা মতে, প্রাচীণকালে কামরূপে, কামসিন্ধু নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। তার মহিষী রাণী উর্মি। কামসিন্ধুর মৃত্যুর পর প্রাগজ্যোতিষপুরের অধিপতি কামরূপ আক্রমণ করলে নিরূপায় ও অসহায় রাণী রাজধানী ত্যাগ করে নিজ রাজ্যের পশ্চিমাংশে এবং নারী রাজ্যের কিছু অংশ দখল করে একটি নতুন রাজ্য স্থাপন করেন। তিব্বতের হাটক রাজ্যের যুবরাজ কৃষক ভারত ভ্রমণে বের হয়ে রাণী উর্মির স্থাপিত জৈন্তারাজ্যে উপস্থিত হয়। ঘটনাচক্রে রাণী উর্মির সুন্দরী কন্যা উর্বরা কৃষকের দৃষ্টিপাত পতিত হন। কৃষক উর্বরা’র রূপ লাবণ্যে মোহিত হয়ে তার প্রেমে পতিত হন। ভুলে যান পিতৃরাজ্য হাটকে প্রত্যাবর্তনের কথা। রাণী উর্মিও কৃষকের নানাগুণে মুগ্ধ হয়ে নিজ কন্যাকে কৃষকের সাথে বিয়ে দেন। কালক্রমে কৃষকের ঔরষে ঊর্বরা এক পুত্র সন্তান লাভ করেন। নবজাতকের নাম পিতামহের রাজধানীর নামানুসারে রাখা হয়-হাটক। যুবরাজ হাটক বয়ঃপ্রাপ্ত হলে মাতামহীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।

তিব্বতের যুবরাজ ও রাজকুমারী উর্বরা’র স্বামী কৃষকের নামানুসারে এ বংশের নাম হয় কৃষক রাজবংশ এবং রাজবংশের কুলদেবতার নাম হয়-হাটকেশ্বর। রাজা হাটকের মৃত্যুর পর তার পুত্র গুহক সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেন। তার ছিল তিন পুত্র ও দুই কন্যা। পুত্রগণ হচ্ছেন লড্ডুক, গুড়ত, জয়ন্তক। গুহকের মৃত্যুর পর তার রাজ্য তিন পুত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। লড্ডুকের অধিকৃত ভূমির নাম হয় ‘লাউড়’। গুড়কের অংশের নাম হয় ‘গৌঢ়’ এবং জয়ন্তকের অধিকৃত ভূমির নাম হয় ‘জয়ন্তিয়া’। গুহকপুত্র জয়ন্তকের নাম হতেই ‘জৈন্তিয়া’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

চতুর্থত: আবার অনেকের মতে রাজা জয়ন্ত রায়ের তিন পুত্র ও এক পোষ্য কন্যা ছিলেন। কন্যার নাম ছিল জয়ন্তি। জয়ন্তীকে একটি বৃহৎ মাছের পেটে পাওয়া গিয়েছিল বলিয়া মাছের পেটে রানীও বলা হত। ইনি শৈশবে পর্বতের হুতুঙ্গা পুঞ্জিতে প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলিয়া রাজা তাহাকে সেই পুঞ্জিরি খাসিয়া সরদারের পুত্র লন্ডবের সহিত বিয়ে দিয়ে ছিলেন। খাসিয়া গণ বিবাহের পর শ্বশুরালয়ে চলিয়া যায় এবং কন্যা পিতৃগৃহে থাকে। ইহা তাদের চিরন্তনতা প্রথা সুতরাং এইজন্য রাজা নিজপাট নগরীসহ জৈন্তাপুরী রাজ পরগনা কন্যাকে, জাফলং পরগনা প্রথম পুত্র চারিকাটা পরগনা দ্বিতীয় পুত্র কে ফালজুর পরগনা তৃতীয় পুত্রকে বন্টন করা দিয়া পরলোকগমন করেন।

কালক্রমে কন্যা জয়ন্তী স্বীয় বুদ্ধি ও ক্ষমতা বলে অতিশয় পরাক্রান্ত হইয়া উঠেনা। এবং প্রথমে চারিকাটা পরে ফালজুর ও জাফলংএর অধীশ্বর কে পরাজিত করে জয়ন্তি তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যান। নিজের নামনুসারে অথবা পালক পিতার নামনুসারে "জয়ন্তা বা জন্তিয়া বলিয়া রাজ্যের নাম রাখেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দ থেকে ০৫ অব্দ পর্যন্ত জৈয়ন্ত দেব জৈন্তিয়া শাসন করেন। ৭৩৫ থেকে ৭৬৫ পর্যন্ত জয়ন্তক দেব জৈন্তা শাসন করেন। ১২৮৫ থেকে ১৩০৫ পর্যন্ত জয়ন্ত রায় শাসন করেন। ১৩০৫ থেকে ১৩২৫ পর্যন্ত জৈয়ন্তি দেবি জৈন্তা শাসন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় আরো ২৩ জন রাজা শাসন করেন সর্বশেষ সরল হৃদয়ের রাজা রাজেন্দ্র সিংহ বা ইন্দ্র সিংহ বিশ্বাসঘাতক ইংরেজ বন্ধু হারি সাহেবের কূটকৌশলে বিনা যুদ্ধে নিরস্ত্র শান্তভাবে পরাজয় বরণ করেন।

গেজেট মোতাবেক- ১৮৭২ সালে নামকরণ করা হয় জৈন্তিয়াপুর এবং ১৯০৮ সালে জৈন্তা নামকরণ করা হয় এবং তার সাথে পুর যোগ করা হয় (পুর একটি প্রত্যয় যার অর্থ নগর, আবাস এবং দুর্গ। ভারতের সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ ঋগ্বেদে শব্দটি নগর এবং বাসস্থান অর্থে প্রায় ৩০ বারের কাছাকাছি ব্যবহৃত হয়েছে) সেই থেকে জৈন্তাপুর।

নতুন প্রজন্মের কাছে আমার এই ছোট্ট প্রয়াস আমরা যাতে গর্ব করে বলতে পারি আমরা ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধশালী কিংডম জৈন্তিয়া রাজ্যের বাসিন্দা একজন জৈন্তাপুরী।

পরিশেষে বলতে চাই
জৈন্তিয়া আমার গর্ব
জৈন্তা আমার জন্ম-জন্মান্তরের অহংকার।

তথ্য সূত্র :
(১) চন্ডিমঙ্গল কাব্য - কবি কঙ্কন
(২) দি ক্যামব্রিজ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, ১৮৯৫ - E.J. Repson
(৩) বাঙ্গলার ইতিহাস - সুখময় বন্দ্যোপাধ্যায়
(৪) তারিখ এ ফিরুজশাহী - রামপ্রাণগুপ্ত সম্পাদিত
(৫) স্ট্যাটিক্যাল একাউন্টস অব আসাম(১ম খন্ড)
(৬) এলএ. স্যাটেলমেন্ট
(৭) মহাভারত
(৮) ঋগ্বেদ
(৯) জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস, মাস্টার আব্দুল আজিজ।
(১০) ইতিহাস-ঐতিহ্যে জৈন্তিয়া, মোঃ কলিম উল্লাহ।
(১১) জৈন্তিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, নুরুল ইসলাম ৷

লেখক: সহকারি অধ্যাপক, জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজ।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন